Sunday, September 27, 2026
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন আখ্যান: তরুণ ও নারীশক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়
26, Sep 2026 | গবেষণা ও ফিচার

মো. ওয়াকিলুর রহমান:জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণটি কেবল একটি প্রথাগত কূটনৈতিক বক্তব্য ছিল না; এটি ছিল পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের নীতিগত অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ আত্মমর্যাদার এক সুসংহত রূপরেখা। বিশ্বজুড়ে সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যখন নতুন মেরুকরণ ঘটছে, তখন বাংলাদেশকে একটি স্বনির্ভর ও টেকসই অর্থনীতি হিসেবে গড়ে তুলতে নিজস্ব মানবসম্পদকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। বৈশ্বিক শান্তি, জলবায়ু মোকাবিলা ও মানবিক সংহতির পাশাপাশি এই ভাষণে যে বার্তাটি সবচেয়ে জোরালোভাবে ধ্বনিত হয়েছে, তা হলো তরুণ ও নারী শক্তিকে কেন্দ্র করে এক অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের রূপান্তর।

বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় যখন বড় বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে এবং মারণাস্ত্র তৈরিতে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে, তখন বাংলাদেশ জাতিসংঘ থেকে বিশ্বশান্তির স্বার্থে অত্যন্ত সাহসী একটি নৈতিক আহ্বান জানিয়েছে। সমরাস্ত্রে বিপুল অর্থ অপচয় না করে সেই সম্পদ মানবিক কল্যাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় বিনিয়োগ করার যে দাবি বাংলাদেশ পেশ করেছে। বাংলাদেশের এই দাবি আন্তর্জাতিক দরবারে দেশের কূটনৈতিক পরিপক্কতা ও নৈতিক নেতৃত্বকে সুদৃঢ় করেছে।

একইসঙ্গে ফিলিস্তিনের নিপীড়িত জনগণের প্রতি অকৃত্রিম সংহতি প্রকাশ, বিশ্বব্যাপী অভিবাসী ও জলবায়ু বাস্তুচ্যুতদের অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের দাবি তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম মূলভিত্তি হলো মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত করা। বাংলাদেশসহ অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশসমুহ (LDC) তালিকা থেকে সফল উত্তরণের এই ক্রান্তিলগ্নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সমতার ভিত্তিতে অংশীদারত্বমূলক সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই আহ্বান বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের এক পরিণত ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ অংশগ্রহণের নির্দেশক।

যেকোনো দেশের টেকসই অগ্রগতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো তার মানবসম্পদ। বাংলাদেশ বর্তমানে জনমিতিক লভ্যাংশ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর সোনালী যুগে অবস্থান করছে। দেশের এই বিপুল কর্মক্ষম তরুণ শক্তিকে যদি সময়োপযোগী দক্ষতায় উন্নীত করা না যায়, তবে এই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। তরুণ সমাজকে কেবল প্রথাগত চাকরির বাজারের প্রত্যাশী হিসেবে না দেখে, তাদের স্বাধীন উদ্যোক্তা, গবেষক, প্রযুক্তিবিদ ও আন্তর্জাতিক মানের উদ্ভাবক হিসেবে গড়ে তোলার একটি স্পষ্ট রূপরেখা পেশ করা হয়েছে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI), বায়োটেকনোলজি ও ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত বিকাশের এই যুগে তরুণদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে চলতি অর্থবছরেই ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের স্টার্টআপ ফান্ড বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিলের মাধ্যমে বিনেয়োগের ৫০% ঋণ এবং ৫০% সরকারি সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি নতুন কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ বা উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা অর্থনীতিতে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। প্রথাগত চাকরির সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে তরুণদের নিজ উদ্যোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টির এই নীতি দেশকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে ধাবিত করবে।

আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হলো আমাদের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার প্রথাগত সনদভিত্তিক কাঠামো। বর্তমানে আমাদের প্রধান সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটগুলোর একটি হলো শ্রেণিকক্ষের তাত্ত্বিক পাঠদান এবং শিল্প খাতের বাস্তব চাহিদার মধ্যকার ব্যবধান। মানসম্মত প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর অভাব, শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার স্বল্পতার কারণে উচ্চ ডিগ্রি নিয়েও বহু তরুণ কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান পাচ্ছে না; ফলে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা।

এই সংকট উত্তরণে প্রথাগত সনদের গণ্ডি থেকে বের হয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে কারিগরি, ব্যবহারিক ও গবেষণানির্ভর দক্ষতায় রূপান্তর করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এই বাস্তবতায় শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে জাতীয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার সুদূরপ্রসারী ঘোষণাটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তবে কেবল বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; এর স্বচ্ছ ও কার্যকর প্রয়োগ, বিশ্বমানের আধুনিক গবেষণাগার স্থাপন, গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিল্পের (Industry) চাহিদার সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (Academia) নিবিড় সংযোগ সুনিশ্চিত করতে হবে। তবেই শিক্ষা সত্যিকার অর্থে কর্মমুখী মানবসম্পদ তৈরি করতে পারবে এবং তরুণ সমাজ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হবে।

একটি রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারীকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে পেছনে ফেলে কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। জাতিসংঘের মঞ্চে দেওয়া বক্তব্যে নারীদের নিছক অনুদান বা সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধাভোগী হিসেবে না দেখে, জাতীয় অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রীয় অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। নারীদের জন্য স্নাতকোত্তর (গ্র্যাজুয়েট) পর্যায় পর্যন্ত অবৈতনিক ও নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি । এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (SME) নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকিং খাতের মাধ্যমে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা প্রদান তাঁদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর ক্ষেত্রে 'ফ্যামিলি কার্ড' উদ্যোগটি পরিবারের নারীপ্রধানের নামে চালুর সিদ্ধান্তটি নারীদের অর্থনৈতিক সুরক্ষার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজে তাঁদের মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করছে। পরবর্তীতে কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডকে একটি সমন্বিত 'ইউনিভার্সাল কার্ড'-এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রাষ্ট্রীয় সামাজিক সুরক্ষাকে সাময়িক অনুদানের গণ্ডি থেকে বের করে এক অধিকারভিত্তিক ও স্থায়ী নাগরিক নিরাপত্তা কাঠামোয় রূপান্তর করবে।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs)-এর অন্যতম মূল দর্শন হলো ‘Leave No One Behind’—‘কেউ পিছিয়ে থাকবে না’। এই বৈশ্বিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক রূপান্তরের লক্ষ্যে ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচির সঙ্গে এসডিজির সমন্বয় একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ। সরকারি তথ্যমতে, এই সংস্কার কর্মসূচির প্রায় ৭৩ শতাংশ কার্যক্রম সরাসরি এবং ২৭ শতাংশ কার্যক্রম পরোক্ষভাবে এসডিজির বিভিন্ন লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিশেষ করে, আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির সুফল দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সমাজের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং ডিজিটাল বৈষম্য দূর করার অঙ্গীকার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন দর্শনের প্রতিফলন। উন্নয়নের সুযোগ, তথ্য, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সবার সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার এই প্রয়াস বাংলাদেশকে আরও বৈষম্যহীন, সাম্যভিত্তিক ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণের পথে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়কে সুস্পষ্ট করে। ফলশ্রুতিতে, গ্রামীণ তরুণ ও নারীদের উদ্যেক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ বেড়ে যাবে।

একই সঙ্গে, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং প্রযুক্তিনির্ভর সুশাসনের সমন্বিত প্রয়াস আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের দায়িত্বশীল, আত্মমর্যাদাশীল ও উন্নয়নমুখী রাষ্ট্র হিসেবে অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করার সুযোগ সৃষ্টি করে।

একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি কেবল গাণিতিক জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার আসল পরিচয় ফুটে ওঠে নাগরিকের সমতা, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার মানদণ্ডে। তরুণদের বাধাহীন উদ্ভাবনী স্বপ্ন এবং নারীদের আত্মবিশ্বাসী অংশগ্রহণের পথ সুগম করাই এখন আগামীর সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। "সবার আগে বাংলাদেশ—সবার জন্য বাংলাদেশ" এই মূলমন্ত্রকে হৃদয়ে ধারণ করে মানবসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ আজ এক স্বনির্ভর, মানবিক ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায়, জাতিসংঘে উপস্থাপিত বার্তাটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে উন্নয়নকে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; বরং এর প্রকৃত মাপকাঠি হলো নাগরিকের সক্ষমতা, অধিকার, সুযোগ ও মর্যাদার উন্নয়ন। ভয় ও বাধার সীমা অতিক্রম করে তরুণরা যেন তাঁদের উদ্ভাবনী স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পায় এবং নারীরা যেন পূর্ণ আত্মবিশ্বাস ও সমঅধিকারের ভিত্তিতে সমাজের মূলধারায় নেতৃত্ব দিতে পারে—তা নিশ্চিত করাই হতে পারে আগামীর বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।

“সবার আগে বাংলাদেশ সবার জন্য বাংলাদেশ” এই দর্শনে উজ্জীবিত হয়ে মানুষের সক্ষমতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য হ্রাস এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে একটি আত্মমর্যাদাশীল, আত্মবিশ্বাসী ও উদীয়মান শক্তি হিসেবে তার নতুন আখ্যানকে আরও সুদৃঢ় করতে পারে। এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই ও অর্থবহ করে তুলতে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সর্বস্তরের জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।
-লেখক: সদস্য, বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল ও
প্রফেসর, গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

Agrilife24 Logo

Agriculturist Md. Shafiul Azam, Editor & CEO
Dhaka Office: 141/4, Lake Circus, Kalabagan, Dhanmondi, Dhaka-1205.
Bogura Office: Hakim Son's House, Seujgari, Bogura-5800.
Email: info@agrilife24.com, editor@agrilife24.com, news@agrilife24.com
Contact: +880 2-48112812, Whatsapp: +880 1912-837-999

Social Share

© Agrilife24 . All Rights Reserved. Developed by Innovative Soft