Wednesday, 26 September 2018

 

বাকৃবিতে মৎস্যবিদদের মিলনমেলা

আবুল বাশার মিরাজ, বাকৃবি:বাঁধভাঙা উচ্ছাস, আনন্দের মাতামাতি, স্মৃতির রোমন্থনে, বর্ণিল সাজসজ্জায় মেতেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। অনুষদের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সুবর্ণজয়ন্তীর উৎসবে এমন মিলনমেলার আয়োজন করেন উপমহাদেশের প্রথম উচ্চতর মৎস্য  শিক্ষা ও গবেষণাখ্যাত প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৬৭ সালে যাত্রা শুরু করে অনুষদটি। ৫০ বছর ধরে গবেষণার ক্ষেত্রে অসাধারণ সফলতার সাক্ষ্য বহন করে যাচ্ছে মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদটি।

এ কারণে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মৎস্যবিদ ও ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান বললেন, বাকৃবির মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ দেশের মৎস্যবিজ্ঞানীদের আতুঁড়ঘর। দেশের মৎস্য সেক্টরে যত অবদান তার প্রায় সবকিছুরই দাবিদার এ অনুষদ। দেশ বিদেশের মৎস্য সেক্টরের সাথে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিব, মহাপরিচালক সহ অন্যান্য পলিসি মেকারগণ, আন্তর্জাতিক, বহুজাতিক সংস্থা, দাতাগোষ্ঠির প্রতিনিধিবৃন্দ, বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী সংস্থার ও কোম্পানির প্রতিনিধি, ব্যক্তি উদ্যোক্তা, মৎস্যচাষী ও হ্যাচারি মালিকগণ, সরকারী-বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিবগসহ প্রায় ২০০০ জন প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন। তিন দিনব্যাপী এ আয়োজন রবিবার শেষ হবে।

জানা গেছে, বিগত ৫০ বছরে অনুষদের শিক্ষক ও গবেষকরা বাইম, মাগুর, শিং, তারা বাইম, গুচি বাইম, বাটা মাছের কৃত্রিম প্রজননসহ ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ পদ্ধতি, এক সাথে মাছ ও সবজি মাছ চাষের আধুনিক পদ্ধতি (একুয়া পনিক্স্র), স্বল্প খরচে বরফ বক্্র, রিং টানেল পদ্ধতিতে শুটকী, খাঁচায় পাঙ্গাস মাছের চাষ, ডাকউইড দিয়ে মিশ্র মাছ চাষ, মাছের বিষ্ঠা দিয়ে সবজি চাষ,মাছের জীবন্ত খাদ্য হিসাবে টিউবিফেক্স (এক ধরনের কীট) উৎপাদনের কলাকৌশল, ইলিশ মাছ আরহণের পর মানসম্মত উপায়ে বাজারজাত করণ, দেশি পাঙ্গাসের কৃত্রিম প্রজনন, মাছের পোনা চাষের জন্য রটিফারের চাষ, কুচিয়া মাছের কৃত্তিম চাষ পদ্ধতি আবিষ্কার, খাঁচায় দেশী কৈ মাছ চাষ পদ্ধতি এবং ইলিশ মাছের স্যুপ এবং নুডুল্স উদ্ভাবন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের জীন টেকনোলজি, মৎস্য জীব ও শারীরতত্ত¡,  মৎস্যচাষ, মৎস্য পুষ্টি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, পানি ও মাটির ভৌত রসায়ন, মৎস্য আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ গবেষণাগারগুলি ইতোমধ্যেই বিশ্বমানে উন্নীত হয়েছে।

সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে শনিবার বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা এবং উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সকাল ১০ টার দিকে মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের সামনে থেকে শোভাযাত্রাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় একই স্থানে এসে শেষ হয়। এরপর অনুষদের মাঠে তৈরি প্যান্ডেলে সুবর্ণ জয়ন্তীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. গিয়াস উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান। প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আলী আকবর। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাকৃবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) নির্বাহী সভাপতি ড. মো. কবীর ইকরামুল হক, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জসিমউদ্দিন খান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ফিশারিজ বায়োলজি এন্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তফা আলী রেজা হোসেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শুরুতে মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ৫০ বছরের গবেষণা, সাফল্য এবং অর্জন তুলে ধরে একটি প্রামাণ্য চিত্র উপস্থাপন করা হয়।

অনুষদের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিউটের পরিচালক বলেন, দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান, দারিদ্র বিমোচন ও রপ্তানি আয়ে মৎস্য খাতের অবদার আজ সর্বজন স্বীকৃত। আমাদের জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৬১ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৮.৪১ শতাংশ। প্রাণিজ আমিজের ৬০ শতাংশ আসে মাছ থেকে। দেশের ১৪ লক্ষ নারীসহ প্রায় ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছে। এ খাতে প্রতি বছর ৬ লক্ষাধিক লোকের নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে। অনুষদটির কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে।

২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের প্রাক্তন শিক্ষার্থী বর্তমানে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুস সালাম সাগর বলেন, সুবর্ণ জয়ন্তী তথা মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের পূর্নমিলনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করছি। অনুষ্ঠানে এসে বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী, শিক্ষক, সিনিয়র-জুনিয়রদের সাথে মিলিত হতে পেরে মনে হচ্ছে ফিরে গেছি ক্যাম্পাস জীবনের সেই প্রাণবন্ত দিনগুলিতে। সেইসাথে ক্যাম্পাসের বর্ণিল আলোক সজ্জা, উৎসবমুখর পরিবেশ ও উপস্থিত সকলের আন্তরিকতা খুবই উপভোগ করেছি।

সুবর্ণ জয়ন্তীতে সুযোগ পাওয়া স্নাতক চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শাহীন সরদার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, মৎস্য সেক্টরের বিপুল উৎপাদনের জন্য পৃথিবীতে মুক্ত জলাশয় ও চাষভিত্তিক মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ আজ পঞ্চম। যা সম্ভব হয়েছে এ অনুষদের কল্যাণেই। এ শিক্ষার্থী আরো বলেন, অ্যালামনাই না হয়েও আমাদের সুযোগ দেওয়াই আমরা অনেক ভাগ্যবান। কারণ এমন অনুষ্ঠান সবসময় আসবে না। দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় আমাদের বড় ভাই-আপুরা কর্মরত, ক্যাম্পাসে তাঁদের পদচারণা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। এটি শুধুই মৎস্যবিদদের মিলনমেলাই পরিণত হয়নি, একইসাথে পুরো ক্যাম্পাসকে এনে দিয়েছে বর্ণিল উৎসবের ছোঁয়া।