Friday, 17 November 2017

 

মুরগীতে প্রোলাপস্

কৃষিবিদ রুহুল আমিন মন্ডল:উচ্চ উৎপাদনশীল মুরগীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ডিম পাড়া মুরগীতে (ব্রিডার,লেয়ার) সর্বোচ্চ ডিম উৎপাদনের সময় যে সমস্যা বড় আকার ধারন করে তা হল প্রোলাপস্। কোন মুরগীতে প্রোলাপস্ হলে খুব কম ক্ষেত্রেই ভাল হয়, হয় জবাই করে ফেলতে হয় অথবা মরে যায়।  আবার কোন ফ্লকে প্রোলাপস্ বেড়ে গেলে সেখানে ভেন্ট পিকিং এর পরিমান বেড়ে যায় এবং এই বদ অভ্যাস সমস্ত ফ্লকের মধ্যে ছড়িয়ে পরলে তা বন্ধ করা খুবই মুশকিল হয়ে যায়। সেজন্য প্রোলাপস্ সর্ম্পকে সঠিক জানা সকলের জন্য জরুরী।

প্রোলাপস্ কি?

সাধারনত: মুরগী ডিম পাড়ার সময় তার প্রজননতন্ত্রের নালীর নিচের অংশ ক্লোয়কা দিয়ে সামান্য বের হয়ে আছে, যা ডিম পাড়ার পর তাৎক্ষণিক আবার আর সেই অবস্থায় ফিরে যায়। কিন্তু কখনও যদি প্রজননতন্ত্রের নালী বের হয়ে আসার পর আর তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে না আসে, তাহলে তা প্রোলাপস্।

প্রোলাপস্ এর লক্ষণ:

প্রোলাপসের প্রথম এবং প্রধান লক্ষণ হল ডিমের খোসায় রক্তের দাগ পাওয়া্। এছাড়া মুরগীর প্রজননতন্ত্রের পিছনের অংশ ক্লোয়াকা দিয়ে বের হয়ে আসে এবং ভেন্টের চারপাশের পাখনাগুলো রক্ত মাখা থাকে।

প্রোলাপসের কারণ:

১) ওজন: অত্যাধিক ওজন এবং অপর্যাপ্ত ওজন উভয়ই প্রোলাপসের জন্য দায়ী।
২) প্রজননতন্ত্রের অসমবৃদ্ধি:ডিম পাড়া মুরগীর ক্ষেত্রে ১৫-১৮ সপ্তাহ বয়স খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।এই সময়ে মুরগীর প্রজননতন্ত্র পুরাপুরি ভাবে বিকশিত হয়।যদি ১৫-১৮ সপ্তাহ বয়সে কোন সমস্যার কারনে প্রজননতন্ত্রের সঠিকভাবে বিকশিত হতে না পারে, বিশেষ করে পিউবিক বোন। তাহলে পরবর্তীতে ডিম পাড়ার সময় প্রোলাপসের সমস্যা দেখা দেয়।
৩) লাইটিং:পুলেটে ডিম পাড়ার আগে যে লাইট ষ্টিমুলেশন দেয়া হয়, তা যদি বয়স ও শারিরীক ওজনের সাথে সামঞ্জস্য না হয়, তাহলে পরবর্তীতে প্রোলাপস দেখা যায়।
৪) অপর্যাপ্ত পুষ্টি:যথেষ্ট পরিমান পুষ্টির স্বল্পতার কারনে বিশেষ করে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দিলে প্রোলাপস হয়।কারণ ক্যালসিয়াম ম্যাসলের স্থিতিস্থাপকতা ঠিক রাখে।ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হলে ডিম পাড়ার সময় যে ডিম্বনালী সামান্য বেড়িয়ে আসে তা আর পূর্বের অবস্থায় ফিরতে পারে না ফলে প্রোলাপস হয়।
৫) ডিমের আকার:ডাবল কুসুম ডিম বা বড় আকারের ডিম বা বিকৃত ডিমের পরিমান বেশী হলে, ডিম পাড়তে গিয়ে মুরগীর ক্লোযাকার স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হয়, ফলে প্রোলাপস হয়।
৬) ডিম্বনালীতে ইনফেকশন:ডিম্বনালীতে ব্যাকটেরিয়ার লোড বেশী থাকলে ইনফেকশন হয়, যা প্রোলাপসের জন্য দায়ী।
৭) আলোর তীব্রতা:আলোর তীব্রতা বেশী হলে কিংবা বেশী সময় ধরে আলো দিলে, ভেন্ট পিকিং বেড়ে যায়। যার ফলশ্রুতিতে প্রোলাপস হয়।
৮) ফ্যাটি লিভার সিনড্রোম সমস্যা দেখা দিলে প্রোলাপস হয়।
৯) ডিম পাড়ার শেষের দিকে যখন লেয়ার মুরগীর বয়স বেশী হয়,তখন প্রোলাপসের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

