Monday, 25 September 2017

 

বন্যার ঝুঁকিতে বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা

মুহম্মদ র. ই. শামীম: বাংলাদেশে প্রতি বছরই বন্যা হয়। বন্যা বাংলাদেশের চিরচেনা নিয়মিত এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশকে প্রতি বছরই বন্যার ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে হয়। অতীতকাল থেকেই বন্যা এদেশের কৃষি, কৃষকের জানমাল, জনস্বাস্থ্য , অবকাঠামো, জীবনযাএা ও অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। কোন কোন বছর বন্যার ক্ষয়ক্ষতি সহনশীল মাত্রায় থাকলেও কয়েক বছর পর পর সৃষ্ট বন্যা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ভয়াবহ বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠতে লেগে যায় আরো কয়েক বছর।

প্রতি বছরের মৌসুমী বন্যা, আকস্মিক বন্যায়ও আমাদের কৃষিখাত ও কৃষক নানাভাবে ক্ষতির শিকার হয়। কোটি কোটি টাকা লোকসান দিতে হয় বন্যার কারণে। প্রতি বছর নি:স্ব হয় বহু কৃষক। ফসলের ক্ষেত ,নদীপাড়ের জমি, ঘরবাড়ি ,গাছপালা সবই নদীগর্ভে বিলীন হয়। ধানের ক্ষেত তলিয়ে যায়, বীজতলা, মৎস্য ও পশু সম্পদ ধ্বংস হয়। এসব ক্ষতির সঠিক অর্থনৈতিক পরিমাপ করাও কঠিন। সাধারণত প্রতি দশ বছরে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মতে বাংলাদেশ বিশ্বে এখন বন্যা ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র সমূহের মধ্যে ৬ষ্ঠ অবস্থানে আছে।

চীন, ভারত, নেপাল, ভুটান হতে ৫৭টি আন্তদেশীয় নদী বাংলাদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। গঙ্গা,যমুনা ও মেঘনা রিভার সিস্টেমের ক্যাচমেন্ট এরিয়ার শতকরা ৯৩ ভাগই বাংলাদেশের বাইরে। এসব এলাকার প্রচুর বৃষ্টিপাত ও অতিবৃষ্টির পানি বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে জালের মতো বিস্তৃত নদীগুলোর কূল উপচে তখন দেখা দেয় ভয়াবহ বন্যা। অসময়ের ঢলে কখনো দেখা দেয় আকস্মিক বন্যা, তলিয়ে যায় ফসল, জনপদ। বাংলাদেশের প্রায় ৮০ ভাগ এলাকাই প্লাবন ভূমি। এসব এলাকা বন্যার পানিতে সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখানে বসবাসরত গ্রামীণ জনগোষ্ঠী তাই খুব সহজেই বন্যার নানা ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখিন হয়।  সাধারণত ভয়াবহ বন্যায় দেশের ৬০ ভাগের অধিক এলাকা তলিয়ে যায় , তা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং  গড়ে এক তৃতীয়াংশ এলাকা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আমাদের দেশে বন্যায় বেশি ক্ষতির সম্মুখিন হয় কৃষিখাত। অতীতকাল থেকেই তা হয়ে আসছে। অতীতের ভয়াবহ বন্যায় সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে এ বাংলায় লক্ষ লক্ষ মানুষ না খেয়ে মারা গেছে। ১৮২২ সালের (বাংলা ১২২৯) ভয়ংকর বন্যায় ১ লাখ মানুষ মারা যায়। কৃষি প্রধান এ বাংলার সর্বস্ব বার বার কেড়ে নিয়েছে বন্যা। এক মৌসুমে কখনো দুই দফা বন্যাও হয় । সাম্প্রতিককালে ২০০৭ সালের বন্যায় ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৬ লক্ষ ৪  হাজার  ৪৮১ মেট্রিক টন। এর আর্থিক মূল্য প্রায় পাঁচ দশমিক ৯ বিলিয়ন টাকা। এই বছর দেশের ৪২ ভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। এছাড়া ২০০৪ সালের বন্যায় শতকরা ৩৮ ভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। ১৯৯৮ সনে যে বন্যা হয়েছিল তাতে শতকরা ৬৮ ভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। এর ফলে কৃষি উৎপাদন শতকরা প্রায় ৪৮ ভাগ কম হয়েছিল। এবন্যায় খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২১৮ লাখ মেঃ টন। ৬৫ হাজার হেক্টর জমি দীর্ঘদিন বন্যায় তলিয়ে ছিল। আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ৩ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। ১৯৮৮ সনের মহাপ্লাবনে ফসলের ক্ষতি হয় ২০ লাখ মে: টন। দেশের ৬১ ভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। সম্পদ নষ্ট হয়েছিল ৫ হাজার কোটি টাকার। এক কোটি কৃষক ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছিল।  

এই বছর দেশের ১৬টি জেলা বন্যা কবলিত হয়েছে। এবং প্রায় ৩৪ লাখেরও বেশি মানুষ দুর্গত হয়েছে। এই  বন্যায় জামালপুর জেলায় বন্যার পানি কোন কোন স্থানে ১৯৮৮ সালের চেয়েও বেশি হয়েছে। এ বছর আবারো বন্যা হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে ।

বন্যায় বেশি ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার পেছনের অন্যতম আরেকটি কারণ, বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে অন্যতম জনাকীর্ণ দেশ। যেখানে শতকরা ৭৫ ভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে। ৬০ ভাগ মানুষ কৃষিখাতে সরাসরি জড়িত। কর্মজীবী মানুষের কর্মসংস্থানের প্রধান ক্ষেত্রও কৃষিখাত। শতকরা প্রায় ৪৯ ভাগ শ্রমজীবীর কর্মসংস্থান কৃষিক্ষেত্রে।

উপর্যুপরি বন্যা, অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল না পাওয়ার মতো হতাশার মাঝেও আমাদের কৃষিখাত অনেক এগিয়ে গেছে। গত ৪৪ বছরে ধান চাষের জমি শতকরা ১৮ ভাগ কমে গেলেও ধান উৎপাদন বেড়েছে ৩ গুণ। এমনকি ধান উৎপাদনে আমরা এখন টেকসই পর্যায়ে পৌঁছে গেছি। এখন ধান উৎপাদনে পুরো প্রকৃতি নির্ভর আমন মৌসুম থেকে সরে এসে বোরো মৌসুমেই বেশি ধান উৎপাদিত হচ্ছে। উৎপাদিত চালের শতকরা ৫৫ ভাগই এখন রোরো মৌসুমে উৎপাদিত হয়। এখন বাংলাদেশ চাল রপ্তানি কারক দেশ।

মাছের উৎপাদন বেড়েছে, আলু ও সবজি উৎপাদন বেড়েছে। বেড়েছে গমের উৎপাদন। সারা বছরই ২০-২৫ জাতের সবজি উৎপাদিত হয়। বিশ্বে সবজি উৎপাদনে আমরা এখন তৃতীয়। ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৭ গুণ। সোনালি আঁশের দুর্দিনও কেটে যাচ্ছে। কৃষি জমি ও কৃষকের স্থান দখল করছে শিল্প ও সেবা খাত। কিন্তু এখনো কৃষি প্রচুর সম্ভাবনার খাত, তেমনি আমাদের অর্থনীতির এখনো মূল চালিকা শক্তি। কৃষিকে অবহেলা করে শিল্প খাতে বেশি পৃষ্ঠপোষকতার মতো অবস্থা আমাদের জন্য নয়।

আমরা ধীরে ধীরে কৃষি অর্থনীতি থেকে শিল্প প্রধান অর্থনীতিতে এগিয়ে যাচ্ছি, এটা ঠিক। জিডিপি’তে কৃষিখাতের অবদানও কমছে। ২০০৫-৬ অর্থ বছরে জিডিপি’তে কৃষি খাতের অবদান ছিল ২১.৮ ভাগ, যা ২০১২-১৩ অর্থ বছরে আরো কমে ১৯ শতাংশে এসে ঠেকেছে। অথচ ১৯৯০ সনে কৃষিখাতের অবদান ছিল ৩০ শতাংশ। তবে অর্থনীতিতে কৃষির আনুপাতিক অবদান কমলেও মোট কৃষি উৎপাদন বাড়ছে।

নানাভাবে অর্থনীতি ক্রমেই কৃষি প্রধান অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির দিকে যাচ্ছে। তবে এটা এখনো ’টেক অব স্টেজে আছে’ বলেই অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। ফলে কৃষি এদেশের অর্থনীতির মূল চালকের ভূমিকায় এখনো আছে। বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতের পর আঘাতসহ অন্যান্য প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশের কৃষকেরা কৃষিখাতের হাল ছাড়েননি।

তাঁরা প্রতিবার বন্যায় সর্বস্ব হারান। লোকসান গুণে গুণে ঘামে-শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দামও পান না। তবুও তারা ফসল উৎপাদনে হাত না গুটিয়ে ফসল ফলান । ১৬ কোটি মানুষের অন্নের সংস্থান করেন। দেশকে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকির মুখে ঠেলে না দিয়ে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেন। অর্থনীতির ভিত্তি টিকিয়ে রাখেন। বৃহৎ শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন।

কিন্তু বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবিকার এখাত বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক ঝুঁকিতে আছে সব সময়। এটাই আমাদের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই আমাদের চলতে হচ্ছে বিধায় আমরা এখনো অর্থনৈতিক সফলতাকে টেকসই করতে পারি নাই। বন্যা আমাদের নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা, উদ্যোগ ও স্বপ্নকে বার বার ভেঙ্গে চূড়ে আরো নাজুক অবস্থায় ঠেলে দেয়। বিপুল জনগোষ্ঠীর কৃষিখাত বার বার লোকাসানে পড়ে। যদিও এরকম আরো বাস্তবতায় এখাতে যাঁরা আছেন তারা বাধ্য হয়েই আছেন। তাঁরাই টিকিয়ে রেখেছেন অর্থনীতির চালিকা শক্তি কৃষিখাতকে।

অতীতে বন্যা হলেই এদেশ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়তো। এখন দেশ দুর্ভিক্ষের কবলে না পড়লেও কৃষকেরা দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্রে আটকে পড়েন। সেখান থেকে অনেকেই আর বেরোতে পারে না। এক দশক আগেও বন্যায় ফসলহানি ঘটলে তার প্রভাব চালের বাজারে পড়তো। দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি রোধ করা করা যেত না। ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তো। বিশ্বব্যাপি খাদ্য সংকট বা খাদ্য শস্যের মূল্য বৃদ্ধির আশংকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের বর্তমান খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি দুশ্চিন্তার পর্যায়ে নেই। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের কৃষিতে বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়বে বৈ কমবে না। নিরুদ্বেগ থাকার কোন কারণ নেই এক্ষেত্রে। সামগ্রিক কৃষিখাতই জলবায়ুজনিত ঝুঁকিতে আছে। ভবিষ্যতে বন্যা অতীতের চেয়ে ভয়াবহ রপ ধারণ করবে এবং পুন:পৌনিকতা আরো বাড়বে ।

বন্যা প্রাকৃতিকভাবে অনিবার্য এটা পুরোপুরি রোধ সম্ভব নয়। বন্যা নিয়ন্ত্রণ নয় বরং বন্যার প্রভাবকে নমনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা এবং ক্ষয়ক্ষতি একটা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসাই গুরুত্বপূর্ণ। যাকে বলা হয় ব্যাবস্থাপনা। বন্যা ব্যাবস্থাপনা সামগ্রিক পানি ব্যাবস্থাপনারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটাই এখন আমাদের জন্য প্রয়োজন। এর জন্য ভারত, নেপাল, ভূটান, এসব দেশগুলোর সাথে এ সংক্রান্ত সহযোগিতা জোরদার করা, যৌথ পরিকল্পনা গ্রহণ, বন্যার পূর্বাভাস ও সর্তকীকরণ ব্যবস্থা উন্নতীকরণ, কৃষিখাতে ও সামাজিকভাবে বন্যার অভিযোজন কৌশল বাড়ানোকে গুরুত্বদিতে হবে। নদী ব্যাবস্থাপনা উজানের দেশসমূহের সাথে সমন্বিতভাবে করতে হবে। একক কোন দেশের পক্ষে এটা সম্ভব নয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত এর মতে, ’বন্যা নিয়ন্ত্রণে অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনার বিকল্প নেই’। বন্যাকে কাঠামোগতভাবে ও অকাঠামোগতভাবে ব্যবস্থাপনাও করতে হবে। বন্যাকে কাঠামোগতভাবে বেশি গুরুত্ব দেয়ার সন্তোষজনক সুফল আমরা দেখি না। আমাদেরকে বন্যার প্রকোপ হ্রাস করতে নদ নদী খালের নাব্যতা রক্ষা ও দখল বন্ধ করতে হবে। নদ-নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়াতে নদি খনন, কৃষকের জন্য আগাম পূর্বাভাস, শস্যবীমা, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, ভূমি ব্যবহারে পরিবর্তন, বন্যা সহিঞ্চু কৃষি ফসলের জাত প্রর্বতন ও প্রচলনের ব্যবস্থা করতে হবে ।

১৯৫৬ সালে বন্যা নিয়ন্ত্রণে ক্রুগ কমিশনের মন্তব্য ছিল ’এদেশের প্রধান সমস্যা হচ্ছে বন্যা। তাই ভবিষ্যতের সকল কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল বিষয় হওয়া উচিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ ’’।  এখনও বন্যা বাংলাদেশের প্রধান সমস্যাই রয়ে গেছে। এজন্য আমাদের কৃষক ও কৃষিখাতকে বাঁচাতে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে বন্যা ব্যাবস্থাপনাকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ কৃষক সমাজই এখনো আমাদের খাদ্য নিরাপত্তায় প্রধান ভরসা। তাঁরাই এদেশের অর্থনীতির প্রকৃত নায়ক।
=========================================
[ মুহম্মদ র,ই, শামীম,  পরিবেশ ও কৃষি বিষয়ক লেখক ]