ড. মোহাম্মদ এরশাদুল হক: বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, জ্বালানি সংকট, খাদ্যনিরাপত্তা এবং দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে কৃষি ও জ্বালানি খাতকে একই সঙ্গে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। একদিকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো প্রয়োজন, অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া জরুরি। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কৃষি উভয় ক্ষেত্রেই কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং শক্তির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন আর শুধু ভবিষ্যতের লক্ষ্য নয়; এটি বর্তমান সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও বৈশ্বিক প্রয়োজন। আইপিসিসি (IPCC)-এর সিক্সথ অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট (Sixth Assessment Report)-এও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সীমিত রাখার জন্য এনার্জি সিস্টেম এর দ্রুত ডিকার্বোনাইজেশন (decarbonization) এবং সোলার ও অন্যান্য লো-কার্বন রিনিউয়েবল এনার্জি এর সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে কৃষি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে একই ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসার প্রযুক্তিগুলো আগামী দিনের টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও কৃষিনির্ভর দেশের জন্য এই চ্যালেঞ্জ আরও জটিল। দেশের কৃষিজমি সীমিত এবং ক্রমাগত নগরায়ন, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে কৃষিজমির ওপর চাপ বাড়ছে। একই সময়ে কৃষির আধুনিকীকরণ ও যান্ত্রিকীকরণের ফলে সেচ, জমি প্রস্তুতি, রোপণ, আগাছা দমন, ফসল সংগ্রহ, শুকানো ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিদ্যুতের ও জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে এমন একটি প্রযুক্তি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে একই জমি থেকে খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করা এবং সেই বিদ্যুৎ আবার কৃষি উৎপাদন ও কৃষিযান্ত্রিকীকরণে ব্যবহার করা যাবে। এই প্রেক্ষাপটে এগ্রিভোল্টাইক (Agrivoltaic) প্রযুক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ধারণা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এগ্রিভোল্টাইক শব্দটি এগ্রিকালচার (Agriculture) এবং ফটোভোল্টাইকস (Photovoltaics)-এর সমন্বয়ে গঠিত। এ পদ্ধতিতে কৃষিজমিতে এমনভাবে ফটোভোল্টাইক (photovoltaic) বা সোলার প্যানেল (solar panel) স্থাপন করা হয়, যাতে একই জমিতে ফসল উৎপাদন এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন উভয়ই সম্ভব হয়। অর্থাৎ জমিটি শুধু সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয় না এবং শুধু কৃষিকাজেও সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং একই ল্যান্ড রিসোর্স থেকে খাদ্য ও বিদ্যুৎ- দুটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন পাওয়া যায়। এ কারণে এগ্রিভোল্টাইকসকে ল্যান্ড-ইউজ এফিসিয়েন্সি বৃদ্ধির একটি সমন্বিত প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কৃষি সেচ, কৃষিযন্ত্র, ফসল শুকানো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড স্টোরেজ, ডেইরি ও পোল্ট্রি ফার্ম এবং বিভিন্ন স্মার্ট ফার্মিং ইকুইপমেন্ট (smart farming equipment) পরিচালনায় ব্যবহার করা সম্ভব। একই সঙ্গে প্যানেলের আংশিক ছায়া কিছু ফসলের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও পানি বাষ্পীভবন কমাতে এবং মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে অতিরিক্ত ছায়া অনেক ফসলের ফলন কমিয়ে দিতে পারে। তাই এগ্রিভোল্টাইকের সফলতা মূলত প্যানেল হাইট (panel height), স্পেসিং (spacing), ওরিয়েন্টেশন (orientation), শেডিং লেভেল (shading level), ক্রপ সিলেকশন (crop selection) এবং ফার্ম ম্যানেজমেন্ট (farm management)-এর সঠিক সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করে।
বাংলাদেশের জন্য এগ্রিভোল্টাইকের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, কারণ এখানে একই জমির বহুমুখী ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত সোলার প্লান্টের ক্ষেত্রে জমির প্রধান ব্যবহার হয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে; অন্যদিকে এগ্রিভোল্টাইক ব্যবস্থায় কৃষি উৎপাদন বজায় রেখে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। ফলে খাদ্যনিরাপত্তা ও রিনেউয়েবল এনার্জি সিকিউরিটি (renewable energy security)- দুইটি লক্ষ্যকে একই ল্যান্ড রিসোর্সের মাধ্যমে সমন্বয় করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ কারণে এগ্রিভোল্টাইকসকে শুধু সোলার টেকনোলজি (solar technology) হিসেবে না দেখে ফুড-এনার্জি-ওয়াটার নেক্সাস (food-energy-water nexus)-এর একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা অধিক যৌক্তিক।
বাংলাদেশে সৌরশক্তি ও কৃষির সমন্বিত ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ ও গবেষণা হয়েছে। তবে এই ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফার্ম মেশিনারি অ্যান্ড পোস্টহারভেস্ট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং (FMPE) বিভাগ গত প্রায় ২৫ বছর এরও বেশি সময় ধরে সোলার প্যানেল-ভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কৃষি কাজে এবং বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র পরিচালনার জন্য ব্যবহারের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষা-পরীক্ষা করে আসছে। ফলে বাংলাদেশে এগ্রিভোল্টাইকের নতুন গবেষণা করার ক্ষেত্রে এফএমপিই ডিভিশনের কাছে সৌরশক্তি, কৃষিযন্ত্র এবং ফার্ম-লেভেল এনার্জি ইউটিলাইজেশন সম্পর্কে একটি দীর্ঘদিনের গবেষণা অভিজ্ঞতা রয়েছে। এগ্রিভোল্টাইকস তাই এফএমপিই ডিভিশনের জন্য সম্পূর্ণ নতুন ও বিচ্ছিন্ন কোনো গবেষণা ক্ষেত্র নয়; বরং সৌরশক্তি ও কৃষিযান্ত্রিকীকরণ নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণাকে আরও সমন্বিত ও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার একটি স্বাভাবিক সম্প্রসারণ।
এগ্রিভোল্টাইক ব্যবস্থায় কোন ফসল সবচেয়ে বেশি লাভজনক হবে, তা সরাসরি একটি নির্দিষ্ট ফসলের নাম দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। ফসলের আলো চাহিদা, ছায়া সহনশীলতা, মৌসুম, জাত, প্যানেল কনফিগারেশন (panel configuration) এবং স্থানীয় আবহাওযার ওপর ফলাফল নির্ভর করবে। তবে বিভিন্ন ধরনের লিফি ভেজিটেবলস (leafy vegetables), উচ্চমূল্যের সবজি, মসলা (যেমন হলুদ, আদা ইত্যাদি), কিছু ডাল এবং হর্টিকালচারাল ক্রপস (horticultural crops) পরীক্ষার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন ফসল বিভিন্ন শেডিং লেভেলের অধীনে পরীক্ষা করা করে সুনির্দিষ্ট প্রযুক্তি প্রস্তাবনা তৈরি করতে হবে। অন্যদিকে ধান ও ভুট্টার মতো অধিক সূর্যালোকনির্ভর ফসলের ক্ষেত্রে প্যানেলের ডেনসিটি (density) ও শেডিং কেয়ারফুলি অপটিমাইজ (carefully optimize) করা প্রয়োজন। তাই বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা লক্ষ্য হওয়া উচিত- কোন ক্রপ কম্বিনেশনে (crop combination) একই সঙ্গে সর্বোচ্চ ফসলের ফলন (crop yield) এবং সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন (electricity generation) পাওয়া যায় তা নির্ধারণ করা।
এগ্রিভোল্টাইক সিস্টেম (Agrivoltaic system)-এর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাগুলোর একটি হলো উৎপাদিত বিদ্যুৎকে সরাসরি কৃষি ও খামারের কাজে ব্যবহার করা। সোলার পিভি (Solar PV) থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ হাইব্রিড/গ্রিড-ইন্টারঅ্যাক্টিভ ইনভার্টার (hybrid/grid-interactive inverter)-এর মাধ্যমে ফার্মের বিভিন্ন ইলেকট্রিক্যাল লোডে (electrical load) সরবরাহ করা যেতে পারে। সেচ পাম্প, ইলেকট্রিক পাওযার টিলার, স্প্রেয়ার, উইডার, থ্রেশার, ড্রায়ার, ক্রপ-প্রসেসিং মেশিনারি, কোল্ড স্টোরেজ, রেফ্রিজারেশন, ডেইরি ফার্মের মিল্কিং মেশিন, মিল্ক চিলার, ওয়াটার পাম্প, ভেন্টিলেশন সিস্টেম এবং পোল্ট্রি ফার্মের লাইটিং ও ফিডিং ইকুইপমেন্ট- এসব কাজে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা সম্ভব। একই সঙ্গে ইউএভি (UAV) বা ড্রোনের (drone) ব্যাটারি চার্জিং, অটোমেটিক ওয়েদার স্টেশন, সয়েল-ময়েশ্চার সেন্সর, আইওটি গেটওয়ে (IoT gateway), রিমোট পাম্প কন্ট্রোলার এবং অন্যান্য প্রিসিশন এগ্রিকালচার ইকুইপমেন্ট পরিচালনায়ও এই বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যেতে পারে।
এই ব্যবস্থাকে ব্যাটারি স্টোরেজ এর সঙ্গে যুক্ত করা হলে এর কার্যকারিতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। দিনের বেলায় সোলার ইলেকট্রিসিটি দিয়ে সরাসরি কৃষি ও ফার্ম লোড চালানো যাবে এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করা যাবে। সন্ধ্যা বা রাতে প্রয়োজন অনুযায়ী সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করা সম্ভব হবে। আবার ব্যাটারি এবং ফার্ম লোড পূরণের পরও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ থাকলে অনুমোদিত গ্রিড-কানেক্টেড সিস্টেম এর মাধ্যমে ডিস্ট্রিবিউশন গ্রিডে সরবরাহ করা যেতে পারে। ফলে একটি এগ্রিভোল্টাইক ফার্ম একই সঙ্গে ফুড প্রডিউসার, রিনেউয়েবল-এনার্জি প্রডিউসার এবং ইলেকট্রিসিটি প্রোসিউমার (electricity prosumer) হিসেবে কাজ করতে পারবে।
বাংলাদেশের বর্তমান নেট মিটারিং গাইডলাইন–২০২৫ (Net Metering Guideline–2025) এই ধারণাকে আরও বাস্তবসম্মত করেছে। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে রিনেউয়েবল ইলেকট্রিসিটি সিস্টেম (renewable electricity system)-এর উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রথমে নিজস্ব ব্যবহারে এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করে ক্রেডিট (credit) পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে এগ্রিভোল্টাইক সিস্টেমের অর্থনৈতিক মূল্যায়নে শুধু সোলার ইলেকট্রিসিটি বিক্রির সম্ভাবনা নয়, নিজের বিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে ইলেকট্রিসিটি বিল সাশ্রয় এবং ডিজেল বা অন্যান্য ফসিল ফুয়েল এর ব্যবহার কমানোর সুবিধাও অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তবে নেট মিটারিংয়ের ক্ষেত্রে গ্রিড কানেকশন, অ্যাপ্রুভড ইনভার্টার, ক্যাপাসিটি লিমিট, অ্যাপ্লিকেবল ট্যারিফ এবং সেটেলমেন্ট মেকানিজম বর্তমান সরকারি নির্দেশিকা ও সংশ্লিষ্ট ইউটিলিটির (utility) নিয়ম অনুযায়ী বিবেচনা করতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে এগ্রিভোল্টাইকস শুধু একটি প্রযুক্তি নয়; এটি একটি সম্ভাবনাময় বিজনেস মডেল (business model) হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। একটি এগ্রিভোল্টাইক প্রজেক্ট (Agrivoltaic project)-এর অর্থনৈতিক সুবিধা নির্ধারণের সময় শুধু বিদ্যুৎ বিক্রির আয় হিসাব করলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না বরং ফসল থেকে আয়, নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে সাশ্রয়, ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি সাশ্রয়, গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের মূল্য এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে রিনেউয়েবল এনার্জি ব্যবহারের সুবিধা- সবকিছু একত্রে বিবেচনা করতে হবে। অন্যদিকে ক্যাপিটাল কস্ট, স্ট্রাকচার কস্ট, সোলার প্যানেল ও ইনভার্টারের মূল্য, ব্যাটারি কস্ট, মেইনটেইন্যান্স, ডিগ্রেডেশন এবং ফাইন্যান্সিং কস্ট হিসাব করতে হবে। এভাবে ক্রপ ইনকাম + এনার্জি সেভিং + গ্রিড-এক্সপোর্ট ভ্যালু − টোটাল সিস্টেম কস্ট (crop income + energy saving + grid-export value − total system cost) ভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ টেকনো-ইকোনমিক মডেল (techno-economic model) তৈরি করা সম্ভব।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে ডিজেলচালিত সেচপাম্প ও কৃত্রিম জ্বালানিচালিত কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার হ্রাস পাওয়ায় খামার পর্যায়ে সরাসরি কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO2) ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে যায়। এই পরিমাপযোগ্য কার্বন নিঃসরণ হ্রাসকরণ (Carbon Abatement/Offset)-কে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত প্ল্যাটফর্ম থেকে ‘কার্বন ক্রেডিট’ হিসেবে প্রত্যায়িত (Certified) করানো সম্ভব। সংগৃহীত এই কার্বন ক্রেডিট আন্তর্জাতিক ভলান্টারি কার্বন মার্কেট (Voluntary Carbon Market - VCM) কিংবা প্যারিস চুক্তির ‘আর্টিকেল ৬’ (Article 6 Framework)-এর আওতায় বিক্রি করে এগ্রিভোল্টাইক প্রজেক্টের জন্য একটি স্থায়ী অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ (Additional Revenue Stream) তৈরি করা যায়। এই অতিরিক্ত কার্বন আয়ের সুবিধা এগ্রিভোল্টাইক প্রজেক্টের পে-ব্যাক পিরিয়ড (Payback Period) আরও কমিয়ে আনবে এবং বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করবে।
এখানে সরকারের নীতিগত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌরবিদ্যুৎ ও এগ্রিভোল্টাইক প্রযুক্তিতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য একটি স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি ট্যারিফ এবং ইনসেনটিভ ফ্রেমওয়ার্ক প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীকে জানতে হবে তার উৎপাদিত বিদ্যুতের মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে, গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে কী ধরনের সেটেলমেন্ট হবে এবং আগামী কয়েক বছর নীতিমালা কতটা স্থিতিশীল থাকবে। বিভিন্ন শ্রেণির ব্যবহারকারী- যেমন কৃষি সেচ, অ্যাগ্রো-প্রসেসিং (agro-processing), ডেইরি, পোল্ট্রি, কমার্শিয়াল ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল কনজিউমার এর লোড প্রোফাইল আলাদা হওয়ায় তাদের জন্য উপযোগী ট্যারিফ ও ইনসেনটিভ স্ট্রাকচার বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে গ্রিন ফাইন্যান্সিং (green financing), কনসেশনাল লোন, ট্যাক্স ইনসেনটিভ (tax incentive), অ্যাক্সিলারেটেড ডেপ্রিসিয়েশন এবং সহজ গ্রিড কানেকশনের মতো ব্যবস্থা রিনেউয়েবল-এনার্জি ইনভেস্টমেন্ট এর ঝুঁকি কমাতে পারে।
সৌরবিদ্যুতের দ্রুত সম্প্রসারণের জন্য একদিকে বিদেশ থেকে মানসম্মত সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও অন্যান্য ইকুইপমেন্ট আমদানির পথ সহজ রাখা প্রয়োজন; অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে দেশে এসব প্রযুক্তির গবেষণা, অ্যাসেম্বলি (assembly), টেস্টিং, ম্যানুফ্যাকচারিং ও কমার্শিয়ালাইজেশন এর সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে ধীরে ধীরে একটি ইমপোর্ট–রিসার্চ–লোকাল ম্যানুফ্যাকচারিং–ইনোভেশন–কমার্শিয়ালাইজেশন ইকোসিস্টেম তৈরি করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা, প্রাইভেট সেক্টর, স্টার্টআপ (startup) এবং ইন্ডিভিজুয়াল ইনোভেটরসকে সৌরশক্তির নতুন ব্যবহার উদ্ভাবনে উৎসাহিত করার জন্য আর্থিক ও নৈতিক পুরস্কারের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। যারা সোলার-পাওয়ার্ড ইরিগেশন, ইলেকট্রিক অ্যাগ্রিকালচারাল মেশিনারি, সোলার ড্রায়ার, সোলার কোল্ড স্টোরেজ, এগ্রিভোল্টাইক সিস্টেম, স্মার্ট ইনভার্টার (smart inverter), ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম কিংবা সোলার-পাওয়ার্ড ডেইরি ও পোল্ট্রি ইকুইপমেন্ট উদ্ভাবন ও কমার্শিয়ালাইজ করবে, তাদের জন্য কম্পিটিটিভ রিসার্চ গ্র্যান্ট, ইনোভেশন ফান্ড, টেকনোলজি-ট্রান্সফার অ্যাসিস্ট্যান্স এবং জাতীয় পুরস্কারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ধরনের প্রণোদনা বাংলাদেশে সোলার টেকনোলজিকে শুধু আমদানিনির্ভর একটি পণ্য হিসেবে না দেখে একটি নলেজ-বেজড ইনোভেশন সেক্টর (knowledge-based innovation sector) হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই বিনিয়োগের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় সরাসরি জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়াতে হয় না এবং রিনেউয়েবল ইলেকট্রিসিটি কৃষি ও অন্যান্য খাতে ফসিল ফুয়েল কনজাম্পশন কমাতে সহায়তা করতে পারে। কৃষিতে সোলার-পাওয়ার্ড ইরিগেশন ও ইলেকট্রিক মেশিনারি ব্যবহারের মাধ্যমে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে এগ্রিভোল্টাইক সিস্টেমের মাধ্যমে একই ল্যান্ড রিসোর্স থেকে ফুড ও এনার্জি উৎপাদন করা গেলে ল্যান্ড-ইউজ এফিসিয়েন্সি বাড়ানো যায। তবে রিনেউয়েবল এনার্জি এক্সপ্যানশন এর পাশাপাশি এনার্জি স্টোরেজ, গ্রিড মডার্নাইজেশন, এফিসিয়েন্ট ট্রান্সমিশন, ডিমান্ড ম্যানেজমেন্ট এবং অ্যাপ্রোপ্রিয়েট টেকনোলজি ইন্টিগ্রেশন-এর বিষয়গুলোও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য তাই ভবিষ্যৎ এগ্রিভোল্টাইক গবেষণাকে শুধু প্যানেলের নিচে ফসল চাষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বরং এগ্রিভোল্টাইকস + স্মার্ট ইরিগেশন + ইলেকট্রিক অ্যাগ্রিকালচারাল মেশিনারি + ব্যাটারি স্টোরেজ + আইওটি (IoT) + ইউএভি + নেট মিটারিং- এই সমন্বিত মডেল নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বারির (BARI) এফএমপিই ডিভিশন একটি গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতে পারে। দীর্ঘদিনের সোলার-পাওয়ার্ড অ্যাগ্রিকালচারাল মেশিনারি রিসার্চের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান কনজারভেশন এগ্রিকালচার পার্ক (Conservation Agriculture Park)-এর অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে একটি স্মার্ট এগ্রিভোল্টাইক রিসার্চ অ্যান্ড ডেমোনেস্ট্রেশন পার্ক (Smart Agrivoltaic Research and Demonstration Park) প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বিভিন্ন প্যানেল হাইট, স্পেসিং ও শেডিং লেভেলের অধীনে বিভিন্ন ফসল, কৃষিযন্ত্র, ইরিগেশন সিস্টেম (irrigation system) এবং এনার্জি ম্যানেজমেন্ট স্ট্র্যাটেজি (energy management strategy) বিষয়ে পরীক্ষা করার কাজ শুরু হয়েছে।
সোলার প্যানেল স্থাপন করে তার নিচে বা মধ্যবর্তী স্থানে বিভিন্ন ফসলের চাষ, স্মার্ট ইরিগেশন, সেন্সর-বেজড পাম্প অপারেশন, ইউএভি-বেজড ক্রপ মনিটরিং (UAV-based crop monitoring) এবং ইলেকট্রিক অ্যাগ্রিকালচারাল মেশিনারির ব্যবহার একসঙ্গে পরীক্ষা করা হবে। একই সঙ্গে সয়েল ময়েশ্চার, সয়েল টেম্পারেচার, সোলার রেডিয়েশন, এয়ার টেম্পারেচার, রিলেটিভ হিউমিডিটি, ক্রপ গ্রোথ (crop growth), ওয়াটার রিকোয়ারমেন্ট এবং ইলেকট্রিসিটি জেনারেশনের তথ্য সংগ্রহ করে একটি পূর্ণাঙ্গ ডাটা-ড্রিভেন এগ্রিভোল্টাইক ফার্মিং মডেল (data-driven Agrivoltaic farming model) তৈরি করা হবে। এ ধরনের গবেষণা বাংলাদেশে ক্লাইমেট-স্মার্ট এগ্রিকালচার এবং স্মার্ট মেকানাইজেশন এর জন্য একটি নতুন গবেষণা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে।
এখান থেকে প্রাপ্ত তথ্য পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন অ্যাগ্রো-ইকোলজিক্যাল জোনে (agro-ecological zone) সম্প্রসারিত করা যাবে। জিআইএস (GIS) ও রিমোট সেন্সিং (remote sensing)-এর মাধ্যমে এগ্রিভোল্টাইক সুইটেবিলিটি ম্যাপ (Agrivoltaic suitability map) তৈরি করে কোন এলাকায় কোন ধরনের এগ্রিভোল্টাইক সিস্টেম স্থাপন করা উপযোগী তা নির্ধারণ করা যাবে। একই সঙ্গে ক্রপ ইল্ড, ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন, ওয়াটার সেভিং, এনার্জি সেভিং, কার্বন রিডাকশন এবং ইকোনমিক রিটার্ন -এর দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংগ্রহ করে বাংলাদেশের জন্য একটি ন্যাশনাল এগ্রিভোল্টাইক গাইডলাইন তৈরি করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে গবেষণার ফলাফলকে কৃষকের মাঠ, প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট এবং জাতীয় রিনেউয়েবল-এনার্জি প্ল্যানিং-এর সঙ্গে যুক্ত করা যাবে।
সবশেষে বলা যায়, এগ্রিভোল্টাইকস বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি নয়; এটি কৃষি, জ্বালানি, পরিবেশ, কৃষিযান্ত্রিকীকরণ ও অর্থনীতিকে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার একটি নতুন সুযোগ। জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মতো সীমিত ভূমি ও ক্রমবর্ধমান খাদ্য ও জ্বালানি চাহিদার দেশের জন্য একই জমি থেকে খাদ্য ও নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনের ধারণা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যদি সৌর প্যানেলকে কৃষি উৎপাদন, কৃষিযন্ত্র, সেচ, ডেইরি ও পোল্ট্রি, অ্যাগ্রো-প্রসেসিং, ব্যাটারি স্টোরেজ এবং ন্যাশনাল গ্রিড এর সঙ্গে সঠিকভাবে সমন্বয় করা যায়, তাহলে একটি কৃষিজমি শুধু খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়- একই সঙ্গে একটি রিনিউয়েবল এনার্জি প্রোডাকশন হাব হিসেবেও কাজ করতে পারে।
এই পরিবর্তনের পথে বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত—“ফুড ফার্স্ট, এনার্জি টুগেদার, টেকনোলজি থ্রু ইনোভেশন” (Food first, energy together, technology through innovation)। অর্থাৎ খাদ্য উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিয়ে একই জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা, কৃষির সঙ্গে নবায়নযোগ্য শক্তিকে সমন্বিত করা এবং দেশীয় গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে প্রযুক্তিকে ক্রমাগত উন্নত করা। এভাবেই এগ্রিভোল্টাইকস ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ক্লাইমেট-স্মার্ট, এনার্জি-এফিসিয়েন্ট, মেকানাইজড অ্যান্ড ইকোনমিক্যালি সাসটেইনেবল এগ্রিকালচার গড়ে তোলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে পরিণত হতে পারে।
তথ্যসূত্র:
১. আইপিসিসি (IPCC). ক্লাইমেট চেঞ্জ ২০২২: মিটিগেশন অব ক্লাইমেট চেঞ্জ, ওয়ার্কিং গ্রুপ ৩, চ্যাপ্টার ৬: এনার্জি সিস্টেমস।
২. স্রেডা (SREDA). নেট মিটারিং গাইডলাইন–২০২৫।
৩. স্রেডা (SREDA). রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যান্ড নেট মিটারিং রিলেটেড পলিসি অ্যান্ড প্রোগ্রাম ডকুমেন্টস।
৪. বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI), ফার্ম মেশিনারি অ্যান্ড পোস্টহারভেস্ট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং (FMPE) ডিভিশন-এর সৌরশক্তি ও কৃষিযন্ত্র পরিচালনা বিষয়ক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম।
-লেখক: মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, এফ এম পি ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর