কৃষিবিদ ড. মোঃ সহিদুল হক বীর:একবিংশ শতাব্দীতে মানবসভ্যতা প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে চরম উৎকর্ষ সাধন করলেও বৈশ্বিক পরিবেশগত বিপর্যয় আজ অস্তিত্বের তীব্রসংকট তৈরি করছে। বন উজাড়, পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন আগামী পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এই সংকট উত্তরণে টেকসই প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতারমাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার দুয়ারও উন্মোচিত হচ্ছে।
বর্তমান বিশ্বে বন উজাড়, পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মানব সভ্যতার জন্য অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। শিল্পায়ন, নগরায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অনিয়ন্ত্রিত শোষণের ফলে বৈশ্বিক পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, খরা, ঘূর্ণিঝড় এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন সংকট সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে ইতোমধ্যে এই পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাব অনুভব করছে। শিল্প বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে পৃথিবীর গড়তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রত্যক্ষ ওপরোক্ষ প্রভাব পড়ছে বন, পরিবেশ, কৃষি, অর্থনীতি এবং মানবজীবনের ওপর।
বনপৃথিবীর “প্রাকৃতিক ফুসফুস” হিসেবে পরিচিত। বনভূমি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন শোষণকরে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান বন উজাড় এবং পরিবেশগত অব্যবস্থাপনার কারণে পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক বনসম্পদ এখনও পরিবেশ রক্ষাও কার্বন সংরক্ষণের প্রধান ভিত্তি হলেও বন ধ্বংসের হার উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ওজলবায়ু-সংবেদনশীল দেশগুলো এই সংকটের সবচেয়েবড় ভুক্তভোগী। ফলে বন, পরিবেশও জলবায়ুকে কেন্দ্র করে নতুন চিন্তা, গবেষণা এবং নীতিনির্ধারণ আজ সময়ের অপরিহার্য দাবি। বন, পরিবেশ এবং জলবায়ু একটি পরস্পর নির্ভরশীল ব্যবস্থা।বনভূমি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণকরে জলবায়ু পরিবর্তনের গতি কমাতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে বনমাটির উর্বরতা রক্ষা, বৃষ্টিপাতের ভারসাম্য বজায় রাখা, জলাধার সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। বিশ্বব্যাপী বনভূমি পৃথিবীর স্থলজ বাস্তুতন্ত্রের অন্যতম প্রধান উপাদান। গবেষণায় দেখা যায়, পৃথিবীর মোট স্থলভাগের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বনাঞ্চলদ্বারা আচ্ছাদিত, যা বৈশ্বিক কার্বনচক্র নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে পরিবেশ দূষণ ও বনউজাড় জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে। যখন বনভূমি ধ্বংস হয়, তখন সেখানে সঞ্চিত বিপুল পরিমাণ কার্বন বায়ুমণ্ডলে নিঃসৃত হয় এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়। ফলে বনসংরক্ষণ শুধু পরিবেশগত নয়, বরং জলবায়ু নীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। আমরা জানি, একটি দেশের আয়তনের তুলনায় শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা আবশ্যক। কিন্তু বাংলাদেশের বিদ্যমান বনভূমির পরিমাণ দেশের আয়তনের প্রায় ১৫.৫৮ শতাংশ (প্রায়)। FAO-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ভূমির প্রায় ১৪.৫ শতাংশ বনাঞ্চলদ্বারা আচ্ছাদিত, যা বৈশ্বিক গড়েরতুলনায় অনেক কম। বৈশ্বিকগড় বনভূমি প্রায় ৩২ শতাংশের বেশি হলেও বাংলাদেশে এই হার ১৫শতাংশেরও নিচে অবস্থান করছে। FAO এবং বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, দেশে প্রায় ১.৬০ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমি রয়েছে। তবে জনসংখ্যার চাপ, অবৈধ দখল, কৃষি সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে বনাঞ্চল ক্রমাগত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান বনাঞ্চলসমূহ হলো: সুন্দরবন ম্যানগ্রোভবন, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সংরক্ষিত বন, সিলেট অঞ্চলের পাহাড়ি বন, রাতারগুল জলাবন, সামাজিক বনায়ন ও উপকূলীয় সবুজবেষ্টনী বিশেষ করে সুন্দরবন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষার দেয়াল হিসেবে কাজ করে। এটি ঘূর্ণিঝড়ের গতি কমায় এবংউপকূলীয় অঞ্চলের জনগণকে সুরক্ষা প্রদান করে।
বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভৌগোলিক অবস্থান, উচ্চ জনঘনত্ব এবং নিম্নভূমি উপকূলীয় অঞ্চল থাকার কারণে দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বর্তমানে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান প্রভাবগুলো হলো—
ক. সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে কৃষিউৎপাদন, পানীয় জল এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। সাম্প্রতিক গবেষণা গুলোতে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।
খ. বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল নিয়মিত ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সম্মুখীনহয়। গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে ঘূর্ণিঝড়জনিত জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা ও পুনরাবৃত্তি আরওবৃদ্ধি পেতে পারে।
গ. বাংলাদেশে মৌসুমি বন্যা নতুন নয়, তবেজলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতিবৃষ্টি ওআকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৪ সালের ভয়াবহবন্যায় প্রায় ৫.২ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
ঘ. বিশ্বব্যাংকের তথ্যঅনুযায়ী, বাংলাদেশে গত কয়েক দশকেসর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ১.১ ডিগ্রিসেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ কৃষি, জনস্বাস্থ্য এবং শ্রম উৎপাদনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ঙ. পরিবেশগত অবক্ষয় শুধু জলবায়ু পরিবর্তনেরফল নয়; এটি মানবসৃষ্টকর্মকাণ্ডেরও ফলাফল। শিল্প বর্জ্য, প্লাস্টিক দূষণ, নদীদূষণ, বায়ুদূষণ এবং বন ধ্বংসের কারণে বাংলাদেশের পরিবেশগত ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় বর্তমানে বৈশ্বিক উদ্বেগের একটি বিষয়। বনভূমি কমে যাওয়ার ফলে অসংখ্য প্রাণীও উদ্ভিদ প্রজাতি তাদের আবাসস্থল হারাচ্ছে।
আগামী পৃথিবীরপ্রধানচ্যালেঞ্জসমূহ:আগামী পৃথিবীর জন্য বন, পরিবেশও জলবায়ু সংশ্লিষ্ট চ্যালেঞ্জগুলো বহুমাত্রিক।
১.বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে।
২. জলবায়ুজনিতঅভিবাসন বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখকরা হয়েছে যে, দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিপুল সংখ্যক মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারে।
৩.পানিরসংকট, লবণাক্ততা এবং কৃষিজমির উৎপাদনশীলতাহ্রাস খাদ্য নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। স্বাস্থ্যঝুঁকি, তাপপ্রবাহ এবং সংক্রামক রোগেরবিস্তার বৃদ্ধি পেতে পারে।
৪. গ্রিনহাউস গ্যাসের অনিয়ন্ত্রিত নির্গমনের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। এর ফলে মেরুঅঞ্চলের বরফ গলছে এবংসমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৫. অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে আমাজনসহ বিশ্বের ফুসফুস খ্যাত বনাঞ্চলগুলো সংকুচিত হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন বিলুপ্তহচ্ছে অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি।
৬. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, খরা ও অসময়ে বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফ্রিকোয়েন্সি ও তীব্রতা বহুগুণবেড়ে গেছে।
৭. সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা ভবিষ্যতে তীব্র সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটতৈরি করবে।
৮. ঋতুচক্রের পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক কৃষিউৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরজন্য খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানিরতীব্র সংকট তৈরি করবে।
সম্ভাবনা ও টেকসইসমাধান: চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সম্ভাবনার দিকও রয়েছে। বর্তমানেবিশ্বব্যাপী “সবুজ উন্নয়ন” (Green Development) ধারণা জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ প্রযুক্তি এবংপরিবেশবান্ধব অবকাঠামো ভবিষ্যতের উন্নয়নের নতুন দিক নির্দেশকরছে।
বাংলাদেশেসম্ভাব্য উদ্যোগসমূহ হলো—
ক. সামাজিকবনায়ন ও কৃষিবনায়ন (Agroforestry) গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
খ. উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ ও অন্যান্য বৃক্ষরোপণ ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
গ. সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং বায়োগ্যাস ব্যবহারের মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।
ঘ. বিশ্বব্যাপী জলবায়ু অর্থায়ন বৃদ্ধি পাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো এই তহবিল ব্যবহারকরে অভিযোজন ও প্রশমনমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারে। বিশ্বব্যাংক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু অর্থায়নে রেকর্ড পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে।
ঙ. রিমোট সেন্সিং, জিআইএস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে বন পর্যবেক্ষণ, দুর্যোগ পূর্বাভাস এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনাআরও কার্যকর করা সম্ভব।
বন, পরিবেশ ও জলবায়ু মানবসভ্যতার টিকে থাকার মৌলিক ভিত্তি। বন ধ্বংস, পরিবেশদূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যৎ পৃথিবী আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-সংবেদনশীল দেশের জন্য এই সংকট আরও গভীর হতে পারে। তবে সময়োপযোগী নীতি, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, টেকসই বন ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সবুজ এবং টেকসই পৃথিবীগড়ে তুলতে বন সংরক্ষণ ওপরিবেশবান্ধব উন্নয়নের বিকল্প নেই। আগামী পৃথিবীর অস্তিত্ব নির্ভর করছে আজ আমরা পরিবেশ রক্ষায় কী পদক্ষেপ নিচ্ছিতার ওপর। বন ওপরিবেশ রক্ষা কেবল কোনো নির্দিষ্টদেশের দায়িত্ব নয়, এটি একটি বৈশ্বিক অঙ্গীকার। সম্মিলিত রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং নাগরিক সচেতন তাই পারে আগামী পৃথিবীকে একটি নিরাপদ ও টেকসই বাসযোগ্য গ্রহে রূপান্তর করতে।
লেখক: সহকারি অধ্যাপক, কৃষি বিভাগ, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।