শেকৃবি প্রতিনিধি:দেশে উন্নতমানের ভোজ্যতেল উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভরতা হ্রাস এবং ক্যানোলা চাষ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) কর্তৃক উদ্ভাবিত ‘এসএইউ ক্যানোলা-১’ জাতের আনুষ্ঠানিক বীজ হস্তান্তর কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়েছে। মানসম্মত বীজ উৎপাদন, দ্ররুত বহুগুণ বৃদ্ধি এবং কৃষক পর্যায়ে তা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি পপ্রতিষ্ঠানের কাছে এ জাতের বীজ হস্তান্তর করা হয়।
‘এসএইউ ক্যানোলা-১’ জাতটি Brassica juncea প্রজাতির একটি ক্যানোলা-গ্রেড সরিষার জাত। এ জাতের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো-এর তেলে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ইউরুসিক অ্যাসিডের মাত্রা ১ শতাংশেরও কম (<১%)। বিপরীতে এতে রয়েছে উচ্চমাত্রার স্বাস্থ্যকর ওলেইক অ্যাসিড (ওমেগা-৯) ৫১.৮ শতাংশ, লিনোলেইক অ্যাসিড (ওমেগা-৬) ৩২.৫ শতাংশ এবং লিনোলেনিক অ্যাসিড (ওমেগা-৩) ৯.৬ শতাংশ। ফলে এ জাতের তেল অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর, সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের অধ্যাপক ড. জামিলুর রহমানের গবেষণা এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি ও শেকৃবির যৌথ সহযোগিতায় এ উন্নত জাতটি উদ্ভাবিত হয়েছে। জাতটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ০৩(০১)-৪১/২৩।
এই সরিষা গাছের উচ্চতা ১৬২-১৭৫ সেন্টিমিটার, জীবনকাল ১০৫-১১০ দিন। ৪০-৪৫ দিনের মধ্যে ফুল আসে এবং ১০৫-১১০ দিনে ফল/শুঁটি হালকা বাদামি বর্ণ ধারণ করে। উচ্চফলনশীল এ জাতের হেক্টরপপ্রতি ফলন ১.৮-২.০ মেট্রিক টন। বীজে তেলের পরিমাণ পপ্রায় ৩৮ শতাংশ। গাছ লম্বা হওয়ায় এর খড় উৎকৃষ্ট জ্বালানি হিসেবে এবং খৈল গবাদিপশুর পুষ্টিকর আমিষ ও জৈব সার হিসেবে ব্যবহারযোগ্য।
উক্ত বীজ হস্তান্তর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)-এর ‘ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদনের মাধ্যমে টেকসই-পুষ্টি নিরাপত্তা জোরদারকরণ প্রকল্প (২য় পর্যায়)’-এর প্রকল্প পরিচালক ড. মোঃ শফিকুল ইসলাম এবং এসিআই সিড (ACI Seed, ACI PLC)-এর ডিরেক্টর (R&D and Operations) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান উপস্থিত থেকে বীজ গ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আব্দুল লতিফ। তিনি বলেন, “প্রতি বছর বাংলাদেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় ২৫ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে দেশে উৎপাদিত হয় প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন। ফলে বাকি বিপুল পরিমাণ ভোজ্যতেল আমাদের আমদানি করতে হয়। এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। এই বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে আমাদের ‘এসএইউ ক্যানোলা-১’ সরিষার চাষ সম্প্রসারণে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “দেশে ভোজ্যতেলের উৎপাদন বাড়াতে হলে উচ্চফলনশীল ও স্বাস্থ্যসম্মত জাতের দ্রুত সম্প্রসারণ প্রয়োজন। ‘এসএইউ ক্যানোলা-১’ জাতটি কৃষক পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে দেশে ভোজ্যতেল উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।”
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ বেলাল হোসেন, ট্রেজারার অধ্যাপক মুহাম্মদ আবুল বাশার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেম (SAURES)-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. এফ. এম. আমিনুজ্জামান, প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোঃ আরফান আলীসহ সংশ্লিষ্ট গবেষক ও কর্মকর্তারা।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে ‘এসএইউ ক্যানোলা-১’-এর মতো দেশীয় উচ্চফলনশীল ও স্বাস্থ্যসম্মত জাত কৃষক পর্যায়ে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া আবশ্যক। বিএডিসি ও এসিআই-এর মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে বীজ উৎপাদন ও সম্প্রসারণ করা গেলে এটি দেশের ভোজ্যতেল খাতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।