ড. মো. জামিনুর রহমান:ডিম আমাদের খাদ্যতালিকার পরিচিত ও সহজলভ্য প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস। কিন্তু ডিমের দাম বাড়লে বা কমলে আলোচনাটি সাধারণত সীমাবদ্ধ থাকে উৎপাদন ব্যয় ও বাজারদরের মধ্যে। তবে প্রশ্ন হলো, একটি ডিমের দাম নির্ধারণে শুধু উৎপাদন খরচই কি যথেষ্ট? নাকি ডিমের পুষ্টিমান, উৎপাদকের ন্যায্য আয়, বাজারজাতকরণ ব্যয় এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত?
ডিমের মূল্যকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে এসকল প্রশ্ন একই কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ একটি খাদ্যপণ্যের দাম শুধু বাজারের একটি সংখ্যা নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে উৎপাদকের টিকে থাকা, ভোক্তার খাদ্যাভ্যাস এবং মানুষের পুষ্টি গ্রহণের সক্ষমতা।
ডিমের দাম নির্ধারণে কী কী বিবেচনায় আসবে?
প্রথমত, উৎপাদন ব্যয়। একটি ডিম উৎপাদনে মুরগির খাদ্য, বাচ্চা, ওষুধ ও টিকা, শ্রম, বিদ্যুৎ, পানি, খামার ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় রয়েছে। এসব ব্যয়ের প্রকৃত চিত্র জানতে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য জরিপ প্রয়োজন। অঞ্চল ও সময়ভেদে উৎপাদন ব্যয়ের পরিবর্তনও বিবেচনায় নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, উৎপাদকের ন্যায্য মার্জিন। উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে এমন একটি যুক্তিসঙ্গত মুনাফা থাকতে হবে, যাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারেন। বাজারদর যদি দীর্ঘ সময় উৎপাদন ব্যয়ের নিচে থাকে, তাহলে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং ভবিষ্যতে উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। আবার অস্বাভাবিক উচ্চ মূল্যও দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তার জন্য চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য জরুরি।
তৃতীয়ত, বাজারজাতকরণ ব্যয়। খামার থেকে ভোক্তার হাতে ডিম পৌঁছানো পর্যন্ত বস্তুত পরিবহন, বাছাই, সংরক্ষণ, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে ব্যয় হয়। তাই খামারি পর্যায়ের দাম ও ভোক্তা পর্যায়ের দামের পার্থক্য বিশ্লেষণ করতে হলে এসব যৌক্তিক ব্যয় হিসাবের মধ্যে আনতে হবে। একই সঙ্গে অস্বাভাবিক মধ্যস্বত্বভোগী বা বাজার বিকৃতির কারণে অতিরিক্ত মূল্য তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও নজরে রাখা প্রয়োজন।
চতুর্থত, ডিমের পুষ্টিমান। একটি ডিম শুধু একটি নির্দিষ্ট ওজনের খাদ্যপণ্য নয়; এর মধ্যে রয়েছে প্রোটিন, শক্তি, ভিটামিন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান। বাংলাদেশের খাদ্য উপাদানসংক্রান্ত প্রামাণ্য তথ্য এবং আন্তর্জাতিক গবেষণায় ডিমের পুষ্টিগত গুরুত্ব উঠে এসেছে। তাই মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু প্রতি ডিমের দাম নয়, প্রতি টাকায় ভোক্তা কতটা পুষ্টি পাচ্ছেন সেটিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
সবশেষে, ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা। স্বাস্থ্যকর খাদ্যের দাম শুধু উৎপাদন ব্যয় দিয়ে বিচার করা যায় না। খাদ্যদ্রব্যের দাম মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি গ্রহণের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ‘স্বাস্থ্যকর খাদ্যের ক্রয়ক্ষমতা’ বিষয়ক নীতিতেও স্থানীয় বাজারে সবচেয়ে কম ব্যয়ে স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয়টিতেও গুরুতরূপ করা হয়েছে।
পুষ্টির তুলনায় ডিম কি ব্যয়-সাশ্রয়ী?
ডিমের বিশেষত্ব হলো তুলনামূলক সহজলভ্যতার পাশাপাশি এটি উচ্চমানের প্রোটিন ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে। তাই ডিমের মূল্যায়ন শুধু বাজারদরের ভিত্তিতে করলে তার প্রকৃত খাদ্যগত গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা দায়।
বৈশ্বিক পর্যায়ের গবেষণাতেও ডিমকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান সরবরাহের ক্ষেত্রে ব্যয়-দক্ষ খাদ্য হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের বাজারে ডিমের মূল্য নির্ধারণে বিদেশি গবেষণার ফল সরাসরি প্রয়োগ করা যাবে না। বাংলাদেশের উৎপাদনব্যয়, বাজারব্যবস্থা, আয়স্তর ও খাদ্যাভ্যাস আলাদা। এসব গবেষণা বরং ডিমের দাম ও পুষ্টিমানকে একসঙ্গে মূল্যায়নের একটি পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে।
অর্থাৎ ডিমের পুষ্টিমান গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু পুষ্টিগুণের ভিত্তিতে এর বাজারদর নির্ধারণ করা যাবে না। একইভাবে শুধু উৎপাদন ব্যয়ের ভিত্তিতেও এর যথার্থ মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
ডিমের মূল্য কি যথার্থ?
উপরের আলোচনা থেকে সরাসরি একটি নির্দিষ্ট ‘আদর্শ দাম’ নির্ধারণ করা বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তিযুক্ত হবে না। কারণ ডিমের দাম অঞ্চল, সময়, ডিমের আকার, উৎপাদন পদ্ধতি এবং বাজারের বিভিন্ন পর্যায়ের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।
তবে একটি যথার্থ মূল্য বলতে এমন একটি মূল্যস্তর বোঝানো যেতে পারে, যা একই সঙ্গে—
১. উৎপাদকের প্রকৃত খরচ ও যুক্তিসঙ্গত মুনাফা নিশ্চিত করে;
২. বাজারজাতকরণের যৌক্তিক ব্যয় প্রতিফলিত করে;
৩. অস্বাভাবিক মধ্যস্বত্বভোগী বা বাজার বিকৃতির কারণে অতিরিক্ত মূল্য সৃষ্টি না করে;
৪. ডিমের উচ্চ পুষ্টিমানকে বিবেচনায় নেয়; এবং
৫. সাধারণ পরিবারের জন্য ডিমকে একটি সাশ্রয়ী প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস হিসেবে বজায় রাখে।
অর্থাৎ ‘যথার্থ দাম’ কোনো একক সংখ্যা নয়; এটি উৎপাদকের স্থায়িত্ব ও ভোক্তার সামর্থ্যের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ একটি মূল্যস্তর।
বাজারদরের ব্যবধান কেন গুরুত্বপূর্ণ?
খামারি পর্যায়ে একটি ডিম যে দামে বিক্রি হচ্ছে, ভোক্তা পর্যায়ে তার দাম সবসময় একই থাকবে না। পরিবহন, বাছাই, সংরক্ষণ, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের যৌক্তিক ব্যয় এর সঙ্গে যুক্ত হবে। কিন্তু খামারি ও ভোক্তার দামের মধ্যে ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে প্রশ্ন উঠতেই পারে- এই অতিরিক্ত মূল্য কোথায় তৈরি হচ্ছে?
এ কারণে খামারি পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত দামের গতিপ্রকৃতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বাজারদরসংক্রান্ত তথ্য এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় সম্পর্কেও নিয়মিত সরকারি তথ্য প্রয়োজন, যাতে বাজারদর নিয়ে আলোচনা অনুমাননির্ভর না হয়ে তথ্যনির্ভর হয়।
সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনেও ডিমের বাজারদর, উৎপাদন ব্যয় এবং খামারিদের লোকসানের বিষয়টি উঠে এসেছে। বিশেষ করে সরবরাহ সংকট, পরিবহন ব্যয় কিংবা বাজারের ওঠানামা ডিমের দামে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে বাজারের একটি নির্দিষ্ট দিনের দাম দিয়ে পুরো খাতের ন্যায্যতা বিচার করা যথেষ্ট নয়।
নীতিগত করণীয়
বাংলাদেশে ডিমের মূল্য স্থিতিশীল ও ন্যায্য রাখতে কয়েকটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
প্রথমত, ডিম উৎপাদনের প্রকৃত ব্যয় সম্পর্কে নিয়মিত ও স্বচ্ছ সরকারি জরিপ প্রয়োজন। খাদ্য, টিকা, শ্রম, বিদ্যুৎসহ উৎপাদনের প্রধান উপাদানগুলোর ব্যয় অঞ্চল ও সময়ভেদে কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, তা নিয়মিতভাবে তুলে ধরতে হবে।
