Friday, October 02, 2026
কৃষি পরামর্শে ভুল, কৃষিতে ঝুঁকি !
01, Oct 2026 | গবেষণা ও ফিচার

সমীরণ বিশ্বাস:বাংলাদেশের কৃষি এখন আর কেবল জমি, বীজ, সার ও পানির ওপর নির্ভরশীল নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, নতুন নতুন রোগ-পোকার আবির্ভাব, মাটির উর্বরতা হ্রাস, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, কীটনাশকের প্রতিরোধক্ষমতা এবং নিরাপদ খাদ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, সব মিলিয়ে কৃষকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় কৃষকের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সঠিক, সময়োপযোগী ও নিরপেক্ষ কৃষি পরামর্শ। কিন্তু বাস্তব চিত্রের একটি উদ্বেগজনক দিক হলো, অনেক ক্ষেত্রে কৃষক ফসলের সমস্যা দেখা দিলে প্রথমে কৃষি কর্মকর্তার কাছে না গিয়ে স্থানীয় কীটনাশক বা কৃষি উপকরণ বিক্রেতার কাছে ছুটছেন। কারণ, দোকানটি হাতের কাছে, বিক্রেতা সবসময় পাওয়া যায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে কোনো একটি পণ্যের নাম ও ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। ফলে কৃষি পরামর্শের জায়গায় ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক পরামর্শের প্রভাব তৈরি হচ্ছে। এখানে মূল প্রশ্ন হলো, যিনি পণ্য বিক্রি করে আয় করেন, তাঁর পরামর্শ কি সবসময় কৃষকের স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখবে? বিষয়টি কোনো ব্যক্তি বা ব্যবসায়ীকে অভিযুক্ত করার নয়; বরং কৃষকের পরামর্শব্যবস্থায় স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনাটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার বিষয়।

কৃষি পরামর্শে বাণিজ্যের প্রভাব: একজন কৃষক যখন জমিতে পোকার আক্রমণ, রোগ, পাতা হলুদ হওয়া, গাছের বৃদ্ধি কমে যাওয়া কিংবা ফলন কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখতে পান, তখন তিনি দ্রুত সমাধান চান। অনেক সময় সমস্যাটি আসলে পুষ্টির ঘাটতি, অতিরিক্ত পানি, মাটির pH-এর সমস্যা, আবহাওয়ার প্রভাব বা ভুল কৃষি ব্যবস্থাপনার কারণে হলেও সেটিকে পোকা বা রোগ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এ অবস্থায় যদি প্রথম পরামর্শ হয়, “এই কীটনাশকটি ব্যবহার করুন” তাহলে কৃষক হয়তো সাময়িকভাবে একটি পণ্য ব্যবহার করবেন, কিন্তু সমস্যার প্রকৃত কারণ অজানাই থেকে যাবে। একই সমস্যা আবার দেখা দিতে পারে এবং কৃষককে আরও একটি পণ্য ব্যবহারের দিকে যেতে হতে পারে। এখানেই প্রয়োজন রোগ-পোকার সঠিক শনাক্তকরণ, মাঠ পর্যবেক্ষণ, ফসলের বয়স, আবহাওয়া, মাটির অবস্থা, পূর্বে ব্যবহৃত বালাইনাশক এবং আক্রান্তির মাত্রা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

মাঠে কর্মকর্তা নয়, ব্যবসায়ীই ভরসা: কৃষকের সঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণকর্মীদের নিয়মিত যোগাযোগ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক মাঠে যে সমস্যার মুখোমুখি হন, তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তাঁকে বোঝানো দরকার। কিন্তু জনবল, কৃষকের সংখ্যা, বিস্তীর্ণ কর্মএলাকা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল কৃষি সমস্যার কারণে সরকারি কৃষি পরামর্শসেবা সবসময় প্রতিটি কৃষকের কাছে একই মাত্রায় পৌঁছাতে পারে না। অন্যদিকে কৃষি উপকরণের দোকান প্রায় প্রতিটি বাজারেই রয়েছে। ফলে কৃষক সহজেই সেখানে গিয়ে পরামর্শ নিতে পারেন। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু এখানেই একটি নীতিগত প্রশ্ন আসে, কৃষি উপকরণ বিক্রেতাকে কি শুধু বিক্রেতা হিসেবে দেখা হবে, নাকি প্রশিক্ষিত ও নিয়ন্ত্রিত কৃষি-পরামর্শ সহায়ক হিসেবে গড়ে তোলা হবে? দ্বিতীয় পথটি বাস্তবসম্মত হতে পারে। কারণ মাঠে তাঁদের উপস্থিতি রয়েছে এবং কৃষকের সঙ্গে তাঁদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগও রয়েছে। তবে তার জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, জ্ঞান যাচাই, দায়িত্বশীল আচরণ এবং যথাযথ নিয়ন্ত্রণ। বিক্রির লক্ষ্য যেন কৃষকের প্রয়োজনের ওপর প্রাধান্য না পায়, সেটিই নিশ্চিত করতে হবে।

কীটনাশক ব্যবসায়ীর পরামর্শ, ঝুঁকিতে কৃষক: কীটনাশক কৃষি উৎপাদনে প্রয়োজনীয় একটি উপকরণ হতে পারে। কিন্তু এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাব বহুমাত্রিক। প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রয়োগ উৎপাদন খরচ বাড়ায়, উপকারী পোকামাকড়ের ক্ষতি করতে পারে, বালাইনাশক-প্রতিরোধী পোকা তৈরির ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং ফসলের অবশিষ্টাংশের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্ন সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে একই সক্রিয় উপাদান বা একই ধরনের কার্যপ্রণালীর বালাইনাশক বারবার ব্যবহার করলে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরির ঝুঁকি বাড়ে। তখন কৃষক আরও বেশি মাত্রায় বা আরও শক্তিশালী পণ্য ব্যবহারের দিকে যেতে পারেন। এটি একটি দুষ্টচক্র তৈরি করতে পারে। আরেকটি সমস্যা হলো, সব পোকা ক্ষতিকর নয়। কৃষিক্ষেত্রে পরাগায়নকারী পোকা, শিকারি পোকা ও পরজীবী পোকাসহ বহু উপকারী জীব রয়েছে। নির্বিচারে কীটনাশক প্রয়োগ করলে ক্ষতিকর পোকার পাশাপাশি এসব উপকারী জীবও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে প্রাকৃতিকভাবে পোকার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। সুতরাং “পোকা দেখলেই কীটনাশক” এমন সরল সমাধান কৃষির জন্য দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ নয়। প্রথমে শনাক্ত করতে হবে, সমস্যাটি কী? তারপর দেখতে হবে, আক্রমণের মাত্রা অর্থনৈতিক ক্ষতির সীমা অতিক্রম করেছে কি না। এরপর সাংস্কৃতিক, যান্ত্রিক, জৈবিক ও প্রয়োজন হলে রাসায়নিক ব্যবস্থাপনার সমন্বিত পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। অর্থাৎ Integrated Pest Management বা সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা হওয়া উচিত সিদ্ধান্তের ভিত্তি।

কৃষকের কাছে পৌঁছাতে হবে নিরপেক্ষ ডিজিটাল পরামর্শ: বর্তমান সময়ে এই সমস্যার একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে ডিজিটাল কৃষি পরামর্শব্যবস্থা। স্মার্টফোনের মাধ্যমে কৃষক যদি ফসলের ছবি, জমির তথ্য, অবস্থান, আবহাওয়া ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে রোগ-পোকার প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং করণীয় জানতে পারেন, তাহলে তাৎক্ষণিক ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আবহাওয়া তথ্য, মাটি পরীক্ষা, IoT সেন্সর এবং কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শকে সমন্বিত করা যেতে পারে। তবে প্রযুক্তিকে কখনোই মাঠকর্মী বা বিশেষজ্ঞের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সিদ্ধান্ত সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। একই সঙ্গে কৃষি উপকরণ বিক্রেতাদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দোকানে লাইসেন্স নবায়নের সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও সনদকে যুক্ত করা হলে দায়িত্বশীলতা বাড়তে পারে। কোন রোগে কোন পণ্য, কখন প্রয়োজন, কত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে, অপেক্ষাকাল কত—এসব বিষয়ে নির্ভুল জ্ঞান ছাড়া পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

কৃষকের ভুল সিদ্ধান্তের দায় শুধু কৃষকের নয়। সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তাঁকে সঠিক তথ্য, সহজলভ্য পরামর্শ এবং নির্ভরযোগ্য সেবা দিতে হবে। কৃষক যদি কৃষি কর্মকর্তার পরিবর্তে বাধ্য হয়ে বাণিজ্যিক উৎসের ওপর বেশি নির্ভর করেন, তাহলে এটি কৃষকের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং কৃষি সম্প্রসারণ ও জ্ঞানসেবা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। সমাধান ব্যবসায়ীকে বাদ দেওয়া নয়; বরং কৃষি পরামর্শকে বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রভাবমুক্ত ও জ্ঞানভিত্তিক করা। মাঠকর্মী, গবেষক, প্রশিক্ষিত কৃষি উপকরণ বিক্রেতা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং কৃষক, সব পক্ষকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন ও বাজার পর্যায়ে কৃষি পরামর্শের সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, কৃষি উপকরণ বিক্রেতাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সনদায়ন, বালাইনাশক ব্যবহারে প্রেসক্রিপশনভিত্তিক নির্দেশনা, রোগ-পোকার সঠিক শনাক্তকরণ এবং ডিজিটাল কৃষি পরামর্শব্যবস্থার সম্প্রসারণ, এসব উদ্যোগ একসঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, ভুল পরামর্শ শুধু একটি ভুল পণ্য কেনায় থেমে থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কৃষকের টাকা, ফসল, মাটি, পরিবেশ এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার খাদ্যনিরাপত্তা। কৃষকের প্রয়োজন শুধু “কীটনাশকের নাম” নয়, প্রয়োজন সমস্যার সঠিক শনাক্তকরণ, কারণভিত্তিক সমাধান এবং কখন কী করতে হবে তার নির্ভরযোগ্য নির্দেশনা। কৃষকের হাতে পণ্য তুলে দেওয়ার আগে তাই নিশ্চিত করতে হবে, সবার আগে পৌঁছাক সঠিক কৃষি জ্ঞান।
-লেখক:কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

Agrilife24 Logo

Agriculturist Md. Shafiul Azam, Editor & CEO
Dhaka Office: 141/4, Lake Circus, Kalabagan, Dhanmondi, Dhaka-1205.
Bogura Office: Hakim Son's House, Seujgari, Bogura-5800.
Email: info@agrilife24.com, editor@agrilife24.com, news@agrilife24.com
Contact: +880 2-48112812, Whatsapp: +880 1912-837-999

Social Share

© Agrilife24 . All Rights Reserved. Developed by Innovative Soft