Saturday, 21 April 2018

 

জাতীয় স্বার্থে পোল্ট্রি শিল্পের জন্য কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবী

ডা.মো. সারোয়ার জাহান: বড় দুঃসময় পার করছি আমরা যারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খামার মালিক, ফিডমিল মালিক, হ্যাচারী মালিক, মেডিসিন কোম্পানি মালিক, কেমিষ্ট, পরিবেশক সহ এবং এই শিল্পের সাথে জড়িত লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষ। ৯০ এর দশক থেকে তিল তিল করে গড়ে উঠা প্রাণিসম্পদের এ বৃহৎ শিল্পটি আজ বড় অসহায়। যাদের কাছে আমরা আশা করি কিছু একটা করার তাদের নিরব ভূমিকা এ সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলেছে।

আর এ সমস্যাটা বানিজ্যক লেয়ার এর ক্ষেত্রে বেশি বেশি প্রযোজ্য। দেশের চাহিদা খতিয়ে না দেখে এবং মাথা পিঁছু গড় ডিম খাওয়ার জটিল সব হিসাব নিকাশ মাথায় নিয়ে অপরিকল্পিত ভাবে লেয়ার প্যারেন্ট আমদানিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ার ফল হলো আজকের এই করুণ দশা। একদিন বয়সী লেয়ার বাচ্চার দাম উঠা নামার কারনও এই অপরিকল্পিত ভাবে লেয়ার প্যারেন্ট আমদানি।

এখানে আমি আমার ২০১২ সালের জুলাই মাসে ‘ভেটসবিডি’তে প্রকাশিত তথ্যটি তুলে ধরছি- লেখাটি দেখেতে চাইলে লিংকে করুন- (অপরিকল্পিত ভাবে প্যারেন্ট স্টক আমদানি করাই হলো একদিন বয়সী লেয়ার বাচ্চা ও ডিমের মূল্য উঠানামা করার মূল কারনঃ প্রকাশকাল-৬ জুলাই,২০১২

২০১৩-১৪ সালে ডিমের ভালোবাজার মূল্য পেয়েছিলেন খামারীরা। ১৫-১৬ তে খাদ্যের দাম কিছুটা কমার কারনে মার্কেট স্থিতিশীল ছিল। ফলে এই সময়ে ডিম উৎপাদনে অনেক বড় বড় উদ্যোক্তার সেক্টরে প্রবেশ ঘটে। একই সাথে যারা বড় বড় উদ্যোক্তা তাদের বানিজ্যিক ডিম উৎপাদন আরও বাড়িয়ে দেয়। এসময়ে পুরনো খামার চালুসহ নতুন নতুন আরও বহু খামার গড়ে ওঠে। স্বাভাবিক কারনেই লেয়ার বাচ্চার ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত চাহিদা বেড়ে দাম ১০০-১২০ টাকা হয়ে যায়। এসময় একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা পাওয়া দুস্কর হয়ে ওঠে।

এমন পরিস্থিতিতে আবারও ছোট বড় হ্যাচারী গড়ে উঠল, প্যারেন্ট আমদানি শুরু হলো। এই লেয়ার প্যারেন্ট আমদানি ২০১৫ সাল থেকেই ধারাবাহিকভাবে প্রতি বছর বেড়েছে এবং ডিমের দামও তুলনামুলক ভাল থাকাতে উদ্যোক্তাগন দেশের প্রকৃত ডিমের চাহিদার কথাই ভুলে গেলেন। এর মাঝে আবার রপ্তানি করার আশ্বাস পাওয়ায় দেশি বিদেশী বিনিয়োগও বাড়তে লাগলো।
 
কিন্তু একটা বিষয় আমাদের মাথায় কখনও আসলো না আসলে আমাদের দেশে মোট কত ডিম দরকার আর এর জন্য কত লেয়ার প্যারেন্ট দরকার। আর এই চিন্তাটা কখনও প্রান্তিক খামারীরা করবে না। এটা করতে হবে যারা নীতি নির্ধারনীতে আছেন তাদের। এখানে উল্লেখ করতে পারি, আজ থেকে ৩-৪ বছর আগেও জানি মাথা পিছু ডিম ৫৫-৬০ টি, তখন প্যারেন্ট ছিল প্রায় ৫ লক্ষ, তাহলে এই ডিম গ্রহনের পরিমান যদি ১০৪ টিতে যায় অর্থাৎ উন্নত দেশের মতো হয় (যদিও আমরা নিম্ন মধ্যবিত্ত) তবুও ৯ লক্ষের বেশি লেয়ার প্যারেন্ট দরকার নাই। এর বেশি প্যারেন্ট আসলে উৎপাদিত ডিম দেশের বাইরে রপ্তানি করতে হবে। প্রকৃ্ত পক্ষে দেশে এখন সর্বোচ্চ চাহিদার চেয়েও উৎপাদন বেশি। তারই একটা বাস্তব হিসাব নিকাশ তুলে ধরছি।

এবার আসি আসলে আমাদের কি পরিমান ডিম দরকার এবং সেই অনুযায়ী লেয়ার ও লেয়ার প্যারেন্ট কত হওয়া উচিৎ।
 
আমাদের দেশের একজন মানুষ যদি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা হিসাব অনুযায়ী সপ্তাহে ২ টি করে অর্থাৎ বছরে ১০৪ টি করে ডিম খায় তাহলে সপ্তাহে মোট ডিমের প্রয়োজন ৩২ কোটি (জনসংখ্যা ১৬ কোটি ধরে)। এই ৩২ কোটি ডিম উৎপাদন করতে প্রতিদিন ডিম উৎপাদন দরকার ৪ কোটি ৫৭ লক্ষ। এই পরিমান ডিম উৎপাদন করতে লেয়ার মুরগি দরকার ৫ কোটি ৭১ লক্ষ ২৫ হাজার (গড় উৎপাদন ৮০% ধরে)। এই ৫ কোটি ৭১ লক্ষ ২৫ হাজার মুরগি সারা বছর ব্যাপি ডিম পাড়া অবস্থায় রাখতে হলে বছরে মোট একদিন বয়সি লেয়ার বাচ্চা দরকার ৮ কোটি ৫৬ লক্ষ ৮৮ হাজার (এর মধ্যে ২ কোটি ৮৬ লক্ষ লেয়ার পুলেট অবস্থায় থাকবে)। এই ৮ কোটি ৫৬ লক্ষ ৮৮ হাজার লেয়ার বাচ্চা উৎপাদন করতে আমদানিকৃ্ত বছরে লেয়ার প্যারেন্ট বাচ্চা দরকার ১০ লক্ষ ২৮ হাজার যার মধ্যে ৬ লক্ষ ৮৬ হাজার উৎপাদনে থাকবে (১২৫ টি লেয়ার বাচ্চা/প্যারেন্ট)।

তাহলে কি দাঁড়ালো- যদি আমরা প্রত্যেকে বছরে ১০৪ টি করে ডিম খাই (যদিও সরকারী হিসাবে ৯০-৯৫ আর বেসরকারী হিসাবে ৬৫-৭০ টি ডিম) তাহলে আমাদের দেশে ১ দিন বয়সী লেয়ার প্যারেন্ট দরকার ১০ লক্ষ ২৮ হাজার। আর অন্যান্য ডিম যদি ১০% ধরি তাহলে সর্বোচ্চ প্যারেন্ট দরকার ৯ লক্ষ ২৫ হাজার। আমার জানামতে ২০১৭ সালে দেশে লেয়ার প্যারেন্ট আসছে প্রায় ১২ লক্ষাধিক এবং লেয়ারের জিপিও এসেছে। এই জিপি থেকেও আরও লেয়ার প্যারেন্ট আমদানিকৃ্ত প্যারেন্টের সাথে যোগ হয়েছে। তাহলে আজকে আমরা যারা ডিমের প্রকৃ্ত চাহিদা, উৎপাদন ও ডিম খাওয়ার পরিমান এবং এর বহুমুখি ব্যবহার নিরূপন না করে ধুম ধারাক্কা লেয়ার প্যারেন্ট আমদানি করছি, যারা সব সময় ব্রয়লার প্যারেন্ট করতাম তারাও কিছু কিছু লেয়ার প্যারেন্ট আমদানি শুরু করলাম-এখন কি হবে? যারা বড় তাদের গত ২ বছরে যা আয় হয়েছে তাতে ২০১৮ সাল পুরাটা দাম না পেলেও চলবে।