দ্বিতীয়ত, খামারি পর্যায় ও খুচরা পর্যায়ের দামের ব্যবধান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা দরকার। এতে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে মূল্যবৈষম্যের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা সহজ হবে।
তৃতীয়ত, উৎপাদন সংকটের সময় সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সাময়িক সমস্যা তৈরি হলে তার প্রভাব যেন অস্বাভাবিকভাবে ভোক্তা ও উৎপাদক দুই পক্ষের কোনো পক্ষের ওপরই না পড়ে, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার।
চতুর্থত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করা যেতে পারে। খাদ্য, টিকা, প্রযুক্তি ও ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ উন্নত হলে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং খামারিদের টিকে থাকা সহজ হতে পারে।
একই সঙ্গে পুষ্টিনীতিতে ডিমকে শুধু একটি বাজারজাত পণ্য হিসেবে নয়, সাশ্রয়ী প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত। কারণ খাদ্যের দাম মানুষের পুষ্টি গ্রহণের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যের মূল্য এবং মানুষের তা কেনার সক্ষমতার সম্পর্কের ওপর FAO-ও গুরুত্ব দিয়েছে।
শুধু বাজার নয়, পুষ্টির দৃষ্টিও জরুরি
ডিমের বাজারদর নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় ভুলে যাই, এর শেষ ব্যবহারকারী একজন মানুষ। তার আয় সীমিত হলে খাদ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে হয়তো ডিমের পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারেন অথবা খাদ্যতালিকা থেকে এটি বাদ দিতে পারেন।
অন্যদিকে, ডিমের দাম এমন পর্যায়ে নেমে গেলে যেখানে উৎপাদক নিয়মিত লোকসানের মুখে পড়েন, তখনও সেটি দীর্ঘমেয়াদে ভালো পরিস্থিতি নয়। কারণ উৎপাদন টেকসই না হলে ভবিষ্যতে সরবরাহ কমে গিয়ে বাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
তাই ডিমের বাজারে প্রয়োজন এমন একটি ভারসাম্য, যেখানে উৎপাদক ন্যায্য আয় পাবেন, বাজারের যৌক্তিক ব্যয় উঠে আসবে এবং ভোক্তাও তার সামর্থ্যের মধ্যে প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণ করতে পারবেন।
উপসংহার
বাংলাদেশে ডিমের মূল্য পুষ্টিগুণের তুলনায় যথার্থ কি না এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ‘ডিম সস্তা’ অথবা ‘ডিম দামি’ এই দুইভাবে দেওয়া যায় না। ডিমের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এর উচ্চমানের প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়, বাজারজাতকরণ ব্যয়, উৎপাদকের ন্যায্য আয় এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি।
ডিমের পুষ্টিমান এটিকে একটি মূল্যবান খাদ্য করে তোলে; কিন্তু পুষ্টিমান একাই বাজারদর নির্ধারণ করতে পারে না। একইভাবে উৎপাদন ব্যয়ও একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না। কারণ অতিরিক্ত মূল্য হলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য ডিমের পুষ্টিগত সুবিধা কমে যায়।
সুতরাং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডিমের যথার্থ মূল্য নির্ধারণে শুধু উৎপাদন ব্যয় নয়; উৎপাদকের ন্যায্য মুনাফা, যৌক্তিক বাজারজাতকরণ ব্যয়, পুষ্টিমান এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে একটি সমন্বিত মূল্যায়ন কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।
অর্থাৎ ডিমের ন্যায্য মূল্য এমন হওয়া উচিত, যাতে খামারি টেকসইভাবে উৎপাদন করতে পারেন এবং একই সঙ্গে সাধারণ মানুষও নিয়মিত ডিম কিনে প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণ করতে পারেন। উৎপাদকের টিকে থাকা ও ভোক্তার পুষ্টি এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হলেই ডিমের বাজারদরকে অর্থনৈতিক ও পুষ্টিগত—উভয় দিক থেকে অধিকতর যথার্থ বলা সম্ভব হবে।
লেখক:সহকারী অধ্যাপক ও সহকারী প্রোক্টর, গণ বিশ্ববিদ্যালয়
বিভাগীয় প্রধান, এনিমেল প্রোডাকশন বিভাগ
ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিমেল সায়েন্সেস অনুষদ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়