সমীরণ বিশ্বাস:ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়ার সক্ষমতা বিজ্ঞান এখনো অর্জন করতে পারেনি। তাই ভূমিকম্প হবে কি না, এই প্রশ্নের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ভূমিকম্প হলে আমরা কতটা প্রস্তুত? সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে একের পর এক ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূকম্পন মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ঢাকার কাছাকাছি উৎপত্তিস্থল হওয়া কয়েকটি ভূমিকম্প রাজধানীর ভূমিকম্প-ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্নকে সামনে এনেছে। ২০২৬ সালের ২২ জুন রূপগঞ্জে প্রায় ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ঢাকার খুব কাছাকাছি ছিল। এর আগে ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর মাধবদী, নরসিংদীতে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পও রাজধানীর নিকটবর্তী এলাকায় আঘাত হানে। এই ঘটনাগুলোকে বড় ভূমিকম্পের নিশ্চিত পূর্বাভাস বলা যাবে না। কিন্তু এগুলো আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত, বিশেষ করে এমন একটি মহানগরের জন্য, যেখানে বিপুল জনসংখ্যা, ঘনবসতি, দুর্বল বা পুরোনো ভবন, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং সীমিত উদ্ধার-অবকাঠামো একসঙ্গে বিদ্যমান।
ঝুঁকি শুধু ভূমিকম্পে নয়, দুর্বল প্রস্তুতিতেও : ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কিন্তু ভূমিকম্পে কত মানুষ মারা যাবে, কত ভবন ধসে পড়বে কিংবা কতটা অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে, তার বড় অংশ নির্ভর করে মানুষের তৈরি পরিবেশের ওপর। গবেষণায় ঢাকার ভূমিকম্প-ঝুঁকির ক্ষেত্রে ভবনের নকশা, নির্মাণের মান, তদারকি এবং বিল্ডিং কোড অনুসরণের ঘাটতিকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ ভূমিকম্প নিজে হয়তো ভবন নির্মাণ করে না; কিন্তু একটি দুর্বল ভবনকে ধসিয়ে দেওয়ার শক্তি তার আছে। একটি ভবন যদি প্রকৌশলগতভাবে নিরাপদ হয়, যথাযথ মাটি পরীক্ষা করা হয়, নকশা অনুমোদিত হয় এবং নির্মাণের প্রতিটি ধাপে মান বজায় থাকে, তাহলে একই মাত্রার ভূকম্পনের ক্ষতি অনেক কমানো সম্ভব। এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
দুর্বল নির্মাণ কাঠামো: নীরব বিপদ: ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভবনের বয়স, নকশা, নির্মাণসামগ্রী, ভিত্তি, মাটির ধরন ও নির্মাণপ্রক্রিয়ায় ব্যাপক বৈচিত্র্য রয়েছে। কোথাও ভবন নির্মাণের সময় অনুমোদিত নকশা পরিবর্তন করা হয়েছে, কোথাও অতিরিক্ত তলা যুক্ত হয়েছে, আবার কোথাও ভবনের ব্যবহার পরিবর্তিত হয়েছে। ভূমিকম্পের সময় এসব অনিয়ম একসঙ্গে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। রাজউকের সাম্প্রতিক উদ্যোগের মধ্যেও তাই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্তকরণ, Rapid Visual Assessment এবং পর্যায়ক্রমে প্রকৌশলগত মূল্যায়নের কথা এসেছে। রাজউক চেয়ারম্যানও বলেছেন, ভবন ধসের ঝুঁকি শুধু ভবনের উচ্চতার ওপর নির্ভর করে না; নকশার ত্রুটি, মাটির অবস্থা এবং নির্মাণের অনিয়মও গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সুতরাং এখন প্রয়োজন শুধু নতুন ভবনকে নিরাপদ করা নয়; পুরোনো ও বিদ্যমান ভবনগুলোর ভূমিকম্প-সহনশীলতা যাচাই করা।
BNBC 2020 আছে, বাস্তবায়ন কতটা আছে? : বাংলাদেশের জাতীয় বিল্ডিং কোড, BNBC 2020, সরকারিভাবে গেজেটভুক্ত হয়েছে এবং Housing and Building Research Institute-এর ওয়েবসাইটে এর Part-1 ও Part-2 প্রকাশিত রয়েছে। কিন্তু একটি কোড থাকা এবং সেটি বাস্তবে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা, দুটি ভিন্ন বিষয়। ভবনের নকশা অনুমোদনের সময় কাঠামোগত নিরাপত্তা যাচাই, নির্মাণকালে মান নিয়ন্ত্রণ, মাটি পরীক্ষা, রড-কংক্রিটের মান, অনুমোদিত নকশা অনুসরণ এবং নির্মাণ শেষে ব্যবহার সনদ—প্রতিটি ধাপেই কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটির সরকারি তথ্যেও BNBC 2020-এর অধীনে ভবন নির্মাণসংক্রান্ত কারিগরি নকশা অনুমোদন ও বাস্তবায়নের জন্য নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কথা উল্লেখ রয়েছে। তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত, আইন আছে কি না, শুধু তা নয়; আইন মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর?
