Saturday, 18 November 2017

 

ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য ক্রয় করতে হবে : শেকৃবি উপাচার্য

রাজধানী ঢাকার বুকে অবস্থিত ‘আধুনিক শ্যামল গ্রাম’ খ্যাত শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি)। পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে শেকৃবির ইতিহাস পনের বছরের হলেও উপমহাদেশের প্রাচীনতম উচ্চতর কৃষি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর ইতিহাস সুদীর্ঘ ৭৮ বছরের। মূলত এই প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই উপমহাদেশের কৃষি ব্যবস্থার ভিত্তি রচিত হয়েছে।

এ বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ। কৃষি, কৃষক, কৃষি শিক্ষা ও গবেষণাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক বিষয়ে তাঁর সাথে কথা বলেছেন মাহমুদুল হাসান সোহাগ।

সোহাগ : স্যার, আপনি ৩৫ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন। আপনার শিক্ষকতা জীবন তো বলা চলে সফল। এই সফলতার মূলমন্ত্র কি ?
ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ : সততা, দায়িত্বশীলতা, শিক্ষার প্রতি অনুরাগ, মানবিক দৃষ্টি ভঙ্গিতে পথ চলা এবং প্রয়োজনীয় পরিশ্রম করাই এই সফলতার মূলমন্ত্র।

সোহাগ : আপনি সবসময় সাদাসিধে জীবন-যাপন করেন। এর পেছনের অণুপ্রেরণা কি ?
ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ : মহান আল্লাহতালা মানুষকে বিভিন্ন গুণে গুণান্বিত করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন এবং সেই গুণের সঠিক প্রয়োগেরও দায়িত্বশীলতা মানুষের উপর ন্যস্ত করেছেন। সে জন্য দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে মহান আল্লাহতালার নির্দেশনা বাস্তবায়নই একজন মানুষের মূল কাজ। তাতে আল্লাহর ইচ্ছা প্রতিফলিত হবে। সে জন্যই আমি সাদাসিধে জীপন-যাপন করে যাচ্ছি।

সোহাগ : একটা প্রজন্ম বাংলাদেশের বিকৃত ইতিহাস জেনে এসেছে। নতুন করে আর কোনো প্রজন্ম যেন এই বিকৃত ইতিহাস না জানে, সেজন্য কি করণীয় বলে আপনি মনে করেন ?
ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ : এর জন্য তিনটি পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। এক, শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে সঠিক ইতিহাস যুক্ত পুস্তক সিলেবাসে অর্ন্তভূক্ত করা। দুই, প্রকাশনার সকল মাধ্যমকে সঠিক তথ্য প্রচারের জন্য সম্পৃক্ত করতে হবে। তিন, মিথ্যা ইতিহাস যুক্ত তথ্যাবলি ধ্বংস করতে হবে।

সোহাগ : বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যাচ্ছে যে, সংগঠনগুলোর আড়ালে জঙ্গি কিংবা অন্য নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এরা প্রায় নেতিবাচক কার্যক্রম করে আসছে। সাবেক উপাচার্যের বাসভবনে বেশ কয়েক বার ককটেল ফুটানো হয়েছিল। তখন বেশ কয়েক জন শিক্ষার্থীকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠনগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করার দরকার বলে মনে করেন কি?
ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ : এ ধরনের সমস্যা এখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ বিষয়ে নজরদারি করা প্রয়োজন। তাছাড়া এ বিষয়ে কোনো লিখিতভাবে আমাদের কেউ জানায়নি। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে দৃষ্টি রাখা হবে, যাতে কোনো নেতিবাচক কর্মকান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ চালাতে না পারে।

সোহাগ  : কৃষক বা কৃষির বর্তমান অবস্থা কেমন ?
ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ : বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষকদেরকে উৎপাদন সহায়ক সহযোগিতা যেমন- কৃষি ঋণ, সার, বালাইনাশক, সেচ সুবিধা, বিদ্যুৎ সহ মোটামুটি পণ্যের সঠিক বাজার মূল্য সুনিশ্চিত করা হয়েছে। সাথে সাথে উন্নত মানের জাতসহ উন্নত মানের প্রযুক্তি কৃষকের মাঝে সরবরাহ করা হচ্ছে। সেই কারণে উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষক অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছে।

সোহাগ : অনেক সময় দেখা যায়, কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য যেমন- দুধ, ধান রাস্তায় ফেলে ন্যায্য মূল্যের দাবিতে প্রতিবাদ করছে। এই অবস্থায় কৃষকদের জন্য প্রশাসনের কি করনীয় বলে আপনি মনে করেন ?
ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ : কোনো কোনো বছর কোনো ফসলের উৎপাদনের আধিক্য দেখা যায়। কিন্তু তুলনামূলক বাজার মূল্য আশানুরূপ চাহিদা মোতাবেক পায় না। এসকল ক্ষেত্রে ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য ক্রয় করতে হবে এবং বাজারজাত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ক্ষেত্র বিশেষ মজুতের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া রপ্তানি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সাথে সাথে কৃষি নির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।

