কৃষিবিদ মুহাম্মদ তাহাজ্জত আলী:অবিভক্ত বাংলা যখন ব্রিটিশ শাসনের শোষণ, দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষে বিপর্যস্ত, তখন কৃষির উন্নয়নকেই মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। তাঁর উদ্যোগ ও কৃষিশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধির ধারাবাহিকতায় ১৯৩৮ সালের ১১ ডিসেম্বর ঢাকার শেরেবাংলা নগরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট’। এরও আগে, ১৯০৮ সালে ঢাকার তেজগাঁও অঞ্চলে প্রায় ৪০৩ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘ঢাকা ফার্ম’, যা ‘মনিপুরী ফার্ম’ নামেও পরিচিত ছিল। এই কৃষি খামারকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে এলাকাটি ‘ফার্মগেট’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯২০ সালের কোলকাতা গেজেটের মাধ্যমে কৃষিশিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রায় ২৯৮ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়ে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৪৩ সালে প্রথম ২০ জন শিক্ষার্থী কৃষিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। সময়ের পরিক্রমায় নাম ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সেই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটিই আজকের শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নিয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে কৃষিশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির জন্য প্রায় ২৯৮ একর জমি বরাদ্দ ছিল। কিন্তু নগরায়ণ ও শেরেবাংলা নগরের সরকারি স্থাপনা সম্প্রসারণের চাপে সেই বিস্তৃত গবেষণাক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস প্রায় ৮৭ একরে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, আশির দশকে এরশাদ সরকারের সময় অবশিষ্ট জমির একটি অংশ বাণিজ্য মেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহারের জন্য নেওয়া হয়। ২০২১ সাল থেকে সেখানে বাণিজ্য মেলা আয়োজন বন্ধ হওয়ার পর জমিটি ফেরত পেতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থীরা দাবি জানিয়ে আসছেন এবং আইনগত উদ্যোগও নিয়েছেন। কিন্তু গবেষণার কাজে জমিটি ফিরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে সেখানে নতুন সচিবালয় নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। অবশ্য জমির মালিকানা ও ব্যবহারাধিকারের বিষয়টি সরকারি নথি ও আইনগত দলিলের ভিত্তিতেই নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে, দেশের জনসংখ্যা, খাদ্যের চাহিদা, কৃষির বহুমুখী সমস্যা এবং শিক্ষা ও গবেষণার পরিধি ক্রমেই বেড়েছে। এমন বাস্তবতায় দেশের কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার ঐতিহাসিক এই প্রতিষ্ঠানের জমি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে, রাজধানীর মধ্যে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন কী? বিশ্ববিদ্যালয়টি অন্য কোথাও সরিয়ে নিলে সমস্যা কোথায়? প্রশ্নটি যাঁরা তুলছেন, তাঁদের কাছে পাল্টা প্রশ্ন, একটি ঐতিহাসিক কৃষিশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে সরিয়ে নেওয়াই কি জমির সংকট সমাধানের একমাত্র পথ? নাকি বিদ্যমান জমি, ইতিহাস ও গবেষণার সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আরও বড় সম্ভাবনা তৈরির সুযোগ রয়েছে?
ইতিহাস কি শুধু স্মৃতিফলকে রাখার বিষয়?
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নিছক একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি এ অঞ্চলে আধুনিক কৃষিশিক্ষার আতুড়ঘর হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানকার কৃষিবিদেরা কৃষি গবেষণা, শিক্ষা, প্রশাসন, সম্প্রসারণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করছেন। দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, উন্নত জাত উদ্ভাবন, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, সেচ প্রযুক্তি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার দীর্ঘ যাত্রায় কৃষিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান অনস্বীকার্য।
স্বাধীনতার পর প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষের খাদ্য চাহিদা মেটানো ছিল বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ। আজ প্রায় ১৮ কোটি মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণে যে কৃষি সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে কৃষক, কৃষিবিদ, গবেষক ও কৃষিশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের শ্রম। উন্নত বীজ, ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া এই অগ্রগতি সম্ভব হতো না।
অথচ কৃষির কথা উঠলেই অনেকে একে গ্রামকেন্দ্রিক ও প্রান্তিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁরা ভুলে যান, রাজধানীর মানুষের প্রতিদিনের খাবারও আসে কৃষকের মাঠ থেকে। কৃষি গবেষণার ভিত্তি দুর্বল হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত শহরের বাজার, খাদ্যের দাম ও মানুষের জীবনযাত্রায় পড়ে।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রাজধানীতে থাকবে কেন?
