Monday, September 28, 2026
জলাতঙ্ক প্রতিরোধ: ওয়ান হেলথ এবং রোটারি ইন্টারন্যাশনালের মূল ভূমিকা
27, Sep 2026 | গবেষণা ও ফিচার

রোটারিয়ান ডা. মো. হেমায়াতুল ইসলাম আরিফ:প্রতি বছর ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস পালিত হয়। এই দিনটির দুইটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। একদিকে এটি জলাতাংক নির্মূলের প্রতিশ্রুতি নতুন করে দেওয়ার দিন। অন্যদিকে এই দিনেই ১৮৯৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর। তিনি প্রথম জলাতাংকের টিকা আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁর সেই আবিষ্কার আজও অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচিয়ে চলেছে।

জলাতঙ্ক একটি ভয়ানক রোগ। একবার এই রোগ হলে প্রায় ১০০% মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু আশার কথা হলো, এই রোগ সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৫৯ হাজার মানুষ জলাতাংকে মারা যায়। এর মধ্যে ৯৫%-এর বেশি মৃত্যু ঘটে আফ্রিকা ও এশিয়ায়। শিশু ও গ্রামীণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষের জলাতাংকের ৯৯% ঘটে কুকুরের কামড় থেকে। তাই কুকুরের মধ্যে এই রোগ ছড়ানো বন্ধ করাই মানুষের জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে ভালো উপায়।

ওয়ান হেলথ: একসাথে কাজ করার মূল কথা
২০১৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, বিশ্ব প্রাণী স্বাস্থ্য সংস্থা এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর র‍্যাবিস কন্ট্রোল একসাথে "জিরো বাই ৩০" নামে একটি পরিকল্পনা শুরু করে। এর লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে কুকুরের মাধ্যমে ছড়ানো জলাতঙ্ককে মানুষের মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনা। এই পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হলো ওয়ান হেলথ। এর সহজ অর্থ হলো মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের স্বাস্থ্য আলাদা নয়। এগুলো একসাথে দেখতে হবে এবং একসাথে সমাধান করতে হবে।

জলাতঙ্ক প্রতিরোধে ওয়ান হেলথের কাজ খুব স্পষ্ট। প্রথমে, সব কুকুরকে টিকা দিতে হবে। এটি সবচেয়ে কম খরচে সবচেয়ে বেশি উপকার দেয়। কারণ কুকুরের মধ্যে রোগ ছড়ানো বন্ধ হলে মানুষও নিরাপদ থাকে। দ্বিতীয়ত, কেউ কুকুরে কামড়ালে সাথে সাথে সাবান ও পানি দিয়ে কমপক্ষে ১৫ মিনিট ক্ষত পরিষ্কার করতে হবে। এরপর পুরো টিকার কোর্স সম্পন্ন করতে হবে। প্রয়োজনে জলাতাংকের ইমিউনোগ্লোবুলিন দিতে হবে। এছাড়াও মানুষকে সচেতন করতে হবে, কামড় থেকে বাঁচার উপায় জানাতে হবে এবং দায়িত্বশীলভাবে কুকুর পালতে উৎসাহ দিতে হবে।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে এই পথ কাজ করে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচি শুরু করে। সচেতনতা তৈরি, আধুনিক কুকুর-কামড় ব্যবস্থাপনা, ব্যাপক কুকুর টিকাদান এবং কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলাতাংকে মানুষের মৃত্যু প্রায় ৫০% কমিয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ সরকার কক্সবাজারের কুতুপালং-বালুখালি শরণার্থী শিবিরে প্রথম ব্যাপক কুকুর টিকাদান অভিযান চালায়। এটি প্রমাণ করে যে কঠিন পরিবেশেও ওয়ান হেলথ কাজ করতে পারে।

রোটারি ইন্টারন্যাশনাল: পোলিও থেকে জলাতঙ্ক পর্যন্ত
রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় রোটারি ইন্টারন্যাশনালের অভিজ্ঞতা ও সুনাম অসাধারণ। পোলিও নির্মূলের বিশ্বব্যাপী কাজ রোটারির সবচেয়ে গর্বের অর্জনগুলোর একটি। ৩৫ বছরেরও বেশি সময়ের নিরলস কাজে বিশ্বে পোলিওর সংখ্যা ৯৯.৯% কমেছে। এই যাত্রায় রোটারি অনেক মূল্যবান জিনিস অর্জন করেছে মানুষকে একত্র করার ক্ষমতা, বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের অভিজ্ঞতা এবং তৃণমূল পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবকদের একটি বড় নেটওয়ার্ক।

এই ক্ষমতাগুলো জলাতঙ্ক নির্মূলেও ব্যবহার করা যেতে পারে এবং করা উচিত। রোটারির "রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা" ক্ষেত্রটি স্পষ্টভাবে টিকা দিয়ে প্রতিরোধ করা যায় এমন রোগকে অগ্রাধিকার দেয়। জলাতাংক ঠিক এমনই একটি রোগএটি টিকা দিয়ে প্রতিরোধ করা যায় এবং এর নিয়ন্ত্রণের উপায়গুলো ভালোভাবে জানা আছে।

রোটারি বিশেষভাবে তিনটি স্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে:
প্রথমত, সচেতনতা তৈরি ও সম্পদ সংগ্রহ। রোটারির বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্ক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলাতাংক নিয়ন্ত্রণকে নীতির আলোচনায় আনতে পারে। রোটারি সদস্যদের মধ্যে আছেন ব্যবসায়ী নেতা, স্বাস্থ্যকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা এবং সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। এই বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষ একসাথে থাকার কারণে ওয়ান হেলথের বহুখাত সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া সহজ হয়।

দ্বিতীয়ত, সমাজের তৃণমূল পর্যায়ে সরাসরি কাজ। পোলিও নির্মূলে রোটারি স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে ঘরে ঘরে টিকা পৌঁছে দিয়েছে। ঠিক সেভাবেই জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে রোটারি ক্লাবগুলো কুকুর টিকাদান অভিযানে মানুষকে একত্র করতে পারে, সচেতনতা ছড়াতে পারে এবং কামড়ের পর সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে শিক্ষা দিতে পারে।

তৃতীয়ত, বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সেতু তৈরি। ওয়ান হেলথের মূল কথা হলো বিভাগগুলোর মধ্যে দেয়াল ভেঙে ফেলা। একটি বেসরকারি সংস্থা হিসেবে রোটারির নিরপেক্ষতা ও মানুষকে একত্র করার ক্ষমতা রয়েছে। এটি স্বাস্থ্য বিভাগ, পশুচিকিৎসা বিভাগ, স্থানীয় সরকার এবং সমাজের সংস্থাগুলোর মধ্যে সেতু তৈরি করতে পারে।

আহ্বান: "জিরো বাই ৩০"-এর অংশ হোন
২০২৬ সালের বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবসের বিষয় হলো "Stronger Together" (একসাথে আরও শক্তিশালী)। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় জলাতঙ্ক নির্মূল করতে হলে প্রতিটি স্তরে অংশীদারিত্ব দরকার। সমাজের সাধারণ মানুষ, পোষা প্রাণীর মালিক, পশুচিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, নীতি নির্ধারক এবং আন্তর্জাতিক অংশীদার সবার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

রোটারি সদস্যদের জন্য করণীয় স্পষ্ট:
কুকুর টিকাদান অভিযানে সহযোগিতা করুন। অর্থ দিয়ে, স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে বা পরিবহন ব্যবস্থা করে রোটারি ক্লাবগুলো স্থানীয় প্রাণিচিকিৎসা বিভাগের সাথে মিলে কুকুর টিকাদানের হার ৭০% বা তার বেশি করতে পারে। এই হারই রোগ ছড়ানো বন্ধ করার জন্য জরুরি।

সমাজে শিক্ষা ছড়ান। জলাতঙ্ক সম্পর্কে না জানা মারাত্মক। শিশুদের শেখান কীভাবে কুকুরের কাছে নিরাপদে থাকতে হয়, কামড় খেলে সাথে সাথে ক্ষত পরিষ্কার করে চিকিৎসা নিতে হয় এবং দায়িত্বশীলভাবে কুকুর পালতে হয়। এই তথ্য জীবন বাঁচায়।

ওয়ান হেলথ নীতির পক্ষে কথা বলুন। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য ও পশুচিকিৎসা বিভাগের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ান। জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণের জন্য রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করুন।

পাস্তুরের মৃত্যুর ১৩১তম বার্ষিকীতে আমরা শুধু একটি টিকা নয়, একটি বৈজ্ঞানিক চেতনাও পাই। সেই চেতনা হলো প্রমাণের উপর ভিত্তি করে কাজ করা, মানুষের কল্যাণকে লক্ষ্য রাখা এবং সবচেয়ে জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন শাখার সীমা অতিক্রম করা। ওয়ান হেলথ হলো ২১ শতকে সেই চেতনারই রূপ।

রোটারি ইন্টারন্যাশনালের মূল কথা হলো "Service Above Self" (সেবা নিজের আগে)। জলাতাংক নির্মূলের যাত্রায় এই আদর্শ বাস্তব কাজে রূপ নেয়। প্রতিটি টিকা, প্রতিটি শিক্ষা সেশন, প্রতিটি নীতি পরিবর্তনের প্রচেষ্টা "জিরো বাই ৩০" লক্ষ্যের দিকে একটি দৃঢ় পদক্ষেপ।

জলাতঙ্ক নির্মূল করা সম্ভব। উপকরণ আছে, পরিকল্পনা স্পষ্ট, অংশীদারিত্ব তৈরি হচ্ছে। শুধু দরকার প্রতিশ্রুতিকে কাজে পরিণত করার দৃঢ়তা।
-লেখক:, ডেপুটি কো-অর্ডিনেটর, রোটারি পাবলিক ইমেজ টিম, রোটারি ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট স্পেশাল এডভাইজার (রিপসা), ডি-৬৪, বাংলাদেশ। 

Agrilife24 Logo

Agriculturist Md. Shafiul Azam, Editor & CEO
Dhaka Office: 141/4, Lake Circus, Kalabagan, Dhanmondi, Dhaka-1205.
Bogura Office: Hakim Son's House, Seujgari, Bogura-5800.
Email: info@agrilife24.com, editor@agrilife24.com, news@agrilife24.com
Contact: +880 2-48112812, Whatsapp: +880 1912-837-999

Social Share

© Agrilife24 . All Rights Reserved. Developed by Innovative Soft