Tuesday, 12 December 2017

 

পুুষ্টি ও কর্মসংস্থানের পথ দেখাচ্ছে পোল্ট্রি শিল্প

এস এম মুকুল, কৃষি-অর্থনীতি বিশ্লেষক:আধুনিক বিশ্বে এখন পোল্ট্র্রি সহজলভ্য ও সুলভ প্রাণিজ আমিষের যোগানদাতা হিসেবে সকল ধর্ম-বয়স ও পেশার মানুষের কাছে অগ্রগণ্য। সঙ্গত কারণেই পুষ্টি সমৃদ্ধিতে পোল্ট্রির গুরুত্ব বাড়ছে আমাদের দেশেও। দেশীয় পুঁজি এবং দেশীয় উদ্যোগে গড়ে উঠা আমাদের পোল্ট্রি শিল্প ব্যাপক কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নতুন বিপ্লবের পথ দেখিয়েছে। বাধাঁ-বিঘ্নতা পেরিয়ে পোল্ট্রি শিল্প আশার আলো ছড়িয়ে বহুমুখি সম্ভাবনার পথ উন্মোচন করছে। এই শিল্পে নিত্য-নতুন তরুণ উদ্যোক্তারা গড়ে তুলছেন ছোট-বড় খামার। তরুণদের উদ্ভাবনী মানসিকতা, মেধা, শ্রম ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে এ শিল্পে বিনিয়োগের চাকা ঘুরছে দ্রুত। আশা করা হচ্ছে ২০৩০ সালে এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠবে কমবেশি ১ কোটি মানুষ।

বিকাশমান পোল্ট্রি শিল্পের যাত্রা শুরু হয় ৯০ এর দশকে। তারও আগে ১৯৬৪ সালে ৩০ একর জমির উপরে গাজীপুরে ব্যক্তি উদ্যোগে পোল্ট্রি শিল্পের গোড়াপত্তন হয়। তবে ১৯৯৫-৯৬ সালে দেশী ও সোনালী জাতের মুরগীর বাইরে উন্নত জাতের লেয়ার ও ব্রয়লার মুরগীর চাষে খামারিরা ব্যাপক সফলতা অর্জন করে। এর ফলে দেশের জনগণ আয়-উপার্জনের সামঞ্জস্যতায় ডিম ও মুরগীর মাংস খেতে পারে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পোল্ট্র্রি ইন্ডাস্ট্রিজ কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ও ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জনাব মসিউর রহমান দৈনিক প্রথম আলো আয়োজিত পোল্ট্রি শিল্প বিষয়ক গোলটেবিল আলোচনায় মত প্রকাশ করে বলেন-:‘মানুষ যেভাবে পোলট্রি গ্রহণ করেছে, তাতে ২০২০ সালে আমাদের উৎপাদন বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ করতে হবে। অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানদের ডিম খাওয়ান। অনেক স্কুলে শিক্ষার্থীদের ডিম দেওয়া হয়। আমরা পোল্ট্র্রির নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করি না। ফলে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ডিমের মান ঠিক থাকে। মুরগি ডিম পাড়ার পর সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যেই ভোক্তার টেবিলে চলে আসে। আমরা মাংস ও ডিমের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছি।’

সত্যিই জনাব মশিউর রহমানের কথার প্রতিফলন ঘটেছে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। গ্রামে-গঞ্জে গেলে এখন দেখা যাবে যেসব পরিবার বছরে দুই ঈদ ছাড়া মাংসের স্বাদ পেত না, পোল্ট্রির কল্যাণে তারা সহসাই ডিম ও মাংসের স্বাদ নিতে পারছে। গ্রামীণ পর্যায়ে এই শিল্পের কল্যাণে যুব নারী ও যুবকেরা নিজেদের জীবনমানের উন্নয়ন, নিজের স্ব-কর্মসংস্থান এবং অপরের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনে বিরাট ভুমিকা রেখেছে।

