Friday, October 16, 2026
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মাঠে সচিবালয় নয়-উন্নয়ন হোক, তবে সবুজ, ঐতিহ্য ও গবেষণার বিনিময়ে নয়
15, Oct 2026 | গবেষণা ও ফিচার

অধ্যাপক ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন, কৃষি রসায়ন বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
রাজধানী ঢাকা বা তার আশে পাশে আধুনিক, নিরাপদ ও কার্যকর সচিবালয় নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই প্রয়োজন পূরণ করতে গিয়ে যদি নগরীর অবশিষ্ট সবুজ পরিসর, জাতীয় স্থাপত্য,ঐতিহ্য এবং একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার স্বার্থ ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাহলে প্রকল্পের স্থান নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। কারণ উন্নয়ন মানে শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ নয়; এর প্রকৃত সার্থকতা মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য নগরী নিশ্চিত করার মধ্যে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মাঠ হিসেবে পরিচিত পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা তাই নিছক জমির ব্যবহার পরিবর্তনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঢাকার নগর পরিকল্পনা, জাতীয় ঐতিহ্য, পরিবেশের ভারসাম্য এবং কৃষি গবেষণার ভবিষ্যৎ। এ অবস্থায় সরকারের উচিত পরিকল্পনাটি পুনর্বিবেচনা করা, সম্ভাব্য প্রভাব নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা এবং বিকল্প স্থানগুলোর উপযোগিতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

ঢাকা কি শুধু ইট-পাথরের নগরী হবে?
যানজট, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, জলাবদ্ধতা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির চাপে ঢাকার নগরজীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যমান খোলা জায়গা ও সবুজ পরিসর সংরক্ষণ বিলাসিতা নয়, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত নিরাপত্তার প্রয়োজন। গাছপালা নগরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করে এবং জীববৈচিত্র্যের আবাস গড়ে তোলে। পাশাপাশি পার্ক, মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গা নাগরিকদের হাঁটা, ব্যায়াম ও মানসিক প্রশান্তির সুযোগ দেয়। এসব পরিসর একবার হারিয়ে গেলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন ও ব্যয়বহুল।

তাই বাণিজ্য মেলার মাঠের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে শুধু জমির প্রাপ্যতা কিংবা নির্মাণের সুবিধা বিবেচনা যথেষ্ট নয়। সম্ভাব্য পরিবেশগত ক্ষতি, যানবাহনের চাপ, পানি নিষ্কাশন এবং জনজীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও সমান গুরুত্ব পেতে হবে। রাজধানীর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমি-ব্যবহার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এই নীতি অনুসরণ করা জরুরি।

জাতীয় স্থাপত্যঐতিহ্য রক্ষায় চাই সতর্কতা
জাতীয় সংসদ ভবন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যকীর্তি। স্থপতি লুই আই কানের নকশায় নির্মিত এ ভবনের স্বাতন্ত্র্য শুধু এর কাঠামোয় নয়; নকশা, জলাধার, উন্মুক্ত পরিসর ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ মিলেই এর স্থাপত্যিক সৌন্দর্য গড়ে উঠেছে। একইভাবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার মাজারসহ সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক পরিসরের পরিবেশ ও মর্যাদাও নগর পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

বড় কোনো সরকারি স্থাপনা নির্মাণের প্রভাব নির্মাণস্থলের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। ভবনের উচ্চতা, দৃশ্যমানতা, নিরাপত্তাব্যবস্থা, যানবাহনের চলাচল ও শব্দ আশপাশের এলাকার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এসব বিষয়ে অনুমানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন।

প্রস্তাবিত প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, নির্মাণবিধি এবং ঢাকা মহানগরের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা-ও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। জাতীয় সংসদ ভবনের স্থাপত্যিক পরিবেশ ও সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক স্থানগুলোর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে সমীক্ষা প্রকাশ করা হলে সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।

কৃষি গবেষণার জমি অব্যবহৃত সম্পত্তি নয়
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বাংলাদেশের কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার দীর্ঘ পথচলার সঙ্গে যুক্ত। ১৯৩৮ সালের ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ঢাকায় কৃষিশিক্ষার এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপন করেন। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। ঐতিহাসিকভাবে এর অধীন থাকা জমির পরিসর বিভিন্ন সময়ে সংকুচিত হয়েছে। এই ইতিহাস ও জমিসংক্রান্ত দাবিগুলো প্রাসঙ্গিক নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাঠপর্যায়ের গবেষণা, ব্যবহারিক শিক্ষা, নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষা এবং কৃষির বাস্তব সমস্যা সমাধানে উপযুক্ত জমি অপরিহার্য। জলবায়ু পরিবর্তন, মাটির স্বাস্থ্য, লবণাক্ততা, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও পানি দূষণের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষি গবেষণার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। এ বাস্তবতায় গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জমিকে কেবল অব্যবহৃত সরকারি সম্পত্তি হিসেবে দেখা দূরদর্শী হবে না। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত স্থানের মালিকানা, অধিগ্রহণের ইতিহাস, বর্তমান ব্যবহার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে এর প্রকৃত সম্পর্কও নথি ও বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি এবং সরকারের পরিকল্পনা উভয়কেই স্বচ্ছ পর্যালোচনার আওতায় আনা জরুরি।

বিকল্প যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়
সচিবালয় নির্মাণের জন্য বাণিজ্য মেলার মাঠই কি একমাত্র উপযুক্ত স্থান? এ প্রশ্নের উত্তর নির্ধারিত হওয়া উচিত তুলনামূলক সমীক্ষার মাধ্যমে। বিদ্যমান সরকারি স্থাপনার কার্যকর ব্যবহার, অন্য উপযুক্ত সরকারি জমি এবং পূর্বাচলের মতো বিকল্প স্থানের সম্ভাব্যতা যাচাই করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের পক্ষ থেকে পূর্বাচলকে বিকল্প হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেটিসহ সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর জমির উপযোগিতা, যোগাযোগব্যবস্থা, নির্মাণব্যয়, নিরাপত্তা, পরিবেশগত প্রভাব ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনব্যয় তুলনা করে দেখা প্রয়োজন।
সরকারের কাছে এ বিষয়ে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি-প্রথমত, বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় নির্মাণের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম স্থগিত রেখে পরিকল্পনাটির পূর্ণাঙ্গ পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিবেশ, যানজট, পানি নিষ্কাশন, সবুজ পরিসর ও ঐতিহাসিক স্থাপনার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন প্রকাশ করতে হবে। তৃতীয়ত, বিকল্প স্থানগুলোর তুলনামূলক সমীক্ষা জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।

পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক, স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতামত গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রকল্পের যৌক্তিকতা, জমির ব্যবহারসংক্রান্ত নথি এবং মূল্যায়নের ফলাফল প্রকাশ করা হলে জনমনে বিভ্রান্তি কমবে এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা বাড়বে।

উন্নয়ন ও পরিবেশের সহাবস্থানই হোক লক্ষ্য
প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ সংরক্ষণ পরস্পরবিরোধী নয়। আধুনিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন পরিকল্পনা গ্রহণ করা, যাতে প্রশাসনিক প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি জাতীয় ঐতিহ্য, নগরবাসীর অধিকার এবং শিক্ষা ও গবেষণার স্বার্থও সুরক্ষিত থাকে। আজকের সিদ্ধান্তের প্রভাব আগামী বিশ কিংবা ত্রিশ বছর পরের ঢাকাতেও থাকবে। তখনকার নাগরিকেরা পর্যাপ্ত সবুজ পরিসর পাবেন কি না, কৃষির শিক্ষার্থীরা গবেষণার সুযোগ পাবেন কি না, জাতীয় স্থাপত্যঐতিহ্যের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন থাকবে কি না এসব প্রশ্ন এখনই বিবেচনায় নিতে হবে। স্বল্পমেয়াদি প্রশাসনিক সুবিধার জন্য দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই সিদ্ধান্তের মূল্য পুরো নগরীকে দিতে হবে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মাঠে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা তাই পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন ও বিকল্প যাচাইয়ের ভিত্তিতে পুনর্বিবেচনা করা উচিত। প্রয়োজনীয় সমীক্ষা শেষ হওয়ার আগে অপরিবর্তনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সমীচীন নয়। আমরা আধুনিক সচিবালয় চাই, দক্ষ প্রশাসন চাই, পরিকল্পিত নগরায়ণও চাই। কিন্তু এসব অর্জনের জন্য ঢাকার অবশিষ্ট সবুজ পরিসর সংকুচিত করা কিংবা কৃষি গবেষণার সম্ভাবনা ক্ষুণ্ন করা অনিবার্য হতে পারে না। সরকারকে এমন বিকল্প বেছে নিতে হবে, যা প্রশাসনিক প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

ঢাকাকে শুধু প্রশাসনিক ভবনের রাজধানী নয়, ইতিহাস, স্থাপত্য, প্রকৃতি, শিক্ষা ও গবেষণার সমন্বয়ে একটি বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। উন্নয়ন হোক কিন্তু সবুজ, ঐতিহ্য ও গবেষণাকে বিসর্জন দিয়ে নয়।

Agrilife24 Logo

Agriculturist Md. Shafiul Azam, Editor & CEO
Dhaka Office: 141/4, Lake Circus, Kalabagan, Dhanmondi, Dhaka-1205.
Bogura Office: Hakim Son's House, Seujgari, Bogura-5800.
Email: info@agrilife24.com, editor@agrilife24.com, news@agrilife24.com
Contact: +880 2-48112812, Whatsapp: +880 1912-837-999

Social Share

© Agrilife24 . All Rights Reserved. Developed by Innovative Soft