কৃষির কাজ মাঠে, গ্রামে এ যুক্তি দিয়ে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। কিন্তু আধুনিক কৃষি গবেষণা কি কেবল ধান, গম, সবজি ও ফলের মাঠপর্যায়ের পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ? কৃষির সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে জীবপ্রযুক্তি, জিনোমিক্স, মাটি ও পানির গুণগত মান, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, নিরাপদ খাদ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, ডিজিটাল কৃষি এবং নগর খাদ্যব্যবস্থাপনা। এসব বিষয়ে পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণার পাশাপাশি জাতীয় নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ প্রয়োজন।
রাজধানীতে অবস্থানের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ, গবেষণার ফল নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উপস্থাপন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ঢাকায় অবস্থান মানে সব গবেষণা ঢাকায় করতে হবে, তা নয়। আবার কৃষি গবেষণার সব কার্যক্রম রাজধানীর বাইরে হলেই বেশি কার্যকর হবে, এমন সিদ্ধান্তও যুক্তিসংগত নয়। গবেষণার ধরন, জমির প্রয়োজন, পরিবেশ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিবেচনা করেই প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে।
ঢাকার মতো জনবহুল ও দূষণপ্রবণ শহরে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় একটি সবুজ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করছে। চারপাশের ইট-পাথরের ভবনের মধ্যে এর গাছপালা, গবেষণামাঠ, উন্মুক্ত জমি ও জলাধার শহরের জন্য একধরনের সবুজ ফুসফুস। এগুলো তাপমাত্রা প্রশমনে, বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশে এবং পাখি ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের আবাস তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা ও নগরবাসী কৃষি, গাছপালা, খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশ সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ পাচ্ছে।
জমি কমেছে, তাই বিশ্ববিদ্যালয় সরাতে হবে এ কেমন সমাধান?
প্রতিষ্ঠানটির জমি কেন কমেছে, কীভাবে কমেছে এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও গবেষণার জন্য কতটুকু জমি প্রয়োজন এসব প্রশ্নের জবাব আগে প্রয়োজন। জমির সংকট থাকলে তার সমাধান করতে হবে। কিন্তু সেই সমাধানের অর্থ কি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটিকে তার অবস্থান থেকে সরিয়ে নেওয়া?
একটি ভবন কয়েক বছরে নির্মাণ করা যায়। কিন্তু একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য, গবেষণার পরিবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এবং জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতা ও গবেষণা মাঠের কার্যক্রম গড়ে তুলতে লাগে কয়েক দশক। একটি গবেষণাক্ষেত্রের মাটি, দীর্ঘদিনের পরীক্ষার ফলাফল, পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য ও গবেষণার ধারাবাহিকতারও নিজস্ব মূল্য রয়েছে। নতুন জায়গায় ভবন নির্মাণ করা সম্ভব, কিন্তু সেই গবেষণাগত ইতিহাস হুবহু স্থানান্তর করা সম্ভব নয়।
আজ নগরায়ণের অজুহাতে বিশ্ববিদ্যালয় সরিয়ে নেওয়া হলে আগামী ৫০ বছর পর নতুন ক্যাম্পাসের আশপাশে নগরায়ণ ঘটলে আবার কি একই যুক্তিতে প্রতিষ্ঠানটিকে সরাতে হবে? একটি ঐতিহ্যবাহী গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে কি এভাবে বারবার স্থানান্তরের অনিশ্চয়তায় রাখা যায়? আন্তর্জাতিক গবেষণা কি বলে,তা ভাবনার বিষয় নয়কি?
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: এক ক্যাম্পাসে সব গবেষণা নয়
ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থিত প্রায় ১ হাজার ২৫০ একর আয়তনের ইন্ডিয়ান অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট (IARI), যা পুসা ইনস্টিটিউট নামে পরিচিত, এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ১৯০৫ সালে বিহারের পুসায় প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। ১৯৩৪ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ১৯৩৬ সালে এটি দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়। বর্তমানে দিল্লির পুসা ক্যাম্পাসে এর প্রধান কার্যক্রম পরিচালিত হলেও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে এর আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র। একইভাবে জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি অব এগ্রিকালচার টোকিওর মূল ক্যাম্পাসের পাশাপাশি আতসুগি ও হোক্কাইডোতে পৃথক ক্যাম্পাস এবং বিভিন্ন অঞ্চলে গবেষণা খামার পরিচালনা করছে। এসব উদাহরণ থেকে স্পষ্ট, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও ব্যবহারিক কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ না রেখেও সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। তাই গবেষণার পরিধি বাড়ানোর সমাধান হিসেবে ঐতিহাসিক মূল ক্যাম্পাস স্থানান্তরের পরিবর্তে নতুন ক্যাম্পাস, আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র ও বিশেষায়িত গবেষণা খামার গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশেও কৃষি অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চল, হাওর, উপকূল ও চরাঞ্চলে বিশেষায়িত গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক অবস্থান অক্ষুণ্ণ রেখেই গবেষণার পরিধি বাড়ানো সম্ভব।
