ডক্টর এএইচএম সাদেক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ:বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স এবং তৈরি পোশাক (RMG) শিল্প—এই দুটি খাতের অবদান অনস্বীকার্য। এই দুই খাত দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশের অর্থনীতি কেবল এই দুটি স্তম্ভের ওপর নির্ভরশীল থাকতে পারে না। এতে করে সবসময় অর্থনীতির অজানা ঝুঁকির এক মনস্তাত্ত্বিক চাপ নিয়ে চলতে হয়। আজকের লেখায় কেবল পোশাক শিল্প, অর্থনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক চাপ কমানোর ভবিষ্যৎ বিকল্প ভাবনা পর্যন্তই থাকতে চাই। আরেকদিন বিদেশে শ্রম বিক্রির কথা হবে।
হ্যাঁ, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) শিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। গত চার দশকে এই শিল্প কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ঘটিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে এবং দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ৩,৩০০–৩,৫০০টি সক্রিয় রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক (RMG) শিল্প কারখানার রয়েছে। BGMEA-তে নিবন্ধিত কারখানার সংখ্যা প্রায় ৪,০০০, তবে সবগুলো একসঙ্গে সক্রিয় নয়। এই শিল্পে প্রায় ৪০–৪৪ লাখ মানুষ সরাসরি কাজ করেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৫৫–৬০% নারী। এক্সপো ডটকম এর মতে, বাংলাদেশ পরোক্ষভাবে আরও প্রায় ৮০ লাখ মানুষের জীবিকা এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। বিজিএমইএ এর হিসাবে, এই তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ১০–১১% অবদান রাখে। EIS-PILOT তথ্যানুসারে, বিগত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এই খাত থেকে প্রায় ৩৯.৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় হয়েছে। রপ্তানিযোগ্য পণ্যের মধ্যে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয়ের ৮০%–৮২% আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে এবং চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশ। এই পরিসংখ্যানগুলোই প্রমাণ করে যে, পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ২,৭৬৯ মার্কিন ডলার। আমাদের অর্থনীতির কলেবর ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্কযজ্ঞের বহুমূখীতাকরন জরুরি। যদিও বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকার 'রিকভারি, রিস্টোরেশন অ্যান্ড রি-কনস্ট্রাকশন' (পুনরুদ্ধার, পুনরুজ্জীবিতকরণ ও পুনর্গঠন) ভিত্তিক একটি নতুন উন্নয়ন মডেল নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু দৃশ্যমান অগ্রগতি চোখে পড়ার মত নয়।
এই যে পোশাক শিল্প যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৮০ লাখ মানুষের জীবন জীবিকা জড়িত। যখনই এই শিল্পে অস্থিরতা দেখা দেয়, তখনই অর্থনীতিবিদ এবং সরকারের কপালে কালো ভাঁজ পড়ে যায়। কেন? কারন - তখন শুধু কারখানার মালিক বা শ্রমিক নয়, বরং লাখ লাখ পরিবারের জীবিকা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। দেশ ও সরকারের উপর চাপ বেড়ে যায়। এই চাপ কমানোর বিকল্প পথ এখন থেকেই রচনা করতে হবে।
এখনই সময় একটি জাতীয় বিকল্প কর্মসংস্থান পরিকল্পনা (National Employment Diversification Strategy) গ্রহণ করা। এর উদ্দেশ্য পোশাক শিল্পকে দুর্বল করা নয়, বরং এমন নতুন শিল্প ও সেবা খাত গড়ে তোলা, যাতে আগামী ১০–২০ বছরে ধীরে ধীরে লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
আজ একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—একটি দেশ আর কতদিন একটি মাত্র শিল্পের ওপর এত বেশি নির্ভর হয়ে এগিয়ে যেতে পারবে? আপনি পোশাক জামা কাপড় তৈরি করে, বিদেশে রপ্তানি করে বড়জোর খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকতে পারবেন কিন্তু মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবেন না, উন্নত রাষ্ট্র বিনির্মানের স্বপ্ন কোনকালেই দেখতে পারবেন না।
লক্ষ্য করা যায়, পোশাক শিল্পে সামান্য অস্থিরতা দেখা দিলেই দেশের অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ে। দেশ ও জাতি শংকায়, উৎকন্ঠায় পড়ে। শ্রমিক অসন্তোষ, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, ক্রেতাদের নীতিগত পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক সংকট, জ্বালানি সংকট বা বৈশ্বিক মন্দা—এসবের যেকোনো একটি ঘটনা রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে। অর্থাৎ, একক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। উন্নত বিশ্বের অর্থনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা কখনোই একক শিল্পের ওপর দাঁড়িয়ে থাকেনি। তারা একই সঙ্গে প্রযুক্তি, গবেষণা, কৃষি, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, জাহাজ নির্মাণ, সেবা খাত, পর্যটন, শিক্ষা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করেছে। ফলে কোনো একটি খাতে সমস্যা হলেও পুরো অর্থনীতি ভেঙে পড়ে না।
