Monday, 25 June 2018

 

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ মৎস্য জাদুঘর

আবুল বাশার মিরাজ, বাকৃবি:মাছের সাথে বাঙালির নাম জন্মসূত্রে গাঁথা। আজন্ম লালিত সাধ ও স্বাদের অপূর্ব সমন্বয় এই দেশজ মাছ। এদের অস্তিত্ব আজ ভয়াবহ হুমকির মুখে। এছাড়াও বিচিত্র রকমের মাছ রয়েছে পৃথিবীতে। এদের এক একটি এক রকমের। এক একটি করে মাছ নিয়ে জানা খুবই কষ্টকর। একারণে সহজে জানার জন্য একই বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে শ্রেণিবিভাগ করেছেন বিজ্ঞানীরা। এর প্রায় সব প্রজাতির মাছই স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মৎস্য জাদুঘুরে। যা দেখে যে কেউই সহজে জানতে পারেন সুবিশাল জগৎ নিয়ে। বৈজ্ঞানিক উপায়ে ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় জাদুঘরটিতে সজ্জিত ও  সংরক্ষণ করা হয়েছে মাছের বিভিন্ন প্রজাতি।

সোমবার জাদুঘরে স্থান পাওয়া এক এক প্রজাতি নিয়ে শির্ক্ষার্থীদের ব্যবহারিক ক্লাসে পরিচিত করানোর কাজটি করছিলেন মৎস্য জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ড. মোস্তফা আলী রেজা হোসেন। শুধু শিক্ষার্থীদেরই নয় দেশ বিদেশের হাজারো দর্শনার্থীদের জন্য এমন কাজটি নিত্যই করে থাকেন তিনি। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতে জানা গেল বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমার তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি জাদুঘরে ‘গুটিকয়’ প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ করা হলেও একক মৎস্য জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদাহরণ এটিই প্রথম। আর এজন্যই জাদুঘরটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফিশ মিউজিয়াম অ্যান্ড বায়োডাইভার্সিটি সেন্টার’।

এ মৎস্য জাদুঘরে দেশের মোট ২’শ ৯৩ প্রজাতির মাছের মধ্যে এখন পর্যন্ত ২’শ ৩০ প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ করা হয়েছে। বাকিগুলো সংরক্ষণ করার জন্যও কাজ করে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। পরিচালক জানান, বিলুপ্তপ্রায় সব দেশীয় ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র, মাছ এবং জলজ প্রাণী সংরক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ গবেষণা কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে মৎস্য জাদুঘর প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে ১০ বছর আগে নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। এ কাজটিতে তার সাথে সহায়তা করেন যুক্তরাজ্যের স্টারলিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যান্ডী শীন। ২০০৯ সালের জুন মাসে জাদুঘরটির অবকাঠামোগত কাজ শুরু হয়। ২০১০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চাশতম সুবর্ণ জয়ন্তীতে উদ্বোধন করা হয় এটি।

জাদুঘরটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের মাঠ গবেষণা (ফিল্ড রিসার্চ) কমপেক্সের দু’তলায় নিবিড় পরিবেশে ৫টি কক্ষ নিয়ে সাজানো। দোতলায় জাদুঘরটি মূল সংগ্রহশালা অবস্থিত। জাদুঘরটিতে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে আপনি প্রথমেই দেখবেন বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত মাছের তালিকা, সিড়িঁর নিচে বহু পুরাতন বাঁশের মোথা। আমাদের দেশের ঐতিহ্যর বাবুই পাখির বাসা, মাছ ধরার যন্ত্রপাতি। অসংখ্য পরিচিত-অপরিচিত মাছ সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারবেন। সর্বশেষ চতুর্থ গ্যালারিটা বিশেষভাবে আকর্ষণ ছড়ায়। এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র, মাছ ও জলজ প্রাণীর নমুনা, ছবি ও কঙ্কাল। মাছের নমুনাগুলো বিভিন্ন আকারের কাচের সিলিন্ডারে অ্যালকোহলের ভেতর রাখা হয়েছে এবং প্রতিটি মাছের উপরে ঝোলানো রয়েছে মাছের ছবি। এতে মাছের বৈজ্ঞানিক নামসহ সব ধরনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। যাতে খুব সহজে মাছটি সম্পর্কে জানা সম্ভব হয়েছে।

জাদুঘরটিতে স্থান পেয়েছে হাঙ্গর, ডলফিন ও কুমিরের কঙ্কাল এবং কচ্ছপ ও বিভিন্ন প্রজাতির কাঁকড়ার নমুনা। এছাড়াও রয়েছে ক্যাট ফিস, ঘোড়ামুইখা, কুমিরের খিল, টাকচান্দা, ভূত বাইলা, পুইয়া, রাণীমাছ, কুটাকান্তি, গুতুম, কাঞ্চনপুটি জাতীয় বিভিন্ন বিলুপ্ত মাছ। এছাড়াও জাদুঘরের করিডোরে স্থান পেয়েছে আবহমানকাল ধরে এ দেশের জেলেদের ব্যবহার্য বিভিন্ন ধরনের মাছ ধরার উপকরণ। একটি কক্ষে দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে থ্রিডি অডিও-ভিজুয়াল-সুবিধা। কক্ষটিতে প্রাগঐতিহাসিক যুগের বিলুপ্ত মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জীবাশ্মের প্রতিলিপি প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে।

রয়েছে কোটি কোটি বছর আগে বিলুপ্ত প্রাণীর কঙ্কাল। জাদুঘরের আরেকটি কক্ষে প্রায় ৪০টি জীবাশ্ম ও কঙ্কাল সংগৃহীত আছে। এর মধ্যে হাঙরের চামড়া, ৫৪০ মিলিয়ন বছর আগে বিলুপ্ত হওয়া দুই দাঁতবিশিষ্ট বাঘের কঙ্কাল, ৫৪ মিলিয়ন বছর আগে বিলুপ্ত জলজ প্রাণী গার পাইক, হর্স গ্রাস, স্টিং রের প্রতিলিপি, ১৫ মিলিয়ন বছর আগে বিলুপ্ত হাঙরের চোয়াল ও দাঁত, ৩৫ কোটি বছর আগে বিলুপ্ত কোরালের প্রতিলিপি অন্যতম।

আরো রয়েছে হাজার বছরের বিলুপ্ত প্রজাতির ফসিল। যা চারটি সুপরিসর গ্যালারিতে সাজানো হয়েছে। ফরমালিনের দ্রবণে বড় বড় কাচের সিলিন্ডারে এই সব মাছ সংরক্ষণ করা হয়েছে। প্রতিটি মাছের উপরে দেওয়ালের সাথে টাঙানো আছে নয়নাভিরাম আলোকসজ্জা। আলোকসজ্জার সাথে বৈজ্ঞানিক নামসহ মাছের যাবতীয় বিবরণ দেয়া রয়েছে, যাতে করে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে যে কেউ এখান থেকে পরিপূর্ণ জ্ঞান নিতে পারে।

ড. মোস্তফা আলী রেজা হোসেন জানান, এ মৎস্য জাদুঘরে রয়েছে দেশের মৎস্য ঐতিহ্যের ইতিহাস ও নিদর্শন। জাদুঘরটিতে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে লন্ডনের ব্রিটিশ ন্যাচারাল মিউজিয়াম, যুক্তরাজ্যের স্টারলিং বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের প্রায় সব জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। তিনি জানান, ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এটিকে সম্প্রসারণ করা হবে। খুব শ্রীঘ্রই সেটির কাজও শুরু হবে। চারদিকে পানি বৃষ্ঠিত একটি বড় জলাধারের মাঝে ৫ তলা বিশিষ্ট একটি কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। যেটির প্রথম তলায় অ্যাকুরিয়ামে সব ধরনের দেশী মাছ জীবন্ত অবস্থায় স্থান পাবে। দ্বিতীয় তলায় নদী-নালায় স্থান পাবে মিঠাপানির সব ধরণের মাছ, তৃতীয় তলায় স্থান পাবে সামুদ্রিক মাছসমূহ। চতুর্থ তলায় স্থান পাবে আবহমান বাংলার সব ধরনের মাছ ধরা ও চাষের যন্ত্রপাতি। পঞ্চম তলায় থাকবে সুবিশাল সম্মেলন কক্ষ। যেখানে গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা, সিম্পোজিয়ামে অংশ নিতে পারবেন।

জাদুঘরটি সপ্তাহে দুইদিন শুক্রবার ও শনিবার সকাল ৮টা হতে দুপুর ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এটা সবার জন্য ঊন্মক্ত এবং প্রবেশের জন্য কোনো ফি প্রয়োজন হয় না।