ইসলামিক ডেস্ক: মানবজীবনে মাতা-পিতার স্থান মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার হকের পরেই। পবিত্র কুরআনের বহু স্থানে আল্লাহর ইবাদত ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশের পরপরই পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের গুরুত্ব অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সূরা লোকমানের ১৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, "আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করেছে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দু'বছরে। কাজেই আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। ফিরে আসা তো আমারই কাছে।"
এই পবিত্র আয়াতের মাধ্যমে সন্তান-সন্ততিদের জন্য আল্লাহর প্রতি এবং পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা বাধ্যতামূলক ও অত্যন্ত জরুরি করা হয়েছে।
ইসলামী চিন্তাবিদ ও মুফাসসিরদের মতে, সূরা লোকমান মক্কী জীবনের এমন এক সন্ধিক্ষণে অবতীর্ণ হয়েছিল যখন মক্কার কুরাইশরা ইসলামের অগ্রযাত্রাকে রুখতে মুসলমানদের ওপর নানামুখী জুলুম-নিপীড়ন শুরু করেছিল। বিশেষ করে তৎকালীন অনেক তরুণ ও যুবক যখন মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করছিলেন, তখন তাদের অমুসলিম পিতা-মাতা তাদেরকে পূর্বপুরুষদের পৌত্তলিকতা ও শিরকের দিকে ফিরে যাওয়ার জন্য চরম মানসিক ও সামাজিক চাপ প্রয়োগ করত। এই পটভূমিতে পবিত্র কুরআনের এই অংশটি অবতীর্ণ হয়। এর মাধ্যমে মুসলিম যুবকদের স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, পিতা-মাতার অধিকার যথার্থই আল্লাহর পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি ইসলামের পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য চাপও সৃষ্টি করে, তবুও দুনিয়াতে তাদের সাথে উত্তম আচরণ ও সৌজন্য বজায় রাখতে হবে।
এই আয়াতের প্রধান বিষয়বস্তু হলো আল্লাহর তাওহীদ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও অধিকারের সীমা নির্ধারণ। আল্লাহ তাআলা এখানে বিশেষভাবে মায়ের অনন্য আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। একজন মা চরম শারীরিক দুর্বলতা ও অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্য দিয়ে সন্তানকে দীর্ঘ সময় গর্ভে ধারণ করেন। এরপর ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর আরও দুই বছর পরম মমতায় নিজের বুকের দুধ পান করিয়ে তাকে বড় করে তোলেন। মায়ের এই অসীম কষ্টের কারণেই পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
আয়াতটির শেষাংশে এক গভীর সতর্কবার্তা রয়েছে যে, সবশেষে মহান আল্লাহর কাছেই সকলকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। অর্থাৎ, যারা দুনিয়াতে পিতা-মাতার অবাধ্য হবে কিংবা আল্লাহর নেয়ামতের অকৃতজ্ঞতা করবে, পরকালে তাদের আল্লাহর কাঠগড়ায় কঠোর জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে। অতএব, আখেরাতে মুক্তির জন্য মহান আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি পিতা-মাতার প্রতি আজীবন অনুগত ও সদাচারী হওয়া প্রতিটি মুমিনের অপরিহার্য দ্বীনি কর্তব্য।