এগ্রিলাইফ প্রতিনিধি:কেন্দুয়া (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি: নিরাপদ, লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব মাছ উৎপাদনে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়িতে আধুনিক মাছ চাষ বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল মঙ্গবার (২২ সেপ্টেম্বর) অ্যাডভান্স এগ্রোটেক বাংলাদেশ আয়োজিত এ কর্মশালায় ৬০ জন মৎস্যচাষি, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অংশ নেন।
সাবেক মৎস্য অধিদপ্তর (DoF) কর্মকর্তা স্বপন দেবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন অভিজ্ঞ ও বৃহৎ পরিসরের মৎস্যচাষি আব্দুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভান্স এগ্রোটেক বাংলাদেশের রয়েলবাড়ি এলাকার একক ডিলার আজিজুল হক।
প্রধান বক্তা ছিলেন অ্যাডভান্স এগ্রোটেক বাংলাদেশের হেড অব টেকনিক্যাল, মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস কৃষিবিদ রেজাউল হক। প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন ময়মনসিংহ রিজিওনের টেকনিক্যাল অ্যান্ড সেলস ম্যানেজার রাহুল রায়।
প্রধান অতিথি আব্দুর রহমান ও বিশেষ অতিথি আজিজুল হক তাঁদের বক্তব্যে মাছ চাষের বিভিন্ন দিক, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং চাষিদের নিয়মিত কারিগরি সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, মাছ চাষে নতুন প্রযুক্তি, রোগ ব্যবস্থাপনা, পানির গুণগত মান ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে চাষিদের নিয়মিত আপডেট থাকা প্রয়োজন। এ ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মশালা চাষিদের বাস্তব জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে উল্লেখ করে তাঁরা এ ধরনের আয়োজন আরও নিয়মিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
প্রশিক্ষণে পুকুর প্রস্তুতি, পানির গুণগত মান, মাছের রোগ প্রতিরোধ, খাদ্য ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, বায়োসিকিউরিটি এবং প্রয়োজনভিত্তিক অ্যাকুয়া মেডিসিন ব্যবহারের বিষয়ে সহজ ও বাস্তবভিত্তিক ধারণা দেওয়া হয়। পাশাপাশি পানির মান নিয়ন্ত্রণে দ্রবীভূত অক্সিজেন (DO), pH, অ্যামোনিয়া, নাইট্রাইট ও তাপমাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
প্রধান বক্তা কৃষিবিদ রেজাউল হক বলেন, “রোগ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসার চেয়ে শুরু থেকেই রোগ প্রতিরোধ করা বেশি জরুরি। নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা, সঠিক খাদ্য প্রয়োগ এবং পুকুরের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে মাছের বৃদ্ধি বাড়ে, রোগের ঝুঁকি কমে এবং চাষির উৎপাদন দক্ষতা বাড়ে।”
তিনি বলেন, অতিরিক্ত খাদ্য ও জৈব বর্জ্য জমে পানিতে অ্যামোনিয়া ও নাইট্রাইটের মাত্রা বেড়ে গেলে মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে নিয়মিত পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা জরুরি।
এ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমিয়ে প্রোবায়োটিক, প্রিবায়োটিক ও ফাইটোজেনিক পণ্যভিত্তিক পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সহকারী বক্তা রাহুল রায় বলেন, “মাছের আচরণ, খাদ্য গ্রহণ ও পানির পরিবর্তন নিয়মিত লক্ষ্য করলেই অনেক সমস্যা আগেভাগে শনাক্ত করা যায়। রোগের লক্ষণ দেখা দিলে আগে কারণ খুঁজে বের করতে হবে; অকারণে ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়।”
তিনি মাছের প্রজাতি, বয়স, মজুদ ঘনত্ব ও পানির তাপমাত্রা অনুযায়ী খাদ্য ব্যবস্থাপনার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে সঠিক পণ্য, সঠিক মাত্রা ও সঠিক সময়ে অ্যাকুয়া মেডিসিন ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রশিক্ষণে বায়োসিকিউরিটির অংশ হিসেবে পুকুরে বাইরের পানি, সরঞ্জাম ও রোগাক্রান্ত মাছের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, নতুন মাছ মজুদের আগে পর্যবেক্ষণ এবং পুকুরের সরঞ্জাম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
মতবিনিময় পর্বে চাষিরা তাঁদের পুকুরের রোগ, পানির মান, খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদনসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। প্রশিক্ষকেরা এসব সমস্যার সম্ভাব্য কারণ বিশ্লেষণ করে মাঠপর্যায়ে প্রয়োগযোগ্য কারিগরি পরামর্শ দেন।
এ সময় অ্যাডভান্স এগ্রোটেক বাংলাদেশের মাছ চাষবিষয়ক নতুন গাইডলাইন বই চাষিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কর্মশালায় অংশ নেওয়া অ্যাডভান্স এগ্রোটেকের নিয়মিত পণ্য ব্যবহারকারী কয়েকজন চাষি তাঁদের নিজস্ব খামারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এবং পণ্যগুলোর গুণমান, কার্যকারিতা ও মাঠপর্যায়ে ব্যবহারের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করেন।
আয়োজকেরা জানান, মাঠপর্যায়ে চাষিদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বাড়াতে এ ধরনের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। মাছ চাষকে আরও নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করার পাশাপাশি চাষিদের উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।