সোহাগ : বর্তমান সময়ে কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রে কোন বিষয়ে গুরুত্বরোপ করা উচিত ?
ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ : কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রে যে বিষয়ে গুরুতা¡রোপ করা উচিত তা হলো- জলবায়ু পরিবর্তন, বৈরি আবহওয়া ও জলবায়ু, আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ, বিভিন্ন উদ্বূত সমস্যা নিরসনের জন্য কার্যক্রম, কৃষি নির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা, বিভিন্ন রকমের কৃষি পণ্যের প্রক্রিয়াজাত প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিভিন্ন সমস্যা উত্তরণের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় কৌলিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণির জাত উদ্ভাবন। সর্বোপরি উৎপাদিত পণ্যের সঠিক বিপণন নিশ্চয়তা করার লক্ষে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

সোহাগ : কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে এবং কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষি মন্ত্রণালয়েরর অধীনে। আপনি কি মনে করেন  এটা ঠিক আছে ?
ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ : আসলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জনবল এবং শাখা-প্রশাখা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মত এতটা শক্তিশালী নয়। সাধারণত কৃষি মন্ত্রণালয় কৃষি সর্ম্পকিত কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। অন্য দিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষা সর্ম্পকিত সকল বিষয়ের ব্যবস্থাপনা করে থাকে। সেই জন্য তারা বিভিন্ন শাখা, বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি), বোর্ড ইত্যাদি বিশেষ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা এবং জনবল নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। যেটি কৃষি মন্ত্রণালয়ে বিদ্যমান নেই। কৃষি মন্ত্রণালয় এ ধরণের ব্যবস্থা গড়ে তুললে তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ন্যায় কৃষি মন্ত্রণালয়ও কৃষি শিক্ষা নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্য দেখাতে পারত ।

সোহাগ : কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা সমন্বয়ের জন্য ন্যাশনাল এগ্রিকালচার রিচার্স সিস্টেম (নার্স) রয়েছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা সমন্বয়ের জন্য এরকম কোনো প্রতিষ্ঠানের দরকার আছে কি ?
ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ :এ ক্ষেত্রে জাতীয় গবেষণা সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান থাকা বাঞ্চনীয়। উক্ত প্রতিষ্ঠান মৌলিক গবেষণা ও প্রায়োগিক গবেষণার বিভিন্ন তথ্যাবলি বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং কৃষি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করে পারস্পরিক তথ্য বিনিময়ের সুযোগ করে দিতে পারে। সাথে সাথে দেশের প্রয়োজন অনুসারে সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের গবেষণার বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করতে পারে। এছাড়া গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে সকল প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব রয়েছে সে সকল বিষয়ে সরকারকে জানানোর মাধ্যমে সম্ভাব্য সুযোগ সৃষ্টির জন্য প্রচেষ্টা চালাতে পারে। এছাড়া উদ্ভাবিত প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনকারীদের সমস্যা সমূহ নিরসনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় গবেষণার বিষয় সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিকট পৌঁছে দিতে পারে। বর্তমানে যেটির খুবই অভাব।

সোহাগ : শেকৃবিতে দেখা যায় প্রতি বছর প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রীর আসন ফাঁকা থাকে। কোনো কোনো বছর তা ২০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর কারণ কি বলে আপনি মনে করেন, আর এ আসন কিভাবে পূরণ করা যায়?
ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ : অপেক্ষমান তালিকা যদি বাড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে এ সমস্যা সমাধান করা যেতে পারে। দ্বিতীয় অপেক্ষমান তালিকা থেকে ভর্তি করেও এ সমস্যা সমাধান করা যেতে পারে। তবে, এক্ষেত্রে দেখা যায় যে, প্রথম ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় অগ্রগামী হয়ে যায়। ফলে পরে যারা ভর্তি হয় তাদের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই জন্য কখনো কখনো পুরোপুরি সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয় না। এছাড়াও, সব সময় কিছু না কিছু শিক্ষার্থী নানা কারণে ভর্তি বাতিল করে থাকে এবং সেটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও বটে।

সোহাগ : শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকার মধ্যে একটি শ্যামল গ্রাম। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য বাড়াতে কি ধরনের পদক্ষেপ নিবেন ?
ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ : বর্তমানে যে সৌন্দর্য বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে, তাকে আরো সম্পদশালী, সৌন্দর্যশীল করার লক্ষে অর্থের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এক অসাধারণ সৌন্দর্যশীল ক্যাম্পাসে পরিণত হবে। এই বিশ্বাস আমার রয়েছে।  

সোহাগ : আপনি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দক্ষতার সাথে পালন করেছেন। এখন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। শেকৃবি নিয়ে আপনার পাঁচটি স্বপ্ন কি হবে?
ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ : পাঁচটি স্বপ্ন হচ্ছে-

এক. সুদক্ষ উচ্চ গুণগত মান সম্পন্ন জনবল তৈরি করা যাতে ছাত্র-ছাত্রীদের সঠিক শিক্ষা প্রদান করতে পারে,

দুই. প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা যাতে সঠিক শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ তৈরি হয়,

তিন. প্রয়োজনীয় সংখ্যক বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা যাতে সুষ্ঠ গবেষণা পরিচালনা করা যায়,

চার. গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক গবেষণাগার ও প্রয়োজনীয় পরিমান গবেষণার মাঠের ব্যবস্থা করা,

পাঁচ. সর্বোপরি ছাত্র-ছাত্রীদের মানবিক ও ন্যায় সংগত চরিত্র গঠনের মাধ্যমে সুমানুষ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটা সুষ্ঠ পরিবেশ সৃষ্টি করা।

########