অপরিকল্পিত নগরায়ন ঝুঁকি বাড়াচ্ছে: ঢাকার ভূমিকম্প-ঝুঁকি শুধু ভবনের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। রাস্তা, খোলা জায়গা, জলাধার, বিদ্যুৎ ও গ্যাসলাইন, হাসপাতাল, ফায়ার স্টেশন, সেতু এবং জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা, সবকিছু মিলিয়েই একটি শহরের দুর্যোগ-সহনশীলতা তৈরি হয়। ভূমিকম্পের পর যদি সরু রাস্তার কারণে ফায়ার সার্ভিস বা উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারে, যদি ধসে পড়া ভবনের কারণে পাশের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, যদি বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করা যায় কিংবা হাসপাতালগুলো অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে না পারে, তাহলে একটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও বড় মানবিক সংকটে পরিণত হতে পারে। ঢাকার ক্ষেত্রে তাই ভূমিকম্প-সহনশীল নগর পরিকল্পনা এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়; এটি বর্তমানের প্রয়োজন।
‘ভেনিজুয়েলা’ থেকে শিক্ষা, আতঙ্ক নয়: ২০২৬ সালের ভেনিজুয়েলার ভূমিকম্পের ভয়াবহতা বিশ্বকে আবারও দেখিয়েছে, ভূমিকম্পের ক্ষতি কেবল ভূতাত্ত্বিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না; ভবনের দুর্বলতা, মাটির বৈশিষ্ট্য, নগর পরিকল্পনা ও নির্মাণমান ক্ষয়ক্ষতিকে বহুগুণ বাড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে সেখানে দুর্বল নির্মাণ, অনিরাপদ মাটি ও বিল্ডিং-কোড প্রয়োগের ঘাটতির বিষয় উঠে এসেছে। তবে বাংলাদেশকে ভেনিজুয়েলার সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না। দুই দেশের ভূতাত্ত্বিক, নগর ও সামাজিক বাস্তবতা ভিন্ন। বরং ওই দুর্যোগ থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো, দুর্যোগের পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর চেয়ে দুর্যোগের আগে ঝুঁকি কমানো অনেক বেশি কার্যকর।
এখন কী করা জরুরি? ; প্রথমত, ঢাকাকে কেন্দ্র করে একটি জাতীয় ভূমিকম্প ঝুঁকি হ্রাস কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। এর আওতায় ওয়ার্ডভিত্তিক ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজধানীর সব ভবন একসঙ্গে পরীক্ষা করার পরিবর্তে ঝুঁকির ভিত্তিতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যেতে পারে। হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মার্কেট, সরকারি ভবন, ফায়ার স্টেশন, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং জনসমাগমস্থল আগে পরীক্ষা করা জরুরি। তৃতীয়ত, পুরোনো ও সন্দেহজনক ভবনের জন্য Rapid Visual Assessment , Detailed Engineering Assessment , Retrofitting বা প্রয়োজন হলে পুনর্নির্মাণ, এই তিন ধাপের ব্যবস্থা করতে হবে। চতুর্থত, নতুন ভবনের ক্ষেত্রে BNBC 2020 বাস্তবায়নে শূন্য-সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করা দরকার। অনুমোদিত নকশা ছাড়া নির্মাণ, নকশাবহির্ভূত পরিবর্তন এবং নির্মাণমানের অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। পঞ্চমত, শুধু ভবন নয়, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, টেলিযোগাযোগ ও পরিবহন অবকাঠামোরও ভূমিকম্প-ঝুঁকি নিরূপণ করতে হবে। ষষ্ঠত, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস, হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত Earthquake Drill চালু করা প্রয়োজন। ভূমিকম্পের সময় কোথায় আশ্রয় নিতে হবে, কীভাবে বের হতে হবে, লিফট ব্যবহার না করা, গ্যাস-বিদ্যুৎ বন্ধ করা এবং আহত ব্যক্তিকে প্রাথমিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে প্রশিক্ষণ থাকা দরকার। সপ্তমত, ঢাকার প্রতিটি এলাকায় জরুরি সমাবেশস্থল বা Emergency Open Space চিহ্নিত করে তা সংরক্ষণ করতে হবে। ভূমিকম্পের পর খোলা জায়গা হবে মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ের অন্যতম প্রধান অবলম্বন। অষ্টমত, উদ্ধারকাজকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। ড্রোন, GIS, স্যাটেলাইট ডেটা, মোবাইল লোকেশন-ভিত্তিক জরুরি যোগাযোগ, AI-ভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন এবং ডিজিটাল কমান্ড সেন্টার ব্যবহার করে দুর্যোগ-পরবর্তী সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া সম্ভব। নবমত, জনগণের জন্য একটি সহজ ‘Earthquake Safety Card’ চালু করা যেতে পারে, যেখানে ভূমিকম্পের আগে, সময় এবং পরে কী করতে হবে তা বাংলা ভাষায় সংক্ষেপে থাকবে।
জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবেই দেখতে হবে: ভূমিকম্পকে শুধু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি জাতীয় অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, আবাসন, শিক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ঢাকায় একটি বড় ভূমিকম্প হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি বড় অংশ সাময়িকভাবে অচল হয়ে যেতে পারে। শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হবে, হাসপাতালের ওপর চাপ বাড়বে এবং পুনর্গঠনে বিপুল অর্থ প্রয়োজন হবে। তাই ভূমিকম্প প্রস্তুতি আসলে মানুষ বাঁচানোর পাশাপাশি অর্থনীতি রক্ষার কৌশল।
ঢাকা ঘিরে সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের ঘটনাগুলোকে আতঙ্ক ছড়ানোর কারণ হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং এগুলোকে প্রস্তুতির সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। কখন বড় ভূমিকম্প হবে, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। কিন্তু বড় ভূমিকম্পের ক্ষতি কতটা কমানো সম্ভব, সে সিদ্ধান্ত আজই নেওয়া যায়। আমাদের সামনে দুটি পথ, ভূমিকম্পের অপেক্ষা করা, অথবা ভূমিকম্পের আগেই প্রস্তুত হওয়া। নিরাপদ ভবন, কার্যকর বিল্ডিং কোড, পরিকল্পিত নগরায়ন, ঝুঁকিভিত্তিক ভবন পরীক্ষা, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা, এই ছয়টি স্তম্ভের ওপর ঢাকার ভূমিকম্প-সহনশীল ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হবে। ভূমিকম্প ঠেকানো আমাদের হাতে নেই। কিন্তু ভূমিকম্পকে জাতীয় বিপর্যয়ে পরিণত হতে না দেওয়া অনেকটাই আমাদের হাতে। এখনই সময়, ঢাকাকে শুধু বসবাসযোগ্য নয়, দুর্যোগ-সহনশীল নগরী হিসেবে গড়ে তোলার।
-লেখক:কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