Thursday, 23 November 2017

 

পোল্ট্রিতে স্ট্রেস (Stress) বা ধকলঃ একটি নিরব ঘাতক

কৃষিবিদ রুহুল আমিন মন্ডল:পোল্ট্রিতে স্ট্রেস (Stress) বা ধকল একটি নিরব ঘাতক হিসাবে কাজ করে। অনেক সময় খামারী ভাইদের অজ্ঞতার কারণেই মুরগী স্ট্রেসে পরে। বিশেষ করে ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগীতে স্ট্রেস  খুবই মারাত্বক একটি ঘাতক হিসাবে দেখা দেয়। পরিবেশের কারণে, শরীর বৃত্তীয় কার্যকলাপের কারণে অথবা খামারীদের অজ্ঞতার কারণে মুরগী আমাদের অজান্তেই স্ট্রেসে পরে যায়। যার ফলে ঐ মুরগী থেকে কাঙ্খিত ফলাফল পাওয়া যায় না। পোল্ট্রি মুরগী খুবই সংবেদনশীল। সামান্য কারণেই স্ট্রেসে পরে। তাই সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য এটা জানা অবশ্যই জরুরী। মুরগী কি কারণে স্ট্রেসে পরে এবং তা থেকে উত্তোরণের উপায় কি?

স্ট্রেসের প্রকারভেদঃ
মুরগীর স্ট্রেস কে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়। নিম্নোক্ত প্রকারভেদ গুলো উদাহরণসহ উল্লেখ করা হলঃ

(ক) পরিবেশগত স্ট্রেস(Environmental Stress)-পরিবেশগত স্ট্রেসের মধ্যে রয়েছেঃ

  • অত্যাধিক গরম বা ঠান্ডা
  • ভেজা লিটার
  • অ্যামোনিয়া
  • খারাপ ভেনটিলেশন
  • বৃষ্টিপাত
  • কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ
  • অত্যাধিক আর্দ্রতা

(খ) নিউট্রিশনাল স্ট্রেস (Nutritional Stress)-নিউট্রিশনাল স্ট্রেসের মধ্যে রয়েছেঃ  

  • কোন নিউট্রিশনের ঘাটতি
  • কোন নিউট্রিশনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার- গরম কালে বেশী ভিটামিন খাওয়ালে পাতলা পায়খানা হয়।
  • হঠাৎ করে খাদ্যের ফরমুলেশন পরিবর্তন
  • অস্বাস্থ্যকর ফিড সরবরাহ

(গ) ফিজিওলজিক্যাল স্ট্রেস (Physitogical Stress)-মুরগীর যে স্বাভাবিক শরীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ রয়েছে অনেক সময় সে কারণেও স্ট্রেসে পড়ে। এর মধ্যে রয়েছেঃ

  • মুরগীর দ্রুত বৃদ্ধি সাধন
  • পিউবারটি
  • প্রথম ডিম পাড়া
  • সর্বোচ্চ উৎপাদনের সময়
  • তীব্র লাইট
  • মোল্টিং

ঘ) ফিজিক্যাল স্ট্রেস (Physical Stress)-মুরগীর ফার্মে দৈনন্দিন কিছু কার্যকলাপ আছে যা অত্যাবশ্যক করণীয়। কিন্তু সেসব কাজ করতে গেলেও মুরগী স্ট্রেসে পড়ে। যেমনঃ

  • মুরগী ধরা
  • ইনজেকশন দেয়া
  • ভ্যাকসিনেশন করা
  • মুরগী বাছাই করা
  • পরিবহন করা
  • ঠোঁট কাটা

(ঙ) মানসিক স্ট্রেস (Psychological Stress)-কিছু কিছু কার্যকলাপের কারণে মুরগী মানসিক স্ট্রেসে পরে। যেমন

  • ভয় পাওয়া
  • ফার্মের ভিতর অস্বাভাবিক কিছু করা
  • শত্রুর আক্রমণ-বন্য বিড়াল, শিয়াল ইত্যাদি

(চ) প্যাথলজিক্যাল স্ট্রেস (Pathological Stress)-সাধারনত কোন রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর আক্রমণের কারণে মুরগী প্যাথলজিক্যাল স্ট্রেসের মধ্যে পরে। প্যাথলজিক্যাল স্টে্েরসর মধ্যে রয়েছে-

  • পানিতে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি বিশেষ করে ই. কোলাই
  • পানির পি-এইচ
  • লিটারে প্রোটোজোয়া ও ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি

স্ট্রেসের কারণসমূহঃ

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, পোল্ট্রি মুরগী অন্য যেকোন প্রাণীর চেয়ে বেশী স্পর্শ কাতর। তাই পোল্ট্রি মুরগীতে স্ট্রেসের বহুবিধ কারণ রয়েছে। সমস্ত কারণ বিস্তারিত ভাবে এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে আলোচনা করা সম্ভবনা। তাই উল্লেখযোগ্য কিছু কারণ নিম্নে আলোচনা করা হলো।

১. মুরগী ধরাঃ এইটি হলো মুরগী জন্য সবচেয়ে বড় স্ট্রেস। সাধারণত মুরগী ধরতে চাইলে সহজে ধরা যায় না। এ জন্য যা করা হয় তা হল, জোরপূবক ধরার জন্য মুরগীকে ধাওয়া করা হয়। এতে সেই মুরগীসহ ফ্লোকের সমস্ত মুরগী প্রচন্ড ভয় পায়। এই স্ট্রেস মুরগী সমস্ত দৈহিক কার্যকালাপ ব্যহত করে।

২. নতুন অতিথির আগমনঃ যেহেতু মুরগীকে একসাথে ফ্লোক অনুযায়ী পালন করা হয় সেহেতু প্রত্যেক মুরগীই স্থান ও খাবারের জায়গা নির্দিষ্ট করে রাখে। ফলে ঐ ফ্লোকে নতুন কোন মুরগী দিলে সে তার খাবারের জায়গা খুজে পায় না। আবার পুরাতন মুরগী সেই নতুন মুরগীকে সহজে গ্রহন করে না। এতে মুরগী বড় ধরণের স্ট্রেসে পড়ে।

৩. পর্যাপ্ত খাবার ও পানির অভাবঃ মুরগীর সংখ্যা ও বয়স অনুপাতে খাবার ও পানি গ্রহনের অনুপাত বাড়ে-কমে। আবার ঋতুর তারতম্য ভেদে পানি গ্রহনের পরিমান বাড়ে কমে। যেমন গ্রীষ্মকালে পানি গ্রহনের পরিমান বেড়ে যায়। সেক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পানির অভাব হলে মুরগী স্ট্রেসে পড়ে। আবার সর্বোচ্চ উৎপাদনের সময় খাবার গ্রহণের পরিমান বাড়ে। সে সময় পর্যাপ্ত খাবারের অভাব হলে মুরগী স্ট্রেসে পড়ে।

৪. অত্যাধিক তাপমাত্রাঃ মুরগীর শরীরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের গ্রন্থি নেই। সেজন্য অত্যাধিক তাপমাত্রা দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তাপমাত্রা ত্যাগ করার জন্য মুখ হা করে তাপ নিঃসরণের চেষ্টা করে। তাই অত্যাধিক তাপমাত্রা মুরগীকে স্ট্রেসের মধ্যে ফেলে দেয়।

৫. ডিম পাড়াঃ ডিম দেওয়া যদিও একটি প্রাকৃতিক ঘটনা তবুও প্রথম প্রথম ডিম পাড়া মুরগীর জন্য একটি বড় রকমের স্ট্রেস। এজন্য মুরগীকে ডিম পাড়ার জন্য আরামদায়ক, শান্তিপূর্ণ ও কিছুটা অন্ধকারময় পরিবেশ দেওয়া দরকার। আবার স্বাভাবিকের চেয়ে বড় বা ডাবল কুসুম ডিম পাড়াটাও মুরগীর জন্য স্ট্রেস হিসেবে কাজ করে।

৬. শত্রুঃ মুরগীর কিছু প্রাকৃতিক শত্রু আছে যেমন-শিয়াল, বেজিঁ, ইদুর, কুকুর, বিড়াল। এদের দেখলেই মুরগী ভয় পায়, আর যদি এরা মুরগীকে ধরার চেষ্টা কওে তাহলে মুরগী আরও বেশী স্ট্রেসে পরে।

৭.পরিবহনঃ বিভিন্ন কারনে মুরগীকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহন করতে হয়। এই পরিবহন মুরগীর জন্য বড় ধরনের স্ট্রেস হিসেবে কাজ করে।

৮. পোকামাকড়ের  আক্রমনঃ বিভিন্ন পোকামাকড় যেমন- উঁকুন, আঁঠালি, মশা, ডাঁশ মুরগীকে আক্রমন করে। বিশেষ করে উঁকুন ও আঠালি হলে মুরগী রক্তশূন্যতায় ভুগতে পারে।

৯. ভ্যাকসিনেশনঃ কিল্ড ভ্যাকসিনেশনের সময় মুরগী জোরপূর্বক ধরা হয় এবং ইনজেকশন দেয়া হয়, উভয়টিই বড় ধরনের স্ট্রেস। এছাড়া লাইভ ভ্যাকসিনের সময়ও মুরগী স্ট্রেসে পড়ে। কারণ লাইভ ভ্যাকসিন নিজেই একটি জীবাণু।

১০. ঠোঁট কাটাঃ মুরগীর ঠোঁট কাটার সময়, মুরগীকে ধরতে হয় যা একটি স্ট্রেস।এছাড়ও গরম ব্লেড দিয়ে ঠোঁট কাটার ফলে ঠোঁটে ব্যাথা লাগে যার কারণে কয়েকদিন মুরগী ঠিকমত খেতে পাড়ে না, যা মুরগীকে স্ট্রেসে ফেলে দেয়।

১১. মুরগীর ঘনত্বঃ অল্প জায়গাতে বেশী মুরগী পালন করলে ফিডিংয়ের সময় সমস্ত মুরগী সুষমভাবে খাবার ও পানি পায় না যার কারণে মুরগী স্ট্রেসে পড়ে।

১২. ঔষধঃ কিছু কিছু ঔষধের তিক্ততার কারণে মুরগী পানি কম খায় যা একটি স্ট্রেস। এছাড়াও বিভিন্ন কারণে মুরগীকে বিভিন্ন ঔষধ খাওয়াতে হয় যেমন-এন্টিবায়োটিক, এন্টিকক্সিডিয়াল, কৃমিনাশক ইত্যাদি যেগুলো মুরগীকে স্ট্রেসে ফেলে দেয়।

১৩. অসুস্থতাঃ মুরগী বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হলে খাবার ও পানি গ্রহণের পরিমাণ কমে যায়। এছাড়াও মুরগীর দৈনন্দিন জৈবিক কার্যকালাপ বিভিন্নভাবে ব্যাহত যা স্ট্রেস হিসাবে কাজ করে।

১৪. ভিজা লিটারঃ মুরগীর লিটার ভিজা থাকলে তাতে ব্যাকটেরিয়ার লোড বেড়ে যায়। তাছাড়াও ভিজা লিটারে সহজেই ফাঙ্গাই জন্মায় এবং অ্যামোনিয়া গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যায়। যার কারণে মুরগী বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়।

স্ট্রেসের লক্ষণসমূহঃ কিভাবে বুঝবো যে, কোন ফ্লকের মুরগী স্ট্রেসের মধ্যে পড়েছে। নিম্নে কতগুলো লক্ষণ উল্লেখ করা হল যা দেখে বোঝা যাবে যে মুরগী স্ট্রেসের মধ্যে পড়েছেঃ

  • বাড়ন্ত মুরগীর থাইমাস ও বার্সা ছোট হয়ে যাবে
  • পিটুইটারী ও এড্রেনাল গ্রন্থি আকারে বড় হবে
  • প্লাজমাতে করটিসন, ইনসুলিন/গ্লুকাগন বেড়ে যাবে
  • গ্লুকুজের শোষণ বেড়ে যাবে ফলে, হাইপোগ্লাইসিমিয়া হবে
  • শারিরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হবে
  • কার্টিলেজ ও হাড় তৈরি ব্যাহত হবে
  • খাদ্য গ্রহনের পরিমান কমে যাবে
  • শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাবে
  • হিট শক প্রোটিন তৈরি হবে
  • মুরগীর ওজন কমে যাবে
  • উৎপাদন কমে যাবে
  • ফ্লকের ইউনিফরমিটি কমে যাবে
  • ব্রিডারে র্ফাটিলিটি কমে যাবে।

পোল্ট্রিতে স্ট্রেসের ক্ষতিকর প্রভাবঃ

  • পোল্ট্রিতে স্ট্রেসের খুবই নেগেটিভ প্রভাব রয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত হার্ট এট্যাক ও মৃত্যুর কারণ হয়েও দাড়ায়
  • স্ট্রেসের কারণে গাটের পি এইচ লেভেলের ভারসাম্য নষ্ট হয় ফলে যে কোন রোগে মুরগী দ্রুত আক্রান্ত হয়
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়
  • শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়
  • ডিম উৎপাদন কমে যায়
  • এফ সি আর বেড়ে যায়
  • ভ্যাকসিন প্রয়োগে কাঙ্খিত মাত্রার টাইটার পাওয়া যায় না

স্ট্রেসকে নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধঃ

  • পোল্ট্রি ফ্লকের পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক রাখতে হবে। যাতে অত্যধিক গরম বা খুব ঠান্ডা না হয়।
  • মুরগীকে ধরতে চাইলে খুব শান্ত ও নরম হাতে ধরতে হবে। মুরগীকে ধরার জন্য তার পিছনে ধাওয়া করা যাবে না।
  • ভাল মানের ফিড মুরগীকে সরবরাহ করতে হবে, যাতে পর্যাপ্ত পরিমান ভিটামিন ও মিনারেল থাকে।
  • গরমের সময় পর্যাপ্ত পরিমান পানি সরবরাহ করতে হবে।
  • অত্যধিক ঠান্ডার সময় মুরগীর সেডের  ভিতরের পরিবেশ গরম রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • ফিডের ফরমূলেশন হঠাৎ করে পরিবর্তন করা যাবে না।
  • মুরগীর জন্য পর্যাপ্ত  জায়গা দিতে হবে।
  • যে কোন স্ট্রেসে পরলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তা দূর করার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • ভ্যাকসিনের আগে ও পরে স্টেস প্রতিরোধক ঔষধ ব্যবহার করতে হবে।
  • অত্যধিক গরমের সময় অবশ্যই মুরগীকে ভিটামিন-সি সরবরাহ করতে হবে।
  • এছাড়াও বাজারে বিভিন্ন ধরনের প্রডাক্ট পাওয়া যায়, যা স্ট্রেস প্রতিরোধের জন্য ভাল কাজ করে।

==============================
লেখক পরিচিতি-
সিনিয়র ফার্ম ম্যানেজার,
নারিশ পোল্ট্রি এন্ড হ্যাচারী লিঃ,
ইমেইল:
মোবাইলঃ ০১৯১৯-৮৪১৮৭৩