Tuesday, 12 December 2017

 

রোপা আমন ধানের সম্পূরক সেচ

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদঃ সকলকে জাতীয় কৃষি দিবসের শুভেচ্ছা। ধান আমাদের দেশের প্রধান খাদ্য শস্য। আমাদের দেশে বছরব্যাপী পর্যায়ক্রমে বোরো, আউশ এবং আমন মৌসুমে ধান চাষ হয়ে থাকে। ধান উৎপাদনে রোপা আমন ধানের গুরুত্ব একটু আলাদাভাবে অপরিসীম। দেশের মোট ধানী জমির শতকরা ৬০ ভাগ জমিতে রোপা আমন চাষ করা হয় এবং মোট উৎপাদনের অর্ধেক পরিমাণ ধান আসে রোপা আমন আবাদ থেকে। তাই রোপা আমন ধানের ক্ষেত্রে একটু বিশেষ খেয়াল ও যত্ন নেওয়া প্রয়োজন।

ধান গাছ পানি পছন্দ করে, তবে সব সময় দাঁড়ানো পানি রাখার প্রয়োজন নেই। তবে প্রজনন পর্যায়ে ধানী জমিতে পানির কোন বিকল্প নেই। বর্তমানে সারাদেশের প্রায় ৫৮% জমি সেচের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। তবে আমন মৌসুমে সেচ দেয়া হয় মাত্র ১১% জমিতে। এখনও আমন চাষাবাদ অনেকটা বৃষ্টি নির্ভর। বৃষ্টির জন্য প্রকৃতির উপর ভরসা রাখতে হয়, মাঝে মাঝেই আশানুরুপ বৃষ্টি সময় মতো সমভাবে হয় না। আমন মৌসুমে চারা লাগানো থেকে শুরু করে থোড় পর্যন্ত বর্ষাকাল বা বর্ষার শেষাংশটুকু পায় বিধায় বৃষ্টির পানির সরবরাহ থাকে। কিন্তু বৃষ্টিপাত সময়মত সমভাবে না হলেই বিপত্তি। ফলে মাঠে ক্ষরা দেখা দেয় এবং চুড়ান্তভাবে ফসলের ফলন কমিয়ে দেয়।

সম্পূরক সেচ:বৃষ্টি-নির্ভর ধানের জমিতে সাময়িকভাবে বৃষ্টির অভাবে খরা জণিত কারণে সেচ দেয়াকে সম্পূরক সেচ বলে। ফসলের প্রয়োজনুসারে সম্পূরক সেচ এক বা একাধিক বার দেয়া যেতে পারে।  

সম্পূরক সেচের প্রয়োজনীয়তা
সাধারণত আষাঢ়ের মাঝামাঝি থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি) সময়ে আমনের চারা রোপণ করার উপযুক্ত সময় এবং আগাম জাতগুলো কার্তিকের মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত (অক্টোবরের শেষ থেকে নভেম্বরের প্রথম) কাটা হয়। তবে বেশীর ভাগ আমন ফসল অগ্রাহায়নের মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত (নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি) সময় কাটা হয়। যদি আশ্বিনের মাঝামাঝি থেকে (সেপ্টেম্বরের শেষে) আর কোন বৃষ্টি না হয় তবে আমন ফসল মারাত্বকভাবে খরায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আশ্বিনের শেষ (অক্টোবরের মাঝামাঝি) পর্যন্ত যথেষ্ট বৃষ্টিপাত হলে সে বৎসর খরার প্রভাব কম পড়ে। অগ্রাহায়ণের প্রথমে (নভেম্বরের মাঝামাঝি) বৎসরের শেষ বৃষ্টিটি যথেষ্ট পরিমাণে হয়ে থাকলে আমনে খরার কোন প্রভাব থাকে না। অতএব বৎসরের শেষ বৃষ্টির ব্যপকতা ও বর্ষণের সময়ের উপর খরার প্রভাব অনেকাংশে নির্ভরশীল। গবেষণায় দেখা গেছে শুধুমাত্র একটি সম্পূরক সেচের মাধ্যমে প্রায় ৬০% ফলন বাড়ানো সম্ভব। অতএব, আমন ধানের আবাদে সম্পূরক সেচের গুরুত্ব অপরিসীম।

সম্পূরক সেচের পূর্বপ্রস্তুতি
প্রতিটি প্রযুক্তির সঠিক কার্যকারিতা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির উপযুক্ত জ্ঞানের উপর। সম্পূরক সেচের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। পরিকল্পনা ও  জ্ঞানের অভাবে অনেক সময় সেচ বা পানির উৎস কাছে থাকা সত্ত্বেও আমন ক্ষতিগ্রস্থ হয়। দুটি বা একটি সম্পূরক সেচ নিকটস্থ ডিপ বা শ্যালো টিউবওয়েল থেকে দেয়া যেতে পারে। তাছাড়া নিকটস্থ নদী, খাল-বিল, পুকুর বা ডোবা থেকে অনায়াসে একটি বা দুটি সেচ দেয়া যায়। কারণ তখন পানির কোন অভাব থাকে না। তবে এর জন্য অবশ্যই পূর্ব প্রস্তুুতির প্রয়োজন। প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক সেচ প্রয়োগের উপায় যেমন সেচ যন্ত্রের ব্যবস্থা, নালা, আর্থিক এবং মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হবে। সম্পূরক সেচের প্রয়োজন বুঝার জন্য বৃষ্টিপাত ও খরার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।  
সম্পূরক সেচের উৎস

আমন মৌসুমে অধিক বৃষ্টিপাত হয় বিধায় সম্পূরক সেচ জমির নিকটস্থ গর্ত, পুকুর-খাল-বিল, নদী-নালা ও টিউবওয়েল থেকে অতি সহজে দেয়া যেতে পারে। তাছাড়া বৃষ্টির পানি ধরে রেখেও সেচের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। নিম্নলিখিত উপায়ে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা যায়, যেমন-

ক) বৃষ্টির পানি সংগ্রহ: ধানী জমির এক কোনায় ছোট একটি গর্ত তৈরী করে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে প্রয়োজনে তা সেচ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। গর্তটি ২ মিটার গভীর এবং জমির মোট আকারের শতকরা ৫ ভাগ হলেই চলবে।  এই গর্ত থেকে ৬০ মিলিলিটার পরিমাণের সম্পূরক দেয়া সম্ভব। খরা-প্রবণ এলাকায় এই পদ্ধতি অতি সহজেই প্রয়োগ করা যায়।

খ) আইল ব্যবস্থাপনাঃ পদ্ধতি প্রাচীন। কৃষক ভাইয়েরা ব্যবহার করে আসছে যুগ যুগ ধরে। তবে একটু গুরুরেত্বও সাথে আইল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে তা ব্যবহার করা যায়। এজন্য আইলের সুষ্ঠু মেরামত ও আইলের উচ্চতা বাড়াতে হবে। আমন জমির আইল ১৫ সেন্টিমিটার উঁচু করে জমানো বৃষ্টির পানির কার্যকারিতা ৯০% পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। এই পানি ব্যবহার করে সাময়িক খরা প্রতিরোধ করা সহ ২০-২৫ % পর্যন্ত ফলন বাড়ানো যায়।

যদিও মাঠে আগাম জাতের ধান কাটার ধুম পড়েছে। তারপরও যারা নাবি জাত ও একটু দেরিতে রোপণ করেছিলেন তাদের জমিতে খরা হওয়ার প্রবণতা হতে পারে। ধান গাছের প্রজনন পর্যায় বিশেষ করে শিষ বের হওয়া, দুধ অবস্থা স্তরগুলো খুবই নাজুক। এ স্তরগুলোতে ধান গাছে প্রয়োজনীয় পানির খুবই প্রয়োজন। তাই কৃষকেরা ধানের মাঠে গিয়ে খরার অবস্থা লক্ষ্য করে, প্রয়োজনে নিকটস্থ খাল বিল, পুুকুর বা নদী থেকে একটি সেচ দেওয়ার উদ্যোগ নিবে। কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, খরা কবলিত ধানের চেয়ে সম্পূরক সেচযুক্ত ধানের ফলন হেক্টরে প্রায় ১ টন বা ১০০০ কেজি ধান বেশি হয়।   

গত মৌসুমে আকস্মিক বন্যায় হাওর অঞ্চলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পরবর্তীতে আউশ উৎপাদনে বন্যার বিরুপ প্রভাব ছিল। এমনকি রোপা আমন ধানের বীজতলা তৈরি এবং রোপণের ক্ষেত্রেও বন্যার সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। তাছাড়া এ বছর স্মরণকালের ইতিহাসে সর্ব্বোচ্চ পরিমাণ এবং দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টিপাত হয়েছে। যা আমাদের প্রধান খাদ্য শস্য ধান উৎপাদনে অন্যতম বাধা। খাদ্য নিরাপত্তা তথা প্রধান খাদ্য শস্য ধান উৎপাদনে আমন ধানের উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে খরা কবলিত এলাকায় সম্পূরক সেচ প্রয়োগ করে আমন ধান উৎপাদন তথা খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে গুরুত্ব ভূমিকা পালন করতে পারে।
 
লেখক: আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, সিলেট।