Sunday, 23 July 2017

 

জলাতঙ্কঃ সচেতন হবার এখন ই সময়

ডা. এম. মুজিবুর রহমান:বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা'র (WHO) প্রতিবেদন মতে বাংলাদেশে প্রতি বছর ২০০০-২৫০০ মানুষ জলাতঙ্ক আক্রান্ত হয়ে মারা যায় এবং লক্ষাধিক মানুষ কামড় পরবর্তী প্রতিষেধক (PEP) গ্রহণ করে। তবে এই পরিসংখ্যান কোন প্রকৃত উপস্থাপন নয়। তাই সব উন্নয়নশীল দেশে জলাতঙ্ক আক্রান্ত মৃত্যুর হার এসব অফিসিয়াল রিপোর্টের চেয়ে ১০০ গুণ বেশী হতে পারে- এই ধারণাও করা হয়।

মানুষে জলাতঙ্ক রোধের সবচেয়ে টেকসই সমাধান প্রাণি'র জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ। এজন্য ইতিমধ্যে কুকুর গণটীকাদান কর্মসূচি (Mass dog vaccination program), কুকুর রেজিস্ট্রেশন (Dog registration), কুকুর বন্ধ্যাকরণ (Neutering), কুকুর নিধনসহ (Culling), গণশিক্ষা কার্যক্রম (Mass education), গণসচেতনতা বৃদ্ধি নানা উপায় গ্রহণ করা হয়েছে। এসবের মাঝে নির্বিচারে কুকুর নিধন যেমন কোন সমাধান নয়; সমাধান হিসেবে তেমনি কুকুর বন্ধ্যাকরণও প্রতিষ্ঠিত নয়। নির্বিচারে কুকুর নিধন রুখতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রাণিহিতৈষী সংস্থাগুলো কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের দেশে এখনো সুপরিকল্পিত পরিচ্ছন্ন খাদ্যবর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠে নাই। যত্রতত্র ডাস্টবিন। উচ্ছিষ্ট খাবার। যতদিন পরিবেশে এরকম খাদ্যবর্জ্য'র উপস্থিতি থাকছে ততদিন সেখানে থাকছে বেওয়ারিশ কুকুরের সুনিশ্চিত উপস্থিতি।

কুকুর বন্ধ্যাকরণ- এটিও কোন প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়। কারণ, কোন নির্দিষ্ট শহর বা এলাকায় কুকুরের সংখ্যা ঠিক কত হতে হবে বা কত থাকা উচিত, সে সম্পর্কে কোন গবেষণালব্ধ পলিসি নেই। এ নিয়ে গবেষণা মাত্র শুরু হয়েছে। তবে কুকুর বন্ধ্যাকরণ তাদের সুস্বাস্থ্য রক্ষা ও সংখ্যাবৃদ্ধি কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে সেটি সহজে অনুমেয়। জলাতঙ্ক প্রতিরোধে কার্যকর টীকা। জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে অনেক বছর ধরেই কুকুরে গণটীকাদান মানুষ ও বন্যপ্রাণি (wildlife reservoirs)- তে প্রতিরোধ গড়ে আসছে। এভাবে জাপান, ইংল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও স্ক্যানডিনেভিয়ান দেশগুলিতে জলাতঙ্ক নির্মূল সম্ভব হয়েছে।

তাত্ত্বিকভাবে কুকুরে জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে এদের মোট সংখ্যার ৫০-৭০% টীকা দিতে হয়। টীকা না দেয়া কুকুর-বিড়ালে জলাতঙ্ক হলে তাৎক্ষণিকভাবে ইউথেনেশিয়া করতে হবে। এতে তাদের মালিকের অসম্মতি থাকলে কঠোরভাবে ৬ মাসের জন্য বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে এবং জলাতঙ্ক রোগের লক্ষণ না মিললেও ছেড়ে দেয়ার ১ মাস আগে টীকা দিতে হবে। জলাতঙ্কের প্রাথমিক চিকিৎসায় ক্ষত স্থানটি অবশ্যই অবশ্যই সাবান পানি দিয়ে ১০-১৫ মিনিট ধৌতকরণ বাঞ্ছনীয়। গবেষণায় দেখা গেছে- জলাতঙ্কে আক্রান্তের ৬০% ভুক্তভোগী'র কামড় ক্ষতটি সাবান দিয়ে ধুয়ে করা হয় নি। এ থেকে বোঝা যায়, ক্ষতস্থানে সাবান পানি'র ব্যবহার জলাতঙ্ক হবার সম্ভাবনা অনেক কমিয়ে আনতে পারে। প্রাণি'র কামড়ে আক্রান্ত ৬০-৭০% এর বেশি মানুষের কোন টীকা না নেওয়াও আরেকটি বড় কারণ।

গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে প্রাণি'র কামড় ও জলাতঙ্কের প্রধান শিকার ১৬ বছরের নিচের বয়সী শিশুরা। বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশের অন্যান্য গবেষণার তথ্যও অনুরূপ। গবেষণায় আরো দেখা যায়, পুরুষরা প্রাণি'র কামড় ও জলাতঙ্কে অধিকতর শিকার হন। দিনের বেশিরভাগ সময় এরা বাইরে থাকেন বলে এমনটি হয়। মানুষের শরীরের নিচের অংশ তথা হাঁটুর নিচে প্রাণি'র কামড় সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়। প্রাণিদের জন্য শরীরে নিচের অংশে আক্রমণ করা খুব সহজ ও বেশি সুবিধাজনক। জলাতঙ্ক সম্পর্কিত সঠিক জ্ঞান, সুচিকিৎসা ও ঠিক সময়ে কামড় পরবর্তী প্রতিষেধক (PEP) এসব বিষয়ে প্রাণি'র কামড়ের অধিকাংশ শিকার এখনো সঠিক ধারণা রাখেন না।


জলাতঙ্ক আজও তাই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা। অথচ ভয়াবহ, মারাত্মক, দুরারোগ্য এই ব্যাধিটি শতভাগ নির্মূল (প্রতিরোধ) সম্ভব। এই প্রেক্ষাপটে জলাতঙ্ক প্রতিরোধ গণশিক্ষা কার্যক্রম এবং যোগাযোগের মাধ্যমে উপযুক্ত গণসচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে জলাতঙ্ক মোকাবেলায় সঠিক স্বাস্থ্যসেবা সুবিধাও। এখনই সে সময়।

প্রচলিত জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারেঃ

১. ১৬ বছর নিচের বয়সী শিশুরা যেহেতু জলাতঙ্কের অন্যতম প্রধান শিকার সেহেতু তাদের পাঠ্যবইয়ে জলাতঙ্ক সম্পর্কিত শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে যাতে কুকুর, বিড়ালের সাথে তাদের আচরণ, জলাতঙ্কের প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কিত জ্ঞান, জলাতঙ্কের টিকা বিবিধ বিষয়ের যুগোপযোগী সন্নিবেশন থাকবে।

২. বেওয়ারিশ কুকুর বিড়াল গুলোকে নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠী, ক্লাব, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা নির্বিশেষে মালিকানা প্রদান করা যেতে পারে। ফি বছর বেওয়ারিশ কুকুরগুলোর টীকা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট নাম থাকবে। তাদের নিরাপদ আবাসস্থান থাকবে। সমাজের বিত্তবান শ্রেণী, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কিংবা নির্দিষ্ট সোসাইটির লোকজন এদের নিয়মিত খাবারের অর্থায়ন করতে পারে। এমনকি তাদেরকে বিশেষ ট্রেনিং পূর্বক নিরাপত্তার কাজে ব্যবহার করাও খুব সম্ভব। এভাবেই সম্ভব বিশাল গোষ্ঠী'র এই প্রাণিসমাজকে সম্পদে রূপান্তর করা।

৩. মালিকানাধীন সব কুকুর বিড়ালের রেজিস্ট্রেশন থাকবে। সচেতন সমাজকে পোষার প্রতি আরো বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

৪. বিভিন্ন প্রাণিহিতৈষী সংস্থা'র স্বেচ্ছাসেবী, পোষাপ্রেমী, প্রাণিসংশ্লিষ্ট চাকুরে, ব্যবসায়ী, প্রাণিডাক্তার সমূহ পেশায় নিয়োজিত সকলের জলাতঙ্কের প্রি-এক্সপোজার ভ্যাক্সিন নেয়া উচিত। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে জলাতঙ্কের দ্রুত চিকিৎসা সুবিধায় কামড় পরবর্তী প্রতিষেধক (PEP) -এর যথেষ্ট যোগান ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

৫. একমাত্র ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া জলাতঙ্ক আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসায় কোন প্রকারের ঝাড়ফুঁক, ওঝা নির্ভরতা চলবে না।

৬. পরিবেশ পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন ও সুস্থ রাখতে হবে। ডাস্টবিন উন্মুক্ত রাখা যাবে না।

৭. দেশীয় সব মিডিয়ায় জলাতঙ্ক সচেতনতা সম্পর্কিত প্রচারণা ও প্রসারণা বাড়াতে হবে।
====================
লেখক:ডিভিএম, এমএস ফেলো
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়।