Tuesday, 25 September 2018

 

ঘুরে আসুন চিরসবুজের ক্যাম্পাস থেকে

আবুল বাশার মিরাজ, বাকৃবি প্রতিনিধি:ইট-বালি, ধূলামাখা দেয়ালে বন্দি ব্যস্ত নগর জীবনের কোলাহল থেকে মাঝে মাঝে ছুটে পালাতে কার না মন চায়? কিন্তু চাইলেই তো আর সবসময় পালানো যায়না। নানা রকম সীমাবদ্ধতায় আমাদের জীবন বন্দি। আর এই সীমাবদ্ধতাকে পাশ কাটিয়েই আমাদের সবসময় চলতে হয়। তাই হাতে যদি আপনার একদিনও সময় থাকে তবে ঘুরতে বেরিয়ে পড়ুন। যারা ঢাকা বা এর আশেপাশে থাকেন তারা খুব সহজেই ঘুরে আসতে পারেন ময়মনসিংহে অবস্থিত প্রকৃতিকন্যাখ্যাত ১২০০ একরের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) ক্যাম্পাস থেকে।

ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে অবস্থিত এই ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আপনাকে বিমোহিত করবেই। ক্যাম্পাসের মাঝ দিয়ে চলে গেছে রেল লাইন। তাই দেরি না করে বেরিয়ে পড়ুন আজই। ফুলে ফলে সাজানো ক্যাম্পাস দেখে মনে হবে প্রতিটি স্থান যেন এক একটি নার্সারি।

১২০০ একরের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ বেষ্টিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)। এ ক্যাম্পাসে রয়েছে বোটানিক্যাল গার্ডেন, পৃথিবীখ্যাত জার্মপ্লাজম সেন্টার, মুক্তিযুদ্ধের সৃতিস্তম্ভ বিজয়-৭১’, গনহত্যার স্মৃতিস্তম্ভ বদ্ধভূমি, শহীদ মিনার, নদের পাড়, বৈশাখী চত্বর, এক গম্ভুজ বিশিষ্ট দেশের বৃহৎ কেন্দ্রীয় মসজিদ, দেশের একমাত্র কৃষি মিউজিয়াম, ফিশ মিউজিয়াম, দেশের দুটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কেন্দ্র বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা), আম বাগান, লিচু বাগান, নারিকেল বাগান, কলা বাগান, সুবিশাল পানির ট্যাংক, ছয়টি অনুষদীয় ভবন, দুটি প্রশাসনিক ভবন, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র, গ্রাাজুয়েট ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী ভবন, কেন্দ্রীয় গবেষনাগার।

আরো আছে দুই হাজার আসন বিশিষ্ট আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম সম্মেলন ভবন, প্রকৌশল ভবন, অতিথি ভবন, ক্লাব ভবন, ৬৫৭ টি আবাসিক ইউনিট, ১২টি ফার্ম, ফিল্ড ল্যাব, ক্লিনিক, ওর্য়াকশপ, শিক্ষার্থীদের জন্য মনোরম ১৩টি হল, স্টেডিয়াম, জিমনেসিয়াম, ঈশাঁ খা হল লেক, হেল্থ কেয়ার সেন্টর, ফ্যাকাল্টি করিডোর, বঙ্গবন্ধু চত্বর, প্রেম বারান্দা, মারন সাগর, ডরমেটরি, কমিউনিটি সেন্টার, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ (কেবি কলেজ), কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হাই স্কুল (কেবি হাই স্কুল), নৈশ বিদ্যালয়, মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ নানা উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান।

ক্যাম্পাসের দর্শনীয় স্থানসমূহ

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ
যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করেন প্রথমেই প্রাণ জুড়িয়ে যাবে সম্পূর্ন প্রাকৃতিক পরিবেশের নরম হাওয়ায়। প্রধান ফটকের সাথেই দেখা মিলবে সাজানো গোছানো পরিপাটি প্রাচীরে ঘেরা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ (কেবি কলেজ)।

গণহত্যার সৃতিস্তম্ভ বদ্ধভূমি
কেবি কলেজ পার হলেই হাতের বাম পাশের রাস্তায় ঢুকলে দেখতে পাবেন ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব, কমিউনিটি সেন্টার, গনহত্যার স্মৃতিস্তম্ভ বদ্ধভূমি।

বৈশাখী চত্বর
প্রধান সড়ক দিয়ে শিক্ষকদের আবাসিক এলাকার মধ্য দিয়ে একটু এগুলেই নিরাপত্তা জোন-১ এর হাতের বাম পাশের রাস্তায় বৈশাখী চত্বর। নদের পাড় ঘেষেঁ গড়ে ওঠেছে চত্বরটি। নদের পাড়ে বাধা ঘাটে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিতেই পারেন। সারাবছর নিরবে পড়ে থাকে পহেলা বৈশাখকে বরণ করার জন্য। সেদিন এখানে ছোটখাটো মেলাও বসে। শিক্ষার্থীরা নানা সাজে ভিড় জমায় এখানে। মিলতে পাড়ে বৈশাখী গানের আসরও।

বিজয়-৭১
প্রধান সড়ক দিয়ে আসতে থাকুন। শিক্ষকদের আবাসিক এলাকা, কামাল রঞ্জিত মার্কেট (কেআর মার্কেট) মেয়েদেরে চারটি হল পেড়িয়ে বিভিন্ন অনুষদীয় ভবন পার হয়ে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে এলেই চোখে পড়বে মুক্তিযুদ্ধের সৃতিস্তম্ভ বিজয়-৭১। বিশ্ববিদ্যালয়ের এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর্য। চারপাশে ফুলগাছ বেষ্টিত মনোরম পরিবেশ। স্মৃতি ধরে রাখতে এখানে একটা ছবি তুলে নিতে পারেন।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তন
বিজয়-৭১ পাশেই শিল্পাাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তন এখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়ে থাকে। ভাগ্য ভালো থাকলে শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় সুন্দর এক সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা উপভোগ হয়েই যেতে পারে। মিলানায়তনের সামনের দিকে তৈরি করা হয়েছে মুক্তমঞ্চ। এখানেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

বঙ্গবন্ধু স্মৃতি চত্বর ও সমাবর্তন মাঠ
মুুক্তমঞ্চ হতে একটু সামনে এগুলেই আম বাগান, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী, প্রশাসনিক ভবন দেখতে পাবেন। কৃষি অনষদের পাশেই রয়েছে বঙ্গবন্ধু চত্বর। ১৯৭৩ সালের ১৩ই ফেব্রয়ারি এই স্থানে দাড়িয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কৃষিবিদদের ১ম শ্রেণীর কর্মকর্তা ঘোষনা করেন। সেই স্মৃতিকে ধারণ করেই গড়ে ওঠেছে এই চত্বর। সাথে পাশের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীও ঘুরে দেখতে পারেন। সাথে রয়েছে একটি সরকারি গ্রন্থাগার, মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের কর্নার ও মাস্টার্সের থিসিস ও পত্রিকায় চোখ মেলাতে পারবেন নিচ তলায়। দোতলায় রয়েছে শিক্ষার্থীদের পড়ার স্থান পাশে সাইবার কক্ষ। তিনতলায় সেমিনার কক্ষ রয়েছে।

ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র
ছাত্র- শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি)। প্রধান সড়ক হতে উপাচার্যের বাসভবন হতে হাতের ডান দিকে প্রবেশ করলে একটু সামনে আসলেই হাতের বামে দেখতে পাবেন হ্যালিপ্যাড, মারন সাগর, শহীদ ািমনার। তার ঠিক সামনেই টিএসসি। এখানে খাবার ব্যবস্থা, কনফারেন্স কক্ষ, বাকসুর অফিস, পত্রিকা পড়ার কক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি কার্যালয়সহ বিভিন্ন সংগঠনের কার্যালয় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পাশেই রয়েছে পুলিশ ক্যাম্প।

