Thursday, October 22, 2026
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত পেঁয়াজ ও রসুনের পাতা কাটার যন্ত্র:প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য, অর্থনৈতিক গুরুত্ব, রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্প্রসারণ সম্ভাবনা
21, Oct 2026 | এগ্রিবিজ এন্ড টেক

ড. মোহাম্মদ এরশাদুল হক:
১. ভূমিকা
বাংলাদেশে পেঁয়াজ একটি অন্যতম প্রধান মসলা ও অর্থকরী ফসল, যা খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, কৃষকদের আয় বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। পেঁয়াজ তোলার পর তা সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের আগে অতিরিক্ত পাতা বা ডগা কেটে ফেলা (ডিটপিং) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট-হারভেস্ট বা ফসল-পরবর্তী প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS, 2025) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পেঁয়াজ চাষের জমি ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৫০৩ হাজার একর থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৩৫ হাজার একরে পৌঁছেছে এবং একই সময়ে পেঁয়াজের উৎপাদন ২.৫৪৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৩.২২১ মিলিয়ন মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। 

এই একই ধারায়, রসুনের ক্ষেত্রেও দেশে আবাদি জমির পরিমাণ এবং উৎপাদন ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বিবিএস (BBS)-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুসারে, সাম্প্রতিক মৌসুমে দেশের মোট ৬৪টি জেলায় রসুনের চাষের মোট জমি বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৭৭,৯০০ হেক্টরে (প্রায় ১.৯২ লাখ একর) উন্নীত হয়েছে এবং দেশব্যাপী রসুনের মোট উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬,৯০,৯০০ মেট্রিক টনে (০.৬৯১ মিলিয়ন মেট্রিক টন)। পেঁয়াজ ও রসুনের এই সম্মিলিত উৎপাদন বৃদ্ধি দেশের অভ্যন্তরীণ মসলার বাজারে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে এবং ফসল-পরবর্তী প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির আধুনিকায়নে (যেমন ডিটপার যন্ত্রের ব্যবহার) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

সনাতন বা প্রচলিত নিয়মে হাত দিয়ে পেঁয়াজের পাতা কাটতে অনেক শ্রমঘণ্টা প্রয়োজন হয়। ফসল তোলার মূল বা পিক মৌসুমে এই মানব-শ্রমের ওপর নির্ভরতা কাজকে কঠিন করে তোলে, যার ফলে ফসল-পরবর্তী প্রক্রিয়াকরণে বিলম্ব ঘটে এবং অপচয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় (ভানাগে, ২০১২; কারাতে এবং অন্যান্য, ২০২৫)। এই পরিস্থিতিতে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাতা কাটা দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ নিশ্চিত করতে পারে এবং শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে কমিয়ে আনে। ভানাগে (২০১২) স্পাইরাল রোলার ডিটপারের মাধ্যমে ৮৬.৮৬% কার্যদক্ষতা এবং রথিনাকুমারী ও সেন্থিল কুমারন (রথিনাকুমারী এবং সেন্থিল কুমারন, ২০২৪) মাত্র ২.০৫% পেঁয়াজের ক্ষতিসহ ৯৮.৪৪% পাতা কাটার দক্ষতা অর্জন করেছেন। 

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বারি) পেঁয়াজ ও রসুনের পাতা কাটার জন্য কাটার-বার, রোটারি ইমপ্যাক্ট, শিয়ারিং, নাইলন-থ্রেড এবং রোলার-ভিত্তিক বিভিন্ন যান্ত্রিক ব্যবস্থা উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর মধ্যে স্পাইরাল রোলার (spiral roller) ব্যবস্থাটি নিরবচ্ছিন্ন ফিডিং, উন্নত ফসল সারিবদ্ধকরণ এবং স্থিতিশীল কাটার ক্ষমতার কারণে বেশ আশাব্যঞ্জক ফলাফল দেখিয়েছে (হক এবং অন্যান্য ২০১৯, ২০২০, ২০২২, ২০২৩)। যদিও এই পরিমার্জনগুলো যন্ত্রের কর্মক্ষমতা বাড়িয়েছে, তবুও সরাসরি কৃষকদের ব্যবস্থাপনায় মাঠ পর্যায়ে এর ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ যাচাইকরণ গবেষণায় একটি উন্নত বারি পেঁয়াজ ও রসুনের পাতা কাটার যন্ত্রের প্রকৌশলগত দক্ষতা, কাটার গুণগত মান, কৃষকদের গ্রহণযোগ্যতা এবং অর্থনৈতিক লাভজনকতা সরাসরি কৃষকদের মাঠ পর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতিতে মূল্যায়ন করা হয়েছে, যাতে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক পেঁয়াজ উৎপাদনে এর উপযুক্ততা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বারি) থেকে ২০২৪ সালে পেঁয়াজ ও রসুনের পাতা কাটার জন্য যন্ত্রটিকে প্রযুক্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

