Friday, 15 December 2017

 

দু’দশকের পথচলায় বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প

মো: আবদুল্লাহ আল জাবের : খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পর এবার লক্ষ্য খাদ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা। আর সেজন্য দরকার একটি সুষম খাদ্যতালিকা অনুসারে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে আমিষ, শর্করা, স্নেহ, ভিটামিন ও খনিজ লবণ তথা সব ধরণের খাদ্য উপাদানের উৎপাদন। আমিষের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে প্রাণীজ আমিষ। ডিম, দুধ, মাছ ও মাংস হতে এসব প্রাণীজ আমিষ পাওয়া যায়। পোল্ট্রি শিল্প প্রাণীজ আমিষের বৃহত্তর একটি উৎস।

বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মুরগি পালনের ইতিহাস প্রায় দু’দশকের। এক সময় শুধু দেশি মুরগিই পালন করা হতো। প্রতিটি কৃষক পরিবারে হাঁস-মুরগি, গরু, ছাগল পালন ছিল পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। হাঁস-মুরগি, গরু, ছাগল পালন করা হলেও সংসারের জমা-খরচে তার আর্থিক মূল্য হিসাব করা হতো না। ধীরে ধীরে এগুলো সংসারে অর্থমূল্যে পরিণত হয় এবং সংসারের একটি বাড়তি আয়ের উৎস হিসাবে পরিগণিত হতে থাকে এবং মানুষ পদ্ধতিগত ভাবে লালন-পালন শুরু করে। কৃষক বাড়ির মহিলারাই সাধারণতঃ এই সব হাঁস-মুরগি পালন করতেন।

পালনকৃত মুরগির মাংস ও ডিম দ্বারা অধিকাংশ কৃষকরাই শুধু তাদের নিজেদের প্রয়োজন মেটাতেন। কেবল সমাজের অতিদরিদ্র শ্রেণির মানুষ তাদের পালনকৃত মুরগি গ্রামের হাটে-বাজারে বিক্রয় করতেন। সমাজের আরেক শ্রেণির মানুষ কেউ গ্রামে ঘুরে ঘুরে ফেরিওয়ারাদের মতো মাথায় বা সাইকেলে বড় বাঁশের ঝুরিতে করে মুরগি ক্রয় করতেন এবং সেগুলো গ্রামের হাটে বিক্রয় আবার কেউ শহরের বাজারে বিক্রয়ের জন্য নিয়ে যেতেন। সে সময়ে দেশির মুরগির প্রাচুর্য ছিল। ৮০-৯০ এর দশকে আমাদের দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মুরগি পালন শুরু হয় এবং নব্বই এর দশকে ব্যাপক সম্প্রসারিত হয়। দেশি মুরগির বিদ্যমান বাজারে যোগ হয় বাণিজ্যিক লেয়ার, ব্রয়লার, সোনালী ও ফাওমির মতো উন্নত বাণিজ্যিক জাতের মুরগি পালন ও বিপণন।

বর্তমানে এ শিল্পটি ফুলে ফলে সুশোভিত হতে শুরু করেছে। আগামী দিনে যা ফল দিতে শুরু করবে। অর্থাৎ প্রাণীজ আমিষে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।

পোল্ট্রি শিল্প পরিচিতি

তত্ত্বীয়ভাবে পোল্ট্রি বলতে বাণিজ্যিকভাবে পালিত পাখিজাতীয় প্রাণী বুঝালেও সাধারণ মানুষের কাছে তা উন্নত জাতের মুরগি তথা ব্রয়লার, লেয়ার, সোনালি ও কক ছাড়া কিছুই নয়। বাংলাদেশে এই পোল্ট্রি ব্যবসা বর্তমানে শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। স্বল্প পুঁজি, স্বল্প প্রশিক্ষণ ও স্বল্প সময়ে অধিক উৎপাদন ও অধিক লাভের জন্য এ শিল্পে বিনিয়োগ দিন দিন বাড়ছে।

পোলট্রি শিল্প থেকে আমরা মাংস, ডিম, বায়োগ্যাস ও জৈবসার পেয়ে থাকি। এ শিল্পে নিয়োজিত থেকে বেকারত্ব ঘুচিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছে হাজারো যুবক। অল্প জায়গায় বেশি মুনাফা অর্জনে এর বিকল্প নেই।

ডিম এমন একটি পণ্য, যা বাজারে ভেজাল হওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিমের ৯৪ ভাগই মানব শরীরে কাজে লাগে। ৫৭ গ্রাম ওজনের একটি আদর্শ মুরগির ডিমে ৬ দশমিক ৭ গ্রাম আমিষ, প্রায় ৬ দশমিক ২ গ্রাম চর্বি, ৯০ কিলোক্যালরি শক্তি ও পর্যাপ্ত পরিমাণে খনিজ পদার্থ ও ভিটামিন বিদ্যমান (চিত্র-১)। ডিমের হলুদ অংশে কোলিন নামক একটি পদার্থ থাকে, যা মানুষের মস্তিষ্কের গঠন, বৃদ্ধি ও স্মৃতিশক্তি রক্ষার জন্য অত্যাবশ্যক। তাই শিশুদের জন্য প্রতিদিন একটি করে ডিম খাওয়া উচিত। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার ২০১৩ সালের এক প্রতিবেদনে ডিমের কোলেস্টেরলের সঙ্গে হূদরোগের কোনো সম্পর্ক নেই বলে উল্লেখ করে প্রতিদিন একটি করে ডিম খাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। সারা পৃথিবীতে আমিষের চাহিদা পূরণ করছে ডিম। একটি ডিমের খাদ্য গুণাগুণ যে কোনো খাদ্যের চেয়ে বেশি। এত কম মূল্যে আর কোনো খাদ্য থেকে যা পাওয়া যায় না।

অপরদিকে মুরগির মাংস অন্যান্য মাংসের তুলনায় ভাল। গরু ও শূকরের মাংসে ধর্মীয় বিধিনিষেধ থাকলেও পোল্ট্রির মাংস সার্বজনীন। গরুর মাংসে আমিষ ও স্নেহের পরিমাণ ১৭ ও ১.১৩ শতাংশ। বিপরীতে মুরগির মাংসে তা যথাক্রমে ১৯ ও দশমিক ৬ শতাংশ (চিত্র-২)। অমিষের অভাব হলে শিশু খর্বাকৃতির হবে, দেশের গঠন ও ক্ষয়পূরণ বাধাগ্রস্থ হবে। এছাড়া কিছু প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেল প্রাণিজ আমিষ থেকে আসে। তাই পর্যাপ্ত প্রাণীজ আমিষ গ্রহণ স্বাস্থ্যকর জীবনের পূর্বশর্ত।

কেন দরকার এই পোল্ট্রি শিল্প?

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, মানবদেহের শক্তির ৬০ শতাংশ আসা উচিত শস্যজাতীয় পণ্য যেমন- চাল, গম, ডাল, ভুট্টা প্রভৃতি থেকে এবং ১০-১৫ শতাংশ আসা উচিত আমিষ থেকে। আবার এ আমিষের কমপক্ষে ২০ শতাংশ বা ১৫ গ্রাম আসতে হবে প্রাণিজ আমিষ থেকে। যদিও উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে এ আমিষের ৫০ শতাংশই আসে প্রাণিজ আমিষ থেকে। এটি নির্ভর করে মানুষের আয়, পুষ্টি সচেতনতা, খাদ্যাভ্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর। বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন একজন ৭ গ্রাম ডিম ও ১৪ গ্রাম মুরগির মাংস খায় (চিত্র-৩)। এ থেকে আমিষ আসে যথাক্রমে এক ও তিন গ্রাম। মুরগি ও ডিম থেকে দৈনিক চার গ্রাম আমিষ। প্রাণিজ আমিষের অন্যান্য উত্স যেমন মাছ এবং পশুজাত মাংসের আমিষের বিবেচনায় নিলেও সেটি কোনোভাবেই জনপ্রতি ৫-৬ গ্রামে যাবে না। কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট শরীরে জমা থাকে। কিন্তু আমিষ জমা থাকে না। প্রতিদিনের খাদ্য থেকে এটা গ্রহণ করতে হয়।

১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য তালিকার প্রাণিজ আমিষের ১৪% আসত পোলট্রি থেকে যা ১৯৮৭ সালে এসে উন্নীত হয় ২৩%। বর্তমানে সেটি আরো বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। দামের স্বল্পতা, উত্তরোত্তর উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে এ ক্ষেত্রে প্রাণিজ আমিষের কমপক্ষে ৫০% দখল করার সুযোগ রয়েছে পোলট্রিজাত পণ্য থেকে। গত দুই দশক ধরে এর বার্ষিক প্রায় ২০% প্রবৃদ্ধি ঘটছে। লেয়ার ও ব্রয়লারের প্যারেন্ট স্টক প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৩০% করে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অপরদিকে বাংলাদেশে ডিমে প্রায় ৫২ শতাংশ, পোল্ট্রির মাংসে প্রায় ৮২ শতাংশ ও মোট মাংসে প্রায় ৮০ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে (চিত্র-৩)। চাহিদার তুলনায় ডিম ও মাংসে বিপুল পরিমাণ ঘাটতি থাকায় এ শিল্পের প্রয়োজনীয়তা অনেক।

গত এক দশক থেকে বাংলাদেশে ভোক্তা পর্যায়ে মুরগি এবং মুরগিজাত পণ্যের চাহিদা ব্যপক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও মান বিবেচনায় এই খাদ্য পণ্যের বিশ্ববাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান সময়ে মানুষ অনেক স্বাস্থ্য সচেতন তাই খাদ্যপুষ্টি এবং খাদ্যের হাইজিনিক অবস্থা সম্পর্কে বেশি সজাগ। এ কারণে মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যপণ্য পেতে ব্যকুল। এমতবস্থায় খাদ্য নিরাপত্তা ও মানের কথা বিবেচনায় ড্রেসড মুরগি বা প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্যরে চাহদিা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০৫০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা হবে ২২ কোটি। বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পোলট্রি শিল্পের ব্যাপক উন্নয়ন করতে হবে।

বাজার অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার আলোকে একজন উৎপাদনকারীকে ভোক্তার পছন্দ, চাহিদা ও চাহিদা বৃদ্ধির বিষয় বিবেচনায় রেখে পণ্য উৎপাদন করতে হয় এবং বাজারে এর যোগান বাড়াতে হয়। সময়ের পরিক্রমায় সমাজে একটি আধুনিক শ্রেণির মানুষের উন্মেষ ঘটেছে। এইসব কর্মব্যস্ত ও আধুনিক শহুরে মানুষদের কাছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডেড পণ্য ক্রয় করা সাধারণ ব্যাপার হয়ে গেছে। আধুনিক প্রসেসিং পস্নান্টে ড্রেসিং করা মুরগির মাংশ এবং মুরগিজাত পণ্য ক্রয় করা এদের কাছে প্রথম পছন্দ। মানুষের খাদ্যভাস পরিবর্তন ও ব্যস্ততার কারনে প্যাকেজিং ফুডের চাহিদা বাড়ছে। যে মাংসের প্যাকেটে মাংসের সকল বৈশিষ্ট্য সম্বলিত লেবেল লাগানো থাকবে তার চাহিদা অন্য সাধারণ মাংসের চেয়ে বেশি হবে।

আমাদের জমি কম। সে তুলনায় মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। পোলট্রি খাত একমাত্র শিল্প যা খুব কম জমি ব্যবহার করে অনেক বেশি উত্পাদন করা যায়। এছাড়া এর সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য শিল্পে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান সম্ভব। তাই বড় বড় উদ্যোক্তাদের নজর কেড়েছে এই পোল্ট্রি শিল্প।


স্বপ্নের বীজ বপন

১৯৬৪ সালে ৩০ একর জমির উপরে গাজীপুরে ব্যক্তি উদ্যোগে পোল্ট্রি শিল্পের গোড়াপত্তন হয়। তবে ১৯৬৮-৬৯ সালে দেশের মাটিতে বাণিজ্যিক মুরগির বাচ্চা প্রথম নিয়ে আসে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পোল্ট্রি খামার। আশির দশকের শেষের দিকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর আরবর একর্স জাতের ব্রয়লার প্যারেন্ট স্টক আমদানি করে। একইসময়ে বিমান পোল্ট্রি কমপ্লেক্স নামে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কানাডার শেভার পোল্ট্রি ব্রিডিং ফার্মের চুক্তিবদ্ধ হয়ে বাণিজ্যিক পোল্ট্রি খামার চালু করে। সেমতে বিমান পোল্ট্রি কমপ্লেক্স বাংলাদেশে ব্রয়লার ব্যবসার পথপ্রদর্শক। তবে তথ্য উপাত্তে জানা যায়, বিকাশমান পোল্ট্রি শিল্পের যাত্রা শুরু হয় ৯০ এর দশকে। ১৯৯৫-৯৬ সালে দেশী ও সোনালী জাতের মুরগীর বাইরে উন্নত জাতের লেয়ার ও ব্রয়লার মুরগীর চাষে খামারিরা ব্যাপক সফলতা অর্জন করে। জানাগেছে, আশির দশকে এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল মাত্র ১ হাজার ৫শ’ কোটি টাকা। যা বর্তমানে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

চলছে স্বপ্নের বাস্তবায়ন

বাংলাদেশ পোল্ট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটির (বিপিআইসিসি) তথ্য মতে, আশির দশকে এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল মাত্র ১ হাজার ৫শ’ কোটি টাকা। আর বর্তমানে এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমান ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। মাত্র তিন যুগের ব্যবধানে সম্পূর্ণ আমদানি-নির্ভর খাতটি এখন অনেকটাই আত্ম-নির্ভরশীল। জাতীয় অর্থনীতিতে পোল্ট্রি শিল্পের অবদান প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রায় ২০ লাখ মানুষের স্বনিয়োজন কর্মসংস্থান হয়েছে এবং এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে প্রায় ৬০-৭০ লাখ মানুষ। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা পেলে আগামী ২০২০ সালের মধ্যে এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা এবং প্রায় ১ কোটি মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে বলে দাবি বাংলাদেশ পোলট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটির। এখানে যেসব মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত, তার প্রায় ৪০ শতাংশই নারী। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট মাংসের চাহিদার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশই এ শিল্প থেকে আসছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে, নারীর ক্ষমতায়নে কৃষির পরই সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প।

বর্তমানে বাংলাদেশে ছোট-বড় শতাধিক হ্যাচারি ও ৭টি জিপি (গ্র্যান্ড প্যারেন্ট) ফার্ম রয়েছে। এসব ছোট-বড় হ্যাচারি থেকে প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ ব্রয়লার বাচ্চা, ৫ লাখ ২২ হাজার ব্রাউন লেয়ার বাচ্চা, ১ লাখ ১৬ হাজার সাদা লেয়ার বাচ্চাসহ সর্বমোট ১ কোটি ২১ লাখ ৩৮ হাজার একদিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদিত হচ্ছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে ৭৮ হাজার ১৭১টি পোলট্রি ফার্ম রয়েছে। এসব ছোট-বড় ফার্ম থেকে দেশে প্রতিদিন ডিম উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় দুই থেকে সোয়া দুই কোটি এবং পোলট্রি মাংস উৎপাদন হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে মোট মোরগ-মুরগির সংখ্যা ছিল ২১২৪.৭ লাখ, ২০১০-২০১১ অর্থবছরের ছিল ২৩৪৬.৮৬ লাখ এবং ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬১৭.৭০ লাখ।

দেশে বর্তমানে ছোট-বড় প্রায় ২০০ ফিডমিল রয়েছে। এদের মধ্যে আধুনিক ফিডমিলের সংখ্যা প্রায় ৮০টি। পোল্ট্রি ফিডের বার্ষিক উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ফিড মিলে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ২৫ দশমিক ৫০ লাখ মেট্রিক টন এবং লোকাল উৎপাদন প্রায় ১ দশমিক ৫০ লাখ মেট্রিক। পোলট্রি বা মুরগির ৬০-৭০ শতাংশই খরচ হয় ফিড বা খাদ্য বাবদ। আবার সে খাদ্য তৈরি প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ৫৫-৬৫ শতাংশই ভুট্টার ব্যবহার। ফলে দেশে এখন ব্যাপক হারে বিশেষ করে চরাঞ্চলে ভুট্টার আবাদ বাড়ছে। এক সময় এ ভুট্টা প্রায় সম্পূর্ণটাই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো।

পোলট্রি শিল্পের বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে বায়োগ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার। বেশ কয়েকটি কোম্পানি নিজেদের খামারের চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ এখন সেখান থেকেই উৎপন্ন করছে। পোলট্রি লিটার থেকে তৈরি হচ্ছে জৈব সার। এছাড়া এ শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, ভ্যাকসিন, যন্ত্রপাতির, প্যাকেজিং ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে। বাড়ছে সামগ্রিক বিনিয়োগের পরিমাণ।

কাজী ফার্মস লিমিটেডের সিনিয়র সেলস ম্যানেজার ডঃ এএসএম সায়েম জানান, বাংলাদেশে ৪ টি জাতের ব্রয়লার পাওয়া যায়। এগুলো হল কব-৫০০, হাবার্ড ক্লাসিক, ইন্ডিয়ান রিভার মিট (লোহম্যান) ও রস ৩০৮। তবে আগে থাকলেও বর্তমানে আরবর একর্স আর পাওয়া যায় না। এছাড়া স্যাসো (টাইগার) ও সোনালি জাতের কিছু মুরগিও মাংস উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিএলআরআই কতৃক উদ্ভাবিত শুভ্রা তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। অন্যদিকে লেয়ার জাতের মধ্যে আছে হাইলাইন ব্রাউন ও হোয়াইট, ইসা ব্রাউন, শেভার ব্রাউন, শেভার হোয়াইট, নভোজেন ব্রাউন, নভোজেন হোয়াইট, হাইসেক্স হোয়াইট, ডিকাল্ব হোয়াইট, লোহম্যান হোয়াইট ও বোভান্স হোয়াইট নামে মোট ১১ টি জাত।

ব্রয়লার বাচ্চার দাম ২২ টাকা থেকে ৫৭ টাকায় উঠানামা করে। লেয়ার বাচ্চার দাম ১৭ টাকা থেকে ৭০ টাকায় উঠানামা করে। ডিমের দাম পাইকারি বাজারে প্রতি শতে প্রায় ৭০০ টাকা। গত বছর জীবন্ত ব্রয়লার মুরগির পাইকারি দাম ছিল প্রতি কেজি গড়ে ১২০ টাকা।

দেশে ছোট বড় মিলিয়ে ব্রিডার ফার্ম আছে প্রায় ৭০ টি। খাদ্য ও বাচ্চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আছে শতাধিক, গ্র্যান্ড প্যারেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আছে ৭ টি, প্যারেন্ট স্টক মার্কেটিং কোম্পানি আছে ১১ টি, রোগ নির্ণয়ের জন্য পোল্ট্রি ল্যাবরেটরি আছে ৮ টি, ফিড উৎপাদন ও বাজারজাতকারি কোম্পানি আছে ৬৩ টি, ইকুইপমেন্ট মার্কেটিং কোম্পানি আছে ১৭ টি। ফিড এডিটিভস এবং নিউট্রিশনালসাপ্লিমেন্টস কোম্পানি আছে ২০ টি, মেডিসিন উৎপাদন ও বাজারজাতকারি কোম্পানি আছে ২৫ টি, টেবিল এগ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ৭টি, পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রির সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ১৪টি, পোল্ট্রি বিষয়ক ম্যাগাজিন ১৫টি, ফিড সাপ্লিমেন্ট সাপ্লায়ার ১২টি, পোল্ট্রি ফিড ব্যাগ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ৪টি, স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৯ টি।

২০০৮ সলে পোলট্রিশিল্পের নীতিমালা হয়েছে। এ নীতিমালায় জৈব ও খাদ্যনিরাপত্তার বিষয় বলা আছে। আমরা নিরাপদ পোলট্রিশিল্প ও খাদ্য নিশ্চিত করেছি। বাইরের কাউকে খামারে প্রবেশ করতে হলে কয়েক ধাপে জীবাণুমুক্ত হয়ে, গোসল করে ও নির্দিষ্ট কাপড় পরে প্রবেশ করতে হয়। বাংলাদেশের পোলট্রিশিল্প এখন প্রযুক্তিনির্ভর। মুরগি পালনের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। খাবার ও পানি সরবরাহ, ডিম সংগ্রহ সবকিছু স্বয়ংক্রিয় উপায়ে করা হয়। ফলে ভোক্তা স্বাস্থ্যকর-জীবাণুমুক্ত ডিম ও মুরগির মাংস পেয়ে থাকে। প্রায় প্রতিটি বড় ফিড মিলের নিজস্ব গবেষণাগার আছে।

খাদ্য তৈরিতে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। ভুট্টা, ওষুধ ও কাঁচামালের পরিমাণ—সবকিছুর সঠিক মান নিশ্চিত করা হয়। উদ্দেশ্য একটাই, নিরাপদ-স্বাস্থ্যকর ডিম ও মাংস সরবরাহ। বাংলাদেশে সর্বাধুনিক পদ্ধতিতে মুরগির মাংস প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এ মাংস এখন ফাইভষ্টারমানের হোটেলসহ বড় বড় শপিং মলে পাওয়া যাচ্ছে। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, আমাদের মাংস ও ডিম গুণগত মানসম্পন্ন। খাসি, গরু, মাছ ও সবজির সঙ্গে তুলনা করলে মুরগি ও ডিমের চেয়ে সস্তা আমিষ বাংলাদেশে আর নেই। বর্তমানে বিদেশে ডিম ও মাংস রপ্তানির কথা ভাবছেন ব্যবসায়ীরা।

মোকাবেলা করতে হবে যে সকল বাঁধা

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ও বিশিষ্ট পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডঃ মোঃ আনোয়ারুল হক বেগ বলেন, বিভিন্ন সময়ে রোগবালাই ও টিকার অপর্যাপ্ত প্রাপ্যতা এ শিল্পকে হুমকির মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে ২০০৭, ২০০৯ এবং ২০১১ সালে বার্ড ফ্লু’র ভয়াবহ সংক্রমণে এ শিল্পের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রায় ৫০ শতাংশ খামার বন্ধ হওয়ার পরও থেমে থাকেনি এই শিল্পের পথচলা। অপরদিকে বার্ডফ্লুর ভ্যাকসিনের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিয়ে জটিলতা নতুন করে বেড়েছে।

ডিম ও ব্রয়লার মাংস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অনেকেরই সঠিক ধারণার অভাব রয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই মনে করেন মুরগির ফিডে ক্ষতিকারক হরমোন ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ধারণাটি সম্পূর্ণই ভুল। জেনেটিক্যালি ইমপ্রুভড বার্ডকে সঠিক ও পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করলে মুরগির স্বাভাবিক বৃদ্ধি এমনিতেই সম্ভব। আবার অনেকেই মনে করেন, ডিম ও ব্রয়লার মাংস উত্পাদনে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার করা হয়। অথচ বাংলাদেশ সরকার এর মধ্যেই সেটি নিষিদ্ধ করেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে যে সেটি একেবারেই হচ্ছে না তা নয়, তবে সেটি মুরগির রোগ হলে এবং সেটি অবশ্যই অভিজ্ঞ ভেটেনারিয়ানের পরামর্শ মোতাবেক। এক্ষেত্রে জনসাধারণকে পোলট্রি সম্পর্কে আরো বেশি শিক্ষিত ও সচেতন করা উচিত।

এছাড়া অনেকে মনে করেন, ডিম খেলে মুটিয়ে যাবেন। কিন্তু ডিম ওজন কমায়। হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়, চোখের ছানি ও তকের সংক্রমণ প্রতিরোধ করে। সপ্তাহে একজন নারী ৬ টি ডিম খেলে তার স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় ৪০ ভাগ কমে যায়। এছাড়া নকল ডিম এবং বার্ড ফ্লুর নামে গুজব ছড়িয়ে মাঝে মাঝে এ শিল্পের প্রভূত ক্ষতি করছে কিছু অসাধু লোকজন।

বাজারব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে। খামারি তার উৎপাদনের সঠিক মূল্য পাচ্ছেন না। ৫৫ টাকার একটি ব্রয়লার বাচ্চা ২ কেজি খাবার খেয়ে ১ মাসে ১২০০ গ্রাম ওজন পায়। পাইকারি হিসেবে ১০০ টাকা কেজি ধরলে খামারি পায় ১২০ টাকা। অথচ ২ কেজি খাবার ৮০ টাকা এবং মেডিসিন ও অন্যান্য বাবদ ১০ টাকা খরচ হলেও বাচ্চার দামসহ মোট খরচ হয় ১৪৫ টাকা। ফলে প্রতি বাচ্চায় ২৫ টাকা ক্ষতি হলে ১০০০ বাচ্চার খামারে ক্ষতি হয় ২৫০০০ টাকা। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বাচ্চার অস্বাভাবিক দামের কারণে এ শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অনেক তরুণ উদ্যোক্তা।

মাছ ও পশুখাদ্য আইন-২০১১ অনুসরণ করা ফিড উৎপাদকদের জন্য কঠিন হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ট্যানারি বর্জ্য গ্রহণের ফলে কিছু মুরগির মধ্যে সামান্য পরিমাণ ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। ক্রোমিয়াম শরীরের জন্য ক্ষতিকর। পোলট্রি থেকে যথেষ্ট প্রাণিজ আমিষ আসছে। কিন্তু ছোট খামারিরা যাতে কোনোভাবে ট্যানারি বর্জ্য খাওয়ানোর সুযোগ না পান, সে ব্যবস্থা করতে হবে। ট্যানারির মালিকদের যেকোনোভাবে তাঁদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বাধ্য করতে হবে। প্রাণিজ আমিষ যদি নিরাপদ না হয় তাহলে সেটা আমাদের কোনো কাজে আসবে না।

দেশে কৃষি গবেষণায় অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু পোলট্রি খাতে খুবই দৈন্যদশা। তাই এই খাতে গবেষণায় গুরুত্ব দেওয়া উচিত। জুওনোটিক রোগ গবেষণা ও তথ্য কেন্দ্রের পরিচালক ডঃ কে, বি, এম, সাইফুল ইসলাম বলেন, দেশে মানসম্মত গবেষণার অভাব রয়েছে। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল ও গবেষণাগার নেই। গবেষণা ছাড়া এ শিল্পের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবেনা। তাই গবেষণা বাড়ানোর জন্য সবাইকে যার যার স্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে।

বিপিআইসিসি বলছে, বিগত বছরগুলোয় এমনকি ২০১৪-১৫ অর্থবছরেও পোলট্রি করমুক্ত খাত হিসেবে সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু ২০১৫-১৬ অর্ধবছরের সর্বশেষ বাজেটে শিল্পটির ওপর করারোপ করা হয়েছে। কাঁচামালের মধ্যে কেবলমাত্র ভুট্টাই দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে, তাও মোট চাহিদার মাত্র ৪০ শতাংশ। বাকি সবকিছ্ইু আমদানি করতে হচ্ছে। হাতেগোনা কিছু ওষুধ দেশে তৈরি হচ্ছে, বেশিরভাগই আসছে বাইরে থেকে। কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে নতুন করে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। আয়কর এবং অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হয়েছে।

কৃষি খাতে ঋণের সুদ ৫ শতাংশ। মুরগির ফার্ম একটি কৃষিশিল্প হলেও এক্ষেত্রে ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হয়। বিদেশিরা ৩ শতাংশ সুদে মূলধন পাচ্ছে। আমাদের সুদ ১৬ শতাংশ। শুরুতেই তারা আমাদের থেকে ১৩ শতাংশ বেশি লাভ পাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প হিসেবে দেশের ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় ঋণ দিতে তেমন আগ্রহী নন। ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প হওয়াই বীমা সুবিধা থেকে বঞ্চিত দেশের পোল্ট্রি শিল্প। ২০১৫ সালের জুনে খামারের জন্য ব্যবহৃত জমির খাজনা যেখানে ছিল শতাংশ প্রতি ২ টাকা, বর্তমানে তা ১৫০ টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে।

হরতাল ও অবরোধসহ রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে গত বছর পোল্টি শিল্পে ৩ মাসে ক্ষতি ৪ হাজার কোটি টাকা। এসময় প্রায় ৩০ শতাংশ খামার বন্ধ হয়ে গেছে। উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে অনেক কম মুল্যে বাচ্চা, খাদ্য, ডিম ও মাংস বিক্রি করায় এবং তারপরও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অবিক্রিত থাকায় ৩ মাসে ব্রয়লার বাচ্চায় ক্ষতি হয়েছে ৩৮২ কোটি টাকা, খাদ্যে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা, ডিমে প্রায় ৬৩০ কোটি টাকা, কর্মাশিয়াল ব্রয়লার মুরগির মাংসে প্রায় ৯৭৫ কোটি টাকা, ওষুধে প্রায় ১৫৮ কোটি টাকাসহ ডিম, বাচ্চা, মুরগি, ফিড এবং ঔষধ খাতে প্রায় ৩ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এর সাথে ব্যাংক সুদ, লজিস্টিক খরচ, বন্দর ডেমারেজ, গাড়ি ভস্মিভূত ও অন্যান্য লোকসানসহ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।

এছাড়া বর্তমানে কিছু হ্যাচারি মালিক নিজেরাই খামার করছেন। গ্রান্ড প্যারেন্ট স্টক থেকে শুরু করে মাংস ও ডিমই শুধু নয়, প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্যও বাজারজাত করছে। যার ফলে ক্ষুদ্র খামারিদের বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই বাচ্চা, খাদ্য ও ঔষধের মূল্য বৃদ্ধির পেছনে এই ধরণের ব্যবসাকে দায়ী করেছেন।

আছে আশার আলোও

আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় ডিম ও মাংসের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। প্রতিদিন আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় ১২০ গ্রাম মাংশের পরিবর্তে পাচ্ছি ২১ গ্রাম, বছরে ১০৪ টি ডিমের অনুকুলে পাচ্ছি ৪৫ টি ডিম। সুতরাং ১৬ কোটি মানুষের প্রয়োজনীয়তা পূরণের কর্মসূচীই যদি আমরা গ্রহণ করি তাহলে এই খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে এবং একটি কর্মক্ষম মেধাবী জাতি গঠনে আমাদের যাত্রা তরান্বিত হবে। বর্তমানে মাথাপিছু আমিষ ভোগের পরিমাণ মাত্র ১১.২ কেজি মাংস আর আন্তর্জাতিক গড়ের পরিমাণ ১৮-২০ কেজি । বাংলাদেশের মানুষের আয় বেড়ে আমিষ গ্রহণের পরিমাণ আগামী পাঁচ বছরে গড় পরিমাণ আন্তর্জাতিক গড়ের সমান হবে। ফলে একটি সুস্থ সবল জাতি গড়ে উঠবে।

বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্পের প্রবৃদ্ধি ডাবল ডিজিটে পা রাখতে যাচ্ছে; নিশ্চয়ই জাতির জন্য এটা খুবই আনন্দের খবর। আগামী পাঁচ বছরে পোলট্রি খাতে গড়ে প্রায় ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। বেশি বিনিয়োগ ও পোলট্রির ব্যবহার এ প্রবৃদ্ধির জন্য ভূমিকা রাখছে।

নতুন নতুন ব্যবসা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রসারিত হচ্ছে এ শিল্প। ফাস্ট ফুডের চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে মুরগির মাংসের চাহিদা। একে একে গড়ে উঠছে পোল্ট্রি প্রসেসিং কোম্পানি। সুপার শপে পাওয়া যাচ্ছে ড্রেসড মাংস ও প্রিমিয়াম ডিম। কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন না থাকায় বিক্রিও হচ্ছে দেদারছে। লাভের পরিমাণ বেশি হওয়াই এ শিল্প বড় বড় বিনিয়োগকারীদের নজর কাড়ছে সহজেই।

জীবন্ত মুরগির পরিবর্তে ড্রেসড মুরগির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ড্রেসড মুরগি ক্রয়-বিক্রয় শুরু হলে প্যাকেজিং খাতে নতুন কিছু কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। সুদৃশ্য প্যাকেট গায়ে মুরগির মাংশের কোয়ালিটি এবং হাইজিনিক অবস্থা ইত্যাদি লিপিবদ্ধ থাকবে, ফলে এমন মাংশের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে এবং প্যাকেজিংসহ এই খাতে কিছু নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। বাংলাদেশে উৎপন্ন উন্নতমানের অনেক কৃষি পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানিতে এদেশের সুনাম আর ঐতিহ্য রয়েছে। যেমন পাট, চা, চামড়া, চিংড়ি। পোল্ট্রি বর্তমানে বাংলাদেশে একটি কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। এই শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়িত রয়েছে যা আমদের পোশাক শিল্পের চেয়ে কম নয়।

দেশে উত্পাদিত মুরগির মাংস পাঁচ তারা হোটেলও ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০২০ সালে উত্পাদন দ্বিগুণ করতে হলে আমাদের মাংস রফতানির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।বর্তমানে দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানির জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশীয় কোম্পানিগুলো। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় হালাল মাংস রফতানির প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশী ভোক্তার এক বিশাল বাজার রয়েছে। আমরা ইচ্ছে করলেই সে বাজার ধরতে পারি।

পোলট্রি শিল্পে বর্জ্য বলতে কিছু নেই। মুরগির বিষ্টা বায়োগ্যাস উত্পাদনের পর কৃষি সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। পরিবেশবান্ধব এই শিল্প থেকে আমাদের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। পোল্ট্রি লিটার থেকে বছরে প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়।

বর্তমানে এ শিল্পে খাদ্যের কাঁচামাল, ঔষধ, ভ্যাক্সিনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। যা লাভের অঙ্কের লাগাম টেনে ধরছে। পোল্ট্রি খাদ্যের ৪৫-৫৫ শতাংশই ভুট্টা। দেশে উত্পাদিত ভুট্টার ৯০ শতাংশ পোলট্রি খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। এ ভুট্টার দিন দিন বাড়ছে। উৎপাদিত হচ্ছে ঔষধ ও ভ্যক্সিন। তবে তা চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। আগামী দিনে এসব পণ্য চাহিদামত উৎপাদিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন শিল্প সংশ্লিষ্টরা।

দেশে এখনও পোল্ট্রি শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত লোকবল তৈরির এবং এ নিয়ে গবেষণার পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। তাই কনসাল্ট্যান্ট হিসেবে বিদেশ থেকে আনতে হচ্ছে বিশেষজ্ঞ। কোন রোগ দেখা দিলে তা গবেষণা করতে পাঠাতে হচ্ছে বাইরের দেশের কোন গবেষণাগারে। তবে আনন্দের বিষয় হচ্ছে গবেষণা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীরা বার্ড ফ্লু প্রতিরোধী মুরগি আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। এমন নিত্য নতুন আবিষ্কার এ শিল্পকে আরও সামনে এগিয়ে নিবে।

নতুন আশা নিয়ে সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০২১ সালের মধ্যে বছরে ১২০০ কোটি ডিম ও ১০০ কোটি ব্রয়লার উৎপাদনের স্বপ্ন দেখছে এই শিল্পটি। বিভিন্ন সূত্রে জানা জানায়, ২০২১ সাল নাগাদ দেশে প্রতিদিন সাড়ে ৪ কোটি ডিম ও প্রায় ৪ হাজার টন মুরগির মাংসের প্রয়োজন হবে। খামারিদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ, পোল্ট্রিশিল্পের জন্য বীমা প্রথা চালু এবং পোল্ট্রি নীতিমালা বাস্তবায়ন তথা পোল্ট্রি শিল্পের উন্নয়ন সম্ভব হলে ২০২১ সালের মধ্যে দেশে প্রতি বছর ১২০০ কোটি ডিম এবং ১০০ কোটিরও বেশি ব্রয়লার উৎপাদন করা সম্ভব। দেশীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ খাত থেকে ডিম ও মাংস রপ্তানি করে বছরে ১২ হাজার কোটি আয় করা সম্ভব। এই পদক্ষেপ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে এই সেক্টরে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে।

বিভিন্ন গবেষণা তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২১ সাল নাগাদ পোল্ট্রি শিল্পে বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়ারে ৬০ হাজার কোটি টাকা। এ সময়ের মধ্যে ছোট-বড় ও মাঝারি আকারের পোল্ট্রি খামারের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৩ লাখ। আর তা হলে দেশের বৃহত্তর খাত হিসেবে পোল্ট্রি শিল্প আত্ম-প্রকাশ করবে। পোল্ট্রি খামার জেলা, উপজেলা থেকে ছড়িয়ে ইউনিয়ন থেকে গ্রাম পর্যায়ে চলে যাবে।

যেতে হবে অনেক পথ

এ শিল্পের ব্যবসায়ী, বিশেষজ্ঞ ও নীতি নির্ধারক গণ বিভিন্ন সময়ে সভা-সেমিনার করে আগামী ২০২১ সাল নাগাদ দেশে প্রতিদিন সাড়ে ৪ কোটি ডিম ও প্রায় ৪ হাজার টন মুরগির মাংসের প্রয়োজন হবে। এ চাহিদা পূরণ করতে এ খাতে কমপক্ষে ৫০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন। এই বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে খামারিদের সহজ শর্তে সিঙ্গেল ডিজিটে ব্যাংক ঋণের সুদ, বীমার আওতায় পোলট্রি খাতকে নিয়ে আসা ও সরকারি সহায়তা দেয়া প্রয়োজন। পোল্ট্রি শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ সহজ ও শুল্কমুক্ত করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা ও প্রোটিন জোগানের জন্য পোলট্রি খাতের বিকল্প নেই। এই শিল্পকে উন্নত বিশ্বের স্থানে নিয়ে যেতে হলে কম পক্ষে আরও ২০ বছর বিশেষ প্রণোদনার আওতায় রাখতে হবে।

পোল্ট্রি ও পোল্ট্রি পণ্য সম্পর্কে কুধারণা দূর করতে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। একইসাথে সুস্থ সবল জাতি গড়তে পর্যাপ্ত আমিষ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা বুঝাতে হবে এবং তা গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ডিম ও মুরগির মাংসের প্রচার বাড়াতে সরকারি গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে বিশ্ব ডিম দিবস উদযাপন, পোল্ট্রি মেলা, পোল্ট্রি সপ্তাহ উদযাপন, বিভিন্ন ধরণের সভা, সেমিনার, মঞ্চ নাটক, যাত্রা ইত্যাদি জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে। মাত্র ৫–১০ শতাংশ ব্যাড নিউজের প্রচার যেন পুরো শিল্পকে হুমকির মুখে ফেলে না দেয়, গণমাধ্যমকে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

স্বল্পমূল্যে প্রাণিজ আমিষের জোগান নিশ্চিত করতে হবে। বৃদ্ধি করতে হলে গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে এটি সহজলভ্য করতে হবে। এখনো গ্রাম ও শহরের মানুষের মধ্যে আমিষ গ্রহণের অনেক পার্থক্য রয়েছে। তবে গত এক দশকে এ পার্থক্য বেশ কিছুটা কমে এসেছে। এ পার্থক্য কমার প্রধান কারণ হচ্ছে ব্রয়লার মুরগির মাংস। ডিম নয়। গ্রামের মানুষ এখনো ডিম সেভাবে গ্রহণ করে না। ফার্মের ৬৫-৭০ শতাংশ খরচ হলো খাদ্যের। খাদ্যের প্রধান উপাদান ভুট্টা। ভুট্টা উৎপাদন খরচ কমাতে পারলে ডিম ও মাংসের দাম কমে আসবে। কীভাবে ভুট্টার দাম কমানো যায়, সেটি সবাইকে ভাবতে হবে। পাইকারি বাজার ব্যবস্থায় খামারি কিংবা উদ্যোক্তাদের সমন্বয় ঘটাতে হবে। এক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম বন্ধ করতে হবে।

একটি লাগসই পোলট্রি শিল্প স্থাপনের লক্ষ্যে জাতীয় কৌশলপত্র ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি, পোল্ট্রি নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং পোলট্রি বোর্ড গঠন করতে হবে। ২০০৮ সলে পোলট্রিশিল্পের নীতিমালা হয়েছে। এ নীতিমালায় জৈব ও খাদ্যনিরাপত্তার বিষয় বলা আছে। প্রতিটি ফার্মকেই এ নীতিমালা শক্তভাবে মেনে চলতে হবে। তবে নীতিমালার এখন সংশোধন প্রয়োজন। বড় কাজ হবে ওয়ার্ল্ড পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ ব্রাঞ্চ, গণমাধ্যম, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর- সবাই মিলে পোলট্রি নীতিমালার প্রয়োজনীয় সংশোধনী তৈরি করা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতো মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের লোকবল, বিনিয়োগসহ সব ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারিত করতে হবে। শিল্প হিসেবে সব খামার ও প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে। এজন্য খামার নিবন্ধন করতে হবে।

এ খাতে উন্নয়নের জন্য গবেষণা কাজে জোর দিতে হবে। গবেষণার মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে খামার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে হবে। আর এ জন্য গবেষণা কাজে অর্থায়ন বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশে এখন মানসম্পন্ন ভ্যাকসিন তৈরি হচ্ছে। এই খাতে এখন বড় ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। সারা দেশের চাহিদা বিবেচনায় নিলে খামারিদের সহযোগিতা করতে প্রত্যেক জেলায় ল্যাব তৈরি করা উচিত। আন্তর্জাতিক মানের একটি ল্যাব তৈরি করতে ৬০০ কোটি টাকা প্রয়োজন। এই অর্থ উদ্যোক্তাদের নেই। সেজন্য সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। পোল্ট্রি শিল্পের উৎপাদন আরও বাড়াতে এবং মান উন্নয়ন করতে উদ্যোক্তা ও বিজ্ঞানীদের মেধার সমন্বয় ঘটাতে হবে।

২০০৭ সালে বাংলাদেশে প্রথম এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রার্দুভাব ঘটে। পরবর্তী কয়েক বছর ব্যপক বিপর্যয় ঘটে। এরপর এই রোগ ব্যবস্থাপনায় বহুমুখী ব্যবস্থা গৃহিত হওয়ার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ এবং ব্যবস্থাপনায় আমাদের সক্ষমতাও বেড়ে বিপর্যয় কিছু কমলেও এ বিষয়ে এক আতঙ্ক সর্বদা তাড়া করে ফিরছে। আমাদের দেশে মুরগি খামার স্থাপন,ব্যবস্থাপনা ও মুরগি চলাচল অনেকাংশেই নিয়মের মধ্যে হয় না বিধায় বিভিন্ন ভাবে রোগ বিস্তার ঘটে।

জীবন্ত মুরগির বাজার মুরগির রোগ বিস্তারের একটি অন্যতম মাধ্যম। মুরগির মাধ্যমে শুধু মুরগিরই রোগ হয় না। অনেক রোগ আছে যা এক প্রজাতি থেকে আরেক প্রজাতিতে সংক্রমণ ঘটায়। এ ধরনের রোগকে বলা “জুনোটিক” রোগ। এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা এ ধরনের একটি রোগ যা মুরগি থেকে মানুষে বিস্তার লাভ করে। যদি জীবন্ত মুরগি বিক্রয় বন্ধ করা যায় তাহলে মুরগির রোগ বিস্তারের ঝুকি ৮০ ভাগ কমে। জনস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তার কথা ভেবে আমাদের জীবন্ত মুরগি বিক্রয় বন্ধ করে ড্রেসড মুরগি বিক্রয়ের ব্যাবস্থা করা হলে মুরগি খামারও রোগ বালাই মুক্ত থাকবে। এছাড়া অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধানের জন্য পোলট্রি খাত অবশ্যই বীমার আওতায় আনতে হবে। কেননা একটি স্থানে বার্ডফ্লু হলে দেখা যায় পুরো এলাকার ভালো মুরগিও মেরে ফেলা হয়, এতে খামারিরা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হন।

ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে অনিরাপদ পোল্ট্রি খাদ্য প্রস্তুত ও বাজারজাত বন্ধ করতে হবে। ট্যানারি মালিকদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বাধ্য করতে হবে। খাদ্য বিধিমালায় স্টেরয়েড, হরমোন, অ্যান্টিবায়োটিক, টক্সিন ইত্যাদি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এগুলো কোনোভাবে প্রয়োগের সুযোগ নেই। কিন্তু সব কৌশলেরই অপকৌশল আছে। বিভাগ থেকে উপজেলা পর্যন্ত খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ কমিটি আছে। এসব কমিটি খাদ্যের মান নিশ্চিতকরণের জন্য কাজ করে থাকে। এদের কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করতে হবে।

পোলট্রি শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপদ খাদ্য (ডিম ও মাংস)। এ শিল্পের নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি একটি বিজ্ঞান। অর্থাৎ এর কিছু নিয়মকানুন আছে। এর সঠিক বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে।

পোলট্রি শিল্পে চিকিৎসা ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা অন্য দশটি প্রাণীর মতো নয়। বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় দেশের প্রতিটি জেলায়/উপজেলায় সরকারি মুরগির খামার রয়েছে এবং সে সব স্থাপনাগুলোতে মুরগির উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা পদ্ধতি ইত্যাদির বিষয়ে ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে দেশে যে পরিমাণ স্নাতকধারী উচ্চশিক্ষিত কিংবা প্রশিক্ষিত ডিপ্লোমাধারী চিকিৎসক বা চিকিৎসাকর্মী রয়েছে এবং তার সঙ্গে ওষুধ সামগ্রী উৎপাদন প্রয়োজন তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল জেনেই আমাদের এই শিল্পে অগ্রসর হতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের প্রাণিসম্পদ বিভাগ, প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ওষুধ তৈরির ল্যাবরেটরি যে পরিমাণ ও মানের ওষুধ তৈরি ও সরবরাহ করে থাকে তা অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আরো মনোনিবেশ করতে হবে।নিরাপদ খাদ্য হিসেবে পোল্ট্রির মাংস ও ডিম রপ্তানির দিকে নজর দিতে হবে।

পোল্ট্রি শিল্পের উন্নয়নের হার বলে দেয়, এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠে এবং সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এ খাত একদিন দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশের উদীয়মান এ খাত ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে আগামীদিনে দেশের আমিষের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রার উৎস হিসেবে কাজ করবে, এটাই সবার প্রত্যাশা।
#######################

লেখক:শিক্ষার্থী সাংবাদিক
এনিম্যাল সায়েন্স এন্ড ভেটেরিনারী অনুষদ
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
email: