Sunday, 23 July 2017

 

নদীপথে দেখে এলাম পোয়ামুহুরী ও রূপমুহুরী ঝর্ণা

ডা. এম. মুজিবুর রহমান: কোরবানি ঈদের সপ্তাহ চারেক আগে থেকে “নদীপথে পোয়ামুহুরী ও রূপমুহুরী ঝর্ণা” -এই ট্যুরের প্ল্যান করা হয়েছিল। সে মোতাবেক চকরিয়া'র সুরাজপুর ব্রীজের নিচে সকাল দশ বাজে আমরা সবাই উপস্থিত হই। সবাই সংখ্যাটা নেহায়েত কম নয়। চব্বিশ.. যাদের ঊনিশ জন সকাল সাতের মাইক্রোবাস যোগে শহর চট্টগ্রাম থেকে আসা আর বাকি পাঁচজন কাছাকাছি স্থান থেকে। সেখান থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা করে আলীকদমের উদ্দেশ্যে যাত্রা।

ঘড়ির কাটায় ততক্ষণে সাড়ে এগার। নৌকা চলছে ঝকরনকর শব্দে। আমরাও যে যার মত সহ্য করে চলছি এই শব্দ অত্যাচার। নদীর নাম মাতামুহুরি। তার বুক চিরে নৌকায় ছুটে চলা আমরা। কারো কণ্ঠে গান। অবিরাম। কারো মুখে আড্ডা। মাতরম। কারো হাতে ক্যামেরা। দৃশ্যে তাক। কারো কানে ইয়ারফোন। রকমফের। নদীর দু ধার দখল করে আছে খোলা মাঠ। সবুজ গাছ-গাছালি। বর্ণিল পাখ-পাখালি। রাখাল। পাল। পাহাড়ি মানুষ। লোকালয়। জুমচাষ। ছোট বড় পাহাড়। দূরে। অদূরে। দু'ধারের নয়নাভিরাম এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে চলছিল দুপুরের খাবারের আয়োজন।

নৌকা'র গলুই'র সামনে টিনের চুলো। তাতে কাঠের লাকড়ি। মিশেল পদের সবজি তরকারি। সাথে পুকুরধৃত চার কেজি ওজনের বোয়াল মাছ ভাজা। তৃপ্ত রসনা। পরিতৃপ্ত মন। লাইনঝিরিতে যাত্রাবিরতি। দুপুরের খাবার। তারও কিছুখন আগে নদীপানিতে গোসল। ডুব প্রতিযোগিতা। আবার শুরু হলো যাত্রা।

সন্ধ্যা নামা'র আগমুহূর্তে এক পশলা বৃষ্টি। আলীকদম পোঁছাতে পোঁছাতেই রাত ন'টা। রাতে তাই পূর্বপরিকল্পিত আলীকদম উপজেলা সদরে ক্যাম্পিং করা সম্ভবপর হয়ে উঠল না। আমরা সবাই শাফকাতদের বাড়ীতে গিয়ে উঠলাম। এটাকে বাড়ী না বলে বাংলো বলাটাই যথোপযুক্ত। রাতের রান্নার আয়োজন। অনবদ্য আতিথেয়তা। আড্ডা। গল্প। গান। নির্লজ্জ চাঁদ। গণরাত্রীযাপন। এভাবেই রাত পার হল রাত।

পরদিন ভোর হতে না হতেই প্রস্তুতি শুরু। আধাঘণ্টা'র মধ্যে আমরা সবাই সেনা জোন সংলগ্ন ব্রীজের ঘাটে। ইতিমধ্যে জোন এনসিও'র সহায়তায় পোয়ামুহুরি পর্যন্ত নৌ ভ্রমণের জন্য অনুমতি নেয়া শেষ। পূর্বনির্ধারিত তিনটি বোটে অভিযাত্রী এখন ২৯। সকাল সাতটায় টান টান উত্তেজনা নিয়ে শুরু হলো যাত্রা। ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে জানালি পাড়া আর্মি ক্যাম্প ঘাট। এরই মধ্যে একটি বোটের ইঞ্জিন বিকল। মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ না করায় কিছুটা দুর্ভোগও পাহাতে হল। বৈকি। তড়িৎ সিদ্ধান্তে এবার দু’টি বোটে সবাই চড়ে বসলাম আমরা। চললাম মাতামুহুরীর শত বাঁক পেরিয়ে। কূল ঘেঁষে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে লম্বা লম্বা পাহাড়ের সারি। সবুজাভ সব সৌন্দর্য। চোখে পড়ছে কিছুদূর পরপর পাহাড় বেয়ে নেমে আসা অসংখ্য ঝিরি, ঝিরিমুখ আর ঝর্ণাধারা। । টংঘর। জুমচাষ। সে এক অসাধারণ ভালোলাগা।

দুপুর সাড়ে বারটা নাগাদ আমরা পোয়ামুহুরী ঝর্ণাতে পৌঁছালাম। তারপর ঝর্ণার শীতলজলে আবগাহন। অদ্ভুত সে ভালোলাগা। ঝর্ণারাণী রূপমুহুরী, পোয়ামুহুরীর খালের মুখ থেকে আরো এক কিলোমিটারের বেশি দূরে। সে দূরত্ব এগুতেই নদী তীর থেকে অদূরে ঝর্ণা’র ঝিরিপথটি দেখা যায়। কিন্তু পুরো ঝিরিপথটা বন্ধুর, পিচ্ছিল আর পাথুরে। ঝিরির দু'ধারে আছে শক্ত পাথরের দেয়াল। সেখানে সবুজ শ্যাওলার একচ্ছত্র বিস্তৃতি। রূপমুহুরী ঝর্ণার ধেয়ে আসা জলধারা ঠাই দাঁড়িয়ে সহ্য করার মত নয়। দেড়-দু'শ ফুট উপর থেকে পতিত সে স্বচ্ছ জলধারা কানের উপরে যেন কাঁটার মত বিঁধে। চোখমুখ ঝর্ণার দিকে তাই উঁচিয়ে রাখা এক প্রকার অসম্ভব। এতকিছুর পরও ঝর্ণাধারা ও তার সবিশেষ কলতান মুহূর্তেই দেহমনে নিয়ে পরম প্রশান্তি নিয়ে বিরাজ করে। সে এক অন্য জগতে হারিয়ে চলা।

এবার ফেরার পালা। যদিও মন এ রূপ ছেড়ে চাইছে না যেতে। বিকেল তিনটা। উনুনে তখনো রান্নার পাতিল। পোয়ামুহুরী বাজারে এসে তাই খাওয়ার অপেক্ষা। তারপর শুঁটকি তরকারি'র ভাত। সে যেন এক অমৃতসুধা। পড়ন্ত বিকেল। পাহাড়ের ফাঁক গলে সূর্যরশ্মি ও নদীজলের অপূর্ব মিতালি। পূর্ব দিগন্ত জুড়ে আছে রংধনু সাতরং। এখানে। সেখানে। অদূরে কাঞ্চনজঙ্গা'র হাতছানি। চারদিকে শুধু বিরাজ করছে, করে চলছে অনবদ্য নৈসর্গিক আবহ। গুধুলি হতে না হতেই আমাদের ঘাটে ফেরা।

#যেভাবে যাবেনঃ
রূপমুহুরী ঝর্ণা দেখতে হলে প্রথমে বান্দরবান জেলার উপজেলা শহর আলীকদমে আসতে হবে। ঢাকা থেকে আসলে আপনাকে প্রথমে চট্রগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের চকরিয়া বাস টার্মিনালে নামতে হবে। চট্রগ্রাম থেকেও বাসে চকরিয়া আসতে পারেন। চকরিয়া থেকে আলীকদম চাঁদের গাড়ীতে (জীপ) আসতে পারবেন। লোকাল ভাড়া জন প্রতি ৬৫ টাকা। রিজার্ভ ভাড়া এক পথ ১০০০-১২০০ টাকা।

বাসে আসলে সময় লাগবে দুই ঘণ্টা। আর চাঁদের গাড়িতে গেলে ৩০ মিনিট বা ৪০ মিনিট কম লাগবে। দুয়ের মাঝে ভাড়ার তফাৎ মাত্র ১০ টাকা। বাস স্টেশন থেকে টমটম বা রিক্সায় করে মাতামুহুরী ব্রীজ  ঘাট। সেখান থেকে বোটে (ইঞ্জিনচালিত নৌকা) করে পোয়ামুহুরী, রূপমুহুরী যাওয়া যাবে। ৮/১০ জন বাহী একেকটি বোটে রিজার্ভ ভাড়া ৫-৬ হাজার টাকা। নদীতে পানি বেশী থাকলে প্রতিবোটে ১৪/১৫ জনও যেতে পারে।
====================================
লেখক-প্রাণিচিকিৎসক
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়।

কৃতজ্ঞতাস্বীকারঃ
১. Esmat Elahee (ট্যুর আয়োজক ও প্রধান, Adventurers)
২. Momtaj Uddin Ahamad (ট্যুর প্রদর্শক ও প্রেসিডেন্ট, আলীকদম প্রেস ক্লাব)
৩. Joynob Islam (ট্যুর প্রদর্শক ও শিক্ষক, চম্পটপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়)
এবং আরো অনেকে...