Sunday, 19 November 2017

 

স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক বাকৃবির বিজয়’৭১

আবুল বাশার মিরাজ:৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালীর চেতনায় চির ভাস্মর এক ঐতিহাসিক ঘটনা। দেশের সর্বস্তরের মানুষের মহান দেশপ্রেমের নিদর্শন আমাদের স্বাধীনতা। এই মহান সংগ্রামে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন মুক্তিযোদ্ধারা। রাজপথে নিজের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে ছিনিয়ে এনেছেন বাংলার স্বাধীনতা। বাঙ্গালী এক মহান জাতি। কেননা শুধু আমরাই করেছি ভাষার জন্য সংগ্রাম, দেশকে স্বাধীন করার জন্য দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। পৃথিবীর মানচিত্রে আমরাই এঁকেছি লাল-সবুজের বাংলাদেশ।

১৯৭১ সালের এই মহান মুক্তির সংগ্রামে বাংলার সর্বস্তরের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে। তারই মূর্ত প্রতীক বিখ্যাত ভাস্কর শ্যামল চৌধুরীর বিজয়’৭১ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) অবস্থিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তনের সামনে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে বিজয়’৭১। পরম আকাঙ্খিত বিজয়ের এ চিহ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ অসংখ্য বাঙালির প্রেরণার উৎস।

ভাস্কর্যটি দুইটি অংশে বিভক্ত। মূল অংশে ৬ ফুট বেদির উপর রয়েছে একজন নারী, একজন কৃষক ও একজন ছাত্র মুুক্তিযোদ্ধার নজরকাড়া ভঙ্গিমা যা দর্শনার্থীদের বারবার মনে করিয়ে দেয় মুুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোর কথা। একজন কৃষক মুুক্তিযোদ্ধার হাতে শোভা পায় লাল-সবুজের পতাকা। দৃষ্টি তার অসীম আকাশের দিকে, এইতো স্বাধীন বাংলাদেশ, স্বাধীন দেশের মানুষের উপর নেই কোন অত্যাচার, নেই কোন নির্যাতন, সুখে শান্তিতে দিন কাটাচ্ছে এই দেশের মানুষেরা। দু’চোখে তার শুধু প্রেরনা, স্বাধীন হবে বাংলাদেশ। তার ডান পাশেই শাশ্বত বাংলার সর্বস্বত্যাগী ও সংগ্রামী এক নারী দৃঢ়চিত্তে আহ্বান জানাচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের। যার সঙ্গে আছে রাইফেল, নেই কোন ভয়। অকুতোভয় এ নারী সবাইকে বলছে, এসো জেগে উঠি, নারী-পুরুষ সবাইমিলে দেশকে স্বাধীন করি, দেশকে হানাদার মুক্ত করি।

অন্যদিকে একজন ছাত্র যার ডান হাতে আছে গ্রেনেড আর বাম হাতে রাইফেল। তেজোদীপ্ত চিত্তে দাড়িয়ে নয়া যৌবনের আভা ছড়াচ্ছে তার চারদিকে। মনের দীপ্ত সংকল্প নিয়ে সে যেন বলছে-কে আছিস সামনে আয়, দেশকে মুক্ত করবই। অপর অংশে বেদির দুই পাশে রয়েছে বাংলাদেশের অভ্যূথানের গল্প। এতে চিত্রিত হয়েছে ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ’৬৬ এর  ছয় দফা, শিক্ষা আন্দোলনসহ বহু আন্দোলনে বাঙ্গালির স্বতস্ফূত অংশগ্রহন।  

বিজয়’৭১ ভাস্কর্যটির নির্মান কাজ শুরু হয় ১৯৯৮ সালে। প্রায় ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভাস্কর্যটির কাজ ২০০০ সালের জুন মাসে শেষ হয়। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা ইতিহাস সম্বন্ধে দর্শনার্থীদের কিঞ্চিৎ হলেও ধারণা দেয় এই ভাস্কর্য। আর তাই বিজয়’৭১ ভাস্কর্যটি দেখতে প্রায় প্রতিদিন অগণিত মানুষ ভিড় জমায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয় শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা।

ভাস্কর্যটির বেদিতে খালি পায়ে উঠার নিয়ম থাকলেও প্রায়ই দেখা যায় অনেকেই সে নিয়মের তোয়াক্কা না করে জুতো পড়ে উঠে। উৎসাহিত হয় বাংলাদেশের মানুষের সফল আন্দোলনের জীবন্ত এই মূর্ত প্রতীক দেখে। এ জাতি গর্ব করে বলতে পারে বাঙালীই একমাত্র জাতি যারা ভাষার জন্য যুদ্ধ করেছে, দেশকে স্বাধীন করেছে মাত্র নয় মাস যুদ্ধ করে, শহীদ হয়েছে ৩০ লক্ষ মানুষ, হারিয়েছে হাজার হাজার মা-বোনের ইজ্জত। দেশকে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নের আদলে সাজাতে আপোষহীন এ জাতি কখনও মাথা নোয়াবার নয়। তাইতো ভাস্কর্যটিতে একপাশে লিখা রয়েছে কিশোর বিদ্রোহি কবি সুকাস্ত ভট্টাচার্যের সেই অমর কথা-‘সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুরে মরে ছারখার তবু, মাথা নোয়াবার নয়।’