বোটানিক্যাল গার্ডেন
বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ প্রজাতির সংরক্ষনের দিক থেকে বাংলাদেশের এক নম্বর এটি। দুষ্প্রাপ্য গাছ-গাছালির সংগ্রহ নিয়ে ২৫ একর জায়গা জুড়ে ব্রক্ষপুত্র নদীর পাড়ে মনোরম পরিবেশে গড়ে ওঠেছে সমৃদ্ধ বোটানিক্যাল গার্ডেনটি। নদের পাড়ে রয়েছে বসার স্থান। ক্যাম্পাস এর বোটানিক্যাল গার্ডেনের সবুজ শ্যামলী আর পাখির কোলাহল এক নিমিষেই শহুরে ক্লাšিত দূর করে দিবে। এখানে মোট ৬০০ প্রজাতির গাছ আছে। হাজারখানেক বিশাল বৃক্ষ, এক হাজার ২৭৮টি মাঝারি ও চার হাজার ৪৬৭টি ছোট আকারের গাছ আছে। ফলে বিশাল এই বাগানকে ৩০টি জোনে ভাগ করে দেখাশোনা করতে হয়। জোনগুলোর নামও দেওয়া হয়েছে। যেমন ঔষধি, ফুল, ফল, ক্যাকটাস, অর্কিড, পাম, মসলা, টিম্বার, বাঁশ, বেত, বিরল, বনজ উদ্ভিদ ইত্যাদি। জলজ উদ্ভিদের জন্য ওয়াটার গার্ডেন, মরুভূমি ও পাথুরে এলাকায় জন্মে এমন উদ্ভিদের জন্য রক গার্ডেন আছে।

দেশের নানা এলাকা থেকে জোগাড় করা বিলুপ্ত ও বিরল ক্যাকটাস আছে নিসর্গ ভবনে। একেবারে দক্ষিণে আছে অর্কিড হাউস। সুন্দরবন জোনে আছে সুন্দরবনের গাছগুলো। এমনকি সেখানে সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া, পশুর, বাইন, হোগলা ও ফার্ন জাতীয় গাছ আছে। নিসর্গ ভবনে আছে বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় ক্যাকটাসের সারি। ‘পট হাউস’ নামের বিশেষ সংরক্ষণাগারে আছে অশ্বগন্ধা, সর্পগন্ধা, গন্ধভাদুলি, পূর্ণনভা, কুর্চি, বচ, উলটচন্ডাাল, অর্জুনর্মূল, অঞ্জন ইত্যাদি জাতের ঔষধি উদ্ভিদ। আছে সুগন্ধি জাতের উদ্ভিদ। বাগানে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ধরনের ফলের গাছের মধ্যে আছে স্টার আপেল, আমেরিকান পেয়ারা, থাই পেয়ারা ইত্যাদি। ফুলের মধ্যে আছে কমব্রিটাম, রনডেলসিয়া, পালাম, ক্যামেলিয়া, আফ্রিকান টিউলিপ, রাইবেলি ইত্যাদি। বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদের মধ্যে আছে রাজ অশোক, নাগলিঙ্গম, কালাবাউশ, ক্যারিলিফ, ফলসা, মনগোটা, মাক্কি, বনভুবি, লোহাকাট, উদাল, পানবিলাস, টেকোমা, বহেরা, হরীতকী, কাঁটাসিংড়া, ম্যালারিউকা, প্যাপিরাস, রুপিলিয়া, স্ট্যাভিয়া, হিং, পেল্টো ফোরাম ইত্যাদি। আরো আছে পদ্ম শাপলার ঝিল, কৃত্রিম দ্বীপ, নারিকেল কর্নার, বিলুপ্ত বাঁশঝাড় ইত্যাদি।

এত সব গাছ ঘুরে দেখার সময় মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে মেলবন্ধনের জন্য বিভিন্ন জায়গায় পশু-পাখির প্রতিকৃতি আছে। মূল গেটের কাছে বাঘ, সিংহ, দ্বীপ জোনে দুুটি রাজহাঁস ও দুটি সারস, আর্কেডিয়া গাছের নিচে আছে হরিণ। বাগানে বেড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে বিশ্রামের জন্য বেঞ্চ আছে। নদীর পাড়ে বেড়াতে আসা মানুষ সেখানে বসে গল্প করে। সেই সঙ্গে নদীতে ভেসে বেড়ানো নৌকা দেখে তাদের চোখ জুড়িয়ে যায়। রবি থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা ও শুক্র-শনিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যšত খোলা থাকে এ গার্ডে। বিশ্ববিদ্যালয়ে একমাত্র বোটানিক্যাল গার্ডেনে প্রবেশমূল্য ৫ টাকা নেওয়া হয়। আর কোথাও কোনো ফি নেওয়া হয় না। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য কোনো ফি নেই।

ফ্যাকাল্টির করিডোর
ছয়টি অনুষদের মধ্য দিয়ে রয়েছে সুন্দর করিডোর। ক্যাম্পাসকে করিডোময় বাকৃবি ও বলা যেতে পারে। করিডোরের মধ্য দিয়েও আনমনে হেঁেট বেড়াতে পারেন।

কৃষি জাদুঘর
৬২০ বর্গমিটার আয়তন বিশিষ্ট অষ্টভুজ মিউজিয়ামটি। এ সুদৃশ্য ভবনের মধ্যবর্তী অংশ সূর্যালোকের জন্য উন্মুক্ত রেখে প্রবেশ লবিও অফিসের জন্য বর্তমানে একটি করে মোট ২টি অফিস রুম এবং প্রদর্শনীর জন্য ৬টি সুসজ্জিত ও মনোরম কক্ষ রয়েছে । প্রদর্শনীতে ব্যবহৃত এই মিউজিয়ামটি বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র কৃষি মিউজিয়াম। ‘কৃষি মিউজিয়াম’ নামে এই জাদুঘরে বাঁশ ও বেতের তৈরি টুকরি, ওচা, মাথলা, বাঁশের তৈরি ঝুড়ি, টুরং, কুরুম, তেরা, খালই, গরুর ঠোয়া, হুক্কা, চালুন, কুলা ও ডুলি সংরক্ষণ করা হয়েছে। আরও আছে লাঙল, জোয়াল, মই, কোদাল, দা, নিড়ানি, কা¯েত, ঢেঁকি, পলো, চেং, বাইর, উড়ি ও সানকি।

বিজয়পুরের চীনা মাটি, এঁটেল মাটি ও দোআঁশ মাটিসহ আরও নানা ধরনের মাটিও সংরক্ষণ করা হয়েছে জাদুঘরে। বিভিন্ন ধরনের সারের পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি বিদ্যালয়, পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও অন্যান্য কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত ধান, পাট, ডাল, ছোলা, সরিষা, টমেটো, বাদামও সংরক্ষণ করা হয়েছে এই জাদুঘরে। আরও আছে বিভিন্ন জাতের শস্যবীজ, বিলুপ্ত প্রায় মাছ। সংরক্ষণ করা হয়েছে মাটি পরীক্ষার সামগ্রী (সয়েল টেস্টিং কিট), ইনসেক্ট কালেক্টিং বক্স ও পাহাড়ি চাষাবাদসহ কৃষি কাজের বিভিন্ন মডেল। আছে অজগরসহ নানা বন্যপ্রাণীর কঙ্কাল। শনিবার ছাড়া সপ্তাহে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যšত খোলা থাকে। জাদুঘরটিতে প্রবেশে কোন ফি নেয়া হয় না।

মৎস্য জাদুঘর
নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক পরিবেশে মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের পশ্চিম দিকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরত্বে দ্বিতলবিশিষ্ট জাদুঘরটি সংগ্রহ ও বৈচিত্র্যর দিক থেকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ মাছের জাদুঘর। বৈজ্ঞানিক উপায়ে ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় জাদুঘরটিতে সজ্জা ও মাছ সংরক্ষণ করা হয়েছে। দোতলায় জাদুঘরটি মূল সংগ্রহশালা অবস্থিত। জাদুঘরটিতে সিঁিড় দিয়ে ওঠতে ওঠতে আপনি প্রথমেই দেখবেন বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত মাছের তালিকা, সিড়িঁর নিচে বহু পুরাতন বাঁেশর মোথা। আমাদের দেশের ঐতিহ্যর বাবুই পাখির বাসা, মাছ ধরার যন্ত্রপাতি।

জাদুঘরটি মোট চারটি সুপরিসর গ্যালারিতে প্রদর্শিত। প্রতিটি মাছের চিত্রের একটি ক্যালেন্ডার সাথে মাছটির দৈর্ঘ্যর বিস্তর ও বৈজ্ঞানিক নাম রয়েছে। ক্যালেন্ডারটির নিচেই ফরমালিনের কাচের পাত্রে রয়েছে উপরের চিত্রে প্রদর্শিত মাছটি। ফলে শিক্ষাথীসহ দর্শনার্থীরা সহজেই মাছটি সর্ম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান লাভ করতে পারবে। পূর্বপাশের ১ম গ্যালারিতে রয়েছে সিপ্রিনিফরমিস বর্গের ৮৭প্রজাতির মাছ। এর মধ্যে রয়েছে ৮১প্রজাতির মিঠাপানির মাছ। গ্যালারিতে মাছের মধ্যে রয়েছে কার্প, রুই, কাতলা, মৃগেল, মলা, ঢেলা, কালিবাউস,বউ, মহাশোল উল্লেখযোগ্য প্রজাতির মাছ।

এখানে জাপান থেকে আনা শতবর্ষী একটি কচ্ছপের কঙ্কাল ও রয়েছে। পাশের দ্বিতীয় গ্যালারিতে সিলুরিফরমিস বর্গের মাছের অবস্থান। যারা ক্যাটফিশ নামেও পরিচিত। এসব মাছে বিড়ালের গোঁফের মত বার্বেল থাকায় এরুপ নামকরন করা হয়েছে। এখানে ১৩টি পরিবারের ৬১প্রজাতির মধ্যে প্রায় ৫৩টি প্রজাতি সংরক্ষন করা হয়েছে। এখানে বোয়াল, মাগুর, শিং, টেংরা, পাবদা, বাতাসি, আইর ,বাঘাইর প্রভূতি উল্লেখযোগ্য প্রজাতির মাছের দেখা মিলবে। অপর গ্যালারিতে পার্সিফরমিস বর্গের ২২টিঁ পরিবারের ৫৪টি প্রজাতি রয়েছে। এখানে কই, চান্দা, বেলে, খলসে, ভেটকি, টাকি, শোলের মত মাছের দেখা মিলবে। প্রধান তিনটি বর্গ ছাড়াও বাংলাদেশে আরো দশটি বর্গ রয়েছে।

স্বাদু পানির শুশুক ও অন্যান্য মাছ নামক গ্যালারিতে রয়েছে ৫০টি প্রজাতির মাছ। এদের মধ্যে ইলিশ, চিতল, ফলি, কানপোনা, চাপিলা, কাকিলা, কাচকি,পটকা, বাইন মাছ সুপরিচিত। এছাড়া এখানে ২৮বছর বয়সের ১৯৯সেন্টিমিটার লম্বা একটি শুশুকের কঙ্কাল রয়েছে।

সর্বশেষ চতুর্থ গ্যালারিতে রয়েছে প্রাগৈতিহাসিক যুগের বিলুপ্ত মাছ ও অন্যান্য প্রাণির জীবাশ্মের সংগ্রহ। স্টারলি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহায্যে যুক্তরাজ্য থেকে এই চমৎকার জীবাশ্মগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে। এই গ্যালারিতে ৪০টি জীবাশ্ম ও কঙ্কাল রয়েছে। জাদুঘরটি সপ্তাহে দুইদিন শুক্রবার ও শনিবার সকাল ৮টা হতে ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এটা সবার জন্য ঊন্মক্ত এবং প্রবেশের জন্য কোনো টিকিটের প্রয়োজন হয় না।

জার্মপ্লাজম সেন্টার
আমেরিকার টঝ-উঅজঝ এর গবেষণায় এটি বাংলাদেশ তথা এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ফলদ বৃক্ষের সংগ্রহশালা। সেন্টারটি দেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্য ফল নিরাপত্তা একটি চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে ফলমূলে দেশকে আরও প্রসিদ্ধ করতে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) জার্মপ্লাজম সেন্টার। ফলের জিন সংরক্ষণ, শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের কেন্দ্র, ফলের হিডেন নিউট্রেশন সংরক্ষণ এবং কৃষকদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের লক্ষে বাকৃবির উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের সহযোগিতায় সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট এ্যান্ড কো-অপারেশনের অর্থায়নে ১৯৯১ সালে ১ একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত হয় এই ফল জাদুঘর। তখন এর নাম ছিল ফ্রুট ট্রি স্টাডিজ। পরবর্তীকালে এ প্রকল্পের নাম দেয়া হয় ফল গাছ উন্নয়ন প্রকল্প। যার বর্তমান নাম ফলদ বৃক্ষের জার্মপ্লাজম সেন্টার এবং এর বর্তমান আয়তন ৩২ একর।

জ্যৈষ্ঠ মাসে এখানে বামন গাছগুলোতে ঝুলে থাকে অসংখ্য কাঁচা-পাকা ফল যা দেখে জিহ্বায় পানি এসে যায়। কণ্টকাকীর্ণ অমসৃণ কান্ড, আগুন রাঙা চোখ এবং ড্রাগনের অবয়বের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। গায়ে খাঁচ কাটা, ক্যাকটাস পরিবারের একটি ফল ড্রাগন! শুনেই মনে হচ্ছে আরব্য রূপকথার সেই দানবের কথা। না এবার সেটি দানব হিসেবে নয়, খ্যাত হবে ফল হিসেবে। শুধু ড্রাগন নয়, এমন হাজার প্রজাতির আকর্ষণীয় বিরল দেশী-বিদেশী ফলের গাছ ঠায় দাড়িয়ে আছে খোলা আকাশের নিচে এক ফালি জমিন কামড়ে।

কোনটি মৌসুমী, কোনটি দোফলা, কোনটি ত্রিফলা আবার কোনটি বারমাসী। কোনটি দেশী, কোনটি বিদেশী আবার কোনটি উদ্ভাবিত। সময়ের সঙ্গে ফল ঝরে পড়ে আবার নতুন ফলে ভরে যায় গাছ। তাই এটি একেবারেই জীবন্ত। প্রতি বছর বিভিন্ন সময়ে দেশী-বিদেশী অনেক গবেষক ও দর্শনার্থী আসেন এ ফল জাদুঘর দেখতে। শুধু দেখতেই নয় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে চারা সংগ্রহ করতে আসে হাজার হাজার মানুষ। দেশের বাইরেও এর প্রসার বৃদ্ধি পাচ্ছে দিন দিন।

কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী
কৃষি বিষয়ক বই সংগ্রহের বিচারে এশিয়ার বৃহত্তম লাইব্রেরী। পুস্তক সংখ্যক প্রায় ২লক্ষ ১২ হাজার। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত তিন তলা বিশিষ্ট এই ভবনে একটি সাইবার কক্ষ রয়েছে।

ভেটেরিনারি ক্লিনিক
প্রশিক্ষণ, পশু চিকিৎসা সেবা প্রদানের দিক থেকে বাংলাদেশের অন্যতম পশু চিকিৎসালয়।

প্লান্ট ডিজিজ ক্লিনিক
উদ্ভিদের রোগ নির্ণয়, গবেষণার কাজে ব্যবহৃত এই ক্লিনিক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম উদ্ভিদ চিকিৎসালয়।

নদের পাড়
পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়েই গড়ে ওঠেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রধান সড়কের হাত বাম পাশের পুরোটাই নদ। তাই নদের পাড় হাটতে হাটতেও আপনি ক্লান্ত হতে পারেন। পাড় ঘেঁষে ইটের মেঠো পথ মাঝে মাঝে বসার বেঞ্চ রয়েছে। ইচ্ছা হলে বিকালটা নৌকায় কাটিয়ে দিতে পারেন।

ঈশা খাঁ লেক, লালন চত্বর ও লো অ্যান্ড ডাউন ব্রীজ
আপনি চাইলে ঈঁশা খা লেকের পাড়ে বসে থাকতে পারেন। লেকের পাড়েই একটি খোলা চত্বর রয়েছে। চত্বরটি নাম লালন চত্বর। ছবি তোলার জন্য যেতে পারেন জিটিআই সংলগ্ন লো অ্যান্ড ডাউন ব্রীজে। এটি এখানে সংক্ষেপে লন্ডন ব্রীজ নামেই বেশি পরিচিত।

হর্টিকালচার সেন্টার ও অনান্য
ক্যাম্পাস চত্বরে ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। রেল লাইনে আনমনে আপনজনের হাত ধরে কিছুক্ষণ হাটতে পারেন। অথবা লিচু বাগান , হর্টিকালচার সেন্টার, আম বাগান , কলা বাগানের রাস্তা ধরে হেটে বেড়াতে পারেন নির্বিঘেœ। বঙ্গবন্ধু চত্বর ফ্যাকাল্টির কড়িডোর বা নদের পাড়ে বসে বসে ও সুন্দর সময় কাটিয়ে দিতে পারবেন।

খাওয়া-দাওয়া
বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে জব্বারের মোড়, রেল লাইন, কেআর মার্কেট, করিম ভবনে রয়েছে অনেক খাবার হোটেল। এসব হোটেল সবসময় আপনি মাছ, মাংস, ভর্তা ভাত, খিচুরি সব পাবেন স্বল্পমূল্যে। টিএসসিতে ও খেতে পারেন। এছাড়া ক্যাম্পাসে সাথেই আশপাশে ফসিলের মোড়, রেশষ মোড়ে পাবেন অনেক হোটেলের দোকান। চাইলে বাড়ি ফেরার সময় ময়মনসিংহ শহর থেকে স্পেশাল মালাইকারি মিষ্টি নিয়ে আসতে পারেন। মালাইকারির জন্য মা-মনি সুইটস এবং কৃষ্ণা কেবিন বিখ্যাত।

যেভাবে আসবেন
মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে বেশ কয়েকটি বাস ছেড়ে যায় প্রতি ১৫-২০ মিনিট পরপর। সময় লাগবে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। এনা গাড়িতে আসলে ভাড়া নেবে ২২০ টাকা। এছাড়া অন্যান্য শ্যামলী বাংলা, আলম এশিয়া, ইসলাম ইত্যাদি গাড়িতে ভাড়া প্রায় ১২০ টাকা। তবে চেষ্টা করবেন এনা তে করে যেতে। এছাড়া আপনি ট্রেন এ করেও যেতে পারেন। ময়মনসিংহ এসে মাসকান্দা বা ব্রীজ মোড় নামিয়ে দিবে। মাসকান্দা হতে ক্যাম্পাসে আসতে অটোতে লাগবে সবোর্চ্চ ২০ টাকা করে। ব্রীজ মোড় থেকে অটোতে নিবে ১০ টাকা করে।
-----লেখক: শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।