Wednesday, 22 November 2017

 

অশালীন দেওয়াল লেখায় সৌন্দর্য হারাচ্ছে বাকৃবি

অাবুল বাশার মিরাজ, বাকৃবি:বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) বিভিন্ন অনুষদের করিডোরে ও দেয়ালে, বিভিন্ন ছাত্র-ছাত্রীর হলের প্রবেশমুখে ও দেয়ালে লিখন ও পোস্টারের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানোর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য বিনষ্টের প্রতিযোগিতা স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতেও একই অবস্থা। ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের মিলনায়তনের দেয়ালে লেখাই রয়েছে এখানে পোস্টার লাগানো নিষেধ। এরপরেও নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করেই সেখানে লাগানো হয়েছে পোস্টার। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন বলেও অভিযোগ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

এদিকে শহীদ শামসুল হক হলের ফ্লোর ফিষ্টকে কেন্দ্র করে কিছু উৎশৃঙ্খল শিক্ষার্থী রাতের আধারে বেগম রোকেয়া হলের গেইট ও তার আশেপাশে অশ্লীন আলপনা ছিটিয়ে দিয়েছে। এ নিয়ে ক্যাম্পাসে সবার মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করলেও ছাত্রনেতাদের ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অনেকেই পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দিয়েছেন।

সামিহা আজাদ নামের এক শিক্ষার্থী লিখেছেন, কোনো রুচিশীল মানুষের কাজ এমন হয়না। হলটার গেট হলো ছয়মাস ও তো হয়নি। প্রতিটা লেডিস হল, ফ্যাকাল্টি সব জায়গায় একই অবস্থা। আসছে ৪ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা, ভালোই তো বাইরের লোকজন এসে দেখে যাবে আমরা আসলেই কি কি পারি?

অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরী লিখেছেন, কেন করেছে, কারা করেছে, ছোটরা করেছে না বড়রা করেছে তাদের রুচি কি, তাদের পারিবারিক শিক্ষা কি এসব নিয়া বলতে চাই না। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির দেয়ালে যখন ফিষ্টের নামে উদাত্ত আহবান লেখা থাকে যে, মেয়েরা চলে এসো,  দরজা আছে খোলা"। তখন নিজের প্রতি লজ্জা হয়, কারন আমিও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ছাত্র হলে বসবাস করা শিক্ষার্থী।

শাখা ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক গৌতম ইশান কর লিখেছেন, গত কয়েক বছরে এই প্রবণতাটি ভয়াবহ মাত্রায় বেড়ে গিয়েছে। যত্রতত্র এমন অশালীন পোস্টার ও ওয়াল রাইটিং ক্রমাগত অধোমুখী সাংস্কৃতিক মানকেই প্রতিফলিত করে। আমরা ভুলে যাই যে প্রতি বছর প্রায় ২৫ লক্ষ শিক্ষার্থীর মধ্যে সেরা যে ৩০ হাজার শিক্ষার্থী তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার সুযোগ পায়। তার মধ্যে অবস্থান করে যে সাংস্কৃতিক চর্চার গতিপথ আমরা তৈরী করে চলেছি প্রতি মুহূর্তে তা দেখে শিহরিত হই। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই যে একসময় বড় বড় মানুষ সৃষ্টি হয়েছে তা কল্পনা করতেও কষ্ট হয়।

আয়েশা আক্তার লিখেছেন, আয়োডিন যুক্ত লবণের অভাব ছিল মনে হয়। যাই হোক, এইসব মতিষ্ক বিকৃত পোলাপানের পিছনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অযথাই টাকা খরচ করে তাদের ডিগ্রী দিচ্ছে, আগে এদের আদবকায়দা শেখানো উচিৎ। প্রশাসন চাইলেই কারা এই কাজ করছে বের করতে পারবে, কিন্তু তাদেরও এত সময় কোথায়!

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নাজমুল হক শাহিন লিখেছেন, প্রথম শ্রেণীর মানুষ যে সব ছাত্ররা হবে তাদের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ লজ্জাজনক। তাদের বিশ্ববিদ্যালয় শব্দের মর্ম জানা নেই। তাদের কে হুশিয়ারি বার্তা নিজেরা নিজের মুখে কালি মাখছেন। নিজেদের অবস্থান নিজেরা ধরে রাখুন। আপনারা নিজেরা নিজেদের সামাজিক অবস্থান নষ্ট করছেন। সময় আছে বিবেকবান হন।

এদিকে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদে ‘দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০১২’ পাস করা হয়। আইন থাকলেও কার্যকারিতা নেই দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো নিয়ন্ত্রণ আইনের। ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও একবারের  জন্যও প্রয়োগ হয়নি আইনটি। ফলে দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানোর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য বিনষ্টের প্রতিযোগিতা স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

‘দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০১২’এর প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল থেকেই দেয়াল লিখন ও পোস্টার সাঁটানোর প্রতিযোগিতায় নামা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানসহ রাস্তার পাশ্ববর্তী দেওয়ালে পোস্টার, ব্যানার আর লিখনে ছেয়ে গেছে। বাদ দেয়া হয়নি বিদ্যুতেরও খুঁটি, লাইটপোস্ট, রাস্তার পার্শ্ববর্তী গাছগুলোও। গাছের ওপর পেরেক ঠুকে সেঁটে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন সাইনবোর্ড। যদিও এটাকে ‘দন্ডনীয়অপরাধ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আইনটির ৩ ও ৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত স্থান ছাড়া দেয়ালে লিখলে কিংবা পোস্টার লাগালে সেটি দন্ডনীয় অপরাধ। কোনো ব্যক্তি ওই ধারা অনুযায়ী অপরাধ করলে কৃত অপরাধের জন্য অনূন্যতম পাঁচ হাজার টাকা এবং অনূর্ধ্ব ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ড প্রদান করবে, অনাদায়ে অনধিক ১৫ দিন পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদন্ড দেয়া যাবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজ খরচে দেয়াল লিখন বা ক্ষেত্রমতে, পোস্টার মুছে ফেলা কিংবা অপসারণের আদেশ দেয়া যাবে। তবে এসব কথা বর্তমানে শুধু আইনটির কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। সুষ্ঠু কোনো প্রয়োগ আজও দেখেনি ভুক্তভোগী সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা।

এব্যাপারে কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী জুবায়ের ইবনে কামাল বলেন, এটা কোন ভাল মানুষের কাজ না। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেন ভেজা বিড়াল হয়ে ব্যাপারটা উদযাপন করেন।
এব্যাপারে হলের বেগম রোকেয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী তনুশ্রী বর্মন বলেন, এটা কোন সভ্য মানুষের কাজ না। মানুষরুপী পশুরাই এমন কাজটি করেছে। এদেরকে উচিৎ শিক্ষা দেওয়া দরকার।

এবিষয়ে কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. হুমায়ূন কবির বলেন, গতকাল রাতে (মঙ্গলবার) ছেলেদের চিল্লাচিল্লাতে আমার ঘুম হয়নি। এদের শিক্ষক হওয়াটাও লজ্জার। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হোক। এদেরকে চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়া দরকার।
এবিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আতিকুর রহমান খোকন বলেন, যারা এই ধরনের কাজ করেছে তাদেরকে অবহিত করছি। তাদের দ্বারা আমরা লেখনীগুলো মুছে ফেলানোর ব্যবস্থা করছি। পরবর্তীতে কেউ যদি এধরনের কাজ করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগত ব্যবস্থা নিব।