Monday, 25 June 2018

 

বিপুল সম্ভাবনায় পাট শিল্পের পুণর্জাগরণ

এস এম মুকুল:পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক আভিজাত্যের সাথে সম্পৃক্ত একটি অনন্য সম্ভাবনার শিল্প নাম। একসময় পাট ছিলো আমাদের জাতীয় অর্থনীতির প্রধানতম অর্থকরী ফসল। নদীমাতৃক বাংলাদেশে বর্ষায় নৌপথে চলাচলে দেখা যেত পাটক্ষেতে পানি আর বাতাসের ঢেউ দোলানোর খেলা।

যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের নেতৃত্বে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের একদল বিজ্ঞানী ২০১০ সালে তোষা পাট, ২০১২ সালে ছত্রাক এবং ২০১৩ সালে দেশি পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেন। এর ফলে খুলে যায় পাট শিল্প নিয়ে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মাকসুদুল আলম মারা যাওয়ার পর পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মনজুরুল আলমের নেতৃত্বে গবেষণার পরবর্তী ধাপ শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশের জিন বিজ্ঞানীরা পাটের আঁশকে সূক্ষ্ম সুতায় পরিণত করার পথে আরেক ধাপ এগিয়েছেন।

আশাজাগানিয়া খবর হচ্ছে-স্বাধীনতা অর্জনের প্রায় ৫ দশকের দ্বারপ্রান্তে এসে আবারো ঘুরে দাঁড়িয়েছে পাট শিল্প। যদিও এখনো ব্যপক হারে আগের মত পাট চাষ শুরু হয়নি। তবে থমকে যাওয়া পাটের চাকা আবারো সজোড়ে চলতে শুরু করেছে এটাই বড় কথা। বর্তমান সরকার পাটশিল্পকে গুরুত্ব দিয়েছেন। পাটশিল্পে প্রণোদনা দিয়ে বহুমাত্রিক তৎপরতা সৃষ্টি করেছেন। আর এসব কার্যক্রমের ফলে আবারো বিশ্বে মাথা উচু দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশের গৌরবের পাটশিল্প।

দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে মোট ২২টি পাটকল চালু রয়েছে এবং বেসরকারিখাতে প্রায় ২০০ পাটকল আছে। দেশের প্রায় চার কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাট খাতের ওপর নির্ভরশীল। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগ এবং নিরন্তর চেষ্টায় পাট ও পাটজাত পণ্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ক্রম ক্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষকরা অন্য ফসলের তুলনায় পাট চাষে যাতে লাভবান হতে পারেন সেজন্য দেশের অভ্যন্তরে পাটের উৎপাদন বাড়াতে মানসম্মত বীজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। পাটপণ্য বৈচিত্র্যকরণে সরকারি পাটকলগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের পাটপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। জাতীয় রফতানি আয়ের শতকরা ৪ দশমিক ৯ ভাগ পাটখাত থেকে অর্জিত হচ্ছে। আগামীতে ইউরোপের বাজারে নিষিদ্ধ হচ্ছে সিনথেটিক পণ্য। যার ফলে বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে। আশা করা যাচ্ছে বিশ্ব বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পরিকল্পনামাফিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে আগামী ৫ থেকে ৭ বছরে পাটের রফতানি কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৫টি দেশ ছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্টেলিয়া, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, ব্রাজিলসহ পৃথিবীর ১৮৮টি দেশে বাংলাদেশের পাট এবং পাটজাত পণ্য রফতানি হচ্ছে।

বাংলাদেশ থেকে কাঁচা এবং প্রক্রিয়াজাত পাট ছাড়াও পাটের তৈরি কার্পেট, চট, পাটের ব্যাগ, বস্তা, ঝুড়ি, বিভিন্ন ধরনের কাপড়, সুতা, তুলা, জুতা, ঘরসাজানোর দ্রব্য বিলাস সামগ্রীসহ বিভিন্ন পাটজাত পণ্য বিদেশে রফতানি হচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে-পাটশিল্পের উৎপাদিত পণ্য রফতানি করে প্রতিমাসে ৬শ’ থেকে ৭শ’ কোটি টাকা আয় করছে। বাংলাদেশ থেকে রফতানি করা তোষা পাট থেকে ভারতে বর্তমানে ১০৪ ধরনের সুতা ও ফেব্রিক্স তৈরি হচ্ছে। সরকার যদি পাট শিল্প খাতের উন্নয়ন অব্যাহত রাখার জন্য প্রণোদনা সহায়তা দেয় তাহলে পাট শিল্প খাত বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা অর্জন করাও অসম্ভব কিছু নয়।

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৮০০ থেকে এক হাজার কোটি টাকার ভিসকোচ আমদানি হয়। বাংলাদেশেই পাট থেকে ভিসকোচ উৎপাদনের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। একনেকের অনুমোদন নিয়ে আগামী দুই বছরের মধ্যে ভিসকোচ উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হবে। বাংলাদেশে উৎপাদিত পাটের মাত্র ১০ শতাংশ বীজ আমরা স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করি, বাকি ৯০ শতাংশ বীজের জন্য ভারতের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই পাটের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমাদের বীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই।

অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্যে ‘সোনালী আঁশের সোনার দেশ, পাট পণ্যের বাংলাদেশ’। শ্লোগানে ৬মার্চ দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয় পাট দিবস উদযাপন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল চাহিদা থাকা স্বত্ত্বেও উৎপাদন ও পণ্য বহুমুখীকরণ স্বল্পতার কারণে পর্যাপ্ত রফতানি করা সম্ভব হচ্ছে না। সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েও ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) পাট এবং পাটজাত পণ্য রফতানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে ৬৬ কোটি ১৮ লাখ মার্কিন ডলার-যা এই সময়ের কৌশলগত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১০ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশ বর্তমানে আফগানিস্তান, আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, বেনিন, ব্রাজিল, বুলগেরিয়া, কানাডা, চিলি, চীন, কংগো, কোস্টারিকা, মিসর, ইতালি, ইন্দোনেশিয়া, ইথিওপিয়া, গাম্বিয়া, জার্মানি, গোয়েতেমালা, হাইতি, ভারত, আয়ারল্যান্ড, ইরান, জাপান, জর্দান, কোরিয়া, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, মরক্কো, মায়ানমার, নেদারল্যান্ড, পাকিস্তান, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, রোমানিয়া, রাশিয়া, সৌদিআরব, সুদান, দক্ষিণ আফ্রিকা, তাইওয়ান, তাজাকিস্তান, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, উগান্ডা, গুয়েতেমালা, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনামে পাট ও পাট পণ্য রফতানি করছে।

আমরা অনেকেই হয়তো জানিনা যে, পাটখড়ির কার্বন দেশের বাণিজ্যে নতুন দিগন্তের সৃষ্টি করেছে। দেশের পাটখড়ি থেকে তৈরি কার্বন পাউডার বা চারকোল রপ্তানি হচ্ছে চীনে। পাটখড়ির কার্বন মোবাইলের ব্যাটারি, প্রসাধনী, দাঁত পরিষ্কারের ওষুধ, কার্বন পেপার, কম্পিউটার ও ফটোকপিয়ারের কালি, আতশবাজি, ফেসওয়াশের উপকরণ, প্রসাধন পণ্যসহ বিভিন্ন জিনিস তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হয়।

পাট অধিদপ্তরের সূত্র মতে, দেশে বছরে উৎপাদিত ৩০ লাখ টন পাটখড়ির ৫০ শতাংশও যদি কার্বন করা যায় তাহলে বছরে উৎপাদন দাঁড়াবে ২ লাখ ৫০ হাজার টন। দেশে পাটখড়ি থেকে কার্বন তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ চারকোল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির মতানুযায়ী, চারকোল রপ্তানি করে বর্তমানে আয় হচ্ছে ১৫০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা। সম্ভাবনা আছে বছরে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আয় করার। তাছাড়[া স্থানীয়ভাবে সাড়ে ১২শ’ টন উৎপাদন হলেও পাট বীজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫ হাজার টন। ফলে ভারত বা চীন থেকে প্রতিবছর বীজ আমদানিতে চলে যাচ্ছে বড় অংকের অর্থ। আমদানি বন্ধ করে দেশের পাট বীজ উৎপাদন বাড়ালে অনেক বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।

বাংলাদেশের অনেক অঞ্চেলে অনেক পাট জন্মে, কিন্তু পাট পঁচনের প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত পানির অভাবে ওইসব এলাকায় উৎপাদিত পাট আঁশের অধিকাংশই অত্যন্ত নিম্নমানের হয়। পাট পচন পদ্ধতির তারতম্যের কারণেই পাট আঁশের গুণাগুণের তারতম্য হয়। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটে পাট চাষি ভাইদের জন্য বাঁশের হুকের সাহায্যে ‘পাটের ছালকরণ (রিবনিং) ও ছাল পচন (রিবন রেটিং) পদ্ধতি’ উদ্ভাবন করেছে। এ পদ্ধতিতে পুরো পাট গাছ না পচিয়ে কাঁচা গাছ থেকে ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে ছাল পচাতে হয়, ফলে পচানোর জন্য পানি কম লাগে, পচনের জায়গা ও সময় কম লাগে, বহন খরচ কম লাগে, আঁশে কোনো কাটিংস থাকে না এবং আঁশের মান অত্যন্ত ভালো হয়, ফলে আঁশের মূল্য বেশি পাওয়া যায়।

পাটশিল্পের বহুমাত্রিক ও নান্দনিক ব্যবহার দিন দিনই বাড়ছে। আধুনিক রুচিশীলতার সাথে তাল মিলিয়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাট এবং পাট থেকে তৈরি সুতা দিয়ে শতরঞ্জি, ব্লেজার, জুতা, বাহারি রঙ-বেরঙের ব্যাগ, ঝুড়ি, ওড়না,ঘর সাজানোর নানা সামগ্রীসহ ১৩৫ রকমের বহুমুখী পাটপণ্য তৈরি হচ্ছে।

পরিবেশবান্ধব ও নান্দনিকতার কারণে রুচিশীল ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে পাটপণ্য। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, পাটের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হলে এর সুদিন ফিরিয়ে আনাও সম্ভব হবে। চাল, গম সহ বেশকিছু পণ্য প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দেশেই ২০ লাখ কাঁচা পাটের অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরি করা হয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে-বর্তমানে বিশ্ববাজারে ৫০০ বিলিয়ন পিস শপিং ব্যাগের চাহিদা রয়েছে। পাটের ব্যাগের বার্ষিক চাহিদা ১০ কোটি থেকে ৭০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে আন্তর্জাতিক শপিং ব্যাগের বাজারে পাটজাত শপিং ব্যাগ রফতানির সম্ভাবনা আরো বাড়বে। আরো একটি আশার খবর হচ্ছে চীনের প্রযুক্তি সহায়তা নিয়ে সরকারি পাটকলগুলোর মানোন্নয়ন করে দেশি পাট থেকে সুতার প্রধান কাঁচামাল ‘ভিসকস’ তৈরি করতে চায় সরকার।

পাট দিয়ে বহুমুখী পণ্য উৎপাদান করে বাংলাদেশ বিশ্বের রফতানি বাজার ধরতে পারে। এক্ষেত্রে পর্দা, টেবিল ক্লথ, রানার, প্লেসমেট, কুশন কাভার, সোফার কাভার, কিচেন ওয়্যার, লন্ড্রি বাস্কেট, ফ্রুট বাস্কেট, স্টোরেজ প্রডাক্ট, হ্যাঙ্গার, ক্রিসমাস ডেকোরেশন সামগ্রী, গার্ডেনিং প্রডাক্ট, ফ্লোর কাভারিং প্রডাক্ট, শপিং ও ফ্যাশনেবল প্রডাক্ট, লাইফ স্টাইল ও টেকনিক্যাল টেক্সটাইল উৎপাদনে মনোযোগী হতে হবে। বিশ্ববাজারে চটের ব্যাগের পাশাপাশি হোম টেক্সটাইল, গিফট অ্যান্ড হাউজওয়্যার প্রডাক্ট, ফ্যাশন এক্সেসরিজ অ্যান্ড লাইফস্টাইল প্রডাক্ট উৎপাদনে ন্যাচারাল ম্যাটেরিয়ালস হিসাবে পাটের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। পাটপণ্য বহুমুখী করে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ববাজার থেকে মোটা অংকের রফতানি আয় করা সম্ভব।

-লেখক : কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক এবং উন্নয়ন গবেষক,