Thursday, 23 November 2017

 

খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় ব্রি'র গৌরবময় ৪৭ বছর

কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন:আবহমানকাল থেকে ধানকে এদেশের জাতীয় সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সম্প্রতি ইরি’র মাসিক মূখপত্র রাইস টুডে এক প্রতিবেদনে লিখেছে, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা বলতে মূলত ধান বা চালের নিরাপত্তাকেই বোঝায়। ক্রিশ্চিয়ান সাইন্স মনিটর পত্রিকায় ২০১৫ সালে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, অতীতের তীব্র খাদ্য ঘাটতির বাংলাদেশ বর্তমানে উদীয়মান অর্থনীতির নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে, যা সম্ভব হয়েছে কেবল চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূণর্তা অর্জন বা খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণের মাধ্যমে। ফলশ্রুতিতে এ অর্জনের ইতিবাচক মূল্যায়ন দেশে যেমন হচ্ছে, তেমনি হচ্ছে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও।

২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে ব্রি পরিদর্শনে এসে বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিও মজিনা খাদ্য নিরাপত্তায় এর অবদানের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেছিলেন, অতীতের তলাবিহীন ঝুড়ি কীভাবে উদীয়মান অর্থনীতির নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হলো, সে প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন তিনি ব্রিতে এসে। বর্তমান স্বয়ংসম্পূর্ণতা বা উদ্বৃত্ত উৎপাদন একদিনে অর্জিত হয়নি; এর পেছনে রয়েছে সরকারের কৃষি বান্ধব নীতি, দেশের ধান বিজ্ঞানীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং কৃষকের নিরলস পরিশ্রম।

মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার প্রথমটিই খাদ্য আর বাংলদেশ ৯০ভাগ লোকের প্রধান খাবার ভাত। কোন দেশের শিল্প, সাহিত্য, অর্থনীতি কিংবা রাজনীতি সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় এই খাদ্য নিরাপত্তা দিয়ে। দেশের জনসংখ্যা যখন ১৮কোটি, তখন এত মানুষের খাবারের যোগান দেয়া সহজ কথা নয়। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এই বিশাল চ্যালেঞ্জই গত ৪৭ বছর ধরে মোকাবেলা করে যাচ্ছে এদেশের খাদ্য নিরাপত্তার কান্ডারী বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। বন্যার ধান, খরার ধান, লোনার ধান, শীত প্রধান অঞ্চলের ধান, জিংক সমৃদ্ধ ধান (বিশ্বেও প্রথম) ও হাইব্রিড ধানসহ গত ৪৭ বছরে  ৮৫টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে ব্রি। দেশের অন্নদাতা এই প্রতিষ্ঠানটির আজ ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। শুভ জন্মদিন ব্রি!।

১৯৭০ সালের ১লা অক্টোবর প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত সাড়ে চার দশকের বেশি সময় ধরে ব্রি এদেশের ক্রমর্বধমান জনসংখ্যার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করণে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে। বিগত চার দশকে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেলেও খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে তিনগুণেরও বেশি। ১৯৭০-১৯৭১ সালে এদেশে চালের উৎপাদন ছিল মাত্র ১কোটি টন। ৪৭ বছরের ব্যবধানে আজ ২০১৭ সালে এসে দেশে যখন জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। বর্তমানে চাল উৎপাদন হচ্ছে ৩ কোটি ৮৬ লক্ষ টনের বেশি। আগে যে জমিতে হেক্টরপ্রতি ২-৩ টন ফলন হতো এখন উফশী জাতের ব্যবহারের কারণে ফলন হচ্ছে ৬-৮টন। উৎপাদন গতিশীলতার এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে চালের উৎপাদন হবে ৪ কোটি ৭২ লাখ টন। বিপরীতে ২০৫০ সালে ২১ কোটি ৫৪ লাখ লোকের খাদ্য চাহিদা পূরণে চাল প্রয়োজন হবে ৪ কোটি ৪৬ লাখ টন। অর্থাৎ গত পাঁচ বছরের চালের উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে দেশে ২৬ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। এটাই আপাতত টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের অভীষ্ট লক্ষ্য, যা সামনে রেখে নিম্নোক্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কাজ করছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)।



