Friday, 15 December 2017

 

পোলট্রি যখন সোশ্যাল প্রোটিন

কানিজ ফাতেমা: সমাজ গঠনে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূুত হয়েছে পোলট্রি শিল্প। পোলট্রিকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে নানা কর্মকান্ড। গ্রাম থেকে নগর থেকে রাজধানী সর্বত্রই এর বিস্তৃতি। সমাজের প্রত্যেকটি স্তরেই রয়েছে পোলট্রির সরব উপস্থিতি। যেখানেই এ শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটেছে সেখানেই একে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কর্মচাঞ্চল্য যা এলাকার সমাজকে বদলে দিয়েছে। পোলট্রিজাত পণ্য প্রোটিনের সবচেয়ে সহজলভ্য ও স্বাস্থ্যকর উৎস হিসেবে আজ প্রমাণিত।

সারা দুনিয়ায় পোলট্রি আজ সহজলভ্য ও সুলভ আমিষের যোগানদাতা হিসেবে সকল ধর্ম-বয়স ও পেশার মানুষের কাছে অগ্রগণ্য। উৎসব আর সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানাদিতে পোলট্রিজাত পণ্যের রেসিপি এখন সমাদৃত। বাচ্চাদের স্কুলের টিফিন থেকে রোগীদের পথ্যেও পোলট্রির নাম সর্বাগ্রে। নতুন প্রজন্মের রুচি ও চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে এখন দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে চিকেন নাগেট, সসেজ, ড্রামস্টিক, বার্গার, চিকেন সামুচা, মিটবলসহ বিভিন্ন ধরনের মজাদার প্যাকেটজাত খাবার যা কিছুকাল আগেও বিদেশ থেকে থেকে আসতো। এসব কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নতুন প্রজন্মের একটি সামাজিক সংস্কৃতি। এসব কিছু বিবেচনা করে বলা যায় পোলট্রি হচ্ছে সোশ্যাল প্রোটিন

বিপুল জনগোষ্ঠীর এ দেশে খাদ্য নিরাপত্তা একটি মুখ্য বিষয়। খাদ্যের অন্যতম একটি পুষ্টি উপাদান হলো প্রোটিন আর প্রাণি থেকে প্রাপ্ত প্রোটিনের সিংহভাগ যোগান দিয়ে যাচ্ছে দেশের পোলট্রিজাত পণ্য সমূহ। বর্তমান বাজারে সবচেয়ে সস্তা প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস হিসেবে পোলট্রির ডিম ও মুরগির মাংসের চাহিদা ব্যাপক। সে কারণেই পোলট্রি খাতকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া দেশে মাছের স্বল্পতা ও উচ্চমূল্য, গরু ও খাশির মাংসের অত্যধিক মূল্য হওয়ায় সাধারণের নাগালের বাহিরে এখন এগুলো। তেমন প্রেক্ষাপটে পোলট্রি শিল্পই পারে সবার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনজাত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে। অর্থাৎ আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরের লোকদের মাঝে পোলট্র্রিই সবচেয়ে সস্তায় প্রাণিজ আমিষের সরবরাহ নিশ্চিত করে চলেছে। সুতরাং পোলট্রিকে আর সামাজিক প্রোটিন না বলে উপায় কি?

গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নে কৃষির পরই সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প। প্রান্তিক পর্যায়ে একজন গ্রামীন নারীর দিকে তাকালে দেখা যাবে, তিনি তার আপন বলয়ে কয়েকটি মুরগি পালন করে অর্থ উর্পাজন করছেন। পরিবারের অন্যান্য দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি অর্থনৈতিক অবদান রাখতে পারছেন। এতে করে একদিকে যেমন তিনি স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজে পেয়েছেন অন্যদিকে কর্মের প্রতি আগ্রহ বাড়ায় তাঁর সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ়তা বাড়ছে। পাশাপাশি সামাজিকভাবে তাঁর উন্নয়ন ঘটছে। বিক্রয়ের পাশাপাশি ডিম ও মুরগির মাংস দিয়ে তিনি তার নিজের, বাচ্চাদের এবং তার পরিবারের সদস্যদের প্রাণিজ প্রোটিনের ঘাটতি মিটাতে পারছেন। ফলে প্রান্তিক পর্যায় থেকেই সুস্থ এবং মেধা সম্পন্ন মানব সম্পদ তৈরী হচ্ছে। আর মেধাবী এই মানব সম্পদই আগামী দিনে আমাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। এখানেও পোলট্রিকে কেন্দ্র করেই আর্থিক ও সামাজিক কর্মকান্ড আবর্তিত হচ্ছে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজে পোলট্রির অবদান

খাদ্য নিরাপত্তায় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে পোলট্রি শিল্পের অবদান অন্য যে কোন শিল্পের চেয়ে অগ্রগন্য। বর্তমানে এই শিল্পে সমগ্র বাংলাদেশের প্রায় ৪ শতাংশ লোক নিয়োজিত রয়েছেন। দেশের পোলট্রি শিল্পে বর্তমানে প্রায় ৬০-৭০ লাখ মানুষ জড়িত। বিপুল এ কর্মক্ষম মানুষের কর্মসংস্থান ও তাদের উৎপাদনমুখী শ্রমঘন্টার কারণে বছর শেষে দেশে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ শতাংশ আসছে পোলট্রি খাত থেকে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিডিপি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড.খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সাম্প্রতিক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার তথ্য থেকে জানা যায় গত অর্থবছরে জিডিপি’র অর্জন ছিল ৭ শতাংশ সে হিসেবে তৈরী পোশাক শিল্পের পরই পোলট্রি শিল্প দেশের বৃহত্তম কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাত।

বর্তমান সময়ে দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট সহ সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছরই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশুনা শেষ করে বের হচ্ছে হাজার হাজার তরুন-তরুনী। তাদের কর্ম সংস্থানের জন্য একটি মজবুত সেক্টর হিসেবে পোলট্রির অবস্থান এখন শীর্ষে।

পোলট্রিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অত্যাধুনিক ফিড মিল, হ্যাচারী, এনিমেল হেলথ্ কোম্পানী, প্যারেন্টস্টক (জিপি) ফার্ম, ব্রিডার ফার্ম, কমার্শিয়াল লেয়ার ও ব্রয়লার ইন্ডাষ্ট্রি, পোলট্রি ডায়াগনষ্টিক ল্যাব ইত্যাদি । আরো গড়ে উঠেছে প্রোসেসিং ও ফারদার প্রোসেসিং ইন্ডাষ্টি। সেসব ইন্ডাষ্ট্রিকে ঘিরে কাজ করছে পরিবেশক, সরববাহকারী প্রতিষ্ঠান।

এসব প্রতিষ্ঠানে উচ্চ বেতনে কাজ করে যাচ্ছেন ভেটেরিনারিয়ান, কৃষিবিদ, নিউট্রশনিষ্ট, ইঞ্জিনিয়ার, ফিন্যাশিয়াল এ্যানালিষ্ট, আইটি এক্সপার্ট, মার্কেটিংসহ নানা পেশার কয়েক লক্ষ জনবল। অনেকেই স্ব-উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করছেন পোলট্রি ফার্ম অথবা পোলট্রি সংশ্লিষ্ট ব্যবসা।

ফলে উচ্চ শিক্ষিতদের আর বেকার থাকতে হচ্ছে না। একসময়ে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করে বের হওয়া যুবক-যুবতীদের কেবল মাত্র সরকারী চাকুরির উপর নির্ভর করতে হতো। বর্তমানে তাদের আর বসে থাকতে হচ্ছে না। দেশের পোলট্র্রি ইন্ডাস্ট্রির ধারাবাহিক বিকাশের ফলে এসব সম্ভব হচ্ছে। সেদিক বিবেচনায় সামাজিকভাবে পোলট্রি শিল্প কর্ম সংস্থানের মাধ্যমে তাদের সামাজিক অবস্থান সুদৃঢ় করতে ব্যাপক অবদান রাখছে।

পোলট্রি খাদ্যের অন্যতম কাঁচামাল ভুট্টা উৎপাদন করে বিপ্লব ঘটিয়েছেন দেশের কৃষকরা। বিশেষ করে চরাঞ্চল এবং পতিত জমিতে ভুট্টা চাষের মাধ্যমে কৃষকদের নিকট একটি অর্থকরী ফসল হিসেবে আর্ভিূত হয়েছে ভুট্টা। উৎপাদনের পাশাপাশি ভুট্টা পরিবহনের সাথে জড়িত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে কয়েক লাখ শ্রমিক। এছাড়া ডিম ও ব্রয়লার বাজারজাতকরণের সাথে জড়িত রয়েছে প্রায় লক্ষাধিক লোকবল। কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকায় তারা সামাজিকভাবে উপকৃত হয়েছে। এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে মূলত: পোলট্রি শিল্প বিকাশের ফলে।

