এগ্রিলাইফ২৪ ডটকম:শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বরিশালের ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখা (WPSA-BB) আয়োজিত ‘বরিশাল বিভাগীয় কর্মশালায় পোল্ট্রি খাতকে আরও নিরাপদ, আধুনিক ও টেকসই করতে খামার পর্যায়ে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা অনুসরণ, রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
প্রফেসর ড. মো. ইলিয়াস হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোঃ এস এম হেমায়েত জাহান, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান, WPSA-BB-এর সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট মো. সিরাজুল হক এবং সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফয়েজুর রহমান।
কর্মশালার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য ও কর্মশালার উদ্দেশ্য এবং ওয়াপসা-বিবির কার্যক্রম তুলে ধরেন WPSA-BB-এর কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য ডাঃ মোঃ রাকিবুর রহমান।
কর্মশালায় ‘নিরাপদ ও আদর্শ ব্রয়লার খামার তৈরিতে ব্যবস্থাপনা ও পুষ্টির গুরুত্ব’ বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করেন মোহাম্মদ নাজমুস সাকিব হামিম। তিনি ব্রয়লার খামারে সঠিক ব্যবস্থাপনা, খাদ্য ও পানির গুণগত মান, বায়োসিকিউরিটি, পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ, খামারের দৈনন্দিন পর্যবেক্ষণ এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। একই সঙ্গে খামারে সঠিক ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করলে রোগের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা ও খামারের লাভজনকতা বাড়ানো সম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়।
এরপর ‘নিরাপদ ও আদর্শ ব্রয়লার খামার তৈরিতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব’ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন বরিশালের আঞ্চলিক প্রাণিরোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারের পিএসও ড. মো. নূরুল আলম। তিনি পোল্ট্রি খাতে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার রোধ, সঠিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, রোগ প্রতিরোধ, বায়োসিকিউরিটি, খামারে জীবাণু নিয়ন্ত্রণ, রোগের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তকরণ এবং যথাযথ চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেন।
WPSA-BB-এর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফয়েজুর রহমান বলেন, পোল্ট্রি শিল্পের টেকসই বিকাশের জন্য খামারিদের আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। এ ধরনের বিভাগীয় কর্মশালার মাধ্যমে খামারিদের হাতে-কলমে ও ব্যবহারিক জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি খামার পর্যায়ের সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলো নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট মো. সিরাজুল হকও খামারিদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের জন্য খামার পর্যায় থেকেই মানসম্মত উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। জনাব মোঃ সিরাজুল হক পোল্ট্রি শিল্পের একজন পরিচিত মুখ এবং একজন অভিজ্ঞ সংগঠক ও পোল্ট্রি শিল্পের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার আলোকে তার বক্তব্যে যে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনা উঠে এসেছে, তা খামারি পর্যায়ে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান বলেন, কৃষি ও প্রাণিসম্পদভিত্তিক উৎপাদনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে উঠলে পোল্ট্রি খাত আরও এগিয়ে যাবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রফেসর ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান বলেন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন শুধু ভোক্তার অধিকার নয়, এটি জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত। পোল্ট্রি খামারে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই রোগ প্রতিরোধ, সঠিক রোগ নির্ণয় এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শের ভিত্তিতে ওষুধ ব্যবহারের বিষয়ে খামারিদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে পোল্ট্রি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ খাতের উৎপাদনশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খামারিদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট গবেষক, শিক্ষক, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং শিল্পসংশ্লিষ্টদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে WPSA-BB-এর প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং বরিশাল বিভাগীয় কর্মশালা কমিটির আহ্বায়ক প্রফেসর ড. মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, নিরাপদ ও আদর্শ পোল্ট্রি উৎপাদনের জন্য শুধু উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা, প্রাণিস্বাস্থ্য, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং খামারির অর্থনৈতিক সক্ষমতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ের খামারিদের বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তার সমাধান করাই এ ধরনের কর্মশালার অন্যতম উদ্দেশ্য।
কর্মশালায় বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের প্রান্তিক ও বাণিজ্যিক পোল্ট্রি খামারি, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও পোল্ট্রি শিল্পের প্রায় দুই শতাধিক প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন যার ভিতর প্রায় দেড় শতাধিক খামারী অংশ নেন।
দিনব্যাপী কর্মশালায় খামারিদের জন্য নিরাপদ ও আদর্শ ব্রয়লার উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা, পুষ্টি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, অ্যান্টিবায়োটিকের দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং রোগ প্রতিরোধ বিষয়ে ব্যবহারিক ও কারিগরি ধারণা দেওয়া হয়।
পরে মধ্যাহ্নভোজের মাধ্যমে কর্মশালার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। উদ্যোক্তারা জানান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খামারিদের আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত করার ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ ধরনের বিভাগীয় কর্মশালা আয়োজন অব্যাহত থাকবে।