তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন: গত ১৮ই অক্টোবর মন্ত্রীপরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে যাচ্ছে সচিবালয়। এমন একটি খবরে প্রকৃতি প্রেমী, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এলামনাই, বর্তমান শিক্ষার্থী ও আশপাশের লোকজনের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে। একথা ঠিক যে, রাষ্ট্র পরিচালনার সুবিধার জন্য আধুনিক প্রশাসনিক অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই উন্নয়নের মূল্য কি দিতে হবে কৃষক ও কৃষির গবেষণা, শিক্ষার সম্ভাবনা, ঢাকার সবুজ পরিবেশ, আশপাশের হাসপাতালের রোগী এবং জাতীয় স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ভবিষ্যৎকে? তাই বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রী পরিষদকে আরেকবার বিবেচনা করার আকুল আবেদন করছে এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই।
গণতান্ত্রিক বর্তমান সরকার কৃষি ও পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়ে ইতিমধ্যে নানান পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগ, খাল খনন কর্মসূচি, কৃষক কার্ড ইত্যাদি নানা উদ্যোগের মাধ্যমে প্রাণ প্রকৃতিকে ঠিক রাখার কার্যক্রম চলমান। এছাড়া প্রিয় ঢাকাকে জানজটমুক্ত ও পরিষ্কার রাখার নানান উদ্যোগও সরকার ইতিমধ্যে গ্রহণ করছে। এর বাহিরেও হকারমুক্ত করে রাস্তায় স¦াভাবিক চলাচল, হাসপাতালের পরিবেশ উন্নয়ন, বিভিন্ন আবাসিক এলাকার পরিবেশ উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর মানবিক ও সামাজিক এসব নানান উদ্যোগ এখন প্রশংসায় ভাসছে। গণতান্ত্রিক সরকার দেশের আপামর জনগণের সার্বিক মান উন্নয়নে কাজ করবে এটাই স্বাভাবিক। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক সরকার কি শুধু প্রশাাসনিক প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেবে, নাকি খাদ্যনিরাপত্তা, ঢাকাবাসীর নির্মল পরিবেশ, কৃষি ও গবেষণার দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থকেও সমান গুরুত্ব দেবে?
একটি সচিবালয় রাষ্ট্র পরিচালনা করে। আর কৃষি গবেষণা রাষ্ট্রের খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনকে নিরাপদ করতে ভূমিকা রাখে। এই দুইয়ের গুরুত্ব আলাদা, কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে উভয়ই প্রয়োজনীয়। তাই প্রশাসনিক অবকাঠামো নির্মাণের জন্য এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবেনা, যা ঢাকার সামগ্রিক পরিবেশ, কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে। রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি কৃষির ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানকার শিক্ষার্থীরা দক্ষ কৃষিবিদ, গবেষক, শিক্ষক, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারক হিসেবে দেশের কৃষি উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। তাঁদের গবেষণার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের উৎপাদন, নিরাপদ খাদ্য, মাটির স্বাস্থ্য, পানির গুণমান, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং দেশের খাদ্যব্যবস্থার স্থায়িত্ব।
আবার কেউ যদি মনে করে থাকে ঢাকা শহরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েরই বা দরকার কি? তাদের জন্য বলে রাখা ভাল রাজধানীর বুকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থাকার বিশেষ তাৎপর্য হলো এখানে কৃষি গবেষণার সঙ্গে জাতীয় নীতিনির্ধারণ, প্রশাসন, বিজ্ঞানী সমাজ এবং জনস্বার্থের মধ্যে সংযোগ গড়ে তোলা। সারা পৃথিবীর উন্নত বেশির ভাগ দেশেই কৃষি ও কৃষককে সহজে কানেক্ট করার জন্য রয়েছে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। যেমনটি রয়েছে ভারতে, চীন, জাপান, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে। এছাড়া এ প্রতিষ্ঠানটি ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত। যার রয়েছে এদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সম্ভবনার সাথে নিবিঢ় সম্পর্ক। আর এটিকে অনুধাবন করেই শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক নিজ হাতে এ প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করে পূর্ব বাংলার কৃষি ও শিল্পে আমূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।
এছাড়া রাজধানীর বুকে এ প্রতিষ্ঠানের দক্ষিন পাশে যদি খোলামেলা বর্তমান এ জায়গাটি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এর মাঠ গবেষণা আর অন্যদিকে জিয়া উদ্যানের নির্মল পরিবেশ। যেই নির্মল পরিবেশে শুয়ে আছেন মরহূম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়া। উনারা একদিকে যেমন প্রধানমন্ত্রীর বাবা-মা, অন্যদিকে কোটি কোটি মানুষের আবেগ ও ভালবাসা । তাই সবার কথা আরেকটিবার ভাবুন প্রিয় প্রধানমন্ত্রী! বরং আমরা বলি পুরাতন এ বাণিজ্য মেলার মাঠটিকে কৃষি গবেষণার জন্য ছেড়ে দিলে একদিকে সবুজ ও নির্মল বাতাস আর অন্যদিকে পাখির কলকাকলীতে মুখরিত ও ফুলেল সুভাসে জিয়া উদ্যান হয়ে উঠবে দর্শনার্র্থীদের একটি অন্যতম ভাল লাগার ও নি:শ্বাস ফেলার সৌন্দর্য্যমন্ডিত একটি অনন্য জায়গা। আর সেই সাথে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণার মাঠ পরিধিও বাড়বে।
এ অবস্থায় বাণিজ্য মেলার মাঠের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আগে কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন, পরিবেশগত প্রভাব, জানজটের প্রভাব এবং বিকল্প ভূমি ব্যবহারের সম্ভাবনা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। ওই মাঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব কি না, কিংবা সেখানে কৃষি গবেষণা, পরিবেশ শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা যায় কি না -তা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে যাচাই করা যেতে পারে।
ঢাকার শেরেবাংলা নগর এলাকা বাংলাদেশের ইতিহাস, রাষ্ট্রীয় স্থাপত্য ও রাজনৈতিক স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। জাতীয় সংসদ ভবন আধুনিক স্থাপত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এর বিস্তৃত প্রাঙ্গণ, জলাধার, সবুজ পরিবেশ এবং স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য রাজধানীর সৌন্দর্য ও পরিচয়ের অংশ। এছাড়া জিয়া উদ্যানও বহু মানুষের কাছে স্মৃতি ও আবেগের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এগুলোর ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ ব্যবহারের সিদ্ধান্তে ইতিহাস, জনস্বার্থ, আইন ও নগর পরিকল্পনার নীতিকে গুরুত্ব দিতে হয়। বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থাপনের কোনো পরিকল্পনা যদি সংসদ ভবনের পরিবেশগত ভারসাম্য, এলাকার উন্মুক্ত পরিসর, ঐতিহাসিক স্থাপনার সৌন্দর্য কিংবা ভবিষ্যৎ জনপরিসরের ওপর প্রভাব ফেলে, তবে সেই প্রভাব সম্পর্কে আগে থেকেই স্বচ্ছ মূল্যায়ন আরো গভীরে হওয়া প্রয়োজন।
এখানে একটি গণতান্ত্রিক উদ্বেগও বিবেচনার দাবি রাখে। আগামী দিনে ভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসলে একই যুক্তিতে কোনো ঐতিহাসিক বা স্মৃতিবিজড়িত স্থান পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয় কি না এমন প্রশ্নও মানুষের মনে দেখা দিতে পারে। এটি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো পূর্বাভাস নয়, বরং এটি একটি নীতিগত উদ্বেগ: রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত যদি সুস্পষ্ট সংরক্ষণনীতি, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং জনসম্মতির পরিবর্তে কেবল ক্ষমতার বিবেচনায় পরিচালিত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ও ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
এছাড়া ঢাকা ইতোমধ্যে জনসংখ্যার চাপ, যানজট, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা এবং উন্মুক্ত জায়গার সংকটে ভুগছে। এমন বাস্তবতায় শহরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ উন্মুক্ত এলাকার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত বিবেচনায় করা প্রয়োজন। সব খালি জমি ভবন নির্মাণের জন্য অপেক্ষমাণ এমন ধারণা হলে আগামীদিনে আর খালি কোন জায়গাই অবশিষ্ট থাকবেনা। কিছু জায়গা জলাধার, সবুজ পরিসর, জনসমাগম, পরিবেশগত ভারসাম্য কিংবা ভবিষ্যৎ নাগরিক প্রয়োজনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আবার কিছু জায়গায় পরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ জনস্বার্থে প্রয়োজনীয়ও হতে পারে। কোন ক্ষেত্রে কোন সিদ্ধান্ত যথার্থ, তা নির্ধারণ করতে হবে তথ্য, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, যানবাহন চলাচলের বিশ্লেষণ এবং বিকল্প স্থানের তুলনামূলক সমীক্ষার ভিত্তিতে। সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক স্থাপনার জন্য এমন স্থান নির্বাচন করা প্রয়াজন, যেখানে পর্যাপ্ত যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ স¤প্রসারণের সুযোগ থাকবে; একই সঙ্গে আশপাশের মানুষের জীবনযাত্রা, পরিবেশ এবং ঐতিহাসিক স্থাপনার ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি হবে না। বাণিজ্য মেলার মাঠের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আগে তাই প্রশ্ন করা প্রয়োজন অন্য কোনো উপযুক্ত স্থান কি রয়েছে? যানজট ও পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব কী? কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার স্বার্থে বিকল্প কোনো জনকল্যাণমূলক ব্যবহার সম্ভব কি না? এবং দীর্ঘমেয়াদে কোন বিকল্পটি রাষ্ট্রের জন্য সর্বাধিক সুফল বয়ে আনবে?
তাই শ্রদ্ধেয় প্রধাানমন্ত্রী, বাণিজ্য মেলার মাঠের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরেকবার ভাবুন। এমন একটি সিদ্ধান্ত নিন, যা কেবল আজকের প্রশাসনিক প্রয়োজন নয়, আগামী দিনের কৃষক, গবেষক, শিক্ষার্থী, নগরবাসী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকেও সমান মর্যাদা দিবে। এবং একটিকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যগুলোর সম্ভাবনাও অকারণে সংকুচিত হবেনা।
লেখক- প্রাণ প্রকৃতি লেখক ও কৃষি গবেষক