ব্রি উদ্ভাবিত জাতের মধ্যে বোরো মৌসুমে সর্বাধিক ফলন ও কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক জনপ্রিয় ব্রি ধান২৮ এবং ব্রি ধান২৯। আমন মৌসুমে অনুরূপ সফলতার নজির সৃষ্টি করেছে বিআর১১ জাতটি। এই জাতগুলোকে বলা হয় মেগা ভ্যারাইটি (বহুল ব্যবহৃত জাত)। সময়ের চাহিদার প্রেক্ষাপটে এই জাতসমূহের পরিপূরক অনেক জাত পরবর্তীতে উদ্ভাবন করা হয়েছে এবং মাঠ পর্যায়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিশ্বের সর্বপ্রথম জিংক সমৃদ্ধ সমৃদ্ধ ধানের জাত (ব্রি ধান৬২), এন্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ধান (বিআর৫), ডায়বেটিক ধানের (বিআর১৬)  জাত উদ্ভাবন এবং প্রো-ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ গোল্ডেন রাইসের জাত উন্নয়ন করে সারা বিশ্বের সুনাম অর্জন করেছেন ব্রির বিজ্ঞানীরা। বিশেষতঃ ব্রি উদ্ভাবিত বিআর১৬ এবং বিআর২৫ লো জি.আই বা নিম্ন গ্লাইসেমিক ইনডেক্স গুণ সম্পন্ন জাত হওয়ায় এগুলোর ভাত ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য নিরাপদ। অনেকেই এই দুটি জাতকে ডায়বেটিক রাইস বলে থাকেন।

স্বল্প জীবনকালের রোপা আমন ধানের জাত ব্রি ধান৩৩ উদ্ভাবন করা হয় ১৯৯৭ সালে। দেশের উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে বৃহত্তর রংপুরে আমন মৌসুমে এ ধানের চাষাবাদ মরা কার্তিকে মঙ্গাজনিত মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ব্রি ধান৬২ এর গড় জীবনকাল ব্রি ধান৩৩ এর চেয়েও কম (১০০ দিন)। ধান ফসলের জীবনকাল কমিয়ে আনার মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে ব্রি’র সফলতার ধারায় এটি অন্যতম মাইল ফলক।

প্রাথমিক পর্যায়ে ব্রি’র গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল অল্প জমি থেকে বেশী পরিমাণ ধান উৎপাদন করা। বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানোই ছিল তখনকার মুল লক্ষ্য। বর্তমানে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে সেই সঙ্গে মানুষের চাহিদা ও রুচির পরিবর্তন এসেছে । তাই উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সরু-সুগন্ধি এবং রপ্তানীর উপযোগি প্রিমিয়াম কোয়ালিটির বেশ কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করেছে ব্রি। ধান গবেষণায় যুগান্তকারী সাফল্যের ফলে ব্রিকে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের জনগণ একটি অন্নদাতা প্রতিষ্ঠান হিসাবে স্বীকৃতি দান করেছে। ভিটামিন এ সমৃদ্ধ ধান, রক্ত শূণ্যতা ও  ডায়রিয়া রোগীদের জন্য উপকারী প্রায় ২০-২৪পিপিএম জিংক সমৃদ্ধ ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৬৪ অবমুক্ত করার ফলে ব্রি অন্নদাতা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি পুষ্টিদাতা প্রতিষ্ঠান হিসাবেও স্বীকৃতি লাভ করছে।

ধান গবেষণায় ব্রি’র সাফল্য জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ব্রি উদ্ভাবিত ধানের আবাদ দেশের সীমা ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। বেশ কিছু দেশে যেমন- ভারত, নেপাল, ভুটান, ভিয়েতনাম, মায়ানমার, চীন, কেনিয়া, ইরাক, ঘানা, গাম্বিয়া, বুরুন্ডি ও সিয়েরালিয়েনসহ অনেক দেশে ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত ব্যবহার করছে। পৃথিবীর ১৪টি দেশে বর্তমানে ১৯ জাতের ব্রি ধানের আবাদ হচ্ছে। বিজ্ঞান ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ব্রি তিনবার স্বাধীনতা দিবস স্বর্ণপদক ও তিনবার রাষ্ট্্রপতির স্বর্ণপদক, দুইবার বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদকসহ জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে ২১টি পুরস্কার লাভ করেছে। দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় ব্রির সাফল্যের এই ধারা অব্যাহত থাকুক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এই কামনা করি।

লেখকঃ উর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, ব্রি, গাজীপুর।
মেইল:smmomin80@.com