কৃষিবিদ মুহাম্মদ তাহাজ্জত আলী:রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন সচিবালয় নির্মাণের প্রস্তাবে মন্ত্রিসভার নীতিগত অনুমোদনের পর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। গত ২৭ অক্টোবর সচিবালয়ের প্রস্তাবিত ভবনের জন্য মাঠটিতে মাটি পরীক্ষার কাজ শুরু হলে শিক্ষার্থীরা তাতে বাধা দেন। পরদিনও তাঁরা আন্দোলন করেন। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত এই জমি বিশ্ববিদ্যালয়কে ফিরিয়ে দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা একেবারে অমূলক নয়। কারণ, একটি প্রতিষ্ঠানকে তার প্রয়োজনীয় গবেষণাক্ষেত্র থেকে ধীরে ধীরে বঞ্চিত করার অভিজ্ঞতা এলাকার ইতিহাসেই রয়েছে।
১৯৩৮ সালের ১১ ডিসেম্বর অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ঢাকার তেজগাঁওয়ে বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। এরও আগে ১৯০৮ সালে এখানে প্রায় ৪০৩ একর জমিতে ঢাকা ফার্ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সংসদ ভবনসহ শেরেবাংলা নগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় একসময় কৃষি গবেষণা ও ব্যবহারিক শিক্ষার পরিবেশ ছিল। সময়ের সঙ্গে নগরায়ণ ও সরকারি স্থাপনা সম্প্রসারণের ফলে সেই কৃষি গবেষণার জমি ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসের আয়তন প্রায় ৮৭ একর। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দাবি, পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠটিও তাদের ঐতিহাসিক গবেষণাক্ষেত্রের অংশ।
আশির দশকে এরশাদ সরকারের সময় বাণিজ্য মেলার মাঠ হিসেবে জমিটি ব্যবহারের জন্য নেওয়া হয়েছিল বলে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য। ২০২১ সাল থেকে সেখানে বাণিজ্য মেলা আয়োজন বন্ধ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থীরা জমিটি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। বিষয়টি নিয়ে তাঁদের আইনগত উদ্যোগও রয়েছে। অথচ সেই জমি গবেষণার কাজে ফিরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে সেখানে নতুন সচিবালয় নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। অবশ্য জমির মালিকানা ও ব্যবহারাধিকারের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে হবে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, ভূমি রেকর্ড ও আইনগত দলিল যাচাই করে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে রাজধানীর বুকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আদৌ প্রয়োজন আছে কি? আমার উত্তর, অবশ্যই আছে। বরং ঢাকা শহরের বর্তমান পরিবেশগত বাস্তবতায় একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে অনেক বেশি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানীতেও কৃষি শিক্ষা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। ভারতের নয়াদিল্লিতে ইন্ডিয়ান এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট (IARI), চীনের বেইজিংয়ে চায়না এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটি এবং জাপানের টোকিওতে টোকিও ইউনিভার্সিটি অব এগ্রিকালচার তার উদাহরণ। অর্থাৎ রাজধানীতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থাকা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। কৃষি গবেষণা এখন শুধু গ্রামের মাঠে ফসল উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নগর কৃষি, ছাদকৃষি, নিরাপদ খাদ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, নগর বনায়ন, মাটির স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনাও আধুনিক কৃষিশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ঢাকার মতো জনবহুল ও দূষণপ্রবণ শহরে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় একটি সবুজ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করতে পারে। চারপাশের ইট-পাথরের ভবনের মধ্যে এর গাছপালা, গবেষণামাঠ, উন্মুক্ত জমি ও জলাধার শহরের জন্য একধরনের সবুজ ফুসফুস। এগুলো তাপমাত্রা প্রশমনে, বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশে এবং পাখি ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের আবাস তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা ও নগরবাসী কৃষি, গাছপালা, খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশ সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ পাবে।
অন্যদিকে, ৩১ দশমিক ৫৮ একর জমিতে ১৪টি ১২ তলাবিশিষ্ট ভবন এবং প্রায় ৩ হাজার ৮০০টি গাড়ি রাখার ব্যবস্থা করে সচিবালয় নির্মিত হলে এই এলাকায় মানুষের ও যানবাহনের চলাচল বাড়বে। প্রকল্পে সবুজ পরিসর ও জলাধারের পরিকল্পনা থাকলেও এত বড় প্রশাসনিক কেন্দ্রের সামগ্রিক পরিবেশগত প্রভাব গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। আশপাশের সড়কে যানজট, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ ও তাপমাত্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। পাশের জিয়া উদ্যান ও অন্যান্য সবুজ এলাকার পরিবেশও এর প্রভাবের বাইরে থাকবে না। কাছাকাছি জাতীয় পর্যায়ের হাসপাতাল থাকায় জরুরি রোগী পরিবহন ও অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, পরিকল্পনাহীন সম্প্রসারণ চলতে থাকলে আজকের এই তুলনামূলক খোলামেলা এলাকাও ভবিষ্যতে পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও নাগরিক সমস্যায় জর্জরিত এলাকায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একটি সচিবালয় নির্মাণের সিদ্ধান্ত তাই শুধু বর্তমান সরকারের প্রশাসনিক প্রয়োজন দিয়ে বিচার করা ঠিক হবে না। এর প্রভাব আগামী কয়েক প্রজন্মকে বহন করতে হতে পারে।
আমাদের মনে রাখা দরকার, সচিবালয় স্থানান্তরের আলোচনা নতুন নয়। গুলিস্তানের বর্তমান সচিবালয় এলাকার যানজট, স্থানসংকট ও নাগরিক সমস্যার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই বিকল্প স্থানের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু একটি এলাকার সমস্যা কমাতে গিয়ে ঢাকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সবুজ ও শিক্ষাগত সম্পদকে একই ধরনের চাপের মুখে ফেলা কি সঠিক পরিকল্পনা?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ করেছে। ব্রাজিলের রাজধানী রিও ডি জেনেইরো থেকে ব্রাসিলিয়ায় এবং পাকিস্তানের করাচি থেকে ইসলামাবাদে স্থানান্তরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এসব উদাহরণ থেকে অন্তত একটি শিক্ষা নেওয়া যায়—প্রশাসনিক কেন্দ্রের অবস্থান নির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা ও জনবসতির ভারসাম্য বিবেচনা করা জরুরি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঢাকার আশপাশে উপযুক্ত স্থানে সচিবালয় স্থাপন এবং পর্যায়ক্রমে সরকারি দপ্তর বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।
আমার বিবেচনায়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক গবেষণাক্ষেত্র ফিরিয়ে দিয়ে সেখানে আধুনিক নগর কৃষি গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। সচিবালয়ের জন্য বিকল্প স্থান নির্ধারণে যানবাহন চলাচল, যোগাযোগব্যবস্থা, পরিবেশগত প্রভাব ও ভবিষ্যৎ নগরায়ণ বিবেচনা করে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।
একটি সচিবালয় নির্মাণের জন্য জমি পাওয়া সম্ভব, প্রয়োজনে নতুন অবকাঠামোও তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু ১৯৩৮ সাল থেকে কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, তাকে বারবার সংকুচিত করে সেই ক্ষতি পূরণ করা যাবে না।
উন্নয়ন মানে শুধু নতুন ভবন নির্মাণ নয়; উন্নয়ন মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ সংরক্ষণও। তাই শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও সংকুচিত করা বা একসময় স্থানান্তরের আশঙ্কা তৈরি করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়টি রাজধানীর বুকেই থাকুক, তার ঐতিহাসিক গবেষণাক্ষেত্র ফিরে পাক। আর সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ হোক ঢাকার বাইরে পরিকল্পিত বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে।
ঢাকায় প্রশাসনিক ভবনের প্রয়োজন আছে, কিন্তু ঢাকার বেঁচে থাকার জন্য সবুজেরও প্রয়োজন আছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে সরিয়ে নয়, বরং তার গবেষণাক্ষেত্র ও ঐতিহ্য রক্ষা করেই একটি বাসযোগ্য রাজধানী গড়ে তুলতে হবে।
লেখক: শেকৃবির সাবেক শিক্ষার্থী ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ঢাকাস্থ শিবগঞ্জ উপজেলা(বগুড়া) কল্যাণ সমিতি।