Friday, 15 December 2017

 

ভাসমান ফিস ফিড এবং প্রসঙ্গ কথা

এখলাসুল হক:বাংলাদেশে ভাসমান ফিস ফিড (Floating Fish Feed) প্রচলন গত কয়েক বছরে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। প্রচলিত ডুবন্ত ফিডের চাহিদার পাশাপাশি ভাসমান ফিডের চাহিদা প্রতিনিয়তই বেড়ে চলেছে। ২০০১ সালে রুপসী ফিস ফিড মিল বাংলাদেশে প্রথম ভাসমান ফিডের যাত্রা শুরু করে। শুরুর দিকে খামারীদের ভিতর ভাসমান ফিডের প্রভাব তেমন পরেনি। পরবর্তীকালে ২০০৬ সালে মেগা ফিড একটু বড় পরিশরে শুরু করে ভাসমান ফিডের বাজারজাত করন যা ক্রমান্নয়ে খামারীদের আগ্রহী করে। ২০০৭ সালে আফিল ফিড লিঃ তাদের ভাসমান ফিড মিল প্লান্ট শুরু করে যা থেকে উৎপাদিত ফিড একান্তই নিজস্ব খামারে ব্যবহৃত হতো। একে একে আফতাব, প্যারাগন, এসিআই গোদরেজ, ন্যাশনাল, ইনডেক্স, নারিশ, এসএমএস, বিশ্বাস গ্রুপ, কোয়ালিটি, এগ্রো ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ট্রাষ্ট (AIT), ফ্রেশ, কৃষিবিদ গ্রুপ ভাসমান ফিড মিল প্লান্ট স্থাপন করে।

বর্তমানে প্রায় প্রতিটি ফিডমিল কোম্পানীই ডুবন্ত ফিডের পাশাপাশি ভাসমান ফিড তৈরি করছেন বা তৈরী করার কথা ভাবছেন। ভাসমান ফিড তৈরীর ক্ষেত্রে অনেকের অভিজ্ঞতা ভালো আবার সঠিকভাবে মেশিনপত্র নির্বাচন করতে না পারায় অনেকেরই অভিজ্ঞতা তিক্ত। এজন্য নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ভাসমান ফিস ফিড উৎপাদন করার আগে কি কি বিষয়ে বিবেচনা করতে হবে, তার উপর আমাদের এই আলোচনা।

ফিস ফিড দু’রকম হয়ে থাকে। প্রথমটি পিলেটেড (Pelleted) ফিড ও দ্বিতীয়টি এক্সট্রুডেড (Extruded) ফিড, যা আমাদের দেশে ফ্লোটিং ফিড নামে অধিক পরিচিত।

প্রকৃত পক্ষে এক্সট্রুডেড ফিড ভাসমান, ডুবন্ত বা ধীর গতিতে ডুবন্ত (Slow Sinking) হতে পারে। তাই এক্সট্রুডার শুধু ভাসমান ফিডের জন্যই না বরং ডুবন্ত বা ধীর গতিতে ডুবন্ত (Slow Sinking) এর জন্য হতে পারে।

একটু পর্যালোচনা করে দেখা যেতে পারে ভাসমান ফিডের ধারনা কি কারণে তৈরি হয়ঃ

প্রকৃতিগত ভাবেই বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পানির বিভিন্ন স্তরে বিচরন করে। সাধারনত মাছ পানির যে স্তরে বিচরন করে সে স্তরেই তাদের খাবার প্রয়োজন হয়। পূর্বে প্রাকৃতিক নিয়মে মাছের প্রজনন ও বৃদ্ধির জন্য প্রাকৃতিক খাবার পর্যাপ্ত ছিল। কিন্তু বর্তমানে চাষের পুকুরে মাছের ঘনত্ব বেশি থাকায় মাছের প্রজনন ও বৃদ্ধির জন্য দরকারী খাবার মূলতঃ বাইরে থেকেই সরবরাহ করতে হয়। ক্ষুধার্ত মাছ তার খাদ্যের জন্য পুকুরের বিভিন্ন স্তরে বিচরন করে। সেক্ষেত্রে ডুবন্ত ও ভাসমান খাবারই চাষের পুকুরে প্রয়োগ করা যায়।

তবে ভাসমান খাবারের কিছু বৈশিষ্ট্য যা ডুবন্ত খাবারের থেকে ভিন্নতর, যেমন- মাছের পরিপাকতন্ত্র ক্ষুদ্র ও পরিপাক প্রক্রিয়া স্বল্প মেয়াদী হওয়ায় মাছের জন্য হালকা খাদ্য অধিক উপযোগী। হালকা খাবার দ্রুত পরিপাক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মাছের ওজন বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। মূলতঃ এই ধারনা থেকেই শুরু হয় এক্সট্রুডেড ফিড টেকনোলজির বিকাশ। সাধারনত ডুবন্ত ফিডে স্টার্চের পরিমান শতকরা ১০ ভাগ হয়ে থাকে অন্যদিকে এক্সট্রুডেড ফিডে কমপক্ষে শতকরা ২০ ভাগ হয় যা তুলনামুলকভাবে মাছের পুষ্টি এবং বৃদ্ধিতে অধিক সহায়ক হয়।

আবার চিংড়ি খাদ্য বিষয়ে বলা যায়, ভাসমান ফিড চিংড়ির জন্য নয়, কারণ তারা পানির সর্বনিম্ন স্তরে বিচরন করে। চিংড়ি খাদ্য সবসময়ই ডুবন্ত হওয়া বাঞ্চনীয়। আমাদের দেশে চিংড়ি খাদ্য পিলেট মেশিন থেকেই তৈরি হয়। অনেকেরই জানা নেই যে চিংড়ির ডুবন্ত খাদ্য এক্সট্রুডার থেকেও তৈরি হতে পারে। এক্সট্রুডার থেকে চিংড়ির ডুবন্ত খাদ্য তৈরি করা হলে অধিক স্টার্চের পরিমান ও পানিতে দীর্ঘক্ষণ স্থায়ীত্বের কারণে চিংড়ি একদিকে যেমন পরিপূর্ণভাবে খাদ্য গ্রহণ করতে পারে, অন্যদিকে খাদ্যগুণ এবং খাদ্য রূাপান্তরের হার অধিক হওয়ায় খুব তাড়াতাড়ি বেড়ে ওঠে। তবে এটি বলাই বাহুল্য এক্সট্রুডার থেকে তৈরি চিংড়ি খাদ্য সাধারন খাদ্যের তুলনায় ব্যয়বহুল। আয় ও ব্যয়ের বিশ্লেষন করলে দেখা যাবে এক্ষেত্রেও এক্সট্রুডেড ফিডের ব্যবহার খামারীদের জন্য লাভজনক।

পিলেটেড এবং এক্সট্রুডেড ফিডের বিশেষ পার্থক্য হচ্ছে, পিলেটেড খাদ্য পানিতে খুব বেশী স্থায়ী হয়না বলে খাদ্যের অপচয় বেশি হয়, অপরদিকে পানিতে এক্সট্রুডেড খাদ্যের স্থায়ীত্ব বেশী হওয়ায় এর কোন অপচয়ই হয় না।

একজন নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে নিম্নোক্ত বিষয়গুলি বিবেচনায় আনা উচিতঃ

১. বাজার পর্যালোচনা।
২. বর্তমান উৎপাদন ও চাহিদা এবং অনুমেয় ভবিষ্যৎ চাহিদা।
৩. এক্সট্রুডেড ফিড উৎপাদনের মেশিনপত্রের দাম বেশি হওয়ায় তুলনামুলকভাবে প্রকল্পের খরচ বৃদ্ধি পাবে, সংগত কারণে নতুন উদ্যোক্তাদের ফিড বিক্রয়ের কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পের উৎপাদন ক্ষমতা ও বিনিয়োগের পরিমান বিবেচনা করা উচিত।
৪. সাধারন পিলেটেড খাবারের তুলনায় এক্সট্রুডারে খাদ্য তৈরী অনেক বেশী জটিল, ফলে বাস্তবে অনেকক্ষেত্রে ফিডের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার থেকে কম হয়। একারণে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিকে ভালোভাবে বুঝে মেশিনের উৎপাদন ক্ষমতা নির্ধারন করতে হবে।
৫. ফিডমিলের মেশিনপত্র সরবরাহের জন্য দেশী বিদেশী বিভিন্ন কোম্পানী আছে, তবে তাদের প্রস্তাবিত মেশিনপত্র যাচাই বাছাই করে সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
৬. দেশে বিভিন্ন কোম্পানীর সচল ফিডমিল পরিদর্শন এবং প্রয়োজনে বিদেশ ভ্রমণ করে নতুন নতুন টেকনোলজি সম্পর্কে জেনে বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
৭. একটি ফিড মিলের জন্য একাধিক কোম্পানীর মেশিনের সমন্বয় একসাথে করা উচিত নয়, আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি পৃথিবীর বিভিন্ন কোম্পানী থেকে বিভিন্ন ভাল মেশিনপত্র একসাথে করার পরেও নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা ভালো না হলে সমন্বয়টা ভালো হয় না, ফলে কাঙ্খিত উৎপাদন পাওয়া যায় না এবং কোন কোম্পানীও এককভাবে এর দায়িত্ব নিতে চায় না।
৮. মেশিন কেনার আগে বিক্রয়ত্তোর সেবা কতোটুকু পাওয়া যাবে এবং তার জন্য কি পরিমান মূল্য দিতে হবে তা অবশ্যই দেখে নেয়া উচিত।
৯. মেশিনের কর্মক্ষমতা, বিক্রয়ত্তোর সেবা ও ওয়ারেন্টি সম্পর্কে ফিডমিলারদের সন্তুষ্টির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা উচিত।
==============
লেখক:
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
চিকস্ এন্ড ফিডস্ লিমিটেড

বিস্তারিত জানতে কল করুন:০১৭২৫-৬৩৩৩৩৭, 017256CKNFEEDS