প্রোলাপসের প্রতিরোধ:

১) ওজন নিয়ন্ত্রণ: প্রোলাপস প্রতিরোধ করার জন্য ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।বয়স অনুপাতে লেযার বা ব্রিডারের ওজন যত হয়, তা রাখার চেষ্টা করতে হবে। সে জন্য বয়স অনুপাতে ফিড সরবরাহ করতে হবে।
২) ফটোস্টিমুলেশন: বয়স, ওজন, পিউবিক বোনের ফাঁক এবং পেলভিক অঞ্চলে ফ্যাট জমা; এইসব বৈশিষ্ট্য দেখে ফটোস্টিমুলেশনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যাতে ফটোস্টিমুলেশন আগে না হয়ে যায়।
৩) পর্যাপ্ত পুষ্টি সরবরাহ:ফিডের ফরমুলেশন বয়স অনুপাতে সঠিক মাত্রায় হতে হবে, যেন বয়স অনুপাতে সমস্ত পুষ্টি উপাদান সঠিক মাত্রায় থাকে।বিশেষ করে ডিম পাড়ার সময় ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।যদি ফিডে কোন উপাদান কম হয়, তাহলে পানির মাধ্যমে তা সরবরাহ করতে হবে।
৪) আলোর তীব্রতা নিয়ন্ত্রণ:আলোর তীব্রতা বেশী হলে ভেন্ট পিকিং এর পরিমান বেড়ে যায়। তাই ফ্লকের মধ্যে আলোর তীব্রতা নিয়ন্ত্রন করতে হবে।
৫) ডিবেকিং:ডিবেকিং না করলে বা  ডিবেকিং ঠিক মত না হলে মুরগীতে ভেন্ট পিকিং এর পরিমান বেড়ে যায়। ফলে প্রোলাপস দেখা দেয়। এজন্য ডিবেকিং সঠিক সময়ে, সঠিক ভাবে করতে হবে।
৬) ইন্টারাইটিস:মুরগীর গাটে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বেড়ে গেলে ইন্টারাইটিস হয়, ফলে ডায়রিয়া বেড়ে যায় এবং প্রোলাপস হওয়ার সম্ভবনা দেখা দেয়।
৭) ফ্লক ইউনিফরমিটি সর্বোচ্চ পরিমানে রাখতে হবে।
৮) কম ওজনের মুরগী ও বেশী ওজনের মুরগী আলাদা রাখতে হবে।
৯) সর্বাবস্থায় মুরগী জায়গা অনুপাতে ঘনত্ব ঠিক রাখতে হবে।
১০) হঠাৎ করেই যেন তাপমাত্রা অত্যধিক বেশী বা কম না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
১১) মশা, মাছি, ইদুরের উপদ্রব নিয়ন্ত্রন করতে হবে।

প্রোলাপসের প্রতিকার:

১)কোন মুরগীতে প্রোলাপস হলে তা দ্রুত ফ্লক থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। তা না হলে ভেন্ট পিকিং সমস্ত ফ্লকে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
২) আক্রান্ত মুরগীর ডিম্বনালী যে অংশ বেরিয়ে এসেছে, তা আঙ্গুলের সাহায্যে ভিতরে ঢুকিয়ে দিতে হবে।
৩) আক্রান্ত মুরগীর ফ্লকে ক্যালসিয়াম সহ অন্যান্য ভিটামিন ও মিনারেল সরবরাহ করতে হবে।বিশেষ করে সোডিয়াম ক্লোরাইড দিতে হবে।
৪) প্রয়োজন হলে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যেতে পারে।
৫)যদি ভেন্ট পিকিং এর পরিমান বেড়ে যায় তাহলে সাদা আলোর পরিবর্তে লাল আলো ব্যবহারে বেশ সুফল পাওয়া যায়।
=================
লেখক পরিচিতি:-
সিনিয়র ফার্ম ম্যানেজার,
নারিশ পোল্ট্রি এন্ড হ্যাচারী লিঃ,
ইমেইল:
মোবাইলঃ ০১৯১৯-৮৪১৮৭৩