কিন্তু যারা বেশি দামের আশায় কোন রকম হিসাব নিকাশ ছাড়াই প্যারেন্ট আনলাম, খামার করলাম, ফিডমিল দিলাম, হ্যাচারী করলাম, মেডিসিন কোম্পানি দিলাম, তাদের এই লোকশান কি কখনো পূরণ হবে? তারা কি আবার ঘুরে দাড়াতে পারবে? সুন্দর সোনালী স্বপ্নে বিভোর হয়ে ডিমে আমরা স্বয়ং সম্পূর্ন হবো, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করবো-কিন্তু একই হাল? একই চিত্র? প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ও কিছু করার নাই। কারন তাদের আমদানি নিয়ন্ত্রন করার কোন আইন নাই। বড়দের ছাড় দিতেই হয় কারন তারা বড়, এ শিল্পের যত উন্নয়ন তারাই করে যাচ্ছে! আর ছোটদের তো আমদানিতে উৎসাহিত করতেই হয় কারন এ শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে। সরকারের একটি বাড়ী একটি খামার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

আমার এতো গুলো কথা কারো পড়ার সময় হয়তো হবে না, তবুও বলছি-আজকে সময় এসেছে এ শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলে মিলে সরকারী, বেসরকারী, ছোট বড় সকল সংস্থা একীভুত হয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করতে হবে। যে কমিটি দেশের লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বাঁচাতে,ডিম, মাংস, দুধের প্রকৃ্ত চাহিদা নিরূপন করে সেই অনুযায়ী ব্রয়লার জিপি, ব্রয়লার ও লেয়ার প্যারেন্ট, উন্নত জাতের গরু আমদানি করার অনুমোদন দিতে হবে। উৎপাদিত ডিম, মাংস, দুধের দাম নির্ধারন করে দিতে হবে যাতে উৎপাদনকারী ও ভোক্তা উভয়েই লাভবান হয়। আর যারা বড় আকারে করবেন তাদের অবশ্যই বিদেশে রপ্তানি করার নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং সেই ভাবেই তাকে উৎপাদন করতে হবে যাতে বিদেশে রপ্তানি করতে কোন সমস্যা না হয়।

মনে রাখতে হবে আমরা এখনও উন্নত জাতিতে পরিনত হতে পারিনি, আমাদের অর্থনীতি এখনও কৃ্ষি ও প্রাণিসম্পদ নির্ভর। দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ এখনও গ্রামীন কৃ্ষি, পোল্ট্রি ও গবাধি প্রাণির উপর নির্ভরশীল। দেশের লক্ষ লক্ষ নারী-পূরুষ, যুব সমাজ কে বেকারত্বের হাত থেকে বাঁচাতে সরকারের এবং সেক্টরের বিভিন্ন সংস্থা কে এক যুগে কাজ করার সময় এসেছে। আর এটা না করতে পারলে মাঝারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা শেষ হয়ে যাবে এবং সেই সাথে সাথে এদের সাথে জড়িত লক্ষ লক্ষ মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। আর তখন বড় বড় ও বহুজাতিক কোম্পানীগুলো নিজেদের ইচ্ছে মতো বাংলাদেশের মার্কেট নিয়ন্ত্রন করবে। আমার এই লেখা আমার একান্ত মতামতের প্রতিফলন এবং ১৫ বছর ধরে সেক্টরে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে লেখা। এতে  কেউ কোন প্রকার কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করছি। আমি একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হয়ে আকুল আবেদন-এর একটা সুন্দর সমাধান চাই। ধন্যবাদ।
-লেখক-ম্যানেজিং ডিরেক্টর, সেইফ বায়ো প্রোডাক্টস্ লি: