ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি:মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি, মাছের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পানির গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক পুকুর ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় প্রশিক্ষণ সেমিনার ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
Advance Agrotech Bangladesh-এর উদ্যোগ ও সার্বিক সহযোগিতায় ১৯ সেপ্টেম্বর (শনিবার) আয়োজিত এ সেমিনারে স্থানীয় মৎস্যচাষি, হ্যাচারি মালিক, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশ নেন। প্রায় ১০০ জন মৎস্যচাষি ও মৎস্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতিতে আধুনিক, বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশবান্ধব মাছ চাষের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
সেমিনারে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির কৌশল, পুকুর প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা, পানির গুণগত মান, রোগ প্রতিরোধ, পরজীবী নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার সহ মাছ চাষের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যানন্দ স্কুল, ফুলবাড়িয়ার সহকারী শিক্ষক আবু বকর সিদ্দিক। প্রধান অতিথি ছিলেন ছনকান্দা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিদারুল ইসলাম বাদশা।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামালপুর সদর থানার এসআই শহিদুল আলম, রাধা কানাই উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আকরাম হোসেন, পূর্ববাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইব্রাহিম খলিল এবং ফুলবাড়িয়া থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাকির হোসেন খান বাপ্পি।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন Advance Agrotech Bangladesh-এর Head of Technical & Sales, ময়মনসিংহ রিজিয়নের Regional Sales & Technical Manager, Senior Sales & Technical Officer, প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় একক ডিলার মো. আবুল খায়ের সহ মৎস্য চাষি, হ্যাচারি মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
সেমিনারে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন Advance Agrotech Bangladesh-এর Head of Sales & Technical কৃষিবিদ রেজাউল হক।
তিনি বলেন, মাছ চাষে রোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে শুধু অ্যান্টিবায়োটিক, পরজীবিনাশক, জীবাণুনাশক কিংবা বিভিন্ন রাসায়নিকের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে রোগ প্রতিরোধ ও মাছের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
মাছ উৎপাদনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিক মাত্রা, প্রয়োজনীয়তা এবং নির্ধারিত সময় মেনে চলার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি অ্যান্টিবায়োটিকের রেসিডিউ ইফেক্ট বা অবশিষ্টাংশের ঝুঁকি সম্পর্কেও চাষিদের সচেতন করেন।
কৃষিবিদ রেজাউল হক বলেন, নিরাপদ ও টেকসই মাছ উৎপাদনের জন্য পানির গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, পুকুরের সঠিক ব্যবস্থাপনা, রোগ প্রতিরোধ এবং মাছের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সমন্বিতভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ও রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি মাছ চাষে প্রোবায়োটিক ও ফাইটোজেনিক পণ্য ব্যবহারের বিভিন্ন দিক নিয়েও আলোচনা করেন।
সেমিনারে সহকারী বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন Advance Agrotech Bangladesh-এর ময়মনসিংহ রিজিয়নের Technical & Sales Manager রাহুল রায়।
তিনি মাছ চাষিদের প্রতিদিনের বিভিন্ন সমস্যার বাস্তব কারণ ও সম্ভাব্য সমাধান তুলে ধরেন। বিশেষ করে পানির গুণগত মানের অবনতি, মাছের রোগব্যাধি, পরজীবীর আক্রমণ, খাদ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটি, পানিতে অ্যামোনিয়া ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদানের ভারসাম্যহীনতা এবং পুকুর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
রাহুল রায় বলেন, মাছের সমস্যা দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসা বা প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি শুরু থেকেই সঠিক পুকুর প্রস্তুতি, নিয়মিত পানির মান পর্যবেক্ষণ, সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং মাছের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিক প্রযুক্তি ও টেকনিক্যাল পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে মাছ চাষের বিভিন্ন ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ সময় সেমিনারে উপস্থিত চাষিদের হাতে Advance Agrotech-এর মাছ চাষবিষয়ক নতুন বই তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি আধুনিক মাছ চাষের গাইডলাইন ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় কয়েকজন চাষি Advance Agrotech-এর নির্দেশিকা অনুসরণ করে নিজেদের মাছ চাষের অভিজ্ঞতা ও সফলতার গল্প তুলে ধরেন। আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করে উৎপাদন ও লাভ বৃদ্ধির অভিজ্ঞতা তাঁরা অন্য চাষিদের সঙ্গে ভাগ করে নেন।
চাষিদের এসব বাস্তব অভিজ্ঞতা অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্য মৎস্যচাষিদের মধ্যেও আধুনিক, বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে মাছ চাষের বিষয়ে আগ্রহ সৃষ্টি করে।
বক্তারা বলেন, মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ ও মানসম্মত মাছ উৎপাদন নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য পুকুর ব্যবস্থাপনা, পানির গুণগত মান, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, রোগ প্রতিরোধ এবং প্রয়োজনভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার—সবগুলো বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।
তাঁদের মতে, মাঠপর্যায়ে এ ধরনের প্রশিক্ষণ ও মতবিনিময় সভা নিয়মিত আয়োজন করা হলে চাষিরা আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আরও বাস্তব জ্ঞান লাভের সুযোগ পাবেন। এতে মাছের স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা ও চাষিদের অর্থনৈতিক লাভজনকতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
সভাপতির সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সেমিনারের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে মৎস্যচাষিদের মধ্যে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব মাছ চাষের চর্চা আরও বিস্তৃত হবে। পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিক ও রাসায়নিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমিয়ে নিরাপদ, টেকসই ও উৎপাদনশীল মৎস্য খাত গড়ে তুলতে এ ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ভূমিকা রাখবে।