শেরেবাংলার ঐতিহ্য রক্ষা করে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হোক
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ক্যাম্পাসে জমির কোনো সংকট নেই এমন দাবি করার সুযোগ নেই। বরং গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য জমির প্রয়োজনীয়তা বাস্তবভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। তবে সমাধান খুঁজতে হবে ভবিষ্যৎমুখী পরিকল্পনায়।
বর্তমান ক্যাম্পাসের অবশিষ্ট জমি, পুরোনো স্থাপনা, গবেষণার মাঠ ও সবুজ পরিবেশের ঐতিহাসিক ও একাডেমিক মূল্য নির্ধারণ করে সেগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ঢাকার বাইরে কৃষি অঞ্চলে আধুনিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ঢাকায় বাণিজ্য মেলার মাঠে গড়ে তোলা যেতে পারে একটি আন্তর্জাতিক নগর কৃষি গবেষণা কেন্দ্র। দ্রুত নগরায়ণশীল এই মহানগরে ছাদবাগান, উল্লম্ব কৃষি, নিরাপদ খাদ্য, মাটি ও পানির দূষণ, পানি পুনর্ব্যবহার, নগর বর্জ্যের ব্যবহার, স্মার্ট গ্রিনহাউস এবং জলবায়ু সহনশীল নগর খাদ্যব্যবস্থা নিয়ে গবেষণার বিশাল ক্ষেত্র রয়েছে। এসব বিষয়ে গবেষণার জন্য ঢাকা নিজেই একটি বড় বাস্তর গবেষণাক্ষেত্র।জিনোমিক্স, বায়োটেকনোলজি, প্রিসিশন এগ্রিকালচার, ড্রোন প্রযুক্তি ও ডিজিটাল/কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক কৃষির জন্য আধুনিক পরীক্ষাগারও গড়ে তোলা যেতে পারে। এভাবে ঐতিহাসিক ক্যাম্পাস, নতুন গবেষণা অবকাঠামো এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিশেষায়িত গবেষণা কেন্দ্রকে একই একাডেমিক কাঠামোর আওতায় আনার সম্ভাবনা যাচাই করা প্রয়োজন।
সিদ্ধান্ত হোক গবেষণা ও যুক্তির ভিত্তিতে
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক সুবিধা কিংবা নতুন ভবন নির্মাণের প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া উচিত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের কৃষিশিক্ষার ইতিহাস, গবেষণার ধারাবাহিকতা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ কৃষি সক্ষমতা। তাই এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।
এ জন্য কৃষিবিদ, কৃষিবিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষাবিদ, স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ ও কৃষি অর্থনীতিবিদদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। বর্তমান ক্যাম্পাসের প্রতিটি জমির ব্যবহার ও গবেষণাগত মূল্য, আগামী ৫০ বছরের শিক্ষা ও গবেষণার জমির চাহিদা, সবুজ এলাকা ও জলাধারের পরিবেশগত গুরুত্ব, স্থানান্তরের আর্থিক ও গবেষণাগত ব্যয় এবং নতুন গবেষণা ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা নিয়ে নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা হওয়া জরুরি। সমীক্ষার ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিতে হবে।
একটি ভবন নির্মাণে কয়েক বছর লাগে, কিন্তু একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য, জ্ঞান, গবেষণার পরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে লাগে কয়েক দশক। ধ্বংস করা সহজ, গড়ে তোলা কঠিন। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষি উন্নয়নের স্বপ্নকে সংকুচিত নয়, বরং সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আরও বিস্তৃত করার সুযোগ আমাদের সামনে রয়েছে। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এক হাজার একরেরও বিশাল কৃষি গবেষণাক্ষেত্র গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন। বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ; এ দেশের মাটি, কৃষি ও কৃষিসম্পদ অমূল্য। তাই আবেগ, প্রশাসনিক সুবিধা কিংবা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে দেশের কৃষিবিজ্ঞানী, গবেষক ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতামতের ভিত্তিতে বিষয়টির গভীর পর্যালোচনা প্রয়োজন।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থানান্তর করা হয়তো প্রশাসনিকভাবে সম্ভব, কিন্তু তার ঐতিহাসিক অবস্থান, গবেষণার পরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের মূল্য কি কেবল জমির পরিমাপে নির্ধারণ করা যায়? জমির সংকট থাকলে তার সমাধান হতে পারে নতুন গবেষণা ক্যাম্পাস, আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র ও আধুনিক পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠা। সে ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক মূল ক্যাম্পাস সংরক্ষণ এবং গবেষণার পরিধি সম্প্রসারণ দুটিই গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
সচিবালয় একটি সরকারের প্রশাসনিক কেন্দ্র; আর একটি আন্তর্জাতিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র হতে পারে বহু প্রজন্মের খাদ্যনিরাপত্তা, জ্ঞানচর্চা ও পরিবেশ সুরক্ষার ঠিকানা। আমরা ঢাকার বুকে আরেকটি কংক্রিটের স্থাপনা চাই না, চাই এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার গবেষণার সুফল পাবে বাংলাদেশ, উপকৃত হবে বিশ্বের নগরবাসীও। প্রশ্নটি তাই শুধু রাজধানীতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কেন, তা নয়; বরং দেশের কৃষির ভবিষ্যৎ নির্মাণে এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায়। শেরেবাংলার মাটি ও ইতিহাসকে বিসর্জন দিয়ে নয়, তাঁর কৃষি উন্নয়নের স্বপ্নকে ধারণ করেই গড়ে উঠুক আধুনিক কৃষিশিক্ষা ও আন্তর্জাতিক গবেষণার নতুন দিগন্ত।
✍️ লেখক:শেকৃবি’র সাবেক শিক্ষার্থী