পোলট্রি না থাকলে সমাজে যে প্রভাবগুলি দৃশ্যমান

আশির দশকের শেষ দিক থেকে বানিজ্যিকভাবে তিলতিল করে গড়ে ওঠা এ শিল্প থেকে বিগত কয়েক বছরে ধারাবাহিক লোকসান, ষড়যন্ত্র, অপপ্রচার, হরতাল-নৈরাজ্য ইত্যাদি কারণে প্রায় ৫০ হাজারের মতো খামার বন্ধ হয়ে গেছে। যার অধিকাংশই স্বল্প পুঁজি নিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ে গড়ে ওঠা। এসব খামারে কর্মসংস্থান হয়েছিল প্রায় ২৫ লক্ষের মতো জনবল। বর্তমানে কর্মহীন হয়ে পড়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। বেকার হয়ে তারা সামাজিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।

অত্যন্ত সূক্ষদৃষ্টি দিয়ে তাকালে দেখা যাবে আজ এ খামারগুলো সচল থাকলে তারা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হওয়ার পাশাপাশি সমাজেও তাদের একটি অবস্থান তৈরী হতো। এসব এলাকায় গেলে এখন দেখা যায় হয় তারা বেকার হয়ে বসে আছে বা সমাজ বিরোধী কার্যকলাপে সংশ্লিষ্ট হচ্ছে।

পোলট্রি ক্ষতিগ্রস্থ হলে গ্রামীণ অগ্রসরমান জনগোষ্ঠীর অগ্রযাত্রা সরাসরি ব্যাহত হবে। প্রান্তিক কৃষক ও গ্রামীণ মহিলারাই পোলট্রি শিল্পের মূল চালিকা শক্তি। ফলে তাদের আর্থিক ক্ষতি সাধারণ কৃষি খাাতেরও বিপর্যয় ডেকে আনবে। যার প্রভাব সমগ্র দেশের অর্থনীতিতে পড়বে এবং  বেকারত্বসহ আরো নানাবিধ অবক্ষয় বেড়ে যাবে।

কৃষিভিত্তিক এদেশে পোলট্রি শিল্পকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইলে আমাদের সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। এজন্য সামাজিকভাবে আমাদের যে কাজগুলি করা প্রয়োজন তা হলো

১) ক্ষতিকর এন্টিবায়োটিক সহ অন্যান্য অনাকাংখিত উপাদান সমূহের ব্যবহার শূণ্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। এসব কাজ সরকারী এবং বেসরকারী সকলে মিলে এক সাথে করা।
২) নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পোলট্রি পণ্যের উৎপাদন ও বিপনণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
৩) পোলট্রির ডিম ও ব্রয়লার মাংশের গুণাগুণ সম্পর্কে ভোক্তাদের কাছে পরিপূর্ণ তথ্য সরবরাহ নিশ্চিতকরণ। এসব তথ্য সঠিক সময়ে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক, অনলাইন মিডিয়ার মাধ্যমে নিয়মিত প্রচার। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিতে এর ব্যাপ্তি আরো বাড়ানো প্রয়োজন।
৪) ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় রেসিপি বিষয়ক অনুষ্ঠানে খ্যাতিমান পুষ্টিবিদ ও রন্ধনশিল্পের সমন্বয় সাধন ।
৫) বিভিন্ন উৎসবমেলায় সেলিব্রেটিদের মাধ্যমে পোলট্রি বিষয়ক রেসিপি/কুইজ কনটেষ্টের আয়োজন করা এবং এগুলি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক হলে ভালো সুফল পাওয়া যাবে।

সুস্থ্য ও মেধাবীদের নিয়ে গড়ে ওঠে মেধাবী সমাজ। আর সমাজ থেকেই রাষ্ট্র। আমরা দেখি আগামী দিনের মেধাবী বাংলাদেশ আর এজন্য চাই বেশি বেশি ডিম আর মুরগির মাংশ। শিশুর পেশীগঠন ও মেধার বিকাশ, শ্রমজীবী মানুষের শক্তির জোগান দেয়া, সর্বোপরি স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনের পোলট্র্রির বিকল্প নেই। আসুন সকলে মিলে মজবুত একটি পোলট্রি শিল্পের মাধ্যমে সমাজে অবদান রাখি এবং স্বপ্নময় একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
###########
লেখক:মিডিয়া ব্যক্তিত্ব
email: