Thursday, 23 November 2017

 

রোহিঙ্গা সমস্যা-সমাধানে আবেগ নয়, বিবেক দিয়ে ভাবুন

মো. আব্দুর রহমান:নাফ নদী আবারও রক্তাক্ত। লালে লাল নদীর পানিতে ভাসছে পঁচা, অর্ধগলিত শিশু, যুবা, পুরুষ, নারীর লাশ। গর্ভবতী মায়েরা সন্তান জন্ম দিচ্ছে জঙ্গলে-পাহাড়ে। আক্রমণকারী মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, যারা অহেতুক আরাকান রাজ্যের একটি অত্যাচারিত জনগোষ্ঠীকে ক্লান্তিহীনভাবে হত্যা করে চলেছে। বাড়িঘর পুড়ছে, গ্রামকে গ্রাম, শহরের পর শহর জ্বলছে আর হাজার হাজার অত্যাচারিত নর-নারী ও শিশু যা কিছু সম্বল পিঠে-পেটে-কাঁধে সেগুলো পোঁটলা করে বেঁধে ছুটছে আশ্রয়হীন অবস্থায় অজানা গন্তব্যে। কোন রকম প্রাণ নিয়ে এসে বাংলাদেশে শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। এই সাময়িক আশ্রয়েই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল?

হয়তো ভয়ানক গুলির শব্দ আর মৃত্যু ভয় থেকে রোহিঙ্গারা রক্ষা পেয়েছে বাংলাদেশ সরকারের মানবিক সহায়তায় জন্য। কিন্তু মায়ানমার থেকে পালিয়ে আসা এই রোহিঙ্গাদের নিত্য পেট ভরে খাবার না পেলেও কিছু খাবার লাগছে। এই খাবারগুলো আসবে কোথায় থেকে? যেখানে বন্যার ক্ষত থেকেই বের হতে পারছেনা বাংলাদেশ। হয়তো কিছু দেশ সাময়িক সময়ের জন্য কিছু ত্রাণ দিচ্ছে। সব সময় কি এই ত্রাণ দিয়ে যাবে ওরা?

ইতিহাসের কোন ঘটনা নেই যে সব সময় ত্রাণ দিয়ে যাবে। এক সময় সবাই চুপ হয়ে যাবে। তখন মানবিক আশ্রয় দেয়া রোহিঙ্গাদের খাবার সরবরাহ হবে আমার আপনার খাবারের অংশ থেকে। কিন্তু এই যে ভয়াবহ সংকট এর সমাধান কি? বাংলাদেশ যে হুমকিতে পড়তে যাচ্ছে এই বিষয়টা ঘোলাটে মনে হলেও স্পষ্ট।

বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে নিয়মিতই রোহিঙ্গারা ঢুকছে। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা এই প্রায় সাড়ে ৪ লাখ রোহিঙ্গাদের পূর্ণবাসনের জন্য কোন আন্তর্জাতিক উদ্যোগও দেখছি না। এটা বাংলাদেশের জন্য মোটেও ভাল খবর নয়। বাংলাদেশে গত বিশ বছরে যে পাঁচ লাখের মতো রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে তাদের বেশিরভাগই নিজ দেশে ফিরে যায়নি। এরা কক্সবাজার আর পার্বত্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে আর নানা ধরণের জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েছে। আবার নতুন করে যদি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হয়, তারা দাঙ্গা শেষে নিজে দেশে ফিরে যাবে- এই নিশ্চয়তা আছে? বাংলাদেশের বাড়তি জনসংখ্যার জন্য এমনিতেই দেশ হিমশিম খাচ্ছে। তাহলে মিয়ানমার যদি রোহিঙ্গাদের ফিরেয়ে না নেয় বাংলাদেশের ভবিষ্যত কি হবে?

তাই রোহিঙ্গাদের প্রতি অন্যায় দেখে আবেগি হলেও, আমাদের বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। রোহিঙ্গাদের সাথে বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক সন্ত্রাসি রাজনৈতিক গোষ্ঠির আঁতাতের কারণে আমাদের দেশের শান্তি ও শৃংখলার কথাটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

বাংলাদেশের ভেতর শরণার্থী শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদেরকে কক্সবাজার সংলগ্ন একটি দ্বীপে জায়গা করে দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার। এটি এ কারণেই যে, বাংলাদেশের মতো জনবহুল একটি দেশের পক্ষে ক্রমবর্ধমান রোহিঙ্গা মুসলিম জনসংখ্যার চাপ সামলানো খুব সহজ কাজ নয়। সম্পদ ও স্থান বিচারে বাংলাদেশের তুলনায় মিয়ানমারের অবস্থা শতগুণ ভালো। সেখানে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের স্থান সংকুলানে কোনও ধরনের সমস্যা হওয়ার কথা নয়, অথচ বিষয়টিকে সে দেশের সরকার এমনভাবে দেখছে যেন, এই সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিতাড়িত করা গেলে রাষ্ট্রটি যেন বেঁচে যায়। সে কারণে পুলিশ, সেনা বাহিনী ও সংখ্যাগুরু বৌদ্ধদের যুগপৎ লেলিয়ে দিয়ে রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়কে উৎখাতের প্রচেষ্টা চলছে।

মায়ানমার রাষ্ট্রটি পৃথিবীর বাইরের কোনও রাষ্ট্র নয়। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘেরও দায়িত্ব রয়েছে রাষ্ট্রটির সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা ও পূর্ণ নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার। তবে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ অবশ্যই শরণার্থী হিসেবে রোহিঙ্গাদের সাহায্য-সহযোগিতা করবে কিন্তু সমস্যাটির সমাধান যে মিয়ানমারকেই করতে হবে সে ব্যাপারে বাংলাদেশের অবস্থান বদলানো হবে আত্মঘাতী, তা পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো থেকে যতোই এ ব্যাপারে চাপ আসুক না কেন। আর সে জন্যই অবিলম্বে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির ঠেঙ্গারচরে সরিয়ে নেওয়াই হবে সঠিক পদক্ষেপ। এ বিষয়ে কারও দূতিয়ালিকেই পাত্তা দেওয়া উচিত হবে না বাংলাদেশের।
*****************************
লেখক:
সাংবাদিক ও ইর্ন্টানী শিক্ষার্থী
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২।