Tuesday, September 22, 2026
হুথিদের বাব আল-মানদেব নিয়ন্ত্রণ: লোহিত সাগর থেকে পূর্ব  আফ্রিকা পর্যন্ত ভূরাজনৈতিক অভিঘাত
21, Sep 2026 | গবেষণা ও ফিচার

ডক্টর এএইচএম সাদেক.বাকৃবি, ময়মনসিংহ:ইয়েমেনের হুথি বাহিনী সম্প্রতি দেশটির সমগ্র লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। তারা ঐতিহাসিক বন্দরনগরী মোচা এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মায়্যুন (পেরিম) দ্বীপ নিজেদের দখলে নিয়েছে। এর ফলে কার্যত হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বাব আল-মানদেব প্রণালী।

বর্তমানে হুথি বাহিনী আফ্রিকার উপকূল থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার (১২ মাইল) দূরে অবস্থান করছে। যদিও তারা ইয়েমেনের সীমানার বাইরে সামরিক অভিযান চালানোর কোনো ঘোষণা দেয়নি, তবুও এই পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যেই পুরো লোহিত সাগর অঞ্চল ও পূর্ব আফ্রিকায় অনুভূত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় দুই হাজারেরও বেশি মানুষ ইয়েমেন থেকে জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছে। ইয়েমেনের উপকূলের নিকটবর্তী জিবুতির ওবক শহরে আশ্রয় নেওয়া এসব মানুষের জন্য খাদ্য ও পানির ব্যবস্থা করা হলেও সংস্থাটি সতর্ক করেছে, দ্রুত আরও মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।

বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাব আল-মানদেব প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। বৈশ্বিক সমুদ্রবাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ, সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের ১১ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG)-এর ৮ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।

এই পরিস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ একই সময়ে ইরান হরমুজ প্রণালীতেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব বজায় রেখেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশদ্বারই এখন বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

হুথিদের আশ্বাস, কিন্তু বাজারের আস্থাহীনতা
হুথি পলিটব্যুরোর সদস্য হাজেম আল-আসাদ দাবি করেছেন, লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবে আন্তর্জাতিক নৌচলাচল নিরাপদ থাকবে। ইরানও বলছে, হুথিরা একটি স্বাধীন গোষ্ঠী এবং তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য তেহরান সরাসরি দায়ী নয়।

তবে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো এই আশ্বাসে আস্থা রাখছে না। সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বাব আল-মানদেব হরমুজ প্রণালীর তুলনায় আরও সংকীর্ণ হওয়ায় এখান থেকে জাহাজ লক্ষ্যবস্তু করা তুলনামূলক সহজ। ইতোমধ্যেই উপকূলে কামান মোতায়েনের ইঙ্গিত দিয়ে হুথিদের এক কমান্ডারের ভিডিওও প্রকাশ্যে এসেছে।

জাহাজ চলাচল অর্ধেকে নেমে এসেছে
আইএমএফ পোর্টওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল ও পণ্য পরিবহনের পরিমাণ ৫০–৫৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

বড় বড় শিপিং কোম্পানিগুলো এখন লোহিত সাগরের পরিবর্তে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের কেপ অব গুড হোপ ঘুরে চলাচল করছে। এতে প্রতিটি যাত্রায় ২০ দিনেরও বেশি অতিরিক্ত সময় লাগছে এবং বিশ্বব্যাপী পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।

নিরাপত্তা ঝুঁকি ও জলদস্যুতার পুনরুত্থান
সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আলেকজান্দ্রু ক্রিস্টিয়ান হুদিসতেনুর মতে, আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীগুলোর একটি বড় অংশ এখন বাব আল-মানদেব ও হরমুজ প্রণালীতে ব্যস্ত। ফলে হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে নিরাপত্তার ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং সোমালি জলদস্যুরা আবার সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অভিযানে অংশ নেওয়া যুদ্ধজাহাজগুলোর নির্দিষ্ট ম্যান্ডেট থাকায় দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রায়ই আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব ঘটে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক।

মিশরের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা
২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত হুথিরা ১০০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়, যেগুলোকে তারা ইসরায়েল বা তার মিত্রদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করেছিল।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মিশরের সুয়েজ খালের ওপর। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩–২০২৪ সময়কালে সুয়েজ খালের আয় প্রায় ৬০ শতাংশ কমে যায় এবং দেশটির প্রায় ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হারায়।

তবুও মিশর সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থেকেছে। আফ্রিকান স্টাডিজের অধ্যাপক বদর হাসান আল-শাফেইর মতে, ২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেন ইস্যুতে সামরিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে চলাই কায়রোর ধারাবাহিক নীতি।

ইরিত্রিয়া ও সোমালিয়ার নতুন বাস্তবতা
হুথিদের নতুন অবস্থান বাব আল-মানদেবের অপর পাশে অবস্থিত ইরিত্রিয়ার কৌশলগত গুরুত্বও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ইসাইয়াস আফওয়ার্কি প্রকাশ্যে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখলেও লোহিত সাগরের এই পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে দেশটি কৌশলগত সুবিধা পাচ্ছে।

অন্যদিকে সোমালিয়ার ব্যবসায়ীরা বিকল্প বাণিজ্যপথ খুঁজতে শুরু করেছেন। মোগাদিশু বন্দরের পরিচালক মোহাম্মদ আলী নুর জানান, উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তারা প্রথমবারের মতো সরাসরি শ্রীলঙ্কা থেকে চিনিবাহী জাহাজ এনেছেন। তাঁর মতে, চলমান সংকটই নতুন এই বাণিজ্য কৌশল গ্রহণে বাধ্য করেছে।

সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
যুদ্ধ ও নিরাপত্তা সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল নৌপথের কারণে খাদ্য, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পরিবহন খরচ বাড়ছে। এর ফলে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আমদানি করা পণ্যের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহে বিলম্ব এবং বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

বাব আল-মানদেব প্রণালীর ওপর হুথিদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ শুধু ইয়েমেনের যুদ্ধের একটি নতুন অধ্যায় নয়; এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক ভারসাম্যের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। লোহিত সাগরের এই পরিবর্তিত বাস্তবতা মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপ—তিন মহাদেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক করিডোর এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও অনিশ্চয়তার কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
-Source: South Africa today প্রকাশিত নিবন্ধের বাংলা রূপান্তর।

Agrilife24 Logo

Agriculturist Md. Shafiul Azam, Editor & CEO
Dhaka Office: 141/4, Lake Circus, Kalabagan, Dhanmondi, Dhaka-1205.
Bogura Office: Hakim Son's House, Seujgari, Bogura-5800.
Email: info@agrilife24.com, editor@agrilife24.com, news@agrilife24.com
Contact: +880 2-48112812, Whatsapp: +880 1912-837-999

Social Share

© Agrilife24 . All Rights Reserved. Developed by Innovative Soft