Wednesday, 23 May 2018

 

গবাদি প্রাণির অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প প্লানটেইন ঘাস

আবুল বাশার মিরাজ, বাকৃবি:মানিকগঞ্জের গিলন্ড গ্রামে ‘প্লানটেইন ঘাস ও নিরাপদ প্রাণি খাদ্য’ শীর্ষক মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পশুপুষ্টি বিভাগ শুক্রবার ওই মাঠ দিবসের আয়োজন করে।

মাঠ দিবসে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জসিমউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব অধ্যাপক ড. জহুরুল করিম। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির পরিচালক ড. এম. এ. মাজেদ এবং বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. খান শহিদুল হক। এছাড়াও স্থানীয় এলাকাবাসী, বিভিন্ন এলাকার খামারীরা উপস্থিত ছিলেন। মাঠ দিবসের শুরুতেই অতিথি, কৃষিবিদ, খামারি ও স্থানীয় এলাকাবাসী গবেষণা মাঠ, গবেষণাকৃত পশু ও পোল্ট্রি খামার পরিদর্শন করেন।

মাঠ দিবসের বিকাল ৪টায় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. জহুরুল করিম বলেন, ‘দীর্ঘ দিন গবেষণা করে গবেষক এই ঘাসটিকে গবাদি প্রাণির জন্য উপকারী প্রমাণ করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে এদেশের আবহাওয়ায় চাষ উপযোগী করে তুলেছেন। যারা গবাদিপশু পালন করেন, নিঃসন্দেহে আপনারা এ ঘাস চাষের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করতে পারেন। আর এটা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে কৃষকদের এ প্রযুক্তি গ্রহণ বরতে হবে।’

উল্লেখ্য, গবাদি প্রাণি মোটাতাজাকরণের ক্ষেত্রে দেশে স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি নানা ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আশির দশকে শুরু হয়েছিল গ্রোথ প্রমোটার অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার। এটি এনজাইমের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে এবং বিভিন্নভাবে পশুর বিপাকের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করে থাকে। কিন্তু এসব কৃত্রিম অ্যান্টিবায়োটিক গ্রোথ প্রমোটার প্রাণিদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস করে। এসব ওষুধ ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদিত পশুপণ্য অর্থাৎ মাংস, দুধ গ্রহণের ফলে মানুষের মাঝে ব্যবহার পরবর্তী (রেসিডিউয়াল) ক্ষতিকারক প্রভাব লক্ষ করা যায়। এতে মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। দেখা দেয় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। হার্ট ডিজিস, ডায়াবেটিস, অটিজমসহ বিভিন্ন ভয়াবহ রোগের কারণ এটি।

৯০ এর মাঝামাঝি থেকে পশুখাদ্যে এসব ব্যবহার নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নসহ উন্নত বিশ্বে প্রায় তিন দশক ধরে গ্রোথ প্রমোটার ব্যবহারের পর এর ক্ষতির দিক অনুধাবন করে ২০০৬ এর ১ জানুয়ারি থেকে পশুখাদ্যে এর ব্যবহার বন্ধ করে। তখন থেকেই বিজ্ঞানীরা গ্রোথ প্রমোটারের বিকল্প পশুখাদ্য উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। গবেষণায় দেখা যায়, ঔষুধি উদ্ভিদ বা প্রাকৃতিক ভেষজ হতে পারে বিকল্প পশুখাদ্য। যদিও ঔষুধি উদ্ভিদের ব্যবহার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইতিহাসে খুব পুরানো। ঔষুধি উদ্ভিদ এরই মধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গ্রিন গ্রোথ প্রমোটার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমাদের দেশেও বিভিন্ন ঔষুধি উদ্ভিদ রয়েছে। যেমন সজিনা, পেঁয়াজ, গার্লিক ইত্যাদি ভেষজ জাতীয় উদ্ভিদ।

প্লানটেইন (Plantago lanceolata L.) একটি নতুন আবিষ্কৃত বহুবর্ষজীবী ঘাসজাতীয় ঔষুধি উদ্ভিদ। যা বিরূপ প্রভাব ছাড়াই পশুর শরীর অ্যান্টিবায়োটিক গ্রোথ প্রমোটার কিংবা তার চেয়ে বেশি হারে বর্ধিত করবে। জাপান এবং চীন এ ভেষজ নিয়ে গবেষণায় অনেকদূর এগিয়েছে। সাধারণ ঘাসের তুলনায় এর মধ্যে অধিক পরিমাণ ভিটামিন 'সি' এবং 'ই' আছে, যা ত্বকের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এ ছাড়া এর মাঝে এমন কিছু উপাদান আছে যা সাধারণ ঘাসে নেই। অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবেও রয়েছে এর চমৎকার কার্যক্ষমতা। যা ফ্রি র‌্যাডিকেলের কার্যকারিতা বন্ধ করে প্রাণিদেহের কোষ ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্লানটেইন খাইয়ে উৎপাদিত মাংস কম চর্বিযুক্ত হয়, যা জাতির সুস্বাস্থ্যের জন্য দরকার। তাই মেধাবী ও সুস্থ জাতির জন্য পশুখাদ্যে ঔষুধি উদ্ভিদ ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। সারা বিশ্ব এখন স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে সোচ্চার। বিশ্ব এখন ঝুঁকছে অর্গানিক দ্রব্যের দিকে। অর্গানিক পদ্ধধিতে প্রাণিজ মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে প্রাণিজ খাদ্য হিসেবে উদ্ভিদটি আলাদা গুরুত্ব বহন করে।

এ বিষয়টি মাথায় রেখে ২০০৪ সালে জাপানের ইউয়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে যান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পশুপুষ্টি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-মামুন। তখন ওই দেশে এই ঘাসের ওপর গবেষণা করে সফলতা পান তিনি। পেয়েছেন জাপানের সেরা তরুণ গবেষক, ডিন ও প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড। কিন্তু উদ্ভিদটি শীতপ্রধান অঞ্চলের হওয়ায় মনে সুপ্ত আকাঙ্খা পোষণ করেন এটিকে কিভাবে দেশের প্রাণিজ মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাজে লাগানো যায়। পরবর্তীতে ২০১১ সালে পিএইচডি ও পোস্টডক শেষে বাংলাদেশে ফিরে উদ্ভিদটি নিয়ে দেশীয় আবহাওয়ায় জন্মানোর চেষ্টা করেন এবং সফলতা পান। শীতপ্রধান অঞ্চলের উদ্ভিদ হওয়ায় তিনি শীতকালকে বেছে নেন তার গবেষণার উপযুক্ত সময় হিসেবে। এটি ৬-২৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। তবে ২০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সবচেয়ে বেশি ঔষধি গুণাগুণ থাকে। উৎপাদন ব্যয় কম হওয়ায় দেশের কৃষকরা এটি ব্যবহার করলে খুব কম খরচেই অধিক লাভবান হবেন বলে জানান তিনি।

ঘাসটির চাষাবাদ সম্পর্কে ড. আল-মামুন বলেন, নভেম্বরের শুরুতে বীজ ছিটিয়ে দিলে তেমন কোনো যত্ন নেওয়া ছাড়াই এটি যেকোনো ধরনের মাটিতে জন্মায়। বীজ বপনের ৪৫-৫৫ দিন পর প্রথম কাটিং দেওয়া যায়। এর এক মাস পর দ্বিতীয় কাটিং এবং দ্বিতীয় কাটিং এর এক মাস পর তৃতীয় কাটিং দেওয়া যায়।

তিনি এর উপকারিতা সম্পর্কে বলেন, রোমন্থক প্রাণী যেমন গরু, ভেড়া ইত্যাদিকে স্বাভাবিক খাবারের সাথে খুব সামান্য পরিমাণে (পোলট্রিতে ১%, ভেড়ায় ৪%, গরুতে ৫-১০%) ফ্রেশ প্লান্টেইন এবং এর পাউডার মিশিয়ে খাওয়ালে প্রাণীর হিট স্ট্রেস কমিয়ে প্রোটিনের সংশ্লেষণ বাড়িয়ে দেয়। উচ্চ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ক্ষমতাসম্পন্ন হওয়ায় মাংসের উৎপাদন, স্বাদ ও রং বৃদ্ধি পায় এবং পঁচন রোধ করে। এটি হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে দুগ্ধবতী ও গর্ভবতী প্রাণীর দুধের উৎপাদনক্ষমতা বাড়ায় এবং সুস্থ-সবল বাচ্চা জন্ম দেয়। একই সাথে ফ্যাটি এসিডের (ওমেগা-৬ এবং ওমেগা-৩) অনুপাত কমাতে সহায়তা করে। এতে করে হার্ট ভালো থাকে। বয়স ধরে রাখতে সহায়তা করে। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও আয়ুষ্কাল বাড়ায়। রক্তে কোলেস্টরেলের মাত্রা কমায়। ক্যান্সার ও অটিজম প্রতিরোধ করে। তাই এ্যানিমেল অ্যাক্ট যথাযথ প্রয়োগ সুনিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। গ্রোথ প্রমোটারের বিকল্প কিছু আবিষ্কার ও ব্যবহারে গবেষকদের সার্বিক সহযোগিতা করার দাবি জানান সরকারের কাছে। তার এ গবেষণাটি এনিমেল জার্নালসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।