ড. এম আব্দুল মোমিন:ধানগাছ সূর্যের আলো থেকে শক্তি সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে, কিন্তু প্রকৃতির এই ব্যবস্থা সবসময় সর্বোচ্চ কার্যকর নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলে ক্যাম্পাসের ইনোভেটিভ জিনোমিক্স ইনস্টিটিউটের একদল গবেষক সম্প্রতি দেখিয়েছেন যে, ধানের নিজস্ব জিনগত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় সামান্য পরিবর্তন এনে সালোক সংশ্লেষণ ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব যা ভবিষ্যতে আরও আধুনিক ও উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনের পথ খুলে দিতে পারে।
ধ্রুব প্যাটেল-টাপার এবং তাঁর সহকর্মীরা CRISPR/Cas9 প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধানের একটি নির্দিষ্ট জিন PsbS এর ঠিক আগে অবস্থিত নিয়ন্ত্রক ডিএনএ অংশে পুনর্বিন্যাস ঘটান। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়ায় গাছের মধ্যে কোনো বহিরাগত জিন প্রবেশ করানো হয়নি; বরং গাছের নিজস্ব জিনের প্রকাশ মাত্রা (এক্সপ্রেশন) বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই পদ্ধতি প্রচলিত জেনোম এডিটিং বা জিন সম্পাদনা থেকে আলাদা, কারণ প্রচলিত পদ্ধতিতে সাধারণত নতুন জিন প্রবেশ করানো হয় অথবা কোনো জিনকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয় উভয় ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রক অনুমোদন প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। যেমনটা হয়েছে বাংলাদেশে অনুমোদিত বিটি বেগুন ও অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা গোল্ডেন রাইসের ক্ষেত্রে।
ধান বা চাল বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের প্রতিদিনের শক্তির প্রধান উৎস। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখা এবং সংস্কৃতির সাথে নিবিড়ভাবে মিশে থাকার কারণে ধান এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের মোট ক্যালরি চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে শুধু ধান থেকে, যা কোটি কোটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষুধার মুখোমুখি হয়েছিল রেকর্ড উৎপাদন সত্ত্বেও এই সংখ্যা অস্বাভাবিক রকম বেশি এবং সামাজিক অস্থিরতার অন্যতম প্রধান কারণ। প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতিতে ফলন বৃদ্ধির গতি ধীরে ধীরে একটি জৈবিক সীমার কাছে পৌঁছে যায় যেটাকে ইল্ড সিলিং বা ফলন সীমা বলে, এটি অতিক্রম করার জন্য নতুন প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
প্রকৃতিতে গাছপালা সাধারণত সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় সূর্যালোককে শর্করায় রুপান্তর করে এবং অতিরিক্ত তাপ হিসেবে নির্গত করে নিজেদের রক্ষা করে এই সুরক্ষা ব্যবস্থাকেই "নন-ফটোকেমিক্যাল কোয়েঞ্চিং" বলা হয়, যা মূলত PsbS জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তামাক গাছে আগের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, এই জিনের প্রকাশ বাড়ালে পানির ব্যবহার দক্ষতা প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় যা ধানেও একই ধরনের সুফল আনতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা ছিল।
গবেষকরা আটটি ভিন্ন CRISPR গাইড ব্যবহার করে জিনের চারপাশের নির্দিষ্ট ডিএনএ অংশ কেটে দেন, যাতে গাছের নিজস্ব মেরামত প্রক্রিয়া সেই খণ্ডগুলো নতুনভাবে সাজিয়ে নিতে পারে। প্রায় এক শতাংশ সম্পাদিত চারায় একটি ডিএনএ অংশ উল্টে যায় আর এই অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনই PsbS জিনের প্রকাশকে দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। প্রোটিন বিশ্লেষণে এই বৃদ্ধি নিশ্চিত হয়েছে, আর সম্পূর্ণ জিনোম পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে মাত্র ১০৪টি জিনে যা মোট জিনোমের ০.২ শতাংশেরও কম।
গ্রিনহাউস পরীক্ষায় তীব্র লাল আলোর নিচে দেখা গেছে, PsbS-বর্ধিত গাছগুলো অতিরিক্ত শক্তি দ্রুত নিষ্কাশন করতে পারলেও কার্বন গ্রহণের হার অপরিবর্তিত থেকেছে। এর ফলে পাতার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কিছুটা কমে যায়, যা তীব্র তাপপ্রবাহের সময় ফসল রক্ষায় বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। এছাড়া পানির ব্যবহার দক্ষতা প্রায় ১১শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, অর্থাৎ একই পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করতে গাছ কম পানি বাষ্পীভূত করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, পূর্ণাঙ্গ পরিপক্বতা পর্যন্ত বেড়ে ওঠা গাছগুলোর সামগ্রিক বৃদ্ধি ও শস্যদানা ভরাটের হার অসম্পাদিত গাছের সমান বা তার চেয়ে ভালো ছিল অর্থাৎ বাড়তি সুরক্ষার জন্য উৎপাদনশীলতায় কোনো ছাড় দিতে হয়নি।
যেহেতু এই পদ্ধতিতে ধানের নিজস্ব ডিএনএ পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে এবং প্রজননের মাধ্যমে CRISPR যন্ত্রাংশ পরবর্তীতে সরিয়ে ফেলা হয়েছে, তাই যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এই নতুন জাতকে "অ-নিয়ন্ত্রিত" শ্রেণিতে ফেলেছে। যার অর্থ মাঠপর্যায়ে পরীক্ষার পথ তুলনামূলক দ্রুত ও সহজ। বিশ্বের অনেক দেশ একই ধরনের মানদণ্ড অনুসরণ করে, ফলে কৃষকদের হাতে নতুন বীজ পৌঁছাতে দশকের বদলে হয়তো কয়েক মৌসুমই যথেষ্ট হবে। এই পদ্ধতি "বিদেশি জিন" নিয়ে ভোক্তাদের মনে যে উদ্বেগ থাকে, তাও অনেকাংশে এড়িয়ে যায় কারণ ফলাফল স্বরূপ প্রাপ্ত জাত জিনগতভাবে সম্পূর্ণ ধানই থেকে যায়, শুধু একটি প্রাকৃতিক জিনের কার্যক্ষমতায় পরিবর্তন আসে। এশিয়ায়, যেখানে দুই লক্ষেরও বেশি স্বতন্ত্র ধানের জাত চাষ হয়, সেখানে এই নমনীয়তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকরা স্পষ্ট করেই বলছেন, শুধু PsbS জিনের এই দ্বিগুণ বৃদ্ধি একাই বৈশ্বিক ক্ষুধার সমাধান দেবে না। তবে এই কৌশলের সঙ্গে যদি ফটোরেসপিরেশন কমানো বা নাইট্রোজেন শোষণ বাড়ানোর মতো আরও জিন সম্পাদনা যুক্ত করা যায়, তাহলে সম্মিলিত প্রভাব অনেক বড় হতে পারে। RIPE কনসোর্টিয়ামের কম্পিউটার মডেল অনুযায়ী, বিভিন্ন সালোকসংশ্লেষণ-সংক্রান্ত পরিবর্তন একত্রে প্রয়োগ করা হলে মাঠপর্যায়ে অস্থির আলোর পরিস্থিতিতেও ধানের ফলন প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।
গবেষকদের মতে, এই গবেষণা ভবিষ্যতে অন্যান্য একক-কপি সালোকসংশ্লেষণ জিনের নিয়ন্ত্রক অংশ সম্পাদনার জন্যও একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে। প্রাণীর তুলনায় উদ্ভিদ জিনোম বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস অনেক বেশি সহনীয়ভাবে গ্রহণ করে আর এই বৈশিষ্ট্যকেই দায়িত্বশীলভাবে কাজে লাগিয়ে জলবায়ু-সহিষ্ণু কৃষির দিকে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন বিজ্ঞানীরা, নিয়ন্ত্রক জটিলতায় না জড়িয়েই। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে সায়েন্স অ্যাডভান্সেস সাময়িকীতে। সূত্র: earth.com
ভাষান্তর: উর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), গাজীপুর-১৭০১। ই-মেইল: smmomin80@gmail.com