Tuesday, 12 December 2017

 

পোলট্রিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হোক বাংলাদেশ

:এস এম মুকুল:আমাদের পোল্ট্রি শিল্প দেশীয় পুঁজি এবং দেশীয় উদ্যোগে তিলে তিলে গড়ে উঠা একটি নতুন শিল্প ইতিহাস। এ শিল্পটির কল্যাণে একইসাথে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি এবং গ্রামীণ মানুষের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। এর পাশাপাশি শিল্পটি মাংস ও ডিম উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের বিপুল বর্ধিষ্ণু জনশক্তির পুষ্টি চাহিদা মিটাচ্ছে। দেশে  তৈরী পোশাক শিল্পের পর এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাত।

দেশের অন্যতম পোল্ট্রি শিল্প-এলাকা টাঙ্গাইল জেলা। সারাদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মুরগীর মাংস ও ডিমের চাহিদার যোগান আসে এ জেলা থেকেই। জেলায় পোল্ট্রি শিল্প খাতে প্রতিদিন প্রায় ২৫ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। দেশের অন্যতম আরেকটি পোল্ট্রি শিল্প এলাকা গাজীপুর। দেশের এক-চতুর্থাংশ ডিম ও মাংস উৎপাদন হচ্ছে গাজীপুরে। উৎপাদন খরচ কমাতে গাজীপুরের ২২ খামারি নিজেদের খামারের প্রয়োজনীয় ফিড নিজেরাই উৎ্পাদন করছেন। বর্তমানে সারা দেশে ছোট-বড় খামার রয়েছে কমবেশি ৭০ হাজার। যোগ হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোক্তা।

এ প্রসঙ্গে ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর সভাপতি আবু লুৎফে ফজলে রহিম খান দৈনিক প্রথম আলো আয়োজিত পোল্ট্রি বিষয়ক গোলটেবিল বৈঠকে বলেন : বাংলাদেশে যে পরিমাণ মা-মুরগির প্রয়োজন, সেটা আছে। কিন্তু এ মুরগি থেকে যে পরিমাণ মানসম্মত ডিম আসার কথা, সেটা আসছে না। এই মুহূর্তে যে পরিমাণ মা-মুরগি আছে, তাতে সপ্তাহে ১ কোটি ৩৫ লাখ মুরগির বাচ্চা উৎপাদন হওয়ার কথা। কিন্তু সেটা আসছেনা। এইচ৭এন৯ ভাইরাসের ভ্যাকসিন আমদানি জরুরি হয়ে পড়েছে। এ জন্য সরকারের অনুমতি প্রয়োজন।

স্বয়ংসর্ম্পূণতার পথে মাইলফলক সাফল্য :
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট মাংসের চাহিদার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশই আসছে পোল্ট্রি শিল্প থেকে। বর্তমান বাজারে যে পরিমাণ ডিম, মুরগি, বাচ্চা এবং ফিডের প্রয়োজন তার শতভাগ এখন দেশীয়ভাবেই উৎপাদিত হয়। বর্তমান সরকার ২০২১ সাল নাগাদ জনপ্রতি বার্ষিক ডিম খাওয়ার গড় পরিমাণ ১০৪টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে সরকারের এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে ২০২১ সাল নাগাদ দৈনিক প্রায় সাড়ে ৪ কোটি ডিম এবং দৈনিক প্রায় ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ হাজার মেট্রিক টন মুরগির মাংস উৎপাদনের প্রয়োজন হবে। এ লক্ষ্য অর্জন করতে প্রয়োজন হবে প্রায় ৫০-৬০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

দেশে ছোট বড় পোলট্রি খামারের সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার। প্রতিদিন ডিম উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২ কোটি। মাংস উৎপাদন হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ টন। পোল্টি শিল্পকে কেন্দ্র করে পরিচালনা, পরিচর্যা, বাজারজাতকরণ এবং খাদ্য উৎপাদন কার্যক্রমের সুবাদে আরো ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারে ব্যবসা এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ক্ষুদ্র শিল্প বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করেছে এই শিল্পটি। দেশে বর্তমানে প্রায় ৭০ হাজার ছোটবড় খামারে ডিম ও মুরগির মাংস উৎপাদন বাড়াতে প্রতিনিয়ত একদিনের মুরগির বাচ্চা উৎপাদনে এখন স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ।

এ প্রসঙ্গে দৈনিক প্রথম আলো আয়োজিত পোল্ট্রি বিষয়ক গোলটেবিল বৈঠকে ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাবু অভিমত প্রকাশ করেন-সরকারের একটা পোলট্রি নীতিমালা আছে। আমরা চাই, নীতিমালার মধ্য দিয়ে এখাত এগিয়ে যাক। ধারণা করছি, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে জনসংখ্যা হবে ১৭ কোটি ৫০ লাখ। এই জনসংখ্যাকে আমরা ডিম, মাংস দিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে চাই। আশার খবর- দেশের খামারগুলোয় প্রতি সপ্তাহে একদিনের লেয়ার, ব্রয়লার ও সোনালী মুরগির বাচ্চার চাহিদা ৯৫ লাখ থেকে ১ কোটি ১০ লাখ। তাছাড়া পোল্ট্রির মাংস বহুমাত্রিক ব্যবহার করে দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে চিকেন নাগেট, চিকেন বল, সসেজ, ড্রামস্টিক, বার্গার, চিকেন সামুচা, মিটবলসহ বিভিন্ন ধরনের মজাদার প্যাকেটজাত খাবার। খাত সংশ্লিষ্টদের আশাবাদ বাংলাদেশের পোল্ট্রি প্রসেসড পণ্য ২০২০ সাল নাগাদ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করলে বছরে অন্তত ৪ থেকে ৫ মিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব হবে।

দেশীয় বড় ও প্রান্তিক খামারিদের পাশে দাঁড়ান সরকার :
ইতোমধ্যেই পোল্ট্রি শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগে ৭টি বিদেশি কোম্পানির মধ্যে ৫টি ভারতের, ১টি থাইল্যান্ডের এবং ১টি চীনের। জানা গেছে দেশের পোল্ট্রি শিল্পের শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ পুঁজি নিয়ন্ত্রণ করছে তারা। এদের সঙ্গে এক অসম প্রতিযোগিতায় পড়েছে দেশি খামারগুলোর। বিদেশি অর্থপুষ্ট খামারগুলো ঋণ নিয়ে আসছে ৩ থেকে ৪ শতাংশ সুদে। আর দেশি খামারগুলোকে ঋণ সংগ্রহ করতে হচ্ছে ১০ থেকে ১২ শতাংশ সুদে। তাই বিদেশি খামারগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে স্থানীয় বড় খামারগুলোকেও অনেক হিমশিম খেতে হচ্ছে। ঝরে পড়ছে ছোট বা প্রান্তিক খামারিরা। তাদের দিকে সরকারের বিশেষ নজর দিতে হবে। কারণ সমস্যার জরাজঞ্জালে প্রান্তিক খামারিদের হতাশা বাড়ছে।

তাছাড়া দেশে কোন ডিম সংরক্ষণাগার নেই। এ কারণে ডিমের দাম খুব বেশি উঠানামা করে। সংরক্ষণাগার থাকলে সারা বছর ডিমের দাম একই রকম থাকবে। যার মাধ্যমে ভোক্তারা এবং খামারিরা উপকৃত হবেন। তাই এই শিল্পের স্বার্থে সরকারি ডিম সংরক্ষণাগার স্থাপন করা খুব জরুরি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর মোরশেদ খান দৈনিক প্রথম আলো আয়োজিত পোল্ট্রি বিষয়ক গোলটেবিল বৈঠকে বলেছেন : দেশের পোলট্রিখামারগুলোতে ভাইরাস বেড়ে গেছে। এতে পোলটি শিল্পের ক্ষতি হচ্ছে। এ অবস্থায় পোলট্রি শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য পোলট্রি গবেষক, পরামর্শক ও এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে একটি উচ্চ মানের কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে দেখা গেছে-মুরগির খাদ্য তৈরির কাঁচামাল ভুট্টার দাম কমলেও ফিডের দাম কখনো কমে না। ডিমের দাম নির্ধারণ করে ঢাকার কারওয়ান বাজারের আড়তদাররা। প্রত্যেকটি জেলায় একটি করে ডিম ও মাংস সংরক্ষণাগার স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। কৃষিক্ষেত্রের মতো পোল্ট্রি শিল্পের ছোট ছোট খামারিকে জন্য ৫ শতাংশ সুদে আলাদা ঋণ প্রদান করা, পোল্ট্রি বীমা চালু করা, প্রশিক্ষণের জন্য আঞ্চলিক প্রাণিসম্পদ অফিসগুলো কাজে লাগানো, বাজেটে ভুট্টাসহ পোল্ট্রি ফিডে ব্যবহৃত বিভিন্ন অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ আমদানিতে ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি), সয়াবিনের ওপর থেকে ১০ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি, ওষুধের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক এবং ডিডিজিএস এর ওপর থেকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে পোল্ট্রি শিল্প সংশ্লিষ্টদের দাবিগুলো বাস্তবতা যাচাই করে বিবেচনা করা দরকার। পক্ষান্তরে এই শিল্পের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের উচিত হবে- সবচেয়ে নিরাপদ ও পুষ্টিমাণ সমৃদ্ধ পোল্ট্রির ডিম ও মাংস যত সুলভে দেশের বাজার সৃষ্টি করা যায় এ শিল্পের বিকাশ ততই ত্বরান্বিত হবে। সাশ্রয়ী দামে জনগণ ডিম আর মাংস পেলে সবাই তা ভোগ করতে পারবে। আর তখনই পুষ্টির ঘাটতি কমবে আমরা পাব স্বাস্থ্যবান প্রজন্ম। ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফালোভী হলে তার ফল ভাল হবে না। চায়নাদের মতো মানসিকতা নিয়ে আমাদের ব্যবসায়ী মহলকে কাজ করতে হবে-কম লাভে বিক্রির জন্য পণ্যকে সহজ্যলভ্য করা আর বেশি বিক্রির মাধ্যমে অধিক লাভবান হওয়া।
============================
লেখক: কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক ও কলাম লেখক,