বাংলাদেশেরও এখন সেই পথেই হাঁটার সময় এসেছে। পোশাক শিল্পকে অবশ্যই আরও শক্তিশালী করতে হবে, তবে একই সঙ্গে নতুন নতুন অর্থনৈতিক খাতের ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। আমাদের সামনে সম্ভাবনার অনেক ক্ষেত্র রয়েছে। অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রাখতে ও ঝুঁকি কমাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বহুমুখীকরণ এখন সময়ের দাবি।
প্রথমত, কৃষিভিত্তিক শিল্প ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ
কৃষিকে কাজে লাগাতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টেকসই ও বহুমুখী করতে হলে কৃষিকে শুধু উৎপাদন নয়, শিল্পে রূপান্তর করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত "Farm to Market" বা "Field to Supermarket" মডেল বাস্তবায়ন করা। অর্থাৎ, ফসল মাঠ থেকে সংগ্রহ করার পর দীর্ঘ মধ্যস্বত্বভোগী-নির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তে উৎপাদন এলাকার কাছেই ধোয়া, বাছাই, গ্রেডিং, প্যাকেজিং, কোল্ড স্টোরেজ এবং প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
এরপর সেই পণ্য সরাসরি সুপারশপ, রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কিংবা ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিতে হবে।আমি থাইল্যান্ডে এ ধরনের কৃষি-শিল্প ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র দেখেছি। সেখানে কৃষিপণ্য শুধু উৎপাদনই হয় না; মাঠের কাছেই মান নিয়ন্ত্রণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, ব্র্যান্ডিং এবং প্যাকেজিং সম্পন্ন করে বাজারজাত করা হয়। এ ধরনের সমন্বিত মূল্যশৃঙ্খল (Value Chain) কৃষকের আয় বাড়ায়, পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখে, খাদ্য অপচয় কমায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা হ্রাস করে। বাজারমুখী কৃষি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, গ্রেডিং, ব্র্যান্ডিং এবং সুপারমার্কেটের সঙ্গে কৃষকদের সংযোগ জোরদারের নানা উদ্যোগ এ ধরনের মডেলকে শক্তিশালী করেছে।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। দেশের প্রত্যেক অঞ্চলে এগ্রো-প্রসেসিং হাব গড়ে তোলা প্রয়োজন। সেখানে থাকবে আধুনিক কোল্ড চেইন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাবরেটরি, প্যাকেজিং ইউনিট এবং দক্ষ লজিস্টিকস ব্যবস্থা। এতে একদিকে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন, অন্যদিকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে মানসম্মত কৃষিপণ্য সরবরাহ করা সহজ হবে।
পোশাক শিল্প যেমন বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তুলেছে, তেমনি কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন আগামী কয়েক দশকে নতুন কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হতে পারে। এই ধারণাটি বাস্তবায়িত হলে কৃষক, ভোক্তা এবং জাতীয় অর্থনীতি—তিন পক্ষই লাভবান হবে। এটি শুধু কৃষি উন্নয়নের নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিল্পায়নেরও একটি শক্তিশালী রূপরেখা হবে। বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশ কৃষিতে সফল হলেও মূল্য সংযোজিত খাদ্যপণ্য (Value-added products) রপ্তানিতে এখনো অনেক পিছিয়ে। আধুনিক প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হিমায়িত পণ্য, মসলা, ফল, সবজি, দুগ্ধ ও মাংসজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার বিশাল।
দ্বিতীয়ত, তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (AI) অর্থনীতি গড়ে তোলার বিকল্প নেই। বিশ্ব দ্রুত ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সফটওয়্যার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স, চিপ ডিজাইন, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (BPO) এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার বৈশ্বিক বাজার প্রতিবছরই সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও হাজার হাজার আইটি প্রতিষ্ঠান, বিপুলসংখ্যক ফ্রিল্যান্সার এবং তরুণ প্রযুক্তিকর্মী এই খাতে কাজ করছেন, যা ভবিষ্যতের আরও বড় সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। তাই এখনই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত একক পোশাক শিল্পের ওপর অতিনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে অর্থনীতিকে বহুমুখী করা। এর অর্থ পোশাক শিল্পকে দুর্বল করা নয় বরং তার পাশাপাশি নতুন নতুন শক্তিশালী খাত গড়ে তোলা।
পোশাক শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে পুনঃদক্ষতা (Reskilling) ও দক্ষতা উন্নয়ন (Upskilling) কর্মসূচি চালু করা দরকার। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে সফটওয়্যার উন্নয়ন, AI, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল মার্কেটিং, ই-কমার্স, রোবোটিক্স, অটোমেশন এবং অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় প্রশিক্ষিত করতে হবে। এতে ভবিষ্যতে তারা শুধু দেশের বাজারেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও দক্ষ জনশক্তি হিসেবে কাজ করতে পারবে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। দক্ষতা উন্নয়ন ও ডিজিটাল খাতে বিনিয়োগকে ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোও গুরুত্ব দিচ্ছে।
তৃতীয়ত, ওষুধ ও বায়োটেকনোলজি শিল্পকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। দেশের প্রায় ৯৮% ওষুধের চাহিদা দেশীয় প্রতিষ্ঠানই পূরণ করছে এবং বাংলাদেশ ১৫০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। এখন এই খাত শুধু জেনেরিক ওষুধেই সীমাবদ্ধ নয়; উচ্চমূল্যের ওষুধ, বায়োটেকনোলজি, ভ্যাকসিন, অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (API) এবং গবেষণাভিত্তিক ওষুধ উৎপাদনের দিকেও এগিয়ে যাচ্ছে।
একক পোশাক শিল্পের ওপর অতিনির্ভরতা কমাতে হলে ওষুধ শিল্পকে আগামী দিনের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতে পরিণত করতে হবে। এজন্য গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বায়োটেকনোলজি গবেষণা, API উৎপাদনে স্বনির্ভরতা, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
একই সঙ্গে দেশের বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে তরুণদের ফার্মাসিউটিক্যাল উৎপাদন, বায়োটেকনোলজি, ল্যাবরেটরি প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ (Quality Control), গবেষণা, ক্লিনিক্যাল ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং চিকিৎসা-প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষিত করতে হবে। এর ফলে পোশাক শিল্পের পাশাপাশি আরেকটি শক্তিশালী শিল্পভিত্তি গড়ে উঠবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
চতুর্থত, জাহাজ নির্মাণ, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও চামড়া শিল্পকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। এসব খাতে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক, ভৌগোলিক ও মানবসম্পদের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ছোট ও মাঝারি আকারের জাহাজ বিদেশে রপ্তানি করছে, হালকা প্রকৌশল শিল্প দেশের উৎপাদন খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, ইলেকট্রনিকস শিল্প ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির চাহিদা বিশ্বব্যাপী দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। একইভাবে পরিবেশসম্মত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারও অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।
কিন্তু সম্ভাবনা থাকলেই হবে না; এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি, আধুনিক প্রযুক্তি হস্তান্তর, গবেষণা ও উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন অবকাঠামো এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্পাঞ্চল ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) কার্যকর করা, সহজ ঋণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক মানের মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশের বিপুল কর্মক্ষম যুবসমাজকে এসব খাতের উপযোগী কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আজ যারা কেবল একটি শিল্পের ওপর নির্ভরশীল, তাদের ধীরে ধীরে বহুমুখী দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তিতে রূপান্তর করতে পারলে নতুন নতুন শিল্পে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অর্থনীতির ঝুঁকিও অনেক কমে আসবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুবসমাজ। বিশেষ করে কর্মক্ষম তরুন যুবসমাজ। বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যার বোনাসকাল সময় পার করছে। এদেরকে সম্পদে পরিনত করতে হবে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করছে। যদি তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কাজে লাগানো না যায়, তাহলে এই জনশক্তি আশীর্বাদের পরিবর্তে বোঝায় পরিণত হতে পারে। দেশে সার্টিফিকেট সর্বস্ব শিক্ষার প্রয়োজন নেই। সনদ নির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে কর্মনির্ভর শিক্ষার প্রসার ঘটানো খুবই জরুরি। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে তারাই হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সম্পদ।
পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পকারখানার মধ্যে কার্যকর সংযোগও অত্যন্ত জরুরি। গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি যদি শিল্পে ব্যবহার না হয়, তবে গবেষণার প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি হয় না। "জ্ঞান থেকে সম্পদ" (Knowledge to Wealth) তৈরির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্যময় করতে হবে, টেকসই অবকাঠামো, সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসা ও বিনিয়োগের সুস্থ পরিবেশ দিতে হবে। কোন ধরনের উৎপাত প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে চান। উন্নয়ন ও অর্থনীতির চাকা ধরে রাখতে চাইলে উৎপাতমুক্ত পরিবেশের শতভাগ নিশ্চয়তার পাশাপাশি নীতির প্রশ্নে আপোষহীনতা হতে পারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি।
সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, উৎপাদন, রপ্তানি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং বিদেশে শ্রমিক পাঠিয়ে অর্জিত রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা কঠিন। এই দুই খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য এগুলোই একমাত্র ভরসা হতে পারে না। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি রূপান্তরিত করা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মতে, এটি কেবল একটি ফাঁকা স্লোগান নয়, বরং একটি সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা।
বাংলাদেশ বর্তমানে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ এতদিন ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপানসহ অনেক দেশে শুল্কমুক্ত (Duty-Free) বা স্বল্প শুল্কে পণ্য রপ্তানির বিশেষ সুবিধা পেয়েছে। রপ্তানি প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ এগিয়ে থাকতে পেরেছে। কিন্তু এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এই বিশেষ সুবিধার একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে কমে যাবে বা শেষ হবে। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২৪ নভেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত বাংলাদেশ এলডিসিভুক্ত দেশের বিশেষ বাণিজ্য সুবিধার আওতায় থাকবে। এরপর অনেক দেশে শুল্কমুক্ত রপ্তানির সুবিধা ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে। এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) উত্তরণের পর বিভিন্ন দেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা কমে যাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধান এবং বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (Free Trade Agreement) ও সেপা (Comprehensive Economic Partnership Agreement) করার ওপর সরকারকে আরো জোর দিতে হবে।
সবশেষে একটি বিষয় স্পষ্ট পোশাক শিল্প বাংলাদেশের গর্ব, কিন্তু সেটিই বাংলাদেশের ভবিষ্যতের একমাত্র ভরসা হতে পারে না। একটি শক্তিশালী অর্থনীতি দীর্ঘসময় ব্যাপী কখনোই এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, তার একাধিক ভিত্তি থাকতে হবে। আজ থেকেই যদি আমরা বহুমুখী শিল্পায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি এবং দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্ব দিই, তাহলে বাংলাদেশ শুধু একটি রপ্তানিনির্ভর দেশ নয়, বরং উদ্ভাবন, শিল্প ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারবে।
সময় এসেছে নতুন প্রশ্ন করার আমরা কি শুধু পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হয়ে থাকতে চাই, নাকি বহুমুখী উৎপাদন, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির কাতারে দাঁড়াতে চাই? সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক দশকের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ।
অতএব অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা জরুরি। তখন পোশাক শিল্পে সাময়িক সংকট এলেও দেশের অর্থনীতির চাকা থেমে যাবে না, এবং যুবসমাজের জন্য নতুন নতুন কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মুক্ত হবে। এটি শুধু অর্থনীতির প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের প্রশ্ন।
বাংলাদেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নির্ভর করবে এই বাস্তবতার ওপর একটি শিল্প নয়, বহু শিল্প; একটি রপ্তানি পণ্য নয়, বহুমুখী রপ্তানি; একটি কর্মসংস্থান নয়, দক্ষতাভিত্তিক বহুমাত্রিক কর্মসংস্থান। এই রূপান্তরই হবে টেকসই ও শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত্তি। এক হাতে পোশাক শিল্প, অন্য হাতে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি এই ভারসাম্যই ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে।