কৃষিবিদ মোঃ শাহিদুর রব্বানী: সম্প্রতি খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রবণতা নতু করে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, যুদ্ধজনিত অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক সংকট এবং এল নিনোর প্রভাবে খরা ও জলবায়ুগত পরিবর্তন বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য এখনই দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশের কৃষি খাত খাদ্য সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, কৃষিজমির সীমাবদ্ধতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
১. কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি
সীমিত কৃষিজমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তি, উচ্চফলনশীল ও জলবায়ু-সহনশীল জাত, সুনির্দিষ্ট কৃষি ব্যবস্থাপনা এবং বৈজ্ঞানিক চাষাবাদ পদ্ধতির প্রয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, পানির দক্ষ ব্যবহার এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
২. সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন
মৌসুমি ফল, শাকসবজি, আলু, ভুট্টা ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের জন্য আধুনিক সংরক্ষণাগার, হিমাগার এবং কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কৃষিপণ্যের সংগ্রহ, পরিবহন ও সংরক্ষণ পর্যায়ে অপচয় কমানোর পাশাপাশি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে। এর মাধ্যমে বছরব্যাপী খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি এবং ভোক্তার জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্যপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ানো সম্ভব।
৩. বিকল্প খাদ্য ও মূল্য সংযোজিত খাদ্যপণ্যের প্রসার
ভাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে আলু, ভুট্টা, ডাল এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য থেকে পুষ্টিকর, নিরাপদ ও সহজলভ্য মূল্য সংযোজিত খাদ্যপণ্য (Value-added Food Products) উৎপাদনে উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে খাদ্যপ্রযুক্তি, পুষ্টিবিজ্ঞান এবং শিল্পভিত্তিক গবেষণার সমন্বয় জরুরি। এর ফলে খাদ্যের বৈচিত্র্য বাড়বে, কৃষিপণ্যের নতুন বাজার তৈরি হবে এবং খাদ্যসংকট মোকাবিলায় বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
৪. প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
জাতির সুস্বাস্থ্য, শারীরিক বিকাশ ও মেধার বিকাশে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত আমিষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সাশ্রয়ী মূল্যে দুধ, ডিম, মাছ ও মাংসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
এ লক্ষ্যে গবাদিপশুর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, উন্নত জাতের সম্প্রসারণ, রোগ নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত পশুখাদ্যের প্রাপ্যতা এবং উন্নত ঘাস চাষের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য বিকল্প খাদ্য উপকরণ ব্যবহার করে সাশ্রয়ী পশুখাদ্য উৎপাদন এবং খাদ্য রূপান্তর দক্ষতা বাড়ানোর জন্য গবেষণা জোরদার করা প্রয়োজন।
মৎস্য চাষের আধুনিকায়ন, নিরাপদ মাছ উৎপাদন এবং পোলট্রি ও ডেইরি শিল্পের টেকসই বিকাশের মাধ্যমেও দেশের আমিষের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন সম্ভব। এ ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
৫. গবেষণা, উদ্ভাবন ও বিনিয়োগে অগ্রাধিকার
কৃষি খাতের টেকসই উন্নয়নে কৃষিবিজ্ঞানী, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি-বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, এনজিও, উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। শুধু গবেষণা পরিচালনা করাই যথেষ্ট নয়; গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, খাদ্যপ্রযুক্তি এবং বিকল্প পশুখাদ্য উৎপাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে গবেষণা ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি উদ্ভাবনী উদ্যোগের বাণিজ্যিক প্রয়োগ, কৃষকের প্রযুক্তি গ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার করতে হবে। গবেষণার ফলাফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারলেই এর প্রকৃত সুফল জাতীয় অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তায় প্রতিফলিত হবে।
পরিশেষে খাদ্যনিরাপত্তা শুধু খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয় নয়; এর সঙ্গে পুষ্টি, সাশ্রয়ী মূল্য, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা নিবিড়ভাবে জড়িত। বৈশ্বিক সংকটের সময় খাদ্যের পর্যাপ্ত প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বজায় রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সীমিত সম্পদকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে অধিক খাদ্য উৎপাদন, পুষ্টির উন্নয়ন এবং টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। এ জন্য কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা, বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং বাস্তবায়নে কার্যকর নেতৃত্ব।
আজকের পরিকল্পিত উদ্যোগ, গবেষণা ও বিনিয়োগই পারে আগামী দিনের খাদ্যসংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে আরও সক্ষম, স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ করে তুলতে।
গবেষণালব্ধ তথ্য ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের PARTNER প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কৃষি খাতের বহুমুখীকরণ, পুষ্টি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থার যৌথভাবে প্রকাশিত The State of Food Security and Nutrition in the World 2025 প্রতিবেদনে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টির ঝুঁকির সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। এই গবেষণালব্ধ মূল্যায়নগুলো নির্দেশ করে যে, ভবিষ্যতের খাদ্যসংকট মোকাবিলায় শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং কৃষির বহুমুখীকরণ, গবেষণা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, খাদ্যের সাশ্রয়ী মূল্য এবং পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।