২. যন্ত্র উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তাx
হাতে পাতা কাটার কাজে শ্রমিকের সংখ্যা, কাজের সময় এবং মজুরি গুরুত্বপূর্ণ ব্যয়। ফসল সংগ্রহের পর দ্রুত পাতা কাটতে না পারলে পরবর্তী শুকানো ও সংরক্ষণ কার্যক্রমের সময়সূচি ব্যাহত হতে পারে। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে অধিক পরিমাণ ফসল অল্প সময়ে প্রক্রিয়াকরণের সুযোগ তৈরি হলে শ্রমনির্ভরতা কমানো এবং উৎপাদন-পরবর্তী ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।

৩. যন্ত্রটির প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) কর্তৃক উদ্ভাবিত পেঁয়াজ ও রসুনের পাতা কাটার এই ডিটপার যন্ত্রটি দেশের কৃষি যান্ত্রিকীকরণে একটি যুগান্তকারী সংযোজন। মাঠ পর্যায়ে ও গ্রামান্তরে সহজে স্থানান্তর করার জন্য যন্ত্রটির পুরো কাঠামোটি চাকার ওপর স্থাপন করা হয়েছে, যা অত্যন্ত সুবিধাজনক। এটি চালনার জন্য একটি ৪ অশ্বশক্তির ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে এবং পুরো যান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি মাত্র দুইজন অপারেটর দিয়েই অত্যন্ত দক্ষভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। কৃষি কাজে ব্যবহারের জন্য বারি পেঁয়াজ-রসুন ডিটপার একটি অত্যন্ত কার্যকরী ও শক্তিশালী যন্ত্র। এই মেশিনটির সামগ্রিক দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা যথাক্রমে ২৮০০ × ১২০০ × ১৩৫০ মিলিমিটার এবং এর মূল কাঠামোর (মেইন ফ্রেম) দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ২১০০ × ৯৪০ মিলিমিটার। যন্ত্রটিতে পেঁয়াজ ও রসুনের পাতা বা ডগা কাটার জন্য একটি অত্যাধুনিক কাটিং মেকানিজম বা কাটার পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, যা মূলত ঘড়ির কাঁটার দিকে এবং বিপরীত দিকে পর্যায়ক্রমিক ঘূর্ণনশীল একটি স্পাইরাল কাটার ও প্লেইন রোলার সিস্টেম। এই পদ্ধতিতে নিখুঁতভাবে কাজ করার জন্য ৯টি স্পাইরাল কাটার এবং ১০টি প্লেইন রোলার রয়েছে, যেখানে প্রতিটি স্পাইরাল কাটারের আকার ৬৬০ × Ø৪৭ মিলিমিটার এবং প্রতিটি প্লেইন রোলারের আকার ৬৬০ × Ø৭৫ মিলিমিটার। যন্ত্রটির ভেতরের প্লেইন রোলার এবং স্পাইরাল কাটারের মধ্যকার ফাঁকা জায়গা বা ক্লিয়ারেন্স ০.২ মিলিমিটারের চেয়েও কম, যা অত্যন্ত সূক্ষ্ম কাটিং নিশ্চিত করে। পেঁয়াজ বা রসুন ভেতরে প্রবেশের জন্য এর ফিডিং ইনক্লিনেশন বা ফিডিং কোণ ৪৩.৭৩ ডিগ্রি নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্পূর্ণ মেশিনটির মোট ওজন ৩০০ কেজিরও বেশি ।

কার্যক্ষমতার দিক থেকে যন্ত্রটি অত্যন্ত শক্তিশালী; এর ঘোষিত উৎপাদন ক্ষমতা ঘণ্টায় ১,৫০০ কেজি বা ১.৫ টন। অর্থনৈতিকভাবেও এই উদ্ভাবনটি কৃষকদের জন্য বেশ সাশ্রয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী। যন্ত্রটির প্রাথমিক ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১,৭৫,০০০ টাকা। অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষমতাসম্পন্ন এই প্রযুক্তিটি পেঁয়াজ ও রসুন চাষীদের শ্রম ও সময় সাশ্রয় করে ফসলের বিপণন প্রক্রিয়াকে অনেক সহজ ও লাভজনক করে তুলবে।

৪. অর্থনৈতিক গুরুত্ব
যন্ত্রটি পেঁয়াজ ও রসুন চাষ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ভূমিকা পালন করে। প্রথমত, যন্ত্রের মাধ্যমে দ্রুত পাতা কাটার ফলে প্রচলিত সনাতন পদ্ধতির তুলনায় শ্রম ও সময় সাশ্রয় হয়। এতে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি কমার পাশাপাশি সময়মতো শুকানো এবং সংরক্ষণের কাজ দ্রুত শুরু করা সম্ভব হয়, যা সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, চাকার ওপর স্থাপিত হওয়ায় যন্ত্রটির স্থানান্তরযোগ্যতা চমৎকার, যা এক মাঠ থেকে অন্য মাঠে বা গ্রামান্তরে সহজে নেওয়ার সুবিধা দেয়। এর ফলে কৃষকেরা নিজেদের চাহিদার পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে ভাড়ায় চালিত সেবা ব্যবসা বা কাস্টম হায়ার সার্ভিসের মাধ্যমে অতিরিক্ত আয় করতে পারেন। এই বহুমুখী ব্যবহারের কারণে যন্ত্রের বার্ষিক ব্যবহার বাড়ে এবং এর স্থায়ী বা ফিক্সড কস্ট বেশি কাজের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়, যা ব্যবসাকে আরও লাভজনক করে।

তবে পেঁয়াজ ও রসুনের মৌসুমি বৈশিষ্ট্যের কারণে যন্ত্রটির বছরে সীমিত ব্যবহার হয়; এটি বছরে মাত্র ৩০ দিন ব্যবহৃত হয় এবং বছরের বাকি বড় অংশ অলস বসে থাকে। এই দীর্ঘ বিরতিতে ধুলো, আর্দ্রতা, মরিচা, ইঁদুর-পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং জ্বালানি বা রাবার অংশের ক্ষয়ের ঝুঁকি থাকে। তাই এই বাস্তবতায় যন্ত্রটির দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম। সংরক্ষণে অবহেলা করলে পরবর্তী মৌসুমে ইঞ্জিন চালু না হওয়া, বেল্ট বা বিয়ারিং আটকে যাওয়া এবং কাটার অংশে মরিচা ধরার মতো সমস্যা দেখা দেয়, যা কৃষকের অপ্রত্যাশিত মেরামত ব্যয় ও আর্থিক ক্ষতি বাড়িয়ে দেয়।

৫. বিস্তারিত অর্থনৈতিক সমীক্ষা
কৃষি কাজে ব্যবহৃত এই যন্ত্রটির প্রাথমিক ক্রয়মূল্য ১,৭৫,০০০.০০ টাকা । এই নির্দিষ্ট খরচ এবং পরিবর্তনশীল খরচ একত্র করে যন্ত্রটির প্রতি ঘণ্টার মোট পরিচালন খরচ দাঁড়ায় ৩৮৪.০৭ টাকা। কার্যক্ষমতার দিক থেকে যন্ত্রটি প্রতি ঘণ্টায় ১,৫০০.০০ কেজি (বা ১.৫ টন) ফসল প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। এই বিপুল কর্মক্ষমতার কারণে প্রতি কেজি ফসল প্রক্রিয়াজাত করতে খরচ হয় মাত্র ০.২৬ টাকা এবং বছরে যন্ত্রটির মোট পরিচালন ব্যয় দাঁড়ায় ৯২,১৭৭.৪০ টাকা। অর্থনৈতিকভাবে যন্ত্রটির বেনিফিট-কস্ট রেশিও বা বিসিআর (BCR) হলো ৩.৮৮, যা নির্দেশ করে যে এই যন্ত্রে প্রতি ১ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে ৩.৮৮ টাকা ফেরত আসে, যা অত্যন্ত লাভজনক একটি বিনিয়োগ। মাত্র ১১৭.৩৮ ঘণ্টা বাণিজ্যিকভাবে চললেই যন্ত্রটির মূল ক্রয়ের টাকা সম্পূর্ণ উসুল হয়ে যাবে।

