Friday, October 16, 2026
বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার দাবি শেকৃবি পরিবারের
15, Oct 2026 | কৃষিবিদ ও ক্যাম্পাস

জাতীয় সংসদ ভবনের সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা, ঢাকার সবুজ পরিবেশ ও কৃষি গবেষণার স্বার্থ রক্ষার আহ্বান
এগ্রিলাইফ ডেস্ক:রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) পরিবার। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মনে করে, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আধুনিক, নিরাপদ ও কার্যকর সচিবালয় প্রয়োজন। তবে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণের স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে ঢাকার পরিবেশ, জাতীয় সংসদ ভবনের স্থাপত্য সৌন্দর্য, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মাজারের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার স্বার্থ যথাযথভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের মতে, উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরস্পরের বিরোধী নয়। বরং দূরদর্শী, পরিবেশবান্ধব ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রশাসনিক প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি রাজধানীর অবশিষ্ট সবুজ এলাকা, উন্মুক্ত পরিসর এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব। এ কারণে পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার আগে বিকল্প স্থানগুলো যাচাই, প্রয়োজনীয় সমীক্ষা প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের মতামত গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে শেকৃবি পরিবার।

ঐতিহাসিক কৃষিশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ পথচলা
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বাংলাদেশের কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৯২০ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ঢাকায় ‘দ্য এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট ইন ঢাকা’ প্রতিষ্ঠার জন্য ১৫/১৯১৯-২০ নম্বর এল.এ. কেইসের মাধ্যমে ২৯৮.৪৮২ একর জমি অধিগ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে ১৯৩৮ সালের ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক নিজ হাতে এ কৃষিশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপন করেন। প্রতিষ্ঠানের প্রথম প্রিন্সিপাল মিস্টার ক্লার্ক ৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে এর শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেন।

পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ফার্মগেট এলাকার নামকরণও সম্পৃক্ত। তবে সময়ের পরিক্রমায় বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়তন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের বক্তব্য। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রতিষ্ঠানটির ২৮.১৩ একর জমি প্রথমে অস্থায়ীভাবে এবং পরে স্থায়ীভাবে দখলে নেওয়া হয়। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জমির পরিমাণ কমে বর্তমানে প্রায় ৮৭ একরে দাঁড়িয়েছে।

দীর্ঘ ঐতিহ্যের এ প্রতিষ্ঠান দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষির আধুনিকায়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং কৃষি গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, লবণাক্ততা ও খরা সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং পানি ও পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে। এসব গবেষণার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত পরীক্ষাগার, গবেষণার মাঠ, নমুনা সংগ্রহের সুযোগ এবং শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কাজ করার পরিবেশ।

এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জমি, উন্মুক্ত পরিসর এবং পরিবেশগত সুবিধাকে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করে শেকৃবি পরিবার। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নির্দিষ্ট জমি বা মাঠ প্রস্তাবিত প্রকল্পের সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট নথি ও বাস্তব ব্যবহার যাচাইয়ের ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

জাতীয় সংসদ ভবন ও ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের দাবি
জাতীয় সংসদ ভবন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যকীর্তি। বিখ্যাত স্থপতি লুই আই. কানের নকশায় নির্মিত এ ভবন শুধু রাষ্ট্রীয় আইন প্রণয়নের কেন্দ্র নয়; এটি বাংলাদেশের স্থাপত্যঐতিহ্য ও জাতীয় পরিচয়েরও গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। একইভাবে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মাজার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক স্মৃতিবিজড়িত স্থান হিসেবে পরিচিত।

শেকৃবি পরিবারের মতে, বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে এসব স্থাপনার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, নান্দনিকতা এবং জনসাধারণের চলাচলের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করা জরুরি। একটি বড় সরকারি স্থাপনা নির্মাণের ফলে যানবাহনের চাপ, শব্দ, নিরাপত্তাব্যবস্থা, জনচলাচল এবং আশপাশের পরিবেশে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধিমালা, ঢাকা মহানগরের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা এবং জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার স্থাপত্য ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার।

সবুজ ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার আহ্বান
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, যানজট, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, জলাবদ্ধতা এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে রাজধানীর পরিবেশ ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে অবশিষ্ট সবুজ এলাকা, খোলা মাঠ, জলাধার ও গাছপালা সংরক্ষণ জনস্বাস্থ্য এবং নগরবাসীর জীবনমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গাছপালা শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, বায়ুর মান উন্নয়ন, জীববৈচিত্র‍্য রক্ষা এবং বৃষ্টির পানি ধারণে ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে উন্মুক্ত পরিসর নগরবাসীর হাঁটাচলা, ব্যায়াম, বিশ্রাম ও মানসিক প্রশান্তির সুযোগ সৃষ্টি করে। তাই রাজধানীর কোনো বড় জমির ব্যবহার পরিবর্তনের আগে পরিবেশগত প্রভাব, পানি নিষ্কাশন, যানজট, বায়ুদূষণ এবং সবুজ পরিসরের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

শেকৃবি পরিবারের বক্তব্য, উন্নয়নের নামে ঢাকার অবশিষ্ট সবুজ পরিসর সংকুচিত করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই সচিবালয় নির্মাণের জন্য এমন বিকল্প স্থান অনুসন্ধান করা উচিত, যেখানে প্রশাসনিক প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বার্থের ক্ষতির ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম থাকবে।

বিকল্প স্থান যাচাই ও স্বচ্ছ মূল্যায়নের দাবি
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার মনে করে, সচিবালয় নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার না করেও প্রস্তাবিত স্থানটির উপযুক্ততা নিয়ে নিরপেক্ষ আলোচনা করা সম্ভব। এ জন্য বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় নির্মাণের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম স্থগিত রেখে একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক পর্যালোচনা সম্পন্ন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের প্রস্তাব অনুযায়ী, সচিবালয়ের বিকল্প স্থানগুলো চিহ্নিত করে জমির উপযোগিতা, প্রশাসনিক সুবিধা, নির্মাণব্যয়, নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থা, পরিবেশ এবং জনস্বার্থের ভিত্তিতে তুলনামূলক সমীক্ষা প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব, যানজট, পানি নিষ্কাশন, গাছপালা, উন্মুক্ত পরিসর এবং নগরের তাপমাত্রার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।

এ ছাড়া জাতীয় সংসদ ভবনের স্থাপত্যসৌন্দর্য, ঐতিহাসিক মাজারগুলোর গুরুত্ব এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক, স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও সাধারণ নাগরিকদের মতামত গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, জি মর ব্যবহারসংক্রান্ত নথি এবং মূল্যায়নের ফলাফল জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখারও আহ্বান জানানো হয়েছে।

উন্নয়ন ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ই প্রত্যাশা
শেকৃবি পরিবারের বক্তব্য, তারা উন্নয়নের বিরোধী নয়; বরং এমন উন্নয়ন প্রত্যাশা করে, যা প্রশাসনিক কার্যক্রমকে আরও আধুনিক, দক্ষ, নিরাপদ ও জনবান্ধব করবে। একই সঙ্গে রাজধানীর সবুজ পরিবেশ, ঐতিহাসিক স্থাপনার মর্যাদা এবং কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ অক্ষুণ্ন রাখবে।

বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার আশা প্রকাশ করে, সরকার তাদের জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে একটি স্বচ্ছ, দূরদর্শী ও পরিবেশবান্ধব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। বাণিজ্য মেলার মাঠের ভবিষ্যৎ ব্যবহারের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা সম্পন্ন, বিকল্প স্থান যাচাই এবং সব পক্ষের বক্তব্য শোনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব।

শেকৃবি পরিবারের আহ্বান বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করুন। জাতীয় সংসদ ভবনের সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মর্যাদা, ঢাকার সবুজ পরিবেশ এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার স্বার্থ রক্ষা করুন। সচিবালয়ের জন্য পরিবেশগত ও জনস্বার্থের বিচারে উপযুক্ত বিকল্প স্থান খুঁজে বের করুন।

ঢাকা বাঁচুক, সবুজ বাঁচুক, গবেষণা বাঁচুক ঐতিহ্য ও উন্নয়নের সমন্বয়ে গড়ে উঠুক আগামী দিনের বাংলাদেশ।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার

Agrilife24 Logo

Agriculturist Md. Shafiul Azam, Editor & CEO
Dhaka Office: 141/4, Lake Circus, Kalabagan, Dhanmondi, Dhaka-1205.
Bogura Office: Hakim Son's House, Seujgari, Bogura-5800.
Email: info@agrilife24.com, editor@agrilife24.com, news@agrilife24.com
Contact: +880 2-48112812, Whatsapp: +880 1912-837-999

Social Share

© Agrilife24 . All Rights Reserved. Developed by Innovative Soft