Tuesday, 12 December 2017

 

বলতে হবে কৃষি ও কৃষকের কথা

এস এম মুকুল:কৃষিকে বহুমুখীকরণে বাংলাদেশ এখন অনেক অগ্রগামী। কৃষি সেক্টরে ধান, পাটের পাশাপাশি মৎস্য ও পশু পালন, দুগ্ধ উৎপাদন, হাঁস-মুরগি পালন, নার্সারি, বনায়ন এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্রশিল্পের দ্রুত প্রসার ঘটছে বাংলাদেশে। কাজেই কৃষি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। সেজন্য কৃষকের কথা বলতে হবে। কৃষকের কথা শুনতে হবে। কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে। কৃষি বাঁচলে দেশ বাঁচবে।

২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পহেলা অগ্রহায়ণ জাতীয় কৃষি দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ওই বছর সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারিভাবে নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হয়। ২০০৯ সালে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পহেলা অগ্রহায়ণ পালিত হয় জাতীয় কৃষি দিবস। পহেলা অঘ্রাণ জাতীয় কৃষি দিবসের স্বীকৃতি যেন আমাদের আদি নববর্ষে প্রত্যাবর্তন। কৃষি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দীর্ঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে প্রকৃতি ও জনসংখ্যার সঙ্গে সমন্বয় রাখতে যুদ্ধ করে এগিয়ে চলেছে। স্বাধীনতার পূর্বে যেখানে সাড়ে সাত কোটি মানুষের খাদ্য উৎপাদন চাহিদায় হিমশিম খেতে হতো, কাল পরিক্রমায় স্বাধীনতার চার দশক পর ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যের চাহিদা মেটানো সংগ্রামে নিয়োজিত বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা। সময়ের বিবর্তনে এসেছে নতুন নতুন ফসল, প্রসারিত হচ্ছে নব নব প্রযুক্তি। ১৯৭০ সালে দেশে চাল উৎপাদন হতো প্রায় এক কোটি টনের মতো।

কৃষকের জ্ঞানকে স্বীকৃতি দিতে হবে: কৃষি আমাদের সমৃদ্ধির অন্যতম উৎস। এ কৃষিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন গ্রাম বাংলার কৃষক। বন্যা, খরা কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ই দমাতে পারেনি বাংলার কৃষকদের। নিঃস্ব, শূন্য অবস্থান থেকেও বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলার কৃষক। ফলিয়েছে সোনার ফসল। কৃষকরা প্রকৃতি ও স্বভাবগতভাবে উদ্ভাবক, সৃজনীক্ষমতার অধিকারী ও প্রকৃতি বিজ্ঞানী। গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা তাত্ত্বিক সূত্র না জানলেও নিবিষ্ট চিন্তা-চর্চা ও প্রকৃতির গতিবিধির সঙ্গে সখ্যের খেলায় উদ্ভাবন করেন নতুন পদ্ধতি-প্রক্রিয়া। প্রাকৃতিক চর্চায় নতুন জাতের ‘হরি ধান’ উদ্ভাবন করে আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন কৃষক হরিপদ কাপালি। তিনি পেয়েছেন চ্যানেল আইয়ের স্বীকৃতি-কৃষিপদক। আবার অনেক কৃষক নিবিষ্ট মনে কাজ করে যাচ্ছেন। উদ্ভাবন করছেন নতুন নতুন জাতের ফসল এবং কৃষিবান্ধব প্রযুক্তি। আফাজ পাগলার ঔষধি গ্রাম, কার্তিক প্রামাণিক কিংবা আজিজ কোম্পানির বৃক্ষপ্রেম এখন রেনেসাঁস দৃষ্টান্ত। রাষ্ট্রীয়ভাবে কৃষকদের স্বীকৃতি দিতে হবে। কৃষি গবেষকদের সঙ্গে কৃষকের যোগসূত্র তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

কৃষক ও প্রযুক্তি-প্রজন্মের মেলবন্ধন: চীনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ সুবিধাসহ তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের ফলে কৃষকরা অনলাইনের মাধ্যমে পণ্য বিক্রিতে ছয় গুণ বেশি লাভ করতে পারছে। অবাধ তথ্যপ্রবাহের এ সুযোগটি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার মাধ্যমে সম্ভব। এর ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্যের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়েও সমৃদ্ধ ও সচেতন হবেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটলে তরুণরাও হয়ে উঠবে কর্মোদ্দীপক। চার-পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে গিয়ে মেধা, শ্রম, পুঁজি ও সময় খাটিয়ে যতটুকু লাভবান হবে তার চেয়ে বহুগুণে দেশের মাটিতে কম টাকা বিনিয়োগ করে গ্রামীণ এলাকা থেকেও বিপুল আয় করা সম্ভব।

তবে এখন আর ফসলের সমস্যা বুঝতে ও সমাধান জানতে আর দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না। মুঠোফোনে ইন্টারনেট চালু করে সেখান থেকে তিনটি অ্যাপ ডাউনলোড বা নামিয়ে নিতে হবে। ‘কৃষকের জানালা’, ‘কৃষকের ডিজিটাল ঠিকানা’ ও ‘বালাইনাশক নির্দেশিকা’ নামের ওই তিনটি অ্যাপ এখন থেকে কৃষককে তাঁর প্রয়োজনীয় তথ্য ও সমস্যার সমাধান দেবে। ‘কৃষকের জানালা’-https://goo.gl/wCn8oU; ‘কৃষকের ডিজিটাল ঠিকানা’ https://goo.gl/3bbVeb; ‘বালাইনাশক নির্দেশিকা’-https://play.google.com/store/apps/details?id=com.pesticideprescriber.gov ঠিকানা থেকে অ্যাপগুলো নামানো যাবে।

কমছে আবাদি জমি: নীতিমালা না থাকায় কৃষি জমি ব্যবহার করে বানানো হচ্ছে কলকারখানা, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ইটখোলা প্রভৃতি। ফলে প্রতি বছর হারিয়ে যাচ্ছে প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর কৃষি জমি। এশিয়ার প্রতিটি কৃষিভিত্তিক দেশই কৃষিজমি সংরক্ষণে কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে। পশ্চিমবঙ্গের সিঙ্গরে টাটা কোম্পানি কারখানা করতে চাইলে তা লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও দেওয়া হয়নি। চীন ও ভিয়েতনামে কৃষি আইন অনুসরণ করা হয় কঠোরভাবে। আশার কথা হলো, কৃষি আইন কার্যকরণে সরকার উদ্যোগী ও মনোযোগী হয়েছে। কৃষিজমি সংরক্ষণ আইন চূড়ান্ত হয়েছে। কৃষিজমিতে স্থাপনা নিষিদ্ধ হচ্ছে। লক্ষ্য রাখতে হবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কৃষি জমি যেন নষ্ট না হয়।

কৃষিক্ষেত্রে সৌর বিদ্যুৎ: বোরো মৌসুমে দেশে প্রায় বিশ লাখ একর চাষযোগ্য জমিতে ১৬ লাখ ৩০ হাজার সেচ পাম্প ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে ১৬ লাখ একর জমি চাষে ব্যবহার হয় ১০ লাখ ৮০ হাজার বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প। বাকি ১১ লাখ ৫৮ হাজার সেচ পাম্প ব্যবহৃত হয় ডিজেল চালিত। সারা দেশে বিদ্যুৎ ও ডিজেলচালিত সেচ পাম্পগুলোকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা সম্ভব হলে বছরে ৭৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ও ৮০ কোটি লিটার ডিজেল সাশ্রয় হবে। যার ফলে ডিজেল ও বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে সরকারের ৮৫৩ কোটি টাকা ভর্তুকি বেঁচে যাবে। এ ভর্তুকির টাকাটা পরপর তিন থেকে চার বছর সৌরবিদ্যুতের পেছনে ভর্তুকি হিসেবে ব্যয় করলে সরকার পরবর্তী ২০ বছরের জন্য ভর্তুকি প্রদান থেকে বেঁচে যাবে। পাশাপাশি জাতীয় বিদ্যুৎ তো সাশ্রয় হবেই।

জীবাণুু সার বাঁচাবে দুই হাজার কোটি টাকা: দেশে বছরে প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সারের চাহিদা। এর মধ্যে ভর্তুকি দিয়ে উৎপাদন হবে ১৭ লাখ মেট্রিক টন। বাকি ১৩ লাখ মেট্রিক টন বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ইউরিয়া সাশ্রয়ের জন্য ডাল, তেল, শিমজাতীয় ফসল ও ধানে ইউরিয়ার পরিবর্তে জীবাণু সার ব্যবহার করা গেলে ২০০০ কোটি টাকার ইউরিয়া সাশ্রয় হবে। বাংলাদেশে জীবাণু সারের চাহিদা হবে এক হাজার টন। এর প্রধান কাঁচামাল বাতাসের নাইট্রোজেন ও পিটমাটি বলে এটি ব্যাপক পরিমাণে উৎপাদন সম্ভব। এ দুটো আমাদের দেশে প্রচুর আছে। পিটমাটি আছে ছয় লাখ হেক্টর জায়গায়।

বাড়াতে হবে গ্রামীণ বিনিয়োগ: গ্রামের মানুষদের উপেক্ষা করে প্রকৃত উন্নয়ন অসম্ভব। গ্রামীণ বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। গ্রাম এলাকায় অন্তত উপজেলা পর্যায়ে শিল্প, কারখানা, গার্মেন্টস, কুটিরশিল্প স্থাপনে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে। গ্রামীণ বিনিয়োগ বাড়লেই ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এলাকায় কাজ পেলে মানুষ আর শহরমুখী হবে না। শহরে মানুষের অযাচিত চাপ কমবে।

কৃষি উন্নয়নে কিছু অভিমত: ব্যবহারের সুযোগ না থাকা, ক্ষেত্র না জানা এবং সচেতনতার অভাবে প্রচুর মূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। সেসব জমিকে উপযোগী করে ফসল, সবজি, ফল বাগান, নার্সারি প্রভৃতি ও পাশাপাশি ক্ষুদ্র এবং কুটিরশিল্প স্থাপনের মাধ্যমে পল্লী উন্নয়ন সম্ভব। পল্লী উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন আবশ্যক। কৃষক সমবায় সমিতিভিত্তিক উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। গ্রামের শিক্ষিত ব্যক্তি ও শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে কৃষকের জন্য কৃষি পাঠাগার স্থাপন করে সান্ধ্যকালীন পাঠচক্র করা যেতে পারে। কৃষিকর্মীদের উন্নত ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কৃষি কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলকভাবে মাঠ ও কৃষকের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন জোরদার করতে হবে। দেশে ১৩ হাজার নার্সারি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উন্নত ও মানসম্মত জাতের বীজ তৈরিতে দক্ষতা বাড়াতে হবে। কৃষক পরিবারের সদস্যদের কুটিরশিল্প স্থাপনে ব্যাংকঋণ সুবিধা সহজীকরণ করতে হবে। সরকারের একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, কৃষি ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, যুব উন্নয়ন অধিদফতর, বিসিক, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, বেসরকারি উদ্যোক্তা সবাই মিলে একযোগে টার্গেটভিত্তিক সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করলে সুফল আসবে। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।

আসুন আমরা কৃষি ও কৃষকের কথা বলি। আমাদের নাড়ির টান গ্রামবাংলার কৃষি ও কৃষকের সঙ্গে। কৃষকের কথা ভাবুন, কৃষককে যথাযথ সম্মান করুন। বাংলার কৃষকদের লাল সালাম।
==================
লেখক-কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলাম লেখক:
যোগাযোগ:০১৫৫২-৩৫৩ ৮৯২, ০১৭১২ ৩৪২ ৮৯৪
, , Facebook.com/mukulsnetro, Facebook.com/smmukul mukul.