Friday, September 11, 2026
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠুক কৃষির জ্ঞান, উদ্ভাবন ও নেতৃত্বের প্রধান বাতিঘর
11, Sep 2026 | কৃষিবিদ ও ক্যাম্পাস

ড. মো. তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিনঃ প্রায় নয় দশক ধরে বাংলাদেশের কৃষি শিক্ষা, গবেষণা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে ভূমিকা রাখা রাজধানীর একটি ছায়া সুনিবিড় সবুজ ক্যাম্পাস হলো শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি)। পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ২৫ বছর অতিক্রম করে প্রতিষ্ঠানটি ২৬ বছরে পদার্পণ করছে আজ ১১ই সেপ্টেম্বর। কিন্তু শেকৃবি’র এ বয়সকে কেবল ২৫ বছরে সীমাবদ্ধ করলে এর প্রকৃত ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। এর প্রাতিষ্ঠানিক শিকড় ১৯৩৮ সালে, অর্থাৎ প্রায় ৮৭ বছর আগে।

১৯৩৮ সালের ১১ ডিসেম্বর ‘দ্য বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট’ নামে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল এ প্রতিষ্ঠানের, সময়ের সঙ্গে তার কাঠামো, নাম ও দায়িত্ব বদলেছে। দীর্ঘ বিবর্তনের পর ২০০১ সালে জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে। রাজধানীর বুকে একটি বিশেষায়িত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে স্বপ্ন ছিল-দেশের কৃষির জন্য দক্ষ জনবল তৈরি, গবেষণা বাড়ানো এবং কৃষি জ্ঞানকে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করা। আজ সেই প্রয়োজন আরও বহুগুণ বেড়েছে।

একসময় কৃষির প্রধান প্রশ্ন ছিল কীভাবে বেশি খাদ্য উৎপাদন করা যায়। এখন প্রশ্নটি অনেক বেশি জটিল। কীভাবে কম জমিতে বেশি উৎপাদন করা যাবে? কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা করে কৃষি টিকিয়ে রাখা যাবে? কীভাবে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা যাবে? কীভাবে কৃষিপণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভারী ধাতুর ঝুঁকি কমানো যাবে? কীভাবে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা যাবে? কীভাবে কৃষক উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাবেন? কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, সেন্সর, ড্রোন ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তিকে কৃষিতে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে? অর্থাৎ কৃষির চরিত্র বদলে গেছে। তাই রাজধানীর প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বও বদলাতে হবে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ঐতিহ্য। ১৯৩৮ থেকে ২০২৬ এই দীর্ঘ সময়ে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার বিবর্তনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। অসংখ্য কৃষিবিদ, শিক্ষক, গবেষক, প্রশাসক ও পেশাজীবী এই প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে দেশের কৃষি খাতকে সমৃদ্ধ করেছেন। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু তার অতীতের অর্জন দিয়ে মাপা যায় না। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো তার বর্তমান সক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুুতি কতটা শক্তিশালী। এখানেই শেকৃবির সামনে বড় প্রশ্ন।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হলো গবেষণা। কিন্তু গবেষণা যদি শুধু থিসিস, জার্নাল আর প্রকাশনার সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তার সামাজিক মূল্য সীমিত হয়ে যায়। বাংলাদেশের কৃষক যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হচ্ছেন, সেগুলোকে গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। মাটির উর্বরতা কমে যাওয়া, লবণাক্ততা, খরা, জলাবদ্ধতা, নতুন রোগ-পোকামাকড়, কৃষিতে প্লাস্টিক দূষণ, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ, কৃষিপণ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, খাদ্যে ভারী ধাতুর দূষণ, নিরাপদ খাদ্য, পোস্টহারভেস্ট লস এসব সমস্যা কেবল বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয় নয়; এগুলো জাতীয় অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন। শেকৃবি’র গবেষণার বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত "Research for Farmers, Research for Food, Research for the Future" গবেষণার ফল মাঠে না পৌঁছালে গবেষণার পূর্ণ মূল্য পাওয়া যায় না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার থেকে কৃষকের মাঠ পর্যন্ত প্রযুক্তি হস্তান্তরের একটি শক্তিশালী কাঠামো প্রয়োজন।

শেকৃবির গবেষণা অবকাঠামো নিয়ে আলোচনায় আবেগের পরিবর্তে বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। রাজধানীর বুকে একটি কৃষি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান হয়েও কেন অনেক এতদিনে অনেক এগুতে পারলোনা? বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় প্রায় ১৪ একরের যে গবেষণামাঠ আছে সেখানে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা নিয়মিত গবেষণা পরিচালনা করেন সংখ্যাায় যা ২০০-৩০০টির মত হতে পারে। এত অল্প জায়গায় এই পরিসংখ্যান গবেষণা কার্যক্রমের ব্যাপ্তি যেমন তুলে ধরে, তেমনি গবেষণামাঠের ওপর চাপের বিষয়টিও সামনে আনে। একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার জন্য যেখানে শত শত একর এর জমি প্রয়োজন সেখানে শুধু মাত্র ১৪ একর জমি কি যথেষ্ট? 

প্রশ্ন হল রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন এই ২৫ বছরে এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেলো না? যদিও একসময়ের এ প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকা পাশের পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠটি বহুবার সাময়িকভাবে গবেষণার মাঠ হিসেবে নেওয়ার জন্য আলোচনায় এসেছে এবং বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এখানকার ছাত্র-শিক্ষক কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নিজেরা টাকা উঠিয়ে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা খরচ করে এর চতুর্দিকে কাটাতারের বেড়া ও মাঠে মাটি ফেলে গবেষণার জন্য প্রস্তুত করছিলেন কিন্তু পরবর্তীতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বাধার কারণে আর এর কাজ খুব বেশি এগোয়নি বলে জানা যায়। এদিকে ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায় জমি বরাদ্ধ দেওয়ার বিষয়টিও দীর্ঘ দিনের আলোচনার। তাই গবেষণাকে সম্প্রসারণের জন্য যত দ্রুত গবেষণার জমি বরাদ্ধ হবে ততই দ্রুত এ দেশের কৃষি আরো এগিয়ে যাবে।

একইভাবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ল্যাবগুলি আছে সেগুলিই বা কতটা আধুনিক? প্রয়োজনীয় যেসব যন্ত্রপাতি আছে তা কতটা সচল? সেসব যন্ত্রপাতির নিয়মিত ক্যালিব্রেশন হয় কিনা? প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল ও কনজ্যুমেবলস সময়মতো পাওয়া যায় কিনা? দক্ষ টেকনিক্যাল জনবল আছে কিনা? এসব প্রশ্নের উত্তরই একটি গবেষণাবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সক্ষমতা নির্ধারণ করে। তাই শেকৃবির জন্য প্রয়োজন একটি Research Infrastructure Master Plan যেখানে আগামী ১০-১৫ বছরে কোন ল্যাব কীভাবে আধুনিক হবে, কোন যন্ত্র কখন প্রতিস্থাপন হবে, কী ধরনের নতুন গবেষণামাঠ প্রয়োজন এবং গবেষণা সহায়ক জনবল কীভাবে বাড়ানো হবে তার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকবে।

ঢাকার ভেতরে জমি সম্প্রসারণের সুযোগ যেহেতু স্বাভাবিকভাবেই সীমিত, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য রাজধানীর বাইরে এক বা একাধিক Satellite Research Farm  প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আর এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন কৃষি-অঞ্চলকে গবেষণার আওতায় আনা সম্ভব। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরা, হাওর এলাকায় জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যা, চরাঞ্চলে বালুময় মাটি এবং পাহাড়ি এলাকায় ভিন্নধর্মী কৃষি ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পরিচালনা করা যেতে পারে। এ ধরনের গবেষণামাঠ শুধু শেকৃবির গবেষণা সক্ষমতা বাড়াবে না; বাংলাদেশের কৃষির অঞ্চলভিত্তিক সমস্যার বাস্তব সমাধান তৈরিতেও ভূমিকা রাখবে। এতে কৃষকের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরত্বও কমবে। বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে তাই শেকৃবির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হতে পারে কৃষকের সমস্যাকে গবেষণার অগ্রাধিকার তালিকায় সর্বোচ্চ স্থানে রাখা।

পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ২৫ বছর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু এটি উদ্যাপনের পাশাপাশি আত্মমূল্যায়নেরও সময়। শেকৃবি কোথায় ছিল, কোথায় এসেছে এবং আগামী ২৫ বছরে কোথায় যেতে চায়-এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। প্রয়োজন হতে পারে একটি Vision 2050 for Sher-e-Bangla Agricultural University। সেখানে গবেষণা, শিক্ষা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শিল্প-সংযোগ, কৃষকসেবা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, স্টার্টআপ, পেটেন্ট, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং সবকিছুর জন্য পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে শিল্প ও কৃষি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যুক্ত করাও জরুরি। গবেষণাগারে তৈরি প্রযুক্তি যদি উদ্যোক্তার মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছায়, তবেই গবেষণার অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি হবে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন শেকৃবি কত পুরোনো তা নয়; বরং আগামী দিনের কৃষির জন্য শেকৃবি কতটা প্রস্তুত তা আমাদের ভাবতে হবে। বাংলাদেশের কৃষি আজ উৎপাদন থেকে নিরাপত্তা, খাদ্য থেকে পুষ্টি, জমি থেকে প্রযুক্তি এবং কৃষক থেকে উদ্যোক্তার নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কেও বদলাতে হবে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে তাই তিনটি বড় দায়িত্ব-ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ, গবেষণাকে আধুনিকীকরণ এবং কৃষির ভবিষ্যৎকে নেতৃত্ব দেওয়া। ৮৭ বছরের ঐতিহ্য তার শক্তি, ২৫ বছরের বিশ্ববিদ্যালয়-অভিজ্ঞতা তার অর্জন। এখন প্রয়োজন এই দুই শক্তিকে একত্র করে নতুন উচ্চতায় পৌঁছানো। ঐতিহ্যের শেকড় আরও গভীরে যাক, গবেষণার ডানা আরও বিস্তৃত হোক আর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠুক বাংলাদেশের কৃষির জ্ঞান, উদ্ভাবন ও নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান বাতিঘর।

লেখক-অধ্যাপক, কৃষি রসায়ন বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

Agrilife24 Logo

Agriculturist Md. Shafiul Azam, Editor & CEO
Dhaka Office: 141/4, Lake Circus, Kalabagan, Dhanmondi, Dhaka-1205.
Bogura Office: Hakim Son's House, Seujgari, Bogura-5800.
Email: info@agrilife24.com, editor@agrilife24.com, news@agrilife24.com
Contact: +880 2-48112812, Whatsapp: +880 1912-837-999

Social Share

© Agrilife24 . All Rights Reserved. Developed by Innovative Soft