Monday, 16 July 2018

 

সুস্বাস্থের চরম শত্রু-অক্সিডেন্ট বনাম পরম উপকারী বন্ধু-এন্টিঅক্সিডেন্ট

“The whole body is Agriculture, Vitality is the Organic in it”
কৃষিবিদ এম.এ.হক :বিগত ২৩শে জানুয়ারী,২০১৮ “মাত্রাতিরিক্ত এন্টিঅক্সিডেন্ট গ্রহণ কি ভালো”? শিরোনামে ডাঃ সজল আশফাক-এর “বাংলাদেশ প্রতিদিন” এ প্রকাশিত লেখাটি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষন করেছে। মাত্রাতিরিক্ত সব জিনিসই খারাপ; অতএব, এন্টিঅক্সিডেন্ট মাত্রাতিরিক্ত হলে যে খারাপ হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কথায় আছে Too more is bad.

সেকালে আমাদের জন্মের পর আমাদের পিতা-মাতা তাঁদের মুরব্বিদের পরামর্শে আমাদের অনেককেই বহু আমিষের সমাহার ও রোগ প্রতিরোধী গুন সম্পন্ন মায়ের শালদুধ (colostrum)-খেতে দেননি। কারণ মাত্রাতিরিক্ত অসচেতনতার দরূন তখন শালদুধকে বিষ দুধ মনে করা হতো। আবার একালে অনেক শহুরে ভদ্র মহিলা মাত্রাতিরিক্ত স্বাস্থ্য সচেতনার কারনে জন্মের পর তার শিশু সন্তানকে বুকের দুধ না দিয়ে কৌটার দুধ পান করান। মাত্রাতিরিক্তের ঠেলা-ধাক্কায় সেকাল-একাল একাকার হয়ে গেছে।

যাহোক, মূল আলোচনায় ফিরে আসি। এন্টিঅক্সিডেন্টের প্রধান উৎস শাক-সবজি, ফল-মূল। হিসাব সোজা-রাসায়নিক সার, কীটনাশক, রোগনাশক, আগাছা নাশক, হরমোন, এন্টিবায়োটিক, ফরমালিন, কারবাইড, ইথালিন ইত্যাদি শাক-সবজিতে ব্যবহার করা হলে চরম শত্রু-স্বাস্থ্য সন্ত্রাসী অক্সিডেন্টের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং রোগ-শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার বিষমুক্ত বা জৈব যথা-গোবর সার, কম্পোষ্ট, সবুজসার, খৈল, ছাঁই, হাড়ের গুঁড়া ইত্যাদি ব্যবহারের মাধ্যমে চাষ-বাস করা হলে পরম উপকারী এন্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় যা অত্যন্ত স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশ বান্ধব।

আর যদি কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোষ্ট-(Vermi compost)-এর মাধ্যমে বিষমুক্ত বা জৈব চাষ-(Organic farming) করা হয় তাহলে সেটা হবে এ যাবৎকালের সর্বোত্তম নিরাপদ পুষ্টি সমৃদ্ধ আবাদ কৌশল (Safe & maximum antioxidant & other food value rich organic farming techniques) ইদানিংকালের চলমান জৈব গবেষনায় দেখা যাচ্ছে কেঁচো শুধু প্রাকৃতিক লাঙ্গলই নয়। এ লাঙ্গল শুধু জমি চাষই করে না, একই সাথে মাটি-মানুষের অত্যন্ত হিতকর প্রাকৃতিক সার-পানি (Natural hormone-enzyme etc.) ও সরবরাহ দিয়ে থাকে এবং তাতে করে শাক-সবজি ফল-মূল, মাছ-মাংস, ডিম-দুধ ইত্যাদির এন্টিঅক্সিডেন্টসহ পুষ্টিগুণ অত্যধিক বৃদ্ধি পায় এবং তাতে শরীর সুস্থ্য-সবল ও রোগ মুক্ত থাকে। যে কেঁচো দেখলে আমরা নাক সিটকাই, এদিকে কেঁচো দেখলে আমরা ভয়-ঘৃনায় অন্যদিক দিয়ে ঘুরে যাই; সে কেঁচো আমাদের আরোও কত যে কি উপকার করে থাকে বা করার সুযোগ আছে আগামী দিনের জৈব গবেষণাই (Organic research) তা বলে দিবে।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অষ্ট্রেলিয়া, জার্মানিসহ বিশ্বব্যাপি প্রচেষ্টা-এন্টিঅক্সিডেন্ট বা নিরাপদ খাদ্য বৃদ্ধিকল্পে জৈব গবেষণা জোরদার করা। কারণ উত্তম জৈব চাষ (Improved organic farming)-এ কোন কোন ভিটামিন ও এন্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ ২/৩ গুন বেড়ে যায়। এমনকি অন্যান্য পুষ্টি উপাদানও ২০-২৫ ভাগ বৃদ্ধি পায়। প্রকৃতির এমনই বিধান, বিষ মুক্ত চাষে শরীরের জন্য পরম উপকারী পুষ্টি উপাদানগুলো অধিক হারে বৃদ্ধি পায়। আবার একই সাথে শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর-নাইট্রেট (Nitrate) সহ ভারী ধাতু (Heavy Metals-mercury, lead, Chromium, cadmium & arsenic that have known toxic effects on internal organs such as the kidneys, brain, bone or retina /Taber’s Medical Dictionary) ইত্যাদি হ্রাস পায়।  

বাংলাদেশে এন্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ বা সুপার ফুড (Super Food) গুলোর মধ্যে পালংশাক, ব্রুকলি, বীট, পেঁয়াজ, রসুন, ভূট্টা, বেগুন, কালোজাম, স্ট্রবেরী ইত্যাদি প্রধান। এই খাবারগুলোর ক্যানসার-ডায়াবেটিসসহ  রোগ প্রতিরোধী শক্তি অধিকতর বিদ্যমান। এন্টিঅক্সিডেন্ট বৃদ্ধিকল্পে এত যে তোড়জোড়, আসলেই এতে আছে কি? কি তার এতো মাহাত্ম! আগেই বলেছি অক্সিডেন্ট-এন্টিঅক্সিডেন্ট প্রাকৃতিকভাবে শাক-সবজি ফল-মূলে প্রধানত সৃষ্টি হয়। কথাই বোঝা যাচ্ছে অক্সিডেন্টের বিপরীত অবস্থান হচ্ছে এন্টিঅক্সিডেন্টের; অর্থাৎ শক্রর শক্র আমাদের বন্ধু। এন্টিঅক্সিডেন্টের কাজ-ক্ষতিকর অক্সিডেন্টের ক্ষতির হার কমানো, ক্ষতি করতে বাধা দেওয়া বা অক্সিডেন্টকে নিরপেক্ষ করে তোলা। এমনিভাবে এন্টিঅক্সিডেন্ট এই বিশ্বের প্রাণীকূলকে (Plant kingdom & Animal kingdom) সুস্থ সবল ও রোগমুক্ত রাখার প্রানান্তকর চেষ্টা করে থাকে।

আমরা জানি একজন সুস্থ সবল মানুষের দৈনিক ২৫০ গ্রাম শাক-সব্জি খাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু আমরা বাস্তবে খাচ্ছি মাত্র ৫০ গ্রামের মত; আর ফল-মূলতো কালেভদ্রে। আমরা যতটুকু ভাত খাই উন্নত দেশে তার চেয়েও বেশি সব্জি খায়। তাই আমাদের এন্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হওয়ার কোন কারণ দেখছি না। আমরা সব্জি-ফল খাচ্ছি প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম। তবে খুব বেশি বেশি সব্জি-ফল থেকে শুধু এন্টিঅক্সিডেন্ট বিশেষ করে “কেরোটিনয়েড-ভিটামিন ই” ইত্যাদি নিষ্কাশন (Extraction) করে মাত্রাতিরিক্ত খেতে থাকলে তা অবশ্যই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেদিক থেকে স্বনামধন্য স্বাস্থ্য নিবন্ধকারের সতর্কবাণী প্রণিধানযোগ্য। আবার “সব সত্যি কথা সব সময় বলতে নেই” বলে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন সাংবাদিক ও কলামিষ্ট জনাব আব্দুল গাফফার চৌধুরী যে উপদেশ দিয়েছেন তাও কম প্রণিধানযোগ্য নয়। তাই ডাক্তার সাহেবের অতিরিক্ত সতর্কতা যেন আতঙ্কে পরিনিত না হয় সেদিকে সংশ্লিটদের খেয়াল রাখা প্রয়োজন। তা না হলে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শাক-সবজি ফল-মূল খেতে জনগণ ভয় পেতে পারে যদি না এন্টিঅক্সিডেন্ট মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যায়! কিন্তু বাস্তবে তা হবার কথা নয়। আমরা এন্টিঅক্সিডেন্ট বা পুষ্টিতে অনেক পিছিয়ে আছি। বাংলাদেশ খাদ্য উদ্বৃত্তের (উৎপাদন ৩ কোটি ৮৫ লাখ টন/কৃষি ডাইরী, ২০১৮) কিন্তু পুষ্টি ঘাটতির দেশ।

অপরদিকে বাংলাদেশের খুব কম চাষিকেই বর্তমানে ফসলি জমিতে জৈব সার ব্যবহার করতে দেখা যায়। নেই তো ব্যবহার করবে কোত্থেকে ? কাগজে পত্রে যা’ই থাকুক না কেন গরু-মহিষ, ঝোপ-জঙ্গল, ঘাস, আগাছা, লতা-পাতা ইত্যাদি দিনকে দিন কমে যাচ্ছে, জৈব সার আসবে কোত্থেকে? আগেই বলেছি উর্বরতা ও পুষ্টির উৎস জৈব সার। তাই জৈব সারও নেই, পুষ্টিও নেই। আবার চাষি/ডেয়রী পর্যায়ে যে টুকু গোবর হয়, রাখা হয় খোলা-মেলা স্থানে। রোদে-বৃষ্টিতে ধুয়ে মুছে গোবর সারের সার পদার্থটুকু খালে-বিলে নষ্ট হয়ে ছোবড়াটুকু পড়ে থাকে। উপরন্ত, না হয় চুলা জ্বালানির জন্য গোবর দিয়ে ঘুঁটে তৈরী করে বর্ষাকালের জন্য মজুদ রাখা হয়।

তাই তো একমাত্র ভরসা ক্যামিকেল সার এবং পরিনামে বাম্পার ফলন। এ জৈব সারের অভাব হেতু ফসলী মাটির অনুর্বরতা বা পুষ্টি ঘাটতি পূরণের উপায় কি? দেশে লাখ লাখ টন জৈব সারের প্রয়োজন। একটি মাত্র উপায়-ঢাকা শহরের জৈব সার উপযোগী দৈনিক প্রায় ২০০০ টন রান্না ঘরের উচ্ছিষ্ট (Decomposable kitchen organic wastes) দিয়ে এবং তার সাথে খড়-নাড়া, কুঁড়া, ভূষি, লতা-পাতা ইত্যাদি মিশিয়ে জৈব সার তৈরী করে সাশ্রয়ী মূল্যে চাষী পর্যায়ে সরবরাহ দেওয়া। (বিঃদ্রঃ ক্যামিকেল সার-কীটনাশক ব্যবহারে সুপারিশকৃত মাত্রা অনুসরণ করা সঙ্গত।)
একই সাথে প্রত্যেক জেলা শহরে ঐ জেলার জৈব আবর্জনা দিয়ে জৈব সার উৎপাদন প্লান্ট (Organic manure preparation plant {(OMPP)} স্থাপন করে উন্নত মানের জৈব সার স্থানীয় চাষী পর্যায়ে সরবারহ দেওয়া গেলে মাটির উর্বরতাসহ ফসলের পুষ্টিমান বৃদ্ধিহেতু সমগ্র দেশের পুষ্টি ঘাটতি পূরণে বিশেষ সহায়ক হবে। আন্তর্জাতিক পুষ্টি বিষয়ক সংস্থাগুলোও এ ব্যাপারে মূল্যায়ন কষে দেখতে পারেন।

ব্যবসায়িক দিক বিবেচনা করে কোন রপ্তানীকারক সংস্থা/কোম্পানীও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে পারেন। অধিকন্তু, পি পি পি (Public Private Partnership)-এর মাধ্যমেও এ ধরনের জৈব/নিরাপদ সমন্বিত কৃষি প্রকল্প Compost, Vermi Compost, Agronomical crop, Horticultural crop, Dairy, Livestock, Fishery, Poultry, Duck Farming, Azola Plant ইত্যাদিও গ্রহণ করা যেতে পারে। কারণ বিদেশের মাটিতে জৈব/নিরাপদ শাক-সব্জি ফল-মূলের দাম দ্বিগুনেরও বেশি। জৈব সার-মাটির মূল্যও কোন অংশেই কম নয়।

১৯৮০ সালে মহকুমা কৃষি কর্মকর্তা, চাঁদপুর থাকাকালীন সময়ে সিআইপিতে (Chandpur Irrigation Project) বোরো মৌসুমে ব্যপকভাবে দস্তার অভাব দেখা দিলে চাঁদপুর শহরের সার উপযোগী আবর্জনা দিয়ে জৈব সার তৈরী করতঃ দস্তা ঘাটতি এলাকায় সরবরাহ দেওয়ার জন্য তদানীন্তন মহকুমা কর্মকর্তা (Sub Divisional Officer) জনাব হাবিবুর রহমান সাহেবকে অনুরূপ প্রস্তাবনা দিয়েছিলাম। এ ব্যাপারে আবর্জনা দিয়ে সার-বিদ্যুৎ তৈরী সহ জাপানের অভিজ্ঞতার কথা বারবার বলা হলেও, অনেক সেমিনার-সিম্পোজিয়াম করা হলেও এ জন-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আর এগুচ্ছেনা।

অদ্যাবধি আবর্জনা “আপদ” ই রয়ে গেল “সম্পদ” এ আর পরিণত হয়নি-মাটির স্বাস্থ্যও ভাল হয়নি। অথচ বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন, Healthy Soil Begets Healthy Nation কারণ ফসলি জমি উর্বর, গাছের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান যোগান, পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি, মাটির গঠন প্রকৃতি উন্নতকরণ, পরিবেশ শীতল রাখা ও অনুজীবের কার্যকারিতা বৃদ্ধিসহ পুষ্টিসমৃদ্ধ-উৎপাদনক্ষম রাখতে হলে ফসলি মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ (Organic matter) ৫% থাকা অতিব জরুরী। কিন্তু সমগ্র দেশের মাটিতে বাস্তবে আছে মাত্র ১% এরও কম। অতএব ক্যামিকেল সারের প্রভাবে বাম্পার ফলন হলেও পুষ্টি ঘাটতি (Malnutrition) দিনে দিনে বৃদ্ধি পাওয়াই স্বাভাবিক।

আন্তর্জাতিক সংস্থা বলছে (Rates of malnutrition in Bangladesh are among the highest in the world  with 6 million children estimated to be chronically undernourished/Save the Children, 8 March, 2015) আমরা সবাই জানি “পুষ্টিতে তুষ্টি”। তাইতো আমাদের দূরদৃষ্টি সম্পন্ন দেশনেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টি সম্যক উপলব্ধি করে যথার্থই মন্তব্য করেছেন-
“খাদ্যে আমরা স্বনির্ভর হয়েছি, পুষ্টিতেও আমাদেরকে স্বনির্ভর হতে হবে”।
=====================
লেখক: সাবেক অতিরিক্ত পরিচালক
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা।
E-mail:
Mob:880201671398810