শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক গবেষণাক্ষেত্র ফিরিয়ে দিয়ে ঢাকাকে নগর কৃষি, নিরাপদ খাদ্য ও পরিবেশ গবেষণার আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব
কৃষিবিদ মুহাম্মদ তাহাজ্জত আলী:একটি জমিতে কী নির্মাণ হবে, তা শুধু বর্তমান প্রয়োজন দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। দেখতে হবে, আগামী ৫০ কিংবা ১০০ বছর পর সেই জমি দেশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠ নিয়ে আজ আমাদের তেমনই একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। সেখানে নতুন সচিবালয় নির্মাণের পরিবর্তে একটি আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক নগর কৃষি গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হলে সেটি বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।
১৯০৮ সালে ঢাকার তেজগাঁও অঞ্চলে প্রায় ৪০৩ একর জমিতে ঢাকা ফার্ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৩৮ সালের ১১ ডিসেম্বর শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের উদ্যোগে সেখানে বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের যে চিন্তা তিনি ধারণ করেছিলেন, এই প্রতিষ্ঠান ছিল তারই বাস্তব প্রতিফলন। সেই সময়ের বিস্তৃত কৃষি গবেষণাক্ষেত্র আজ নগরায়ণ ও সরকারি স্থাপনা সম্প্রসারণের চাপে সংকুচিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস প্রায় ৮৭ একরে এসে দাঁড়িয়েছে। এখন আবার পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় নির্মাণের উদ্যোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্বিগ্ন করেছে। তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবি, ঐতিহাসিক গবেষণাক্ষেত্রটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হয়েও রাজধানীর বুকে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক মানের কৃষি গবেষণাকেন্দ্র রাখার প্রয়োজনীয়তা কেন অনুভব করবে না? কৃষি এখন শুধু গ্রামের মাঠে ফসল উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে নগর কৃষি, ছাদকৃষি, ভার্টিক্যাল ফার্মিং, নিরাপদ খাদ্য, খাদ্যদূষণ, নগর বনায়ন, মাটির স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কৃষিবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এসব বিষয়ে গবেষণার জন্য ঢাকা নিজেই একটি বড় বাস্তব গবেষণাক্ষেত্র।
ভারতের নয়াদিল্লিতে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৫০ একর আয়তনের Indian Agricultural Research Institute (IARI)। জাপানের Tokyo University of Agriculture-ও টোকিওর মূল ক্যাম্পাসের পাশাপাশি আতসুগি ও হোক্কাইডোতে পৃথক ক্যাম্পাস এবং বিভিন্ন অঞ্চলে গবেষণা খামার পরিচালনা করে। অর্থাৎ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও ব্যবহারিক কার্যক্রম এক জায়গায় সীমাবদ্ধ রাখতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
আমার প্রস্তাব, পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠটি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে ফিরিয়ে দিয়ে সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হোক International Centre for Urban Agriculture, Food and Environmental Research। এটি হবে আন্তর্জাতিক মানের নগর কৃষি, খাদ্য ও পরিবেশ গবেষণাকেন্দ্র। এখানে ছাদকৃষি, ভার্টিক্যাল ফার্মিং, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, মাটি ও পানির দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, নগর তাপদ্বীপ প্রভাব, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নগর বনায়ন, জীববৈচিত্র্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কৃষি প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী, গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা যাবে। FAO ও UN-Habitat-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতাও নেওয়া যেতে পারে।
এখানে শুধু গবেষণাগার ও ভবন নির্মাণ করলেই হবে না। পুরো এলাকাটিকে একটি জীবন্ত নগর কৃষি গবেষণাক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। থাকবে পরীক্ষামূলক ফসলের প্লট, ফলদ ও বনজ বৃক্ষ, ঔষধি উদ্ভিদের সংগ্রহশালা, জলাধার, প্রদর্শনী ছাদকৃষি এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহারিক কেন্দ্র। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা এখানে এসে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন সম্পর্কে হাতে-কলমে জানতে পারবে। নগরবাসীও নিরাপদ খাদ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতন হওয়ার সুযোগ পাবে।
এমন উদ্যোগের পরিবেশগত গুরুত্বও কম নয়। ঢাকা বায়ুদূষণ, তাপপ্রবাহ, জলাবদ্ধতা ও সবুজের সংকটে ভুগছে। কংক্রিটের বিস্তারের মধ্যে একটি বড় সবুজ গবেষণাক্ষেত্র গাছপালা, উন্মুক্ত মাটি ও জলাধারের মাধ্যমে তাপমাত্রা প্রশমনে, বৃষ্টির পানি শোষণে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সহায়তা করতে পারে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সবুজ বলয় ও পরিবেশ গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। ঢাকাকে বসবাসযোগ্য করার যে প্রচেষ্টা চলছে, তার সঙ্গে এমন একটি উদ্যোগ সরাসরি সম্পর্কিত।
তবে কৃষি গবেষণার জন্য বিস্তৃত জমির প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করা যায় না। সে ক্ষেত্রে আমার আরেকটি প্রস্তাব রয়েছে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস ও আন্তর্জাতিক নগর কৃষি গবেষণা কেন্দ্র ঢাকাতেই থাকুক। পাশাপাশি ঢাকা থেকে ৫০–১০০ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে উপযুক্ত জমিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন পৃথক কৃষি গবেষণা ক্যাম্পাস বা আধুনিক পরীক্ষামূলক খামার প্রতিষ্ঠা করা হোক। সেখানে ধান, গম, ডাল, তেলবীজ, উদ্যানতত্ত্ব, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, মাটি ও পানি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ুসহিষ্ণু কৃষি নিয়ে বিস্তৃত মাঠপর্যায়ের গবেষণা হবে। শিক্ষার্থীরা সেখানে আবাসিকভাবে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণও নিতে পারবে। এভাবে রাজধানীতে অবস্থান বজায় রেখেও গ্রামীণ পরিবেশে কৃষি গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ করা সম্ভব। দূরবর্তী গবেষণা খামার বা পৃথক ক্যাম্পাসের জন্য জমি নির্বাচন অবশ্যই যোগাযোগ, মাটি, পানি, গবেষণার ধরন ও দীর্ঘমেয়াদি ভূমি পরিকল্পনা বিবেচনা করে করতে হবে।
অন্যদিকে, সচিবালয়ের জন্য বিকল্প জায়গা খোঁজা অসম্ভব নয়। গুলিস্তানের বর্তমান সচিবালয়ের যানজট ও স্থানসংকটের সমাধান করতে গিয়ে শেরেবাংলা নগরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগত ও পরিবেশগত সম্পদকে নতুন চাপের মুখে ফেলা কতটা যুক্তিসংগত, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রস্তাবিত এলাকায় নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে উঠলে যানবাহন ও মানুষের চলাচল বাড়বে। এর প্রভাব আশপাশের সড়ক, জিয়া উদ্যান, হাসপাতাল এবং পরিবেশের ওপর পড়তে পারে। তাই ঢাকার আশপাশে পরিকল্পিত স্থানে সচিবালয় স্থাপন এবং পর্যায়ক্রমে সরকারি দপ্তর বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। ব্রাজিলের ব্রাসিলিয়া ও পাকিস্তানের ইসলামাবাদ প্রশাসনিক রাজধানী পরিকল্পনার আন্তর্জাতিক উদাহরণ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার বিনীত আবেদন, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবিকে শুধু জমির দাবি হিসেবে দেখবেন না। এটি বাংলাদেশের কৃষিশিক্ষার ঐতিহ্য, নগর পরিবেশ, নিরাপদ খাদ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠের মালিকানা ও ব্যবহারাধিকারের ইতিহাস যাচাই করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায্য দাবি নিষ্পত্তি করুন। সেখানে আন্তর্জাতিক নগর কৃষি গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করুন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করুন।
একটি ভবন নির্মাণে কয়েক বছর লাগে, কিন্তু একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য, জ্ঞান ও সক্ষমতা গড়ে তুলতে লাগে কয়েক দশক। ধ্বংস করা সহজ, গড়ে তোলা কঠিন। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষি উন্নয়নের স্বপ্নকে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ আমাদের সামনে রয়েছে। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো শেকৃবির জন্য এক হাজার একরের বিশাল কৃষি গবেষণাক্ষেত্র গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন। বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ; এ দেশের মাটি ও কৃষিসম্পদ অমূল্য। তাই আবেগ বা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে নয়, দেশের কৃষিবিজ্ঞানী, গবেষক ও নগর পরিকল্পনাবিদদের সমন্বয়ে বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ঢাকার মতো শহরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন থাকতেই পারে। এর উত্তর দিতে হবে গবেষণা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে উন্নত দেশগুলো কীভাবে নগর কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করছে, তা বিবেচনায় নিয়ে। এই মূল্যবান জমিকে আরেকটি প্রশাসনিক ভবনে সীমাবদ্ধ না রেখে জ্ঞান, কৃষি গবেষণা, উদ্ভাবন ও পরিবেশ সুরক্ষার কাজে ব্যবহার করা হোক।
আমার মতামত শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকাতেই থাকবে, পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠ বিশ্ববিদ্যালয়কে ফিরিয়ে দেওয়া হবে এবং সেখানে প্রতিষ্ঠিত হবে আন্তর্জাতিক মানের নগর কৃষি গবেষণা কেন্দ্র। প্রয়োজন হলে ঢাকার বাইরে পৃথক গবেষণা ক্যাম্পাস গড়ে উঠবে, কিন্তু মূল বিশ্ববিদ্যালয়কে সরানো হবে না।
সচিবালয় একটি সরকারের প্রশাসনিক কেন্দ্র; আর একটি আন্তর্জাতিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র হতে পারে বহু প্রজন্মের খাদ্যনিরাপত্তা, জ্ঞান ও পরিবেশ সুরক্ষার ঠিকানা। আমরা ঢাকার বুকে আরেকটি কংক্রিটের স্থাপনা চাই না, আমরা চাই এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার গবেষণার সুফল পাবে বাংলাদেশ, উপকৃত হবে বিশ্বের নগরবাসীও।
✍️ লেখক:শেকৃবি’র সাবেক শির্ক্ষাথী