ড. এম আব্দুল মোমিন: আজ ১৬ অক্টোবর, বিশ্ব খাদ্য দিবস। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতিবছর ১৬ অক্টোবর বিশ্বব্যাপি পালিত হয় বিশ্ব খাদ্য দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য-Innovate today. Nourish tomorrow’ বা আজকের উদ্ভাবন, আগামীর পুষ্টি। এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে এফএও-র আহ্বান হলো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সঙ্গে ঐতিহ্যগত জ্ঞান মিলিয়ে এমন কৃষি-খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা বর্তমান প্রজন্মের মানুষকে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা দেবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য ও পুষ্টির অধিকারের সুরক্ষা দেবে। প্রতিপাদ্যটি মনে করিয়ে দেয়, ক্ষুধা জয়ের লড়াই শুধু পেট ভরানোর নয়, পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করাও।
পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিতকরণে বেশ অগ্রগতি আছে, তবে এর বৈশ্বিক অগ্রগতির চিত্র যথেষ্ট সূখকর নয়। চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত জাতিসংঘের "বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা" (SOFI) ২০২৬ প্রতিবেদনে মিশ্র চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে প্রায় ৬৪.৫ কোটি মানুষ ক্ষুধার মুখোমুখি হয়েছেন, যা বিশ্ব জনসংখ্যার ৭.৮ শতাংশ। এটি ২০২৪ সালের চেয়ে প্রায় ১.৪ কোটি এবং ২০২২ সালের চূড়ার চেয়ে ৪.৩ কোটি কম। টানা তৃতীয় বছর বিশ্বব্যাপি ক্ষুধা কমেছে, এটি আশার খবর। এই হারে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা হ্রাস পেলেও ২০৩০ সালে এসে প্রায় ৫২ কোটি মানুষ ক্ষুধার মধ্যে থাকতে পারেন, ফলে জাতিসংঘ ঘোষিত "জিরো হাঙ্গার" (এসডিজি-২) লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। বিশেষ করে, আফ্রিকায় ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ৩০.৯ কোটিতে পৌঁছেছে, যা এশিয়াকে ছাড়িয়ে গেছে।
খাবার যোগাড়েই যখন এমন অবস্থা সেখানে স্বাস্থ্যকর খাবারের চিন্তাতো কেবল বিলাসিতা। ২০২৫ সালে মাথাপিছু দৈনিক স্বাস্থ্যকর খাদ্যের গড় ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪.২৮ ডলারে (ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পিপিপি হিসাবে), যা ২০২১ সালে ছিল ৩.৪৪ ডলার। ফলে বিশ্বে প্রায় ২৬৯ কোটি মানুষ, অর্থাৎ ৩২.৭ শতাংশ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যের খরচ জোগাতে পারেননি। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের খর্বতার হার ২০১২ সালের ২৬.৪ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪ সালে ২৩.২ শতাংশ হয়েছে, কিন্তু ২০৩০ সালের লক্ষ্য ১৬.৮ শতাংশ ছোঁয়ার জন্য এই অগ্রগতি যথেষ্ট নয়। সহজ কথায়, বিশ্বে খাবার যথেষ্ট আছে, কিন্তু পুষ্টিকর খাবার অনেকের নাগালের বাইরে। বাংলাদেশের গল্পটিও একই রকম। বাংলাদেশে ক্ষুধা কমেছে, কিন্তু পুষ্টির চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। SOFI ২০২৬ অনুযায়ী ২০২৩–২৫ সময়ে দেশের ৮.২ শতাংশ মানুষ (১.৪৩ কোটি) অপুষ্টিতে ভুগেছেন, যা ২০০৪–০৬ সালে ছিল ১৫.১ শতাংশ (২.১৯ কোটি)। দুই দশকে এই অগ্রগতি দেশের কৃষি ও জনস্বাস্থ্য খাতের সম্মিলিত সাফল্য।
কিন্তু অন্য সূচকগুলো ভাবনার কারণ। একই সময়ে জনসংখ্যার ২৬.২ শতাংশ, অর্থাৎ ৪.৫৪ কোটি মানুষ মধ্যম বা তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ছিলেন। ২০২৫ সালে ৩৮.৬ শতাংশ, অর্থাৎ ৬.৭৮ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যকর খাদ্যের খরচ জোগাতে পারেননি। ২০১৭ সালের ৬২.৮ শতাংশের তুলনায় এটি বড় উন্নতি, তবু সংখ্যাটি এখনো বিশাল। এ দেশে স্বাস্থ্যকর খাদ্যের ব্যয় ২০১৭ সালের ৩.০৯ ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৪.৫৯ ডলারে (পিপিপি) দাঁড়িয়েছে। টাকার অঙ্কে এটি মাথাপিছু দৈনিক প্রায় ১০৮ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১৬০ টাকা হয়েছে। এটি উন্নতি বটে কিন্তু যথেষ্ট আশাপ্রদ নয়। শিশুপুষ্টিতেও দ্বৈত বোঝা স্পষ্ট। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ২৫.১ শতাংশ (৪২ লাখ) খর্বাকৃতি ও ১০.৭ শতাংশ (১৭ লাখ) কৃশকায়, আবার ৫.৮ শতাংশ ওজনাধিক্যে আক্রান্ত। অর্থাৎ অপুষ্টি ও অতিপুষ্টি একই সমাজে পাশাপাশি চলছে।
বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা দেখিয়েছে, উদ্ভাবন বদলে দিতে পারে একটি জাতির ভাগ্য। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এ পর্যন্ত ১২৭টি আধুনিক উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে লবণাক্ততা, খরা, বন্যা, ঠান্ডা ও জলাবদ্ধতা সহনশীল জাত যেমন আছে, তেমনি আছে জিংক, প্রোটিন ও ভিটামিন-ই সমৃদ্ধ এবং ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিম্ন গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের জাত। ২০২৪–২৫ বোরো মৌসুমে দেশে আধুনিক জাতের আবাদ ছিল ৯৯.৭৫ শতাংশ, এর মধ্যে ব্রি-র জাতের হিস্যা প্রায় ৭৫ শতাংশ।
পুষ্টির দিক থেকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবন জিংকসমৃদ্ধ ধান। ব্রি ধান৬২ বিশ্বের প্রথম জিংকসমৃদ্ধ ধান। ব্রি এ পর্যন্ত সাতটি জিংকসমৃদ্ধ জাত উদ্ভাবন করেছে, যাতে প্রতি কেজি চালে ২৪ মিলিগ্রাম বা তার বেশি জিংক রয়েছে। যে দেশে মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত, সেখানে প্রতিদিনের ভাতের মধ্য দিয়েই অণুপুষ্টি পৌঁছে দেওয়া সবচেয়ে সাশ্রয়ী পথগুলোর একটি। দামি ফল, মাছ-মাংসের জায়গায় এটি পুষ্টির একটি নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে। পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত এলাকা, লবণাক্ত উপকূল, হাওরের আগাম বন্যা কিংবা বরেন্দ্রের খরা, এসব প্রতিকূলতার জন্যও আলাদা আলাদা জাত আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মধ্যেও উৎপাদন ধরে রাখার জন্য এই উদ্ভাবন অপরিহার্য। প্রতিপাদ্যের "আজকের উদ্ভাবন" অংশটি তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা মাঠে পৌঁছাবে। কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে ভাবতে হবে।
প্রথমত, শুধু ভাতের পুষ্টি নয়, খাদ্যের বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন। SOFI বলছে, ডিম, দুধ, মাছ-মাংস, ফল ও সবজিই স্বাস্থ্যকর খাদ্যের ব্যয়ের সিংহভাগ হয়। বৈশ্বিক হিসাবে প্রাণিজ খাদ্য, ফল ও সবজি স্বাস্থ্যকর খাদ্যের মোট ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ, অথচ শর্করাজাতীয় প্রধান খাদ্য মোট ব্যয়ের মাত্র এক-ষষ্ঠাংশ। তাই সবজি, ডাল, মাছ ও পশুপালনে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং সংরক্ষণ-পরিবহনে অপচয় কমানো জরুরি, যাতে পচনশীল পুষ্টিকর খাবারের দাম নাগালে আসে। দ্বিতীয়ত, উদ্ভাবনের বিস্তার। নতুন জাত ও প্রযুক্তি গবেষণাগারে থেকে গেলে লাভ নেই। কৃষি সম্প্রসারণ, বীজ সরবরাহ ও ক্ষুদ্র কৃষকের কাছে তথ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। জিংকসমৃদ্ধ চালের জন্য ভোক্তা সচেতনতাও দরকার। তৃতীয়ত, জলবায়ু ও বাজারের ধাক্কা সামলানো। SOFI ২০২৬ সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে খাদ্য, সার ও জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা ক্ষুধা কমানোর অগ্রগতিকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। আমদানিনির্ভর উপকরণের ওপর চাপ কমাতে দেশীয় গবেষণা ও সার-সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। চতুর্থত, ডিজিটাল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্ভাবন। আবহাওয়ার আগাম তথ্য, মোবাইলভিত্তিক পরামর্শ, নারী কৃষকের সম্পদ ও প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের কৃষি-প্রযুক্তিতে যুক্ত করা ভবিষ্যৎ খাদ্যব্যবস্থার ভিত্তি হতে পারে।
বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৬-এর বার্তা স্পষ্ট: ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াই এখন "কতটা খাবার" থেকে সরে "কেমন খাবার, কত দামে, সবার জন্য কি না" প্রশ্নে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ দেখিয়েছে, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করলে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগোনো যায়। এখন সেই সাফল্যকে পুষ্টিনিরাপত্তায় রূপ দেওয়ার সময়। দেশের পুষ্টি নিরাপত্তার বাইরের ৬.৭৮ কোটি মানুষের পাতে সুষম খাবার তুলে দেওয়াই আগামীর বড় কাজ। আজকের প্রতিটি উদ্ভাবন, প্রতিটি নীতিগত সিদ্ধান্ত ও প্রতিটি কৃষকের হাতে পৌঁছানো নতুন প্রযুক্তি গড়ে দেবে আগামী প্রজন্মের পুষ্টির ভিত্তি। "আজকের উদ্ভাবন, আগামীর পুষ্টি" তাই কেবল স্লোগান নয়, এটি হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
লেখক: ফ্রিল্যান্স কৃষি সাংবাদিক ও উর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), ই-মেইল: smmomin80@gmail.com