Saturday, 21 April 2018

 

সাগরের নীল ভালোবাসার সান্নিধ্যে

আবুল বাশার মিরাজ:‘প্রবালদ্বীপের তলে সমুদ্র অমরায়/ নোনা জলে ফিন ফিনে ফেনিল ধারায়// চিকচিক করে ওঠা অভ্র নীল ঢেউ/ দেখেছে অনেকে আগে, আঁকেনি তো কেউ।’ সব সময়ই কবি সাহিত্যিকের মুগ্ধতার একটা বড় অংশ সাগর বা সমুদ্র।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে কাজী নজরুল, হুমায়ূন আহমেদ, জীবনানন্দ দাস, বুদ্ধদেব বসুদেরকে ভালোবেসে মুগ্ধতায় বুঁদ করে রেখেছিল সমুদ্র। তাইতো রয়েছে বাংলা সাহিত্যে একটা বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে সাগরের উপস্থিতি। রচিত হয়েছে অসংখ্য কবিতা, গান, সিনেমা আর কত কি। আর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একদম শেষে প্রান্তে এসে আমাদের নীল সাগর আলিঙ্গনের এক অপূর্ব সুযোগ এনে দিলো কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ।

সময়ের বিখ্যাত ও মহামানবদের যেখানে সাগর তার নীল জলের অপর সৌন্দর্য, মহিমা ও ভালোবাসায় মোহাবিষ্ট করে রেখেছে সেই তুলনায় আমরা তো অতি ক্ষুদ্র। আমাদের আর কি সাধ্য সমুদ্রের আহ্বানকে উপেক্ষা করার!! তাইতো দেরি না ফেইসবুকে ‘আজ আমরা চলে যাচ্ছি দু’একবার হাটুজলে নেমে, আমাদের কতটা জেনেছো সমুদ্রের জল’ স্টেটাস দিয়ে বিভাগের সাত জন শিক্ষকসহ আমরা ১৬ জন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী চললাম সাগর সান্নিধ্যে। সমুদ্রযাত্রায় বাড়তি ফ্লেভার যোগ করতে ময়মনসিংহ থেকে যথাসময়ে চেপে বসলাম ট্রেনে।

রাতের অন্ধকার ভেদ করে চলা রেলগাড়ির একই বগিতেই আমাদের দলের সবাই। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে রেলের কামরায় জমে উঠলো আমাদের নাচ, গান,আড্ডা আর কবিতা। কামরার সহযাত্রীরা ভাগাভাগি করে নেয় আমাদের আনন্দ। হয়তো এই বয়সে এসে অনেকই ক্ষণিকের জন্য হলেও ফিরে গিয়েছিল তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সোনালী দিনগুলোতে। চট্রগ্রামে নেমে আমাদের জন্য নির্ধারিত বাসে করে সোজা কক্সবাজার। হোটেলে ব্যাগ রেখে দুপুরের খাবার সেরে সী বীচে কাটিয়ে দিলাম বাকী সময়টা।

পরদিন খুব সকালে ওঠে টেকনাফ যাই। উদ্দেশ্যে আমাদের ট্যুরের মূল আকর্ষণ নীল অম্বু আর সহস্র প্রবালে বাঁধাই করা নারিকেল গাছে ঘেরা স্বপ্নের সেন্টমার্টিন। সমুদ্রগামী জাহাজে চেপে পৌঁছাই ঠিক সাড়ে ১২ টায়। সাগর থেকে ছোট্ট এই দ্বীপটিকে দেখে মনে হয় সাগর জলেভাসা একটা পদ্ম। হোটেলে ব্যাগ রেখে ফুটবল নিয়ে আমরা নেমে যাই সেন্টমার্টিনের সী বীচে। সাগরের বিশাল জলরাশি তীরে ইচ্ছামত ফুটবল খেলে, নীলাম্বুর নীল পানিতে গোছল, উত্তাল গর্জন, জোয়ার-ভাটা, ডাবের মিষ্টি পানি, শামুক, ঝিনুক, প্রবাল কুড়িয়ে ও সূর্যাস্ত দেখে কেটে গেল দিনের বাকীটা সময়। সাগরের বিশাল কল্লোলের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলা কিংবা দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় মনে পড়ে বুদ্ধদেব বসুর কবিতার সেই লাইন ‘একবার নিজেকে দাও না সমুদ্রের কাছে/ তারপর দ্যাখ সে তোমাকে নিয়ে কি করে। একবার না বারবার সঁপে দিয়েছি নিজেকে, সমুদ্র খেলেছে আমাকে নিয়ে আর মনকে বেঁধে রাখেছে নীল আকাশের নীচে প্রবালের উপর আছড়ে পড়া উর্মি আর ঘন কেয়াবনের এক অজানা মায়ায়।

রাতের সমুদ্র সে তো এক অজানা কুহক। রাত্রি বাড়ার সাথে সাথে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সাগরের গর্জন। দরিয়ার বিশাল বিশাল ঢেউ আছরে পড়ছে প্রবালের গায়ে। নোনা জল ছোঁয়া বাতাস শরীরে ভুলিয়ে দিয়ে যায় ভালোবাসার এক অব্যক্ত শিহরণ। শেষ রাতের দিকে সাগরের জলে চুম্বন দিয়ে জেগে ওঠে চন্দ্র। ক্ষণিকেই সাগরের নীলঅম্বু রুপালী জ্যোছনায় সোনালী রং ধারণ করে। মুহূর্তেই চারপাশটা গ্রাস করে নেয় অন্যরকম ভালোবাসা, মোহনীয়তা ও সিগ্ধতায়। দ্বীপটাকে মনে হয় সোনা জলে ভাসা কোন এক সবুজপরী। খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠে সূর্যোদয় দেখতে গেলাম। মনে হচ্ছিল ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে আসছে সূর্য। সময়ের সাথে সূয়ের তীব্রতা বাড়তে থাকে। আমরা সাইকেল নিয়ে দ্বীপের চারদিকটা ভালো করে ঘুরে দেখি। সাড়ে ১২টার দিকে ঘাটে জাহাজ ভীড়তে দেখে মনটা কেমন করে ওঠে। কারণ কিছুক্ষণের মধ্যেই ইতি ঘটবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ ট্যুরটির।

কিছু দিনের মধ্যে শেষ হবে ছাত্র জীবন, আলাদা হয়ে যাবো সবাই। কোন সময় হয়তো আবার আসবো এই সমুদ্রের পারে। তখন থাকবে না এই বন্ধুগুলা। তবে স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে বন্ধুদের সাথে সমুদ্র দর্শনেই এই সময়গুলো। তখনো কানে বাজবে সাগর পাড়ের বেঞ্চিতে বসে সোহান, শফিক, সিফাত, ত্বোফা, নিপা, রেশমার গাওয়া গান-কবিতা, রাইসা, আরিফ, জাকির, সাগরকে সাথে সাইকেল চালানোর কথা। তখন সত্যিই মনে পড়বে আলেয়া, সানজিদা ও সেতু ম্যাডামের কেয়ারিং, শাসন ও রাসেল স্যারের কাছে আমাদের শত আবদারের কথা। আর হয়তো মনে মনে বলতে থাকবো জীবনানন্দ দাসের সিন্ধুসারস কবিতায় সেই বিখ্যাত লাইন ‘তুমি তাহা কোনোদিন জানিবে না; সমুদ্রের নীল জানালায়/ আমার শৈশব আজ আমারেই আনন্দ জানায়।’