আসুন, কয়েকজন প্রান্তিক সফল খামারির গল্প শুনি। ২০০০ সালে পোল্ট্রি পালনে তিন মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে একটি শেডে মাত্র ৩০০ বাচ্চা নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বাঘিল ইউনিয়নের চাকতা গ্রামে বজলুর রশীদ। মাত্র ২৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ৫শ’ মুরগির বাচ্চা ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন খামার গড়ে তোলেন তিনি। শুরু থেকে নিজেই পুরো খামারের দেখাশোনা করছেন নিজেই। ২০০৫ সালে বিয়ের পর স্ত্রী রুমাও সহযোগিতা করেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ব্যবসা। বাড়ছে আয়, পরিবারের আসছে সচ্ছলতা। ১৭ বছরে পরিবারের আর্থিক অবস্থার অনেক পরিবর্তন এসেছে। এক হাজার মুরগি দিয়ে ব্যবসা শুরু করলে খরচ বাদ দিয়ে বছরে লাভ আসে প্রায় এক লাখ টাকা। মুরগির দাম বেশি হলে লাভের পরিমাণও বেড়ে যায়। বজলুর রশীদের মতে, চাকুরীর আশায় বসে না থেকে যে কেউ প্রশিক্ষণ নিয়ে এ ব্যবসায় এলে সফলতা পাবে।

আরেক সফল খামারি পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার মুলাডুলি ইউনিয়নের শেখপাড়া গ্রামের সোয়াত পোল্ট্রি খামারের স্বত্বাধিকারী মো. মশিউর রহমান জাহাঙ্গীর। এসএসসি পাশ করার পর যুব উন্নয়ন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০০১ সালে ৫০০ মুরগি দিয়ে পোল্ট্রি খামার করে সংসারের অর্থের যোগান দিতেন তিনি। তার খামারে কমবেশি এক হাজার মুরগি রয়েছে। প্রতিদিন খামার থেকে কমবেশি আটশত ডিম পাচ্ছেন। জাহাঙ্গীরের মতে, সহজ শর্তে কোনো ব্যাংক, বীমা ও এনজিও প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে আমার খামার প্রসারিত করে এলাকার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব।

আরো একজন পোল্ট্রি সফল খামারি লক্ষ্মীপুরের নিজাম। কঠোর পরিশ্রম, মেধা ও কাজের প্রতি একনিষ্ঠতা থাকলে স্বল্প পুঁজি নিয়েও যে ভাগ্য বদল করা যায় তার বাস্তব প্রমাণ তিনি। ১৯৯৭ সালে পড়াশোনার পাশাপাশি শখের বসে বাড়ীর পাশে একখন্ড জমিতে গড়ে তোলেন পোল্ট্রি খামার। মাত্র ১২ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে তিনি পোল্ট্রি খামার করে বর্তমানে জেলার অন্যতম একজন প্রতিষ্ঠিত পোল্ট্রি ব্যবসায়ী। ছেলের, পরিশ্রম, আগ্রহ ও পোল্ট্রি খামারের ব্যবসার ভাল অবস্থা দেখে বাবা হোসেন আহমেদ পুঁজি দিলেন আরো ৭০ হাজার টাকা। সেই থেকে গতি পায় তার ব্যবসায়। উপজেলার কুশাখালী ইউনিয়নের জাউডগা গ্রামে ১০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে মমতাজ এগ্রো ইন্ডাট্রিজ। তাঁর খামারে প্রতিদিন প্রায় আড়াই হাজার ডিম উৎপাদন ও মৎস্য খামার থেকে বছরে ১০ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করা হয়। তার আরো কয়েকটি মুরগির খামারে দৈনিক ৮ থেকে ৯ হাজার ডিম উৎপাদন হয়। ডিম বিক্রি হয় দৈনিক ৪৪ থেকে ৫০ হাজার টাকা। সদর উপজেলায় ৫৫টি ব্রয়লার মুরগী খামারে তার বিনিয়োগ রয়েছে। নিজামের প্রতিষ্ঠানে ৩৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাসিক বেতন দেয়া হচ্ছে আড়াই লাখ টাকা। বর্তমানে তার পোল্ট্রি খাতে বিনিয়োগকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা।

টাঙ্গাইলের বজলুর রশীদ, পাবনার মশিউর রহমান জাহাঙ্গীর কিংবা লক্ষ্মীপুরের নিজাম বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে সফল খামারিদের এমন অনেক উদাহরণ দেশীয় পোল্ট্রি শিল্পে নব-জাগরণের সৃষ্টি করেছে। তাদের নিবিষ্ট প্রচেষ্ঠায় আশার আলো দেখাচ্ছে আমাদের পোল্ট্রি শিল্প।

পোল্ট্রি শিক্ষিত যুবক ও যুব মহিলাদের জন্য আর্শিবাদতুল্য একটি শিল্পখাত। এই শিল্পটি লাখো তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সরকারের অপেক্ষায় বসে না থেকে এবং চাকরি নির্ভরশীল না হয়ে আমাদের যুব সমাজ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুঁজি নিয়ে সমৃদ্ধ অর্থকরী শিল্পে পরিণত করেছে পোল্ট্রি শিল্পকে। পোল্ট্রি শিল্পের কল্যাণে আমাদের দেশের যুব ও যুব মহিলারা নিজেদেরকে সফল ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নিজেদের সক্ষমতার সীমারেখায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে পোল্ট্রি শিল্পের মতো এমন ব্যাপকভিত্তিক সফলতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পুষ্টি চাহিদা পূরণের নজির আর কোনো শিল্পে লক্ষ্য করা যায়নি।

ওয়ার্ল্ড পোল্ট্র্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ব্রাঞ্চ এর সভাপতি সামসুল আরেফিন খালেদ দৈনিক প্রথম আলো আয়োজিত পোল্ট্রি শিল্প বিষয়ক গোলটেবিল আলোচনায় বলেছেন-: পোল্ট্র্রি হলো পুষ্টির সবচেয়ে সহজলভ্য ও সস্তা উৎস। পোল্ট্র্রি অনেক কম জায়গায় উৎপাদন করা যায়। পোলট্রি ছাড়া অন্য কোনো শিল্প ভার্টিক্যাল করা যায় না। নিজের বাড়িতে, এলাকায় থেকেই পোলট্রি করা যায়। ঘর-সংসারের কাজ করেও এটা করা যায়। অধিকাংশ খামারে দেখেছি পোলট্রিতে মেয়েরা কাজ করছে।

আশার খবর-মুরগির বাচ্চা উৎপাদন, ডিম ও মাংস উৎপাদনে এখন স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। পোল্ট্রি শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, খামারিদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ, পোল্ট্রি শিল্পের জন্য বীমা প্রথা চালু এবং  দেশীয় শিল্পবান্ধব পোল্ট্রি নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে এ খাত থেকে ডিম ও মাংস রপ্তানি করে বছরে ১২ হাজার কোটি আয় করা সম্ভব হবে। ব্যাপারটিকে হাল্কা করে দেখার মোটেই অবকাশ নেই।

দেশে এক সময় কোন জিপি ফার্ম ছিল না। পুরোটাই ছিল আমদানি নির্ভর। বর্তমানে এ খাতে ৮ টি কোম্পানির ১৫ টি খামার গড়ে উঠেছে। বেড়েছে পিএস খামার বা হ্যাচারি সংখ্যা। দেশে বর্তমানে ২০৫ টি হ্যাচারি রয়েছে। এক সময় প্যাকেটজাত ফিড আমদানি হতো। এখন দেশেই ১৮৬ ফিডমিল রয়েছে। আগে দেশীয়ভাবে তেমন কোন ওষুধ তৈরি হতো না। এখন প্রায় ৩০টি কোম্পানি দেশীয়ভাবে বিভিন্ন ওষুধ তৈরি করছে। ফলে আমদানি নির্ভরতা কমছে। এভাবেই নীরবে দেশের পোল্ট্রি শিল্পে বিপ্লব ঘটছে। দেশে একই সঙ্গে বেড়েছে ডিম ও মুরগির মাংসের উৎপাদন। পোল্ট্রি শিল্প মানুষের স্বপ্ন পূরণের জায়গা। এ খাতে শিক্ষিত বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হচ্ছে।

দেশের পোল্ট্রি শিল্পে বর্তমানে ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। পরোক্ষভাবে এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল ৬০ লাখ মানুষ। ২০৩০ সালে এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠবে প্রায় ১ কোটি মানুষ। সম্ভাবনাময় এ শিল্প ২০২১ সালের মধ্যে বছরে ১২০০ কোটি ডিম ও ১০০ কোটি ব্রয়লার উৎপাদনের স্বপ্ন নিয়ে এগোচ্ছে। ২০২১ সালের মধ্যে লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হলে দেশের চাহিদা পূরণ,  বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে।
=======================
লেখক:কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

ফোনালাপ : ০১৭১২৩৪২৮৯৪, ০১৫৫২৩৫৩৮৯২