৬. রক্ষণাবেক্ষণ
যন্ত্রটি বছরে মাত্র ৩০ দিন বা ২৪০ ঘণ্টা ব্যবহৃত হওয়ায়, মৌসুম শেষে এর দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। যন্ত্রটির স্থায়িত্ব রক্ষা এবং মরিচা, ইঁদুরের উপদ্রব, বেল্ট ও রাবারের ক্ষয় ঠেকাতে মৌসুম-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। সংরক্ষণের পূর্বে ইঞ্জিন সম্পূর্ণ ঠান্ডা করে কাটার ব্লেড, ফ্রেম ও চাকা থেকে মাটি ও ময়লা পরিষ্কার করে শুকিয়ে নিতে হবে। উন্মুক্ত ধাতব অংশে মরিচা-প্রতিরোধক তেল ব্যবহারের পাশাপাশি ইঞ্জিনের নির্দেশিকা মেনে জ্বালানি ব্যবস্থা, এয়ার ফিল্টার ও লুব্রিকেন্ট পরীক্ষা করতে হবে।

যন্ত্রটি সরাসরি মাটিতে না রেখে ছাদযুক্ত, শুকনো ও পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলকারী মেঝের ওপর জলরোধী কিন্তু বায়ু চলাচল-সহায়ক কভার দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। সংরক্ষণকালীন সময়ে প্রতি মাসে অন্তত একবার কভার, আর্দ্রতা, মরিচা, তারের অক্ষত অবস্থা বা তেলের লিক নিয়মিত পরীক্ষা করা আবশ্যক। এছাড়া, প্রতিবার চালুর আগে, প্রতিদিনের কাজ শেষে এবং প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত সার্ভিসিংয়ের একটি সুনির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে চলতে হবে, যা যন্ত্রের স্থায়ী খরচ কমাতে সাহায্য করবে। পরবর্তী মৌসুমে পুনরায় মাঠে নামানোর আগে সব অস্থায়ী ঢাকনা সরিয়ে প্রাক-চালু পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। পূর্ণাঙ্গ কাজ শুরুর আগে প্রথমে ফসল ছাড়া নিরাপদ স্থানে এবং পরে অল্প পরিমাণ পেঁয়াজ বা রসুন দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে চালিয়ে যন্ত্রটির কাটার মান ও সামগ্রিক কর্মক্ষমতা যাচাই করে নেওয়া উচিত। প্রস্তুতকারকের নির্দেশিকা মেনে এই সুনির্দিষ্ট রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করলে যন্ত্রটির ১০ বছরের প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল নিশ্চিত করা সম্ভব এবং অপ্রয়োজনীয় মেরামতের আর্থিক ক্ষতি থেকে বাঁচা যায়।

৯. সম্প্রসারণ ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের সম্ভাবনা
কৃষি যন্ত্রটির সফল সম্প্রসারণ ও টেকসই ব্যবহারের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ও সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। প্রথমত, কৃষি যন্ত্রসেবা কেন্দ্র বা স্থানীয় কৃষি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে যন্ত্রটি বাণিজ্যিকভাবে একাধিক কৃষকের জমিতে ভাড়ায় ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। তবে এই সেবামূল্য বা ভাড়ার হার নির্ধারণের সময় কেবল ডিজেল ও অপারেটরের খরচই নয়, বরং পরিবহন, নিয়মিত মেরামত, যন্ত্রের অবচয় এবং মৌসুম-পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ব্যয়কেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যা ব্যবসাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করবে। দ্বিতীয়ত, পেঁয়াজ ও রসুন উৎপাদন-ঘন এলাকাগুলোতে কৃষক সমবায় ও যৌথ মালিকানা মডেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের ওপর থেকে প্রাথমিক ক্রয়মূল্যের বড় আর্থিক চাপ অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়। তবে এই যৌথ মালিকানার ক্ষেত্রে যন্ত্রের সফল পরিচালনার জন্য কে এটি চালনা করবেন, কোথায় সংরক্ষিত হবে, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এবং আনুষঙ্গিক ব্যয় কীভাবে বহন করা হবে—তা শুরুতেই লিখিত বা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।

সর্বোপরি, এই নতুন প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও পরিচিতি বাড়াতে প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), স্থানীয় কৃষক সংগঠন এবং যন্ত্রসেবা উদ্যোক্তাদের যৌথ সমন্বয়ে নিয়মিত মাঠ প্রদর্শনী, দক্ষ অপারেটর তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, এই প্রশিক্ষণগুলোতে যন্ত্রের দৈনন্দিন যত্নের পাশাপাশি মৌসুম শেষে সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে কৃষকেরা দীর্ঘ সময় ধরে যন্ত্রটির সর্বোচ্চ সুফল ভোগ করতে পারেন।

১০. চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ গবেষণা
যন্ত্রটির মাঠ পর্যায়ের কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, বিভিন্ন জাত, আকার এবং মাঠ থেকে তোলার পর ভিন্ন ভিন্ন আর্দ্রতার পেঁয়াজ ও রসুনের ওপর যন্ত্রটির প্রকৃত কার্যক্ষমতা ও কাটার মান নিবিড়ভাবে যাচাই করা দরকার, যা এর প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বাড়াতে সাহায্য করবে। দ্বিতীয়ত, সনাতন পদ্ধতিতে হাতে কাটার মোট শ্রমঘণ্টা এবং যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাতা কাটার প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে একটি তুলনামূলক মাঠ জরিপ পরিচালনা করা আবশ্যক; এর মাধ্যমে কৃষকদের সামনে যন্ত্রটির প্রকৃত অর্থনৈতিক সাশ্রয় ও লাভজনকতার চিত্রটি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, নির্দেশিকা অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের ফলে পরবর্তী মৌসুমে যন্ত্রটি চালুর ক্ষেত্রে কেমন সাফল্য আসছে, বার্ষিক মেরামত ব্যয় কতটা কমছে এবং যন্ত্রের সামগ্রিক আয়ুষ্কালের ওপর এর কেমন ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা উচিত। সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্থানীয় বাজারে যন্ত্রের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ, নিয়মিত সার্ভিসিং এবং প্রশিক্ষিত মেকানিকের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা, যেন যেকোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দ্রুত সমাধান করে মৌসুমের সময় মাঠ পর্যায়ে যন্ত্রটির নিরবচ্ছিন্ন ব্যবহার বজায় রাখা যায়।

১১. প্রাপ্তিস্থান
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাথে গবেষণা-সম্প্রসারণ সম্পর্ক আছে সেসকল ম্যানুফাকচারিং ওয়ার্কশপ যেমনঃ জনতা ইঞ্জিনিয়ারিং, জিএসএম এগ্রো ইঞ্জিনিয়ারিং, নিউ শাপলা ইঞ্জিনিয়ারিং, আর কে মেটাল, হোসেন ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদিতে অর্ডার করলে যন্ত্র পাওয়া যাবে। বারি থেকে উদ্ভাবিত যন্ত্র বিক্রয়ের জন্য কোন রয়েলিটি নেয় না বরং যন্ত্র উৎপাদন ও উন্নয়নের জন্য প্রস্তুতকারকদের সহায়তা করে থাকে। 

১২. উপসংহার
বারি উদ্ভাবিত পেঁয়াজ ও রসুনের পাতা কাটার যন্ত্রটি উৎপাদন-পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় শ্রম ও সময় সাশ্রয়ের সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি। প্রশিক্ষণ, সহজলভ্য মেরামত সেবা এবং বাস্তব অর্থনৈতিক তথ্য সংগ্রহের সমন্বয়ে যন্ত্রটির টেকসই সম্প্রসারণ সম্ভব হতে পারে।

লেখক: মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, এফ এম পি ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর

Agrilife24 Logo

Agriculturist Md. Shafiul Azam, Editor & CEO
Dhaka Office: 141/4, Lake Circus, Kalabagan, Dhanmondi, Dhaka-1205.
Bogura Office: Hakim Son's House, Seujgari, Bogura-5800.
Email: info@agrilife24.com, editor@agrilife24.com, news@agrilife24.com
Contact: +880 2-48112812, Whatsapp: +880 1912-837-999

Social Share

© Agrilife24 . All Rights Reserved